

শেষে দিল রা-(ছয়)
এতো বছর ধরে হাসপাতালের আউটডোরে, ক্লিনিকে যাঁদের দেখলাম তাঁদের একটা অংশের ভাবনাচিন্তা এবং আচরণ একটু অন্যরকম। কথাবার্তা কিম্বা সামাজিক অসঙ্গতির কারণে পরিবারের লোকজন অথবা সাধারণ মানুষের চোখেও এনারা অস্বাভাবিক।
এঁদের অনেকেই নিজেদের মনগড়া জগতের বাসিন্দা এবং সেটাকেই তাঁরা একান্ত বিশ্বাসও করেন।
সংখ্যার বিচারে এই অংশটা গরিষ্ঠ না হলেও মনোরোগের ধোঁয়াশা কুন্ডলী পাকায় এঁদের ঘিরেই।
চলতি কথায় এঁরা সাইকোটিক, পাগল।
লোকে এদের নিয়ে অস্বস্তিতে থাকে,ভয় পায়।
কারণ এরা কখন কী যে করবে তার ঠিক নেই। সমাজের একটা বড়সর অংশের মানুষের ধারণা এসব কক্ষনও সারে না। অতএব এরা খরচের খাতায়।
প্রায় ষাট সত্তর বছর আগে,যখন মনের অসুখের ওষুধ এলো, তখন তার নাম হ’ল অ্যান্টিসাইকোটিক! সাইকোটিকদের ঠান্ডা করে দেবে, শুইয়ে দেবে– তাই এর আরও একটা নামকরণও হ’ল, মেজর ট্রাঙ্কুলাইজার।
বিগত কয়েক দশকে সারা পৃথিবীতে নিত্য নতুন ওষুধের আবিষ্কার এবং প্রয়োগেও এই ধন্ধ কাটেনি আজও।
তাই হাজার প্রশ্নের পর,সব আলোচনা সাঙ্গ হওয়ার পরও শুনতেই হয়–“ওষুধটা কিছুদিন আর দিইনি ডাক্তারবাবু, ভালই তো ছিল!”
এইসব মেজর মেন্টাল ডিসঅর্ডার এর শুরুটা প্রায়ই বয়ঃসন্ধি অথবা যাকে বলে ঐ ইয়াং অ্যাডাল্টহুড। আর এই সময়ই আমরা উদ্বিগ্ন চিত্তে বেশি সাবধানী হতে গিয়ে বেশি বিপদ ডেকে আনি।
রোগ এবং তার ওষুধ থাকলেও দুটো দিকের মাঝের সাঁকোটা কিছুতেই গড়ে ওঠেনা!
লিখতে লিখতেই অঞ্জলি-র মুখটা মনে পড়ল।
অবাঙালী পরিবারের মেয়ে, সতেরো বছরে প্রথমবার সাইকোসিস । হাসপাতালের চিকিৎসায় যখন প্রায় সেরে উঠছে, তখন ভাল পাত্র পাওয়া গেল। বিয়ের মাসপাঁচেকের মাথায় ফিরেও এল সে। বিধ্বস্ত, ক্ষতবিক্ষত অবস্থায়।
এরপর থেকেই কখনও একটানা ওষুধ খাওয়ানো যায়নি অঞ্জলিকে। মাঝে মাঝেই বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। শ্বশুরবাড়ি যাবে বলে ট্রেনে উঠে পড়ে। বার দুয়েক মারধর খেয়ে ফিরল।
একদিন সে এল সালাঙ্কারা বধূর সাজে। লাজুক হাসি তার চোখেমুখে, অ্যাত্তো বড়ো ঘোমটা মাথায়।
বললাম, বর কই?
আবার লজ্জিত,
হি ইজ ভেরি বিজি! সুটিং আছে না?
পাশেই বসে থাকা বাবা বললেন, ওকে শাহরুখ খান বিয়ে করেছে বলছে!
ওষুধ টষুধ খাচ্ছে না, শাহরুখই বারণ করেছে নাকি!
বেশ কিছুদিন চলল এমন।
ঘরের কাজও চলছে আর মকাই কা রোটি পাকানোর সাথে কল্পনার স্বামীর জন্য প্রতীক্ষাও চলছে।
ওষুধ চলতে চলতে এই ভাবনাটা খানিক ফিকে হ’ল বটে, কিন্তু শাহরুখ থেকেই গেল। এটা তখন আর সাইকোসিস নেই, অসহায় একটা মেয়ের বেঁচে থাকার ফ্যান্টাসিই বলব আমি।
আরও একজনের কথা বলি। তেইশ চব্বিশ বছরের ছেলে,নাম রতন। হাসপাতালে আসার দিনসাতেক আগে থেকেই খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। ডিহাইড্রেটেড, ভর্তি করতেই হওয়ার পর জানলাম, রোজ সকালে ঘুম ভাঙলেই সে দু’পাশে দুটো হাত মেলে দিয়ে খোলা উঠোনে দাঁড়িয়ে যায়।
রোদ, বৃষ্টি যাই-ই হোক, সারাদিন এইরকম।
কথা বলে জানলাম, কিছুদিন আগেই ও বুঝে গেছে গাছেদের মতোই ফোটোসিন্থেসিস করতে পারে সে। অতএব, আলাদা করে খাওয়ার আর দরকারটা কি?
আপনাদের অবাক লাগতেই পারে, তবে এ হ’ল সাইকোসিস– যেখানে রিয়ালিটি কনট্যাক্ট এর অভাবটাই দস্তুর।
অন্যদিকে এ ঘটনাটাই যদি অনেকেই মানত, বিশ্বাস করত, তখন কিন্তু কেউ আর একে সাহস করে মনের রোগ বলত না। সমাজের আশি নব্বই ভাগ লোকই তো ভূত, ভগবান, তাবিজ, আংটি কতো কী বিশ্বাস করে দিব্যি শান্তিতে আছে, কেবলমাত্র অনেক লোকে বিশ্বাস করা ছাড়া তারই বা ভ্যালিডিটি কি?
এগুলোও আসে ভয় থেকে।
সারভাইভাল মেকানিজমের খেলায় মানুষের জীবনে ভয়ই ভগবান।
এই মানুষেরই একটা বেশ বড় অংশ চিকিৎসকের কাছে নিয়মিত আসেন। নিশ্চিত হতে চান, সব ঠিকঠাক আছে তো?
কিন্তু নিরাপত্তার অভাব বোধটা যদি অনেক গভীরে শিকড় গাড়ে, তখন? অতিরিক্ত চিন্তা, অমূলক ভয়কে নিশ্চিন্তির মোড়কে বাঁধতে গিয়ে আরও উপসর্গ ডেকে আনা। শেষমেশ এঁরাও আসেন আমাদের কাছে। বহুকাল থেকেই একে নিউরোসিস অথবা সাইকোনিউরোসিস বলে।
কারও উদ্বেগের কারণ শরীর। উঁচু সিঁড়ি ভাঙতে গিয়ে হাঁফ ধরল, হৃৎপিন্ড একটু বেশিই চঞ্চল হ’ল– হার্ট অ্যাটাক হবে না তো? খুঁজে খুঁজে সর্বত্র এঁরা কিছু না কিছু অসঙ্গতি আবিষ্কার করবেনই করবেন।
উদ্বেগ ছাড়াও এখানে সাংঘাতিক একটা নেগেটিভ মন জুড়ে থাকে ,যা কিছুতেই সন্তুষ্ট হয়না। কাজেকাজেই যতই অ্যাসিওরেন্স দিই না কেন এঁদের খুশি করা মুশকিল! ঘুরেফিরে এঁরা সেই প্রথম পয়েন্টেই পড়ে থাকেন– শেষমেশ এঁদের দেখলেই অনেকে পালান,বিরক্ত হন, অবশ্য তাতে তাঁদের খুব বেশি আসে যায় কি?
উদ্বেগ এবং এই নেগেটিভিটি ছাড়াও এখানে আরও একটা ফ্যাক্টর উপস্থিত, সেটা ইনসিকিওরিটি! নিরাপত্তার অভাব বোধ! সেই কারণেই হয়ত এঁরা সকলের কাছ থেকেই একটা মানসিক সাপোর্ট, একটা ভ্যালিডেশন চান। যদিও শেষ পর্যন্ত কারও কথাই শোনেন না।
একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরেই মনে করেন, এটা কি ঠিক হ’ল? নাহ্, আগেই যেটা ভেবেছিলাম সেটা হলেই ভাল হ’ত। এ এক উভয়বল, অ্যাম্বিভালেন্স!
–মেয়ের কাছে বেড়াতে গেছেন মা, মুম্বাই তে। মেয়ে জামাই দুজনেই ব্যস্ত। গোটা বাড়িতে ঠাকুর ঘর টর নেই, তাতে কি– টিভি সেটের পাশেই একটা রাধাকৃষ্ণর মাঝারি সাইজের বাঁধানো ছবি আবিষ্কার করেছেন মা। এবার তো পুজোও করতে হয়! দেখা গেল কোষাকুষি ছাড়া পুজোর বাকি সব উপকরণ আছেই।
কলকাতায় ফোন গেল পুরুত মশাই এর কাছে, ঠাকুরমশাই চামচ বাটি তে হবে?
পুরোহিত মানুষকে সাইকোলজিও জানতে হয়, বললেন, খুব হবে, ভালই হবে!
পরদিন আবার ফোন।
ঠাকুরমশাই! অঘটন ঘটে গেছে! যে বাটিটা কোষা করেছিলাম, ওটা না, আঁশের!
এত দুশ্চিন্তা হচ্ছে, কাল সারারাত ঘুমোইনি! কী হবে?
— ধাতুর জিনিসে সমস্যা নাই!
পুরোহিত মশাই সামলান এযাত্রায়।
শরীর নিয়েও এমন অনেক অনেক কিছু চলে। দিল্লি,বম্বে, ভেলোর, চেন্নাই ছোটাছুটির পর সাময়িক শান্তি। পুরোপুরি কখনই নয়। কারণ ভেতরে ভেতরে টেনশনের যে চাকাটা ঘুরছে, সেটা অসম্পূর্ণ হওয়ায় ঘুরেফিরে সেইই আমড়াতলার মোড়ে।
বরাবরই এঁদের ঘিরেই ইন্ডাস্ট্রির অনেক কিছু দাঁড়িয়ে থাকে। চিকিৎসা জগতে এই যে এত এত ইনভেস্টিগেশন, তার একটা বড়সর অংশের গ্রাহক এই নিউরোসিসের ভোক্তারা।
বলা হচ্ছে,কোনও সিটিস্ক্যান, কোনও এম আর আই করার প্রয়োজন নেই, দরকার হলে আমিই বলব!
কাকস্য পরিবেদনা! ক’দিন পরেই দামী সেন্টারের বিজ্ঞাপিত মোলায়েম প্যাকেটবন্দী হয়ে এসে যায় রিপোর্টস্! সব ঠিক আছে স্যার! না করলে কেমন একটা খচখচ করছিল মনটা!

সার কথাই বলেছেন, তবু মায়া হয়– আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি থাকলে পৃথিবীর কোথাও কারও উপরেই বিশ্বাস রাখা যায় কি?
অতএব, এ চেষ্টা চলবেই।
সেই কবেই তো মন মেরামতির
শাস্ত্রকারেরা বলে গেছেন, মানুষের টিঁকে থাকার, সারভাইভালের যতক’টি প্রকরণ আছে, তাদের সবক’টির অতিব্যবহার বা ওভার ইউজ করেন এঁরা। এই করাটা শেষমেশ এতদূর পৌঁছায় যে এঁরা কখনই স্বস্তি পান না। ভয় হতে অভয়সাগরে ছুটতে ছুটতে এইসব নিপাট ভালমানুষের দল শেষ অবদি আর কোথাও পৌঁছান না।
সবই তো কল্পনা! দোষ কেবল আমার অঞ্জলির? নাকি রতনের, যে দুনিয়ার খাদ্যসমস্যার সমাধান প্রায় করেই ফেলেছিল?

[পরম্পরা ওয়েবজিন, সেপ্টেম্বর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

খুব ভালো লাগলো ভাই, লেখাটা। একদম সঠিক কথা গুলো খুব সুন্দর বোঝালে।
খুব ভালো লাগছে পড়ছে