
যাত্রাপথের আনন্দ-গান ৪
(বঙ্গবন্ধু)
বড় গোল চাকাটা খুব টানে। ইয়া ঘেরের সাদা পাজামা আর হালকা মেরুন পাঞ্জাবি পরা মানুষটাকে তখন অন্যগ্রহের জীব মনে হয়। যেন দেবদূত। টিকালো নাক, মুখের মধ্যে খচখচ করছে পান, মাঝেমধ্যেই লাল জিভ বের করে হাতের আঙুলের মাঝে চিপকে থাকা পানের বোঁটা জিভে ছোঁয়াচ্ছে। টানটান সোজা বসে আছে আর চাকতিটাকে একবার ডাইনে একবার বাঁয়ে ঘোরাচ্ছে। পা দু’টো পালা করে ঢেঁকির মত উঠছে-নামছে। বালক কল্পচোখে নিজেকে লোকটার সীটে দেখতে পাচ্ছে। সামনের বড় কাচের ধারে আড়াআড়ি জায়গাটায় সে বসবেই। অনেকটা ইংরেজি “K” অক্ষরের মত লোহার রড, রডের মাথায় কালো রবার ডিউজ বলের মত অংশটাকে বাম হাত দিয়ে পেছনে সামনে ধারের দিকে সজোরে ঠেলছে লোকটা। ডানদিকের জানলার বাইরে রবারের বড় চোঙওয়ালা ভেঁপু। সদ্যবৃষ্টির পরে খালবিল থেকে ভেসে আসা ব্যাঙের ডাকের মত গুরুগম্ভীর শব্দ বের হয় ভেঁপু থেকে। খটাস ক’রে লোহার দরজা খুলে বেশ খানিকটা উঁচু সিঁড়িতে পা দিয়ে অদ্ভুত কায়দায় লোকটা উঠে আসে ভিতরে। নিজের জায়গায় বসামাত্রই মুখটা কঠোর হয়ে যায়, অথচ অল্প আগেও নিচে দাঁড়িয়ে হাসিঠাট্টা করছিল অন্যদের সাথে। লোকটার মুখের বাম দিকটাই দেখতে পাচ্ছে বালক। মনে হচ্ছে অরণ্যদেবের মত বেগুনি মুখোশ যদি থাকতো লোকটার মুখে, তাহলে কী দারুণ-ই না মানাতো! নাকটা অমনই তো! বাস চলতে আরম্ভ করেছে।
মা আর ভাইয়ের সাথে বালক চলেছে মামাবাড়ি। কদিন কী মজা-ই না হবে। বাড়িতে বড়রা চা খেতে দেয় না। রোজ রোজ হরলিক্স কি আর ভালো লাগে! সাতসকালে বাড়ির কাছের বেকারি থেকে ভাঙা বিস্কুট আসে, বড়রা চা-বিস্কুট খায়। বালক খায় হরলিক্সে ডুবিয়ে। মামাবাড়িতে সবাইকে চা দেয়। দিদা মাটির উনুনের ভিতর কাঠের গুঁড়ো ভর্তি করে একটা লম্বা পাইপ উনুনে ঢুকিয়ে সমানে ফুঁ দেয়। বড় কেটলিতে সবার জন্য চা তৈরি হয়— দু’বেলা। কেটলির ঢাকনিটা টং-টং শব্দ করে অল্প ওঠে-নামে, চা-এর গন্ধে ম-ম করে মাটির রান্নাঘর। মা বলে এটা নাকি গুড়-চা। বালকের চা আর বাতাসার প্রতি লোভ খুব বেশি। দাদুর গালামালের দোকানে সাদা কাপড়ের তোষকগুলো থেকে সোঁদা গন্ধ বের হয়। জামার হাতা গোটানোর মত করে অনেকগুলো বস্তা গোটানো, তাতে এটা সেটা জিনিস। সবগুলো সে চিনতেও পারে না। তবে, ক্যাশবাক্সের সামনে দাদু যেখানে বসেন, তার পিছনে কাঠের পার্টিশান, সেখানে একটা গোটানো বস্তায় বাতাসা আর বাতাসা। আলিবাবা চল্লিশ চোর গল্পে গুহার ভিতর এমনই নাকি অনেক বস্তা ছিল! সেগুলো থেকে মাটিতে উপচে পড়ে মোহর-সোনা-হিরে আর জহরত! বালকের কাছে বাতাসা ভর্তি বস্তাটাই যেন চল্লিশ চোরের গুহায় লুকোনো বস্তা। টুপটাপ মুখে দিতে থাকে বাতাসা। দাদু, মামা কেউ টের পায় না, টের পেলেও কেউ কিচ্ছু বলে না। কী মজা!
পাশাপাশি, সামনে-পিছনে, কত রকমের দোকান। অল্প এগোলে সার সার টিনের চালাঘর। এখানে সোম আর শুক্রবারে হাট বসে। সামনে বিশাল মাঠ। হাটের দিনে কত গোরু আর ঘোড়া। কী বিশ্রী গন্ধ! মা বলেছে ঘোড়ার হাগু যেন পা-য় না লাগে। লাগলে সেপটিক হয়ে যায়। ধনুষ্টঙ্কার ব’লে একটা রোগ হয়, শরীর নাকি ধনুকের মত বেঁকে যায়। বালকের পা-য় নেপালের হাওয়াই চপ্পল। ফিতেগুলো কী সুন্দর, রঙিন মোমের মত। চপ্পলটাও পুরু, পা-য় ঘোড়ার হাগু লাগবে কী করে! হাটের সামনের মাঠে গিজগিজ করছে মানুষ আর মানুষ। বালক টো-টো করে পুরো মাঠ চক্কর দেয়। মাঠের একদিকে নিচে প্লাস্টিক বিছিয়ে একটা লোক জড়িবুটি বিক্রি করে। অনেক লোক তাকে বৃত্তাকারে ঘিরে থাকে। বিক্রেতা অদ্ভুত অদ্ভুত সব কথা বলে। বলে— অমুক শেকড়টা হাতে বাঁধলে আর ‘স্বর্ণসিন্দুর’ পাথরের হামানদিস্তায় বেঁটে সকাল বিকেল খেলে শক্তি খুব বাড়বে। বালক সেইসব কথার মাথামুণ্ডু কিচ্ছু বুঝতে পারে না। ঘিরে থাকা বয়স্ক আর অল্পবয়সী লোকগুলোও শেকড় কেনে, ফিসফিস করে বিক্রেতাকে কী যেন জিজ্ঞেস করে। বিক্রেতাও মাথা নেড়ে নেড়ে উত্তর দেয়। এদের অনেককেই মামা অথবা দাদু বলে ডাকে বালক। মামাবাড়িতে সবাই মামা অথবা দাদু-ই তো হয়, না?

সারা দুপুর ছাড়া গোরুর মত ঘুরে বেড়ানোই কাজ। হাঁটু অবধি ধুলোয় সাদা। ক্ষিদে পেলেই দাদুর দোকানে গিয়ে হয় বাতাসা, নয়ত মামার থেকে পয়সা নিয়ে বাদাম দেওয়া শক্ত চিটেগুড় কিনে খাওয়া। দাদু ক্যাশবাক্সে ব্যস্ত, তাই বাতাসা নেওয়া সেভাবে তাঁর নজরে পড়ে না। তবে, বালকের নজর গোরুর হাটের দিকে। দাঁতের পাটি দেখে-দেখিয়ে গোরু কেনা-বেচা দেখেছে সে। তবে, ঘোড়া বিক্রির হাট সে এড়িয়ে চলে— সেপটিক হবার ভয়ে।
সন্ধ্যায় চা-মুড়ি-খই খেয়ে দে ছুট দাদুর দোকানে। অন্ধকার মাঠটায় বড় বটগাছ আর পাকুড় গাছ। চারদিক নিস্তব্ধ, দূরের বাড়িগুলোয় কুপির আলো টিমটিম করছে। গোবরের গন্ধ আর ধানের গন্ধে ম-ম করছে কার্তিক মাসের সন্ধ্যা। ভয়-ভয় করে একটু-আধটু। ছুটে দোকানের কাছাকাছি যেতেই আশেপাশে অনেক হ্যাজাকের আলোয় ভয় কেটে যায়। দাদু বসে আছে সাদা পাশবালিশে হেলান দিয়ে। দাদুর বন্ধুরা চলে এসেছেন আড্ডা দিতে। তাদের কথাবার্তায় মাঝেমধ্যেই উচ্চারিত হচ্ছে “জয়বাংলা”.. বালক কিছুতেই বুঝতে পারছে না কেন সবাই “জয়বাংলা” বলছে! কাঠের পার্টিশানে ঝোলানো রয়েছে দুটো বড় ছবি। একজন পুরুষ, একজন মহিলা। মহিলাটিকে বালক খবরের কাগজে দেখেছে। মাথার চারদিকে কালো চুল, অথচ, কপালের সামনে থেকে পিছন পর্যন্ত সাদা। কী সুন্দর দেখতে! উনি ইন্দিরা গান্ধী। পুরুষ মানুষটির চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। দেখলেই সমীহ জাগে। তাঁর ছবিতে সাদা মালা ঝুলছে। গল্পরত দাদুদের মুখে শুনেছে, দুই বছর আগে এই ভদ্রলোক-কে সপরিবারে গুলি করে মেরে ফেলা হয়েছে। রাত হয়েছে। এবার দোকান বন্ধ করে দাদু আর মামার সাথে ঘরে ফেরার পালা। দাদুর হাতে পাঁচ ব্যাটারির টর্চ। টর্চের আলো বটগাছটার মাথায় পড়তেই হু-হু করে কান্না দলা পাকিয়ে উঠল গলার কাছে— ছয় বছরের বাচ্চাটা আর শেখ মুজিবর রহমানের জন্য!

[পরম্পরা ওয়েবজিন, সেপ্টেম্বর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

কী ফোটোগ্রাফিক মেমোরি ! নিজের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো ভেসে আসছে যেন! অর্ধেক কথা ভুলেই গিয়েছিলাম।
Too good….Rajid da has an unique sense of telling stories….so vivid…so light…yet so heavy after completing!
This one is no exception!
Waiting for more Rajibda…