
শম্ভুনাথ
শানের ডোবার পশ্চিমপাড়ে একটা আমগাছ। বকুল এসেছে ঝেঁপে। শম্ভুনাথ ছিপ ফেলে বসেছিলো সকাল হতে না হতে। রোদ চচ্চড়িয়ে উঠেছে তখন। গোটা চারেক বাটা আর বড় পুঁটি খানকয়। আর একটা দুটো হলেই উঠে যাবে ভাবছে সেসময় হঠাৎই এসে দাঁড়ালো সুখেনডাক্তার। বিনা বাক্যব্যয়ে শম্ভুর পাশে রাখা থলিটা তুলে তার ভেতর উঁকি মেরে দেখলো, আট দশটি মাছ তার সংগ্রহে। ‘কি করবি রে ছোঁড়া মাছগুলো?’ আমতা আমতা করে শম্ভুনাথ উত্তর দেয়, ‘খাবো’। ‘ছোটো ছেলে ধরে লেগা কটা খানেক। এগুলো আমার বেড়ালটা খাবে’। নিজের নাইলনের ব্যাগে মাছগুলো ঢেলে নিয়ে চলে যায় সুখেনডাক্তার।
শম্ভুনাথের বাবা ভোলানাথ আজ চারদিন হলো কেতুগ্রামে বাবুদের বাড়ির কাজে গেছে। তারপর একদিন ভাত হয়েছিলো। বিগত তিনটি দিন আখের গুড় গোলা খেয়ে ঘুমিয়েছে। আজ ভাত হবে শুনেই শম্ভুনাথ সকালে ছিপ নিয়ে বেরিয়েছিলো।
চোখ মুছতে মুছতে পেট ডোকলা শম্ভু বাড়ির পথ ধরে। সুখেনডাক্তারের বাড়ির আগেই একটা জলের কল। খিদের পেটে কলের মুখটা চেপে বারকয়েক টিউবয়েলে পাম্প দিয়ে জল জমিয়ে নেয়। তারপর কলে চুমুক দিয়ে খানিকটা জল খেয়ে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের জল মুছে ফেলে বাড়ির পথ ধরতেই চোখে পড়ে সুখেনডাক্তারের বাড়ির সামনের চাতালে শুয়ে আছে পোষা বেড়ালটা। সব রাগ গিয়ে পড়ে ওটার ওপর। এক লাথি মারে। বেড়ালটা লাফিয়ে গিয়ে একটা খড়ের পালুইয়ে পড়ে। ‘মাছ খাবে শালো। আমার মাছগুলো খেতে দিলোনি’।
নোনেদের বাগানে নারকোল পাড়তে ডেকেছিলো সকালে। ডোকরা পেটে গামছা বেঁধে শম্ভুনাথ গাছে ওঠে। নারকোল পাড়ে, গাছ ছাড়ায়। একটা নারকোল আর একঠোঙা মুড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরে ভাইয়ের সঙ্গে নারকোল মুড়ি খেতে বসে।
তখনই। ঠিক তখনই অমৃতের মতো নাকে আসে ভাতের গন্ধ। রান্না চালায় কুপি জ্বলছে। তার মানে! মুখে একগাল মুড়ি দিয়েই শম্ভুনাথ আনন্দে চিৎকার করে ওঠে, ‘ এ বাপ্, এ মা, মুড়ি খাবি আয় গা’।

মুনিয়া
শিংশপা গাছের তলায় পড়তে বসতো সে। ভোরের প্রথম আলো এসে পড়তো তার মুখে। মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকতো মুনিয়া।
যেদিন বিকেলে ঘি দিতে আসতো, দেখতো শিংশপা গাছের গুঁড়ির কাছটায় বসে আছে সে। রেহালে রাখা বইয়ের পাতা, তার মুখে মাখামাখি হয়ে আছে সূর্যাস্তের রাঙা আলো। নালন্দা মহাবিহারের পাঁচিলের গা ঘেঁষে ছোটো পাহাড়টার গায়ে সূর্য অস্ত যেতো। তারই আভায় আগুনের মতো গনগন করতো তার মুখ। মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকতো মুনিয়া।
এমন আলো শুধু জ্ঞানেরই হয়।
নালন্দা মহাবিহারে সাধারণের প্রবেশের অনুমতি নেই।মুনিয়ার আছে। সামনের চাতাল পেরিয়ে পাকশালার বিস্তৃত দুয়ার অবধি। দুধ দিতে এলে ভোরবেলা। বিকেলে ঘি। মুনিয়ার মা সর জাল দিয়ে ঘি তৈরি করে। ঘিয়ের গন্ধে ম’ম ‘ করে সারা বাড়ি। মুনিয়া একটুও দেরি করেনা। ঘি নিয়েই দৌড়োয়।
পাকশালার দিকে যেতে যেতে, পাকশালার দুয়ারে বসে সে মুগ্ধ চোখে শুধু তাকেই দেখে। জ্ঞানতাপস সে ছেলের নাম জানেনা। কোথায় তার বাড়ি সেসব কিছু জানার উপায় নেই। কথা বলার নিয়ম নেই। মুনিয়ার সে সাহসও নেই। তবু ওটুকুই মুনিয়ার দিনরাত্তিরের ভাবনা। তার মুগ্ধতা।
বখতিয়ার খলজি লুটপাঠ চালিয়েছে নালন্দায়। জ্বালিয়ে দিয়েছে বইয়ের বিপুল সম্ভার। মুনিয়াদের গ্রাম থেকে আগুনের শিখা দেখা যাচ্ছিলো। খলজির সেনারা গ্রামেও লুটপাঠ চালিয়েছে। মুনিয়ারা ঘর থেকে বেরোয়নি দিন পনেরো।
বখতিয়ার খলজির আতঙ্ক কাটিয়ে গ্রাম একটু স্বাভাবিক হতেই মুনিয়ার মা একটুখানি ঘি তৈরি করেছিলো বাড়িতে খাবার জন্য। মুনিয়া অনুনয় বিনয় করে সেই ঘি খানিকটা নিয়ে দৌড়োতে দৌড়োতে সোজা নালন্দা মহাবিহার। তখনও বইপোড়া গন্ধ চারদিকে। প্রাচীরের ইঁট তেতে আছে। বিক্ষিপ্ত আগুন ইতিউতি। বাতাসে ছাইয়ের কুঁচি উড়ছে। কোনোদিন পাকশালা পেরিয়ে ওদিকে যায়নি মুনিয়া। আজ কোনো বাধা নেই। ধ্বংসস্তুপ পেরিয়ে মুনিয়া ছুটে বেড়ায় মহাবিহারের ছাত্র ও অধ্যাপকদের থাকার ঘর, বিরাট হলঘর, সর্বত্র। কেউ কোত্থাও নেই।হাঁপাতে হাঁপাতে এসে দাঁড়ায় শিংশপা গাছটার তলায়। আগুনের আঁচে ঝলসে গেছে বৃক্ষ। মানুষের দয়া নেই। আগুনেরও না। একটু দূরে আধপোড়া রেহালটা দেখেই কান্না পেয়ে যায়। তবে কি!
বাইরে এসে দাঁড়ায় মুনিয়া। বাইরের বড় তোরণটা পুড়ে গিয়ে একটু হেলে গেছে। ওখান থেকে তিনটে রাস্তা তিনদিকে গেছে। সোজা রাস্তাটা মুনিয়াদের গ্রামের দিকে গেছে। ওপথে কেউ যায়নি। যারা বাধা দিতে গিয়েছিলো, বখতিয়ারের লোকেরা তাদের মুন্ডচ্ছেদ করেছিলো। কয়েকজন আগুনে পুড়ে মরেছে। দিনদুই আগে গ্রামের লোকেরা সেইসব দেহ ও দেহাবশেষ জড়ো করে পুড়িয়ে দিয়েছে ডানদিকের রাস্তার বাঁকে। ওখানে শবপোড়া ছাই আর জড়ো করে রাখা কিছু পোশাক। শুকিয়ে যাওয়া রক্তও লেগে আছে কোনো পোশাকে। তার সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে মুনিয়া। তবে কি!
বাঁ দিকের রাস্তাটা ছোটো পাহাড়টার পাদদেশ ঘেঁষে চলে গেছে দূরে, দূরদেশে। যারা পালাতে পেরেছে, ও পথ দিয়েই গেছে হয়তো। সেই জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত মুখ আর কোনোদিন দেখতে পাবেনা। ঝরঝর করে জল পড়ছে মুনিয়ার চোখ থেকে। বাঁ দিকের রাস্তার দিকে অপলক চেয়ে থাকে মুনিয়া। তবে কি!


দুটো অনুগল্প ভালো লেগেছে। অভিনন্দন।
ধন্যবাদ।
দুটো গল্পই ভালো লাগলো
ধন্যবাদ।
খুব ভালো দুটো গল্প পড়লাম। শুভেচ্ছা।
ধন্যবাদ।