উইম্বলডনে এখন হেমন্ত। চারিদিকে ফলে-ফুলে ভরে আছে। পাকা ফলের বীজ ধারণ করবে ধরিত্রী। বীজ থেকে বৃক্ষ হবে। মাটির আঁধার ভেঙে তিরতির হাত মেলে দেবে আকাশের দিকে, আলোর দিকে। জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছেন নিবেদিতা। ভোরের আলো এসে পড়েছে জানালা দিয়ে টেবিলের উপর। টেবিলে খোলা চিঠি। চিঠির উপর নরম রোদের আলো। তাকালেন চিঠিটির দিকে। বাংলায় লেখা। চিঠিটির উপরে ডানদিকে বাংলায় লেখা — ‘জয়রামবাটি’। তার ঠিক নীচে লেখা তারিখ — ‘২১শে চৈত্র’। নিবেদিতার চোখের কোণে মুক্তোদানা জল। পশ্চিমবঙ্গের এক প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ভেসে আসে এক মায়ের গন্ধ। লালপাড় শাড়ি। খোলা চুলে নারকল তেলের গন্ধ। পা ছড়িয়ে বসে আছেন পুতুল-পুতুল গড়নের এক মা। চিঠিটি লেখা বাংলায়। অনুবাদ করেছেন সারদানন্দ ইংরেজিতে। বাংলা ও অনুবাদ করা ইংরেজি চিঠি— দু’টিই একসঙ্গে পাঠিয়েছিলেন সারদানন্দ। নিবেদিতা সেই চিঠি কপি করছেন। রেখে দেবেন নিজের কাছে। আর সারা বুল, ম্যাকলয়েড সহ প্রিয়জন সবাইকে পাঠাবেন। কলম তুলে নিলেন। রাইটিং প্যাড গুছিয়ে নিলেন।
JAIRAMBATI
21st Chaitra
[ 13.5.1900 ]
Sri Sri Gurupada bharasha –

My trust is in His sacred Feet.
May this letter carry all blessings! My dear love to you, Baby Daughter Nivedita! I am so glad to learn that you have prayed to the Lord for my eternal peace. You are a manifestation of the ever-blissful Mother. I look at your photograph which is with me, every now and then. And it seems as if you are present with me. I long for the day and the year when you shall return.

নিবেদিতা থামলেন। মুখে চিলতে হাসি। ঠোঁট টিপে হেসে তাকালেন জানালা দিয়ে। তারপরেই ড্রয়ার খুলে একটি পুরনো খাম বার করে আনলেন। খাম খুলে তিনটি ছবি বার করলেন। রাখলেন টেবিলের উপর। তাকিয়ে থাকেন।

‘মার্গট, পায়ের আঙুলগুলো পর্যন্ত শাড়িতে ঢেকে গেছে! আঙুলগুলো একটু বার করে দাও প্লিজ! ওখানেই তো প্রণাম রাখবেন সবাই!’
সারা বুল মার্গারেটকে নির্দেশ দিয়েই ফটোগ্রাফার হ্যারিংটনের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। ভাল করে নজর রাখছেন। অনেক অনুরোধ-উপরোধের পর মা সারদা ছবি তুলতে রাজি হয়েছেন।
বারান্দায় দুটি থামের মাঝখানে বাঘের চামড়ার উপর বসানো হয়েছে সারদাদেবীকে। মা সারদা যেখানে বসেছেন তার সামনের সিঁড়িতে কয়েকটি টব রেখেছেন নিবেদিতা। হ্যারিংটন রেডি হয়েছেন ক্যামেরার বাক্সের পিছনে। স্ট্র্যান্ডের উপর ক্যামেরা সেট করা। কালো কাপড়ের ঢাকা ক্যামেরার সামনের লেন্সটুকু বেরিয়ে আছে। কালো কাপড়ের ভেতর ঘাড় নিচু করে মাথা ঢাকলেন হ্যারিংটন। আবার মাথা বার করে আনলেন।
‘প্লিজ মাদার, ওপেন ইয়োর আইজ! লুক অ্যাট মি!’
মার্গারেট বাংলা করে দেন, ‘মা, ওই ক্যামেরার দিকে তাকান।’
হ্যারিংটন বোঝানোর চেষ্টা করেন সারদা-মাকে। সারদা-মা একমাথা ঘোমটা টেনে মাথা নিচু বসে আছেন। চোখ বন্ধ।
নিবেদিতা পাশে গিয়ে বসলেন, ‘মা, চোখ খুলে রাখুন। আর অতটা ঘোমটা টানা থাকলে ছবি উঠবে কীভাবে? মুখ তো দেখা যাবে না!’ নিবেদিতা নিজেই ঠিক করে দিলেন ঘোমটা। কিন্তু সারদাদেবী গ্রাম্য বিধবা, বাইরের পুরুষের দিকে তাকান না। পর্দানশিন থাকেন। মহা ফাঁপরে পড়েছেন নিবেদিতা ও সারা বুল। হ্যারিংটন ক্যামেরার কালো কাপড়ের নীচে মাথা ঢুকিয়ে ছবি তোলার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু সারদাদেবী আড়ষ্ট। ঘোমটা মাথায় দিয়ে স্থির বসেই আছেন।
বেশ কিছুক্ষণ সারদাদেবী মাথা নিচু করে চোখ বুজে বসে থাকলেন। হতাশ সারা বুল ও নিবেদিতা। হঠাৎ সারদাদেবী মাথা তুলে চোখ সম্পূর্ণ খুলে জিজ্ঞেস করলেন, ‘শেষ হয়েছে কি?’

ক্রীঈঈঈকিক্ ক্রীঈঈঈকিক্!
হ্যারিংটন সুযোগ ছাড়েননি। সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরা সচল হয় তাঁর। তৃপ্তির হাসি নিয়ে কালো পর্দা সরিয়ে মুখ বার করেন হ্যারিংটন, ‘ডান। এক্সিলেন্ট।’
১৮৯৮ সালের নভেম্বর মাসের ঘটনা। আর আজ ১৯০১ সালের মে মাস। এখনও ছবির মতো মনে আছে। রামকৃষ্ণদেবের পরলোকগমনের ১২ বছর পর তোলা হয়েছিল এই ছবি। সারদাদেবীর বয়স তখন পঁয়তাল্লিশ। ব্রহ্মানন্দ তখন ভীষণভাবে অসুস্থ। সারদাদেবী চিন্তা করে করে না ঘুমিয়ে শুকিয়ে গিয়েছিলেন কিছুটা।

প্রথম ছবিতে নতদৃষ্টি সহ সারদাদেবী। দ্বিতীয় ছবিটি, যা ছড়িয়ে গেছে, চোখ তুলে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন সারদা-মা। তৃতীয় ছবিটির দিকে নিবেদিতা তাকিয়ে থাকেন। বছর তিনেক আগের নিবেদিতা আর আজকের নিবেদিতার চেহারায় অনেক তফাত। মুখমণ্ডলে ধকলের ছাপ স্পষ্ট। তৃতীয় ছবিটি হাতে তুলে তাকিয়ে আছেন। মনে মনে হ্যারিংটনের প্রশংসা করলেন। সেই সময়ে হ্যারিংটনের বেশ নাম হয়েছিল। বিভিন্ন মহলে তাঁকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হত ছবি তোলার জন্য।

সারদাদেবীর পাশে এসে বসলেন নিবেদিতা, ‘হয়ে গেছে মা! সারা বুল আপনার ছবি নিয়ে যাবে বিদেশে। ওখানে পুজো করবে তোমাকে। ওর প্রিয়জনদের দেবে।’
সারদাদেবী মুখ তুলে পাশে বসা নিবেদিতার দিকে তাকালেন, ‘সত্যিই! পুজো করবে! কেন?’
দু’জনে দু’জনের দিকে তাকিয়ে থাকেন। পরম এক ভালবাসার ছোঁয়া থেকে যায় সেই তাকানোয়। দু’জনে দু’জনের চোখের গভীরে কৃষ্ণগহ্বরে প্রবেশ করেন।
হ্যারিংটনের ক্যামেরা আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে দ্রুত। দক্ষ ক্যামেরাম্যান হ্যারিংটন এত সুন্দর একটি কম্পোজিশন নষ্ট করতে দিতে চাননি। সুন্দর একটি ছবি তুলেছেন। নিবেদিতা তাকিয়ে থাকেন ছবিটির দিকে। চোখের কোণ উপচে জলের ধারা নেমে আসে গাল বেয়ে। রুমাল দিয়ে জল মুছে ঝুঁকে পড়েন টেবিলের উপর। চিঠিটির অনুবাদ শেষ করেন।

“May the prayers you have uttered for me from the heart of your pure virgin soul be answered! I am well and happy. I always pray the Lord to help you in your efforts, and keep you strong and happy. I pray too for your quick return. May He fulfill your desires about the women’s home in India, and may the would-be home fulfill its mission in teaching true dharma to all.”

মুহূর্তের মধ্যে ভেসে এল বাগবাজারের বোসপাড়া লেনের সেই গলি। হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল ফেরিওয়ালার ডাক, ছেলেমেয়েদের কলকাকলি, মহিলাদের কৌতূহল, হাসাহাসি, সাধুদের হুঙ্কার, চৌকিদারের চিৎকার, শিয়ালের ডাক, ঝিঁ ঝিঁ পোকার কনসার্ট, অসহ্য গরম, মশা, মাছি, সাপ, বিছে, প্লেগ, ম্যালেরিয়া নিয়ে এক অনাবিল সরল শ্যামলী গলি, নিবেদিতার প্রিয় বোস পাড়া লেন। ফিরে যেতে হবে তাঁকে। ফিরে যেতে হবে তাঁকে তাঁর কাজে। যে কাজের জন্য তিনি ভারতবর্ষের এক অন্ধকার গলিতে ছোট্ট বাড়িতে গিয়ে উঠেছেন! সেই কাজ ওই গলির ওই ছোট্ট বাড়িটি থেকেই শুরু করতে হবে। ফিরে যেতে হবে। ফিরে যেতে হবে ভারতবর্ষে। ভারতবর্ষের মা তাঁকে ডাকছেন।

“My dear love to you and blessings and prayers for your spiritual growth. You are indeed doing good work – but do not forget your Bengali! Or I shall not be able to understand you, when you come back. It gave me such delight to know that you are speaking of Dhruba, Savitri, Sita-Ram and so on there!”

না মা, আমি ভুলিনি আমার বাংলাকে। বাংলার এক বিজ্ঞানী আজ বাংলার তথা ভারতবর্ষের বিজ্ঞানযাত্রার জয়ধ্বজা নিয়ে ওই এগিয়ে চলেছে। রণক্লান্ত, আঘাতে-আঘাতে জর্জরিত তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে সাহায্য করছি। বিশ্ববাসীর কাছে তাঁর গবেষণা শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করবে অদ্বৈত দর্শনের কথা, যে কথা স্বামীজি বলেন। জীব, উদ্ভিদ, জড় এক আশ্চর্য প্রেমময় চৈতন্যের জীবনসূত্রে গাঁথা। এক ভয়ংকর লড়াইয়ের শেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি। সামনেই বিজ্ঞানীর বক্তৃতা এবং গবেষণাপত্র প্রকাশের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। তার পরেই ফিরে যাবেন নিবেদিতা তাঁর কর্মভূমি ভারতবর্ষে। অনন্ত কাজের ধারা নেমে আসছে আগামী দিনে ভারতের মাটিতে — নিবেদিতা দেখতে পাচ্ছেন মানসলোকে। ভেসে চলেছেন আত্মকথনে।

‘স্বাধীনতার একটা কদর আছে আমার কাছে। এমন অনেক কিছুকে জীবনে মেনে নিয়েছি যা স্বামীজি বোধ হয় কখনও অঙ্গীকার করতে দিতেন না। কিন্তু তাঁরই জন্য সেসবকে মনে ঠাঁই দিয়েছি। আমার বিশ্বাস ‘সব ভাল যার শেষ ভাল’। স্বামীজিও আগের মতোই আমাকে তাঁর সন্তান বলেই গ্রহণ করবেন।’ নিবেদিতা তাকিয়ে থাকেন জানালা দিয়ে। নতুন এক দিন শুরু হচ্ছে দিকে দিকে।

‘আমার সম্পর্ক এখন কাজের সঙ্গে, আমি এখন ওদেশের মেয়েদের সম্পত্তি। আজ আমি ভাবনায় যতটা হিন্দু এতটা এর আগে কখনও ছিলাম না। কিন্তু সেইসঙ্গে ওদেশের রাষ্ট্র-চেতনার প্রয়োজনটাও অত্যন্ত পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি যে! এই হল আমার মনের কথা … নিজের কাছে আমাকে খাঁটি থাকতেই হবে। নবজাগ্রত ভারত আর ভারতীয়দের জন্য আমার কিছু করবার আছে, এ-বিশ্বাস আমার জন্মেছে।’

ছবির দিকে তাকিয়ে থাকেন নিবেদিতা। মায়ের দিকে। মায়ের চোখের দিকে। ভারতের মায়ের দিকে। অবগুণ্ঠনবতী ভারতের দিকে।

‘ভারতবর্ষ তার স্বাধ্যায়-তপস্যায় ডুবে ছিল। একদল দস্যু তার ঘরে হানা দিয়ে দেশটাকে ছারখার করে দিয়েছে। ভারতবর্ষের তপোভঙ্গ হয়েছে। দস্যুর দল আর-কিছু কি শেখাতে পারে? না। এখন ভারতের কর্তব্য হল তাদের তাড়িয়ে দিয়ে আবার আপন স্বভাবে ফিরে যাওয়া। “Something like that, I fancy, is the true programme for India. And so I have nothing to do with Xtians or Government-agencies as long as the government is Foreign. That which is Indian for India, I touch the feet of, however stupid and futile. Anything else will do a little good and much harm, and I have nothing to do with it. Yes, my way will do some harm, and I have nothing to do with it. Yes, my way will do some harm, too, but it will be vital to the people themselves – Good and Evil of their own – not any others – and for such harm I care nothing. They need it. Oh! India! India! Who shall undo this awful doing of my nation to you? Who shall atone for one of the million bitter insults showered daily on the bravest and keenest, nerved and best of all your sons?” ( Letters of Nibedita dated 19 th July 1901 to Josephine MacLeod)

নিবেদিতা ভারতবর্ষের মায়ের দিকে তাকিয়ে আছেন এই ভোরে। দুঃখিনী মা। ভারতবাসীর প্রতি দস্যু ব্রিটিশদের প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে নিবেদিতার অন্তরাত্মা জেগে ওঠে। ভারতবাসীর রাষ্ট্রচেতনা জাগ্রত করা দরকার। ভারতবাসীরা স্বদেশের স্বাধীনতা যেদিন আমাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেবে, সেদিন আমি যেন আবার নতুন জন্ম নিয়ে ‘তরুণ ভারতের’ জয়গাথা উচ্চারণ করতে পারি … এই আমার প্রার্থনা। চাই উদাত্ত আহ্বান, জনতার উন্মাদনা, প্রাণ বিসর্জনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা। এগুলো না হলে চলবে না। ভারতবর্ষ তোমাকে জেগে উঠতে হবে। জাগ্রত বিবেক। আমার কাজ আমি স্থির করে ফেলেছি। হতে পারে তা রাজনৈতিক, তাতে কী? ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে যে কাজ প্রয়োজন সেই কাজ করাই আমার আগামী দিনের কর্মসূচি।

নিবেদিতা ছবিগুলো আবার যত্নে ড্রয়ারের ভেতরে রেখে দেন। ড্রয়ার বন্ধ করেন। চিঠিটির কপি শেষ হয়েছে। গুছিয়ে রাখছেন টেবিলের সবকিছু। নিজের মনেই হেসে উঠলেন। রমেশচন্দ্র দত্তের কথা মনে পড়ল। নরওয়েতে যখন সারা বুলের ব্যবস্থাপনায় নিবেদিতা বিশ্রাম নিতে গেছেন কয়েক মাসের জন্য সেখানে রমেশচন্দ্র দত্ত গিয়েছিলেন। একদিন ভারতের আগামী দিনের চলার পথ নিয়ে নিজের ভাবনা প্রসঙ্গে কথা বলছিলেন নিবেদিতা। মি. দত্ত হঠাৎ বলে ওঠেন, ‘হয়তো জাতীয় মহাসভায় কিছু বলার জন্য তোমার ডাক আসতে পারে। তাহলে কী করবে?’
নিবেদিতার অকপট উত্তর ছিল, ‘ডাকলে নিশ্চয়ই যাব, কারণ আমারও কিছু বলবার থাকতে পারে!’

মনে পড়ে যায়। রমেশবাবু জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি। নিজের মনে হাসলেন নিবেদিতা আজ এই ভোরে… ‘আমি প্রস্তুত, ভারতবর্ষ। দু’দিন আগে হোক বা পরে হোক, আমার কাজকে সবাই খাঁটি রাজনীতি বলে ধরে নেবে।’

নিবেদিতা স্থির তাকিয়ে আছেন বেলুড়ের অস্থায়ী ঘাটের দিকে। ঘাটের পাড়। পাড় ছাড়িয়ে মঠের সামনে তাঁর দৃষ্টি। ভ্রু কুঁচকে দেখছেন! মঠের সামনে ছোটখাটো জটলা। ব্রহ্মচারীদের দেখা যাচ্ছে ইতস্তত দ্রুত যাতায়াত করছেন। স্বামীজি গভীর ঘুমে। আর কোন‌ওদিন না-জাগার ঘুমে ঢলে পড়েছেন তিনি। নিবেদিতাকে নিয়ে নৌকা এগিয়ে চলেছে। প্যারিস কংগ্রেসের পর এমা কালভ্যে এবং জ্যুল বোয়া সহ একটি দলের সঙ্গে বেরিয়ে পড়েন স্বামীজি। ইজিপ্টে গিয়েই শরীর খারাপ হতে শুরু করে। ফিরে আসেন দ্রুত কলকাতায়। শরীর তখন থেকেই ভাল যাচ্ছিল না। ভাঙছিল। ফিরে এসেছেন দ্রুত। শরীর ভেঙেছে। হাঁপানি, বহুমূত্র। তবুও কর্মোৎসাহে ভাঁটা পড়েনি তাঁর। নিবেদিতা ভারতে ফিরে এসেছেন ১৯০২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি মাদ্রাজে এবং ৯ ফেব্রুয়ারি বোস পাড়া লেনে। এবারে ১৭নং বোস পাড়া লেনের বাড়িতে। স্বামীজি তখন কাশীতে। ছুটে এসেছেন নিবেদিতা মঠে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছেন। মঠের দরজায় তাঁকে স্বাগত জানাতে আজ আর স্বামীজি নেই। ব্রহ্মানন্দ এগিয়ে এলেন। ব্রহ্মচারীরা তাঁকে ঘিরে ধরলেন। কিন্তু নিবেদিতার কাছে সবকিছু ফাঁকা-ফাঁকা লাগছে। তিনি নেই। নিবেদিতা জানতেন তিনি অসুস্থ। তিনি কাশীতে গোপাললাল শীলের বাগানবাড়িতে বিশ্রাম নিচ্ছেন কয়েকদিনের জন্য। তবুও…তবুও চোখে জলের ধারা বাঁধ মানল না। চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল জল। দ্রুত গেলেন তাঁর ঘরে। তিনি নেই। বেশ বড় ঘর। চারিদিকে জানালা। আলো-বাতাস খেলা করে। রোদ এসে পড়েছে বিছানায়। স্বামীজি যেন বসে আছেন বালিশে ঠেস দিয়ে। ওই তো গেরুয়া চাদরে ঢাকা তাঁর পা। নিবেদিতা অঝোরে কাঁদছেন। দু’গাল বেয়ে জলের ধারা। হাঁটু মুড়ে বসলেন বিছানার পাশে, যেন পায়ের কাছে বসেছেন। পিতা! আমি কি কোনও অন্যায় করেছি?— বিছানায় মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন নিবেদিতা। কিন্তু তিনি নেই। ফাঁকা ঘরে রোদ আর হাওয়া।

কাশীতে স্বামীজির কাছে পৌঁছে গেছে নিবেদিতার প্রত্যাবর্তনের খবর। খুশি তিনি। নিবেদিতা ফিরে এসেছেন দেশসেবায় স্বেচ্ছায়। তাঁর খুশি তিনি প্রকাশ করেছেন ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯০২, গোপাললাল ভিলা, বেনারস ক্যান্টনমেন্ট থেকে সারা বুলকে লেখা চিঠিতে … “মাতা ও কন্যাকে ভারতে আবার স্বাগত জানাচ্ছি। জো-এর সৌজন্যে মাদ্রাজের একখানি সংবাদপত্র পেয়ে আমি বিশেষ আনন্দিত হয়েছি; নিবেদিতা মাদ্রাজে যে অভ্যর্থনা পেয়েছে, তা নিবেদিতা ও মাদ্রাজ উভয়ের পক্ষেই কল্যাণকর। তাঁর ভাষণ যথার্থই সুন্দর হয়েছিল।”

৩ ফেব্রুয়ারি মাদ্রাজে নেমেছেন নিবেদিতা ও রমেশচন্দ্র দত্ত। ৪ ফেব্রুয়ারি মাদ্রাজের মহাজন-সভা প্রেক্ষাগৃহে দু’জনকে সংবর্ধনা দেওয়া হল। নিবেদিতাকে বক্তৃতা দেওয়ার আমন্ত্রণ করা হয়েছে। রমেশচন্দ্র দত্ত অভিভাষণে বলেন যে, নিবেদিতা ভারতবর্ষের মুক্তি-সাধনায় উৎসর্গীকৃত, তাঁকে বক্তৃতার জন্য নিমন্ত্রণ করায় তিনি বিশেষ আনন্দিত। নিবেদিতা একবার তাকালেন ড. দত্তের প্রতি। রমেশচন্দ্র জানেন নিবেদিতা একবুক আগুন আগলে এনেছেন ভারতবর্ষের মাটিতে। তাঁর যুদ্ধংদেহী রূপ তিনি দেখেছেন। নিবেদিতা প্রারম্ভিক ধন্যবাদ জ্ঞাপনের পরেই সরাসরি চলে গেলেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে জাতীয় চেতনা গঠনের বক্তব্যে — “য়ূরোপ-যাত্রার পূর্বে ভারতবর্ষে বিভিন্ন প্রদেশের সাধারণ জীবনের সহিত আমার পরিচয়ের সুযোগ ঘটিয়াছিল। পবিত্রতা, গভীর চিন্তা ও অনুভূতিই ভারতীয় দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বৈশিষ্ট্য। কলিকাতায় অবস্থানকালে ওইগুলিই ছিল আমার জীবন যাপনের মূল লক্ষ্য। ভোগবিলাসপূর্ণ পাশ্চাত্যে ভ্রমণকালে হিন্দু পরিবারের সুখময় গৃহই ছিল তাঁহার স্মৃতি।” নিবেদিতা এরপরেই বেশ জোরের সঙ্গে জগদীশচন্দ্র বসুর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর সংগ্রামের কথা বললেন। ব্রিটিশদের বাধাদানের কথা বললেন। বললেন ভারতের সুমহান ঐতিহ্যের কথা। তারপরেই বললেন, “স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে, ধর্ম-ব্যাপারে আপনারা দাতা, পাশ্চাত্যের নিকট আপনাদের শেখবার কিছু নেই। সামাজিক ব্যাপারেও সেই রকম। প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাধনের যোগ্যতা আপনাদের যথেষ্ট আছে। বাইরের কোনও ব্যক্তির ওই বিষয়ে উপদেশ দেবার বা হস্তক্ষেপ করবার অধিকার নেই। জীবনের অগ্রগতির জন্য পরিবর্তন অপরিহার্য, কিন্তু এই পরিবর্তন মৌলিক, স্বনিয়ন্ত্রিত হওয়া চাই। তিন হাজার বছরের প্রাচীন সভ্যতার কি কোনও মূল্য নেই যে, পাশ্চাত্য দেশের তরুণ জাতিগুলি প্রাচ্যবাসীদের পরিচালিত করবে?” নিবেদিতার পূর্ণ বক্তৃতা ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯০২ অমৃতবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হল। নিবেদিতা ভারতে পা দিয়েই বুঝিয়ে দিলেন মাদ্রাজের বক্তৃতায় যে, তিনি ভারতবর্ষের জাতিসত্তার উন্মেষের জন্য এসেছেন। তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ভারতীয় আত্মাকে জাগ্রত করার কাজ নিয়ে এসেছেন। তিনি ভারতবাসীর কাছে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার সংগ্রামের পথ নিয়ে এসেছেন। সেই বক্তব্য ‘অমৃতবাজার’ পত্রিকায় পড়ে স্বামীজি প্রশংসা করেন। তিনিও তো মুক্তি চান!

নিবেদিতার পাশে এই মুহূর্তে ব্রহ্মানন্দ ও সারদানন্দ। ব্রহ্মানন্দ এখন মঠের মহারাজ। কথা হল নিবেদিতার ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে।
একদিন নিবেদিতা চলে গেলেন কামারহাটি গোপালের মাকে দেখতে। গঙ্গার ধারে ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। ঘর থেকে মিষ্টি ধূপ-ধুনোর গন্ধ ভেসে আসছে। গোপালের মায়ের ঘরে দেবদেবী যাতায়াত করে, এমন শোনা যায়! লোকজনের বিশ্বাস। বিধবা নিঃসহায় গোপালের মা, অঘোরমণি আসল নাম, থাকেন ভাই নীলমাধব বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। গঙ্গার ধারে বাড়ি। নীলমাধব যজমানি করেন। সবসময় গোপালের মা পুজো-পাঠেই নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। নিষ্ঠ তিনি। নিবেদিতা তাকিয়ে থাকেন। বয়সের ছাপ সর্বাঙ্গে।
‘আমি এসেছি, তোমার খুকি! আমাকে ভেতরে ডাকবে না?’
গোপালের মা ঘোলাটে চোখ নিয়ে তাকায়। ‘কে খুকি! খুকি এয়েচো? মেমসাহেব খুকি তো? তুমি ফিরে এয়েচো? জানতাম, আমি জানতাম ঠাকুর তোমাকে ঠিক নিয়ে আসবেই, ঠিক নিয়ে আসবে।’
ঘরের একধারে তৈরি ঠাকুরের বেদীতে গড় করে প্রণাম করলেন গোপালের মা।
‘আমাকে ভেতরে ডাকবে না? ঢুকব না আমি?’ নিবেদিতা ঝুঁকে পড়ে।
‘এ আবার কেমন কথা গো? তুমি তো আমাদের ঘরের মেয়ে! তোমার ছোঁয়া খেয়েছি।’ গোপালের মা উঠে বসেন। দাঁড়াবার চেষ্টা করেন। নিবেদিতা ঘরে ঢুকে ধরে ফেলেন। তাঁকে বসিয়ে দিয়ে নিজে পাশে বসেন। প্রণাম করেন। গোপালের মা নিবেদিতার মাথায় হাত বুলিয়ে, চিবুকে আঙুল ছুঁইয়ে নিজের ঠোঁটে ঠেকান। এইভাবেই বৃদ্ধারা স্নেহচুম্বন দিয়ে থাকেন।
গোপালের মা নিবেদিতাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলেন, ‘তুমি ফিরে এয়েচো! ফিরে এয়েচো তুমি! বিশ্বেস হচ্চে নে গো!’
নিবেদিতার মাথায়, গায়ে, হাতে, মুখে হাত বোলাতে থাকেন।
‘চলো তোমাকে সুস্থ হতে হবে তো! বাগবাজারে আবার স্কুল খুলব তো! মেয়েদের স্কুল। মেয়েদের ডেকে ডেকে কে আনবে? আর আমাকে কে আগলে রাখবে?’ নিবেদিতা গোপালের মায়ের গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।

‘তোমাকে যিনি আগলাবার তিনিই আগলে রাখবেন গো! আমি কি আর পারব গো খুকি?’ তোমার পাঠালে…!’
নিবেদিতা অনেক অনেক দিন পর এই ‘খুকি’ ডাকটা শুনতে পেলেন। গোপালের মায়ের পাশে বসে চোখ মুছিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘তুমি চলো আমার কাছে থাকবে বাগবাজারে। আমি তো আছি! আর কুসুম আছে, সে ব্রাহ্মণ মেয়ে, তোমার পুজোর কাজ করে দেবে।’

নিবেদিতা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন। হিন্দু বিধবা রমণীর এমন আকুল কান্না এক বিদেশিনী মেয়ের জন্য… এই দৃশ্য কি কোনও প্রবন্ধে লেখা যাবে? এমন দৃশ্যের পর আন্তর্জাতিকতা বিষয়ে ভারী ভারী বক্তৃতার কি কোনও দরকার হয়? নিবেদিতা গোপালের মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে ভাবেন, ভারতবর্ষের অন্তরাত্মায় যে মাতৃবোধ আছে তার পরম উদ্ঘাটন আজ ছড়িয়ে দিতে হবে বিশ্বময়।
নিবেদিতা ফিরে আসেন বাগবাজারে বিকেলে। ফেরার সময় পাড়ার ঘরে ঘরে যান। মেয়েদের জড়ো করতে থাকেন স্কুল খোলার জন্য। স্কুল খুলতেই হবে। মহিলাদের স্কুল খুলতেই হবে। ঘরে এসে বসলেন তাঁর প্রিয় পড়ার টেবিলে। বাইরে টুপ করে সন্ধ্যা নেমে এল। ঝিঁঝি পোকার তীব্র ডাক শুরু হল। একটু বাদেই কলকাতার বিখ্যাত শিয়ালের ডাক শোনা যাবে। নিবেদিতা টেবিলের উপর রাখা চিঠিগুলো পড়া শুরু করলেন। কাশী থেকে স্বামীজির চিঠি এসেছে। তাড়াতাড়ি খুললেন। তারিখ দেওয়া আছে ১২ ফেব্রুয়ারি, ১৯০২। বারবার পড়ছেন নিবেদিতা।
“তোমার চিঠি পেয়ে অতীব উল্লসিত। উল্লাসের অধিক কারণ, তুমি অখণ্ড ইচ্ছা এবং পুনঃ প্রাপ্ত স্বাস্থ্য সহ ফিরে এসেছ।…’মা’ যেভাবে চালান, ঠিক সেভাবেই চলো; যদি সম্ভব হয়, তোমাকে সাহায্য করব, কিন্তু আমি এখন কম্বলবন্ত বই আর কিছু নেই, তদুপরি এক চক্ষু ( স্বামীজির এইসময় একটি চোখের দৃষ্টিশক্তি প্রায় নষ্ট হয়ে যায়)। কিন্তু তোমাকে আমার পূর্ণ, সম্পূর্ণ আশীর্বাদ … যদি আরও বেশি থাকে, তাও।”

জানালা দিয়ে বাইরে তাকান নিবেদিতা। অন্ধকার আকাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি নারিকেল গাছ। মাথা দুলিয়ে চলেছে। হিমেল রাত। কুয়াশা ঘিরে আছে বোস পাড়া লেন। গলিটা রহস্যময় পড়ে আছে। ওই তিনি এগিয়ে আসছেন। একটু শ্লথ তাঁর হাঁটা। ক্লান্তি জড়িয়ে আছে তাঁর পদচারণায়। অসুস্থ তিনি। হাঁপাচ্ছেন।

“আমার কোনও অভিযোগ নেই। যেভাবেই হোক আমাকে বলি হতে হবে — স্বেচ্ছাবলি — কোনও সন্দেহ নেই।… তুমি ইস্পাতের মতো খাঁটি এবং বিশ্বস্ত … নিজের ছায়ার মতোই বিশ্বস্ত। ধনী বন্ধুর পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া মাত্র তুমি বেশি এগিয়ে পড়োনি, বা বিদ্রোহী হওনি। তোমার জন্য আমার সর্বশেষ আশীর্বাদ রইল।”

নিবেদিতা চিঠিটি দু’হাতের তালুতে নিয়ে বুকের কাছে রাখেন। চোখ দিয়ে জলধারা গড়িয়ে পড়ছে। ‘আমি তো…আমি তো তোমার কাজ করতে এসেছি প্রভু! যে ভারতবর্ষকে তোমার চোখ দিয়ে দেখেছি! যে মূর্খ দরিদ্র ভারতবাসীর জাগরণের স্বপ্ন দেখেছি তোমার চোখের তারায় তারায়! সেই অসমাপ্ত তোমার কাজ সমাপ্ত করার সংকল্প নিয়ে এসেছি প্রভু। তুমি পাশে থেকো, তুমি শক্তি দাও হে পরম স্বামী!’ রাত গভীর হয়। নিবেদিতা আবার চিঠি পড়েন।

“সর্বপ্রকার শক্তি তোমাতে উদ্বুদ্ধ হোক, মহামায়া স্বয়ং তোমার হৃদয়ে এবং বাহুতে অধিষ্ঠিতা হোন! অপ্রতিহত মহাশক্তি তোমাতে জাগ্রত হোক এবং সম্ভব হলে সঙ্গে সঙ্গে অসীম শান্তিও তুমি লাভ করো — এই আমার প্রার্থনা।”

“যদি শ্রীরামকৃষ্ণ সত্য হন, তবে যেমন ভাবে তিনি আমাকে জীবনে পথ দেখিয়েছেন, ঠিক তেমনিভাবে কিংবা তার চেয়েও সহস্রগুণ স্পষ্টভাবে তোমাকেও পথ দেখিয়ে নিয়ে যান।”

“আগে এক চিঠিতে আমার সামান্য যা অনুরোধ করার আছে তা লিখেছিলাম, আমি আর কারও উপর নির্ভর করতে বলি না — আর কেউ নয় — একমাত্র ব্রহ্মানন্দ। I recommend you none — not one — except Brahmananda. That old man’s judgement never failed — mine always do. If you have to ask any advice or to get anybody to do your business Brahmananda is the only one I recommend, none else, none else. With this my conscience is clear.”

চিঠি পড়া শেষ করেন নিবেদিতা। চিঠিটি যত্নে রাখেন। হঠাৎ জগদীশচন্দ্রের চশমা-দড়িটি নড়ে ওঠে যেন চোখের সামনে। আর কিছুদিন পরেই লিনিয়ার সোসাইটিতে প্রিয় বেয়ার্ন তাঁর গবেষণাপত্রটি পেশ করবেন। জগৎময় ছড়িয়ে পড়বে সে কথা। বিশ্বময় প্রচার পাবে ভারতবর্ষের এক অভাবী বিজ্ঞানীর অভাবনীয় আবিষ্কার — জগতের জড় ও জীব এক পরম চেতনার মায়াখেলা। কী করছেন প্রিয় বেয়ার্ন ও বো! রাত নামে কলকাতায়, উইম্বলডনে এখন বিকেলের নরম সূর্যের খেলা। প্রাণ থেকে প্রাণে এক মহাজাগতিক সুর ঘোরে-ফেরে। চৈতন্য বিরাজিছে সর্বত্র। নিবেদিতার চোখে ঘুম নামে। ঘুম নামে কাশীর ঘাটে ঘাটে।

পরের দিন সকালেই নিবেদিতা যান মহারাজ ব্রহ্মানন্দের কাছে। ব্রহ্মানন্দ উত্তেজিত। উত্তেজিত নিবেদিতা। নিবেদিতা খুব দ্রুত গতিতে কথা বলেন, বিশেষ করে উত্তেজনায়। দ্রুত ইংরেজি কথা ব্রহ্মানন্দ ঠিক মতো বুঝতে পারেন না। চেষ্টা করেন। তত নিবেদিতা দ্রুত বোঝানোর চেষ্টা করেন। স্কুল খোলার কাজ, বৃদ্ধাবাস তৈরির কাজ, ইত্যাদি ইত্যাদি নানা কাজ তাঁর সামনে। ব্রহ্মানন্দ কিছুক্ষণ বোঝার ও শোনার চেষ্টা করেন, তারপর চোখ বুজে ধ্যানে বসে পড়েন। নিবেদিতা কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকেন কখন ব্রহ্মানন্দ চোখ খুলবেন। তারপর অপেক্ষা করতে করতে তিনিও চোখ বুজে ফেলেন। দু’জনকে ধ্যানমগ্ন মুখোমুখি বসে থাকতে দেখেছেন অনেকেই। এক সময় ব্রহ্মানন্দ ধ্যান থেকে উঠলেন। নিবেদিতার দিকে তাকালেন। নিবেদিতা তখনও ধ্যানের গভীরে। কিছুক্ষণ পর নিবেদিতা চোখ খুললে ব্রহ্মানন্দ বললেন, ‘স্বামীজি চিঠি দিয়েছেন আমাকে। তুমি মহিলাদের জন্য স্কুল আবার শুরু করে দাও। তিনি অনুমতি দিয়েছেন স্কুল খোলার।’

চিঠির একটি অংশ পড়ে শোনান ব্রহ্মানন্দ — “তোমার পত্রের সবিশেষ জানিয়া আনন্দিত হইলাম। নিবেদিতার স্কুল সম্বন্ধে যা আমার বলবার ছিল, তাকে লিখেছি। বলবার এই যে, তার যা ভাল বিচার হয় করবে।”

নিবেদিতা জোড়হাতে প্রণাম করে উঠে আসেন। পিতার নির্দেশ পেয়েছেন তিনি।
এইসময় নিবেদিতার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন কংগ্রেসের ছোট-বড় অনেক নেতাই। তরুণ বারীন ঘোষ আসছেন। বারীন ঘোষের তরুণ বন্ধুরা জড়ো হচ্ছে ১৭ নম্বর বোসপাড়া লেনের বাড়িতে। নিবেদিতা তাদের জড়ো করে বক্তৃতা দিচ্ছেন ঘরে বসিয়ে। বোঝাচ্ছেন দেশ-চেতনা, দেশ-মাতা ধারণা। অনেকদিন সকালেই চলে আসে তারা। দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে কীভাবে মুক্ত করা যায়, তাই নিয়ে আলোচনা চলে। সঙ্গে থাকে প্রাতরাশ। ক্রমে ক্রমে ছেলেদের দল সকালে প্রাতরাশের সময়কেই যথাযথ সময় বলে মনে করতে থাকে। নানারকম প্রাতরাশের সঙ্গে জমে ওঠে দেশমাতৃকার মুক্তির চেতনা তৈরির কাজ। দেশ-চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার ডাক দেন নিবেদিতা। প্রাতরাশের এই জমায়েতের নাম হয়ে যায় নিবেদিতার ‘প্রাতরাশ সভা’। মাঝে মাঝেই ড. রমেশচন্দ্র দত্ত আসছেন, সঙ্গে কংগ্রেসের কোনও রাজনৈতিক নেতা। ১৯০১-এর ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে কলকাতায় হয়ে গেছে কংগ্রেসের জাতীয় মহাসভা। অনেক নেতাই থেকে গেছেন বেশ কিছুদিন। যেমন মহাত্মা গান্ধী। তিনি একদিন এলেন নিবেদিতার বাড়ি। দীর্ঘক্ষণ আলোচনা হল নিবেদিতার সঙ্গে। নিবেদিতা সর্বাত্মক স্বাধীনতার পক্ষে। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রয়োজন এবং তা ছিনিয়ে নিতে হবে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। তার জন্য দরকার তরুণ প্রজন্মকে সংগঠিত করা, জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, দ্রুত জাতীয়তাবাদী আন্দোলন গড়ে তোলা। শুধু অনুরোধ-উপরোধের উপর নির্ভর করে দেশকে স্বাধীন করা সম্ভব নয়। মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে মতের অমিল হলেও নিবেদিতার চিন্তাকে মহাত্মা গান্ধী শ্রদ্ধা জানালেন। নিবেদিতার শিক্ষা প্রসারের উদ্যোগকে, বিশেষ করে স্ত্রী-শিক্ষা প্রসারের কর্মোদ্যমকে, প্রশংসা করলেন গান্ধীজি। যদিও গান্ধীজি স্বীকার করেছেন, “কথাবার্তায় আমাদের মধ্যে বিশেষ কোনও ঐক্যের সুর ধরা পড়িল না।”

বারীন্দ্রকুমার ঘোষ

এই রকম এক মুহূর্তে নিবেদিতা ‘প্রবুদ্ধ ভারত’ পত্রিকা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলেন। দ্বন্দ্ব যা অনিবার্য ছিল, তার প্রকাশ দেখা দিল স্বরূপানন্দের সঙ্গে লেখা নিয়ে মতানৈক্যে। স্বরূপানন্দ নিবেদিতার কর্মক্ষেত্রের উপর বিধি-বিধান আরোপ করতে চাইলেন। ‘প্রবুদ্ধ ভারত’ পত্রিকায় নিবেদিতার লেখায় যেন রাজনৈতিক বক্তব্য না থাকে! একসময় নিবেদিতা দিনে সতেরো ঘণ্টা পরিশ্রম করেছেন এই পত্রিকার জন্য। নিবেদিতা তাকিয়ে থাকেন স্বরূপানন্দের দিকে। ভারতাত্মার মুক্তির জন্য চাই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতা, ভারতবাসীকে জাতীয়তাবাদী ভাবনায় ভাবিত করার কাজ নিয়ে এসেছেন তিনি ভারতে। ভারতবর্ষের সুমহান ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, সম্পদ সব কিছুর অধিকার ভারতবাসীর, তা লুঠ করে নিয়ে যাবে কেউ, তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবেই, মানসিক প্রস্তুতি এবং দৈহিক প্রস্তুতি প্রয়োজন আজ তরুণদের — এইসব বিষয়গুলি নিয়ে লেখার উপর নানা রকম বিধিনিষেধ আসে। নিবেদিতা স্থির, তিনি এখন থেকে এই কথাগুলির প্রচারক। দেশগঠন তাঁর মূল কাজ। কিন্তু রাজনৈতিক কোনও মত প্রকাশ করা যাবে না ‘প্রবুদ্ধ ভারত’ পত্রিকায় — স্বরূপানন্দ মঠের অবস্থান পরিষ্কার করে দেন। নিবেদিতাও জানিয়ে দেন, কোনও অবস্থায় তিনি তাঁর স্বাধীনতা বর্জন করতে পারবেন না। ‘প্রবুদ্ধ ভারত’ পত্রিকার সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করলেন নিবেদিতা।

ওই তিনি শুয়ে আছেন। নিথর। শ্বাস-প্রশ্বাসহীন। নৌকা চলেছে ঘাটের দিকে। ছবির মতন ভেসে আসছে এক-একটি চরিত্র, নানা রকম ঘটনা। স্বামীজি ফিরে এলেন কাশী থেকে। শরীর ভেঙে পড়েছে। চোখ লাল। হাঁফ উঠছে থেকে থেকে। সঙ্গে জোসেফাইন ম্যাকলয়েড ও তাঁর দুই জাপানি বন্ধু। জোসেফাইন তাঁর জাপানি বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন নিবেদিতার। প্রিন্স ওডি একজন নিষ্ঠ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষ। তাঁর ইচ্ছা স্বামীজির সঙ্গে যাবেন সাঁচি স্তূপ দেখতে, বুদ্ধগয়া। ওকাকুরা কাকুজো শিল্প ও দর্শন শাস্ত্রের পণ্ডিত মানুষ। জাপানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও মন্দির সংরক্ষণ ও সংস্কার সমিতির প্রধান। আশ্রমবাসীর মতো অনাড়ম্বর জীবন কাটান। জাপানে এক বিরাট ধর্মসভায় স্বামীজিকে নিমন্ত্রণ করতে এসেছিলেন। স্বামীজি নাকি সঙ্গে সঙ্গে জাপানে যেতে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। প্রিন্স ওডির প্রস্তাব মতো উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন যাবেন বুদ্ধগয়া ও কাশী। কয়েকজন সন্ন্যাসীকে সঙ্গে নিয়ে ম্যাকলয়েড, প্রিন্স ওডি এবং ওকাকুরা দলবেঁধে গিয়েছিলেন বোধিদ্রুম বৃক্ষমূলে এবং বিশ্বনাথের পায়ে পুজো দিতে। স্বামীজির এই দু’টি ইচ্ছে ছিল — ধূপকাঠি জ্বালিয়ে করুণাবতার বুদ্ধের সামনে সাষ্টাঙ্গ শুয়ে নিবেদন করবেন প্রার্থনা আর কাশীর গঙ্গায় স্নান করে চিতাভস্ম ললাটে মেখে ধ্যান করবেন। কিন্তু কাশী ও বুদ্ধগয়া ঘুরে আসার পর শরীর আরও খারাপ হয়েছে। নিবেদিতার উৎকণ্ঠা ধরা পড়ে চোখে-মুখে। ওকাকুরার সঙ্গে প্রাথমিক আলাপে ভাল লাগে নিবেদিতার। ঔপনিবেশিক দেশগুলোর স্বাধীনতার বিষয়ে তাঁর মতামত বেশ পরিষ্কার। জাতীয় শিল্প ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ নিয়ে তাঁর কাজের কথাও শুনলেন নিবেদিতা। কিন্তু নিবেদিতার মনের সবটুকু জুড়ে এখন তাঁর পিতার শরীর ও মনের স্বাস্থ্য। আর কিছুতেই তাঁর মন নেই।

ওকাকুরা কাকুজো

নিবেদিতা সর্বক্ষণ সময় কাটাতেন মঠে স্বামীজির সেবায়। স্বামীজি কখনও শিশুর মতো সরল, কখনও স্নেহবৎসল, কখনও চূড়ান্ত বিরক্ত ও খিটখিটে। নিবেদিতা হাসিমুখে সব মেনে নিচ্ছেন। ‘উনি অসুস্থ এমন যে এখন যেন-তেন-প্রকারেণ সবসময় ওঁকে আরাম দেওয়া ছাড়া আমার কাজ নেই। এ সময় সত্য-মিথ্যার চুলচেরা বিচার করলে বা যুক্তির গরমিল হল কি না তা নিয়ে মাথা ঘামালে চলে না।’

নিবেদিতা এখন নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিতে চান স্বামীজির সেবায়। আর স্বামীজি তাঁর দৈনন্দিন জীবন অসম্ভব নিয়ন্ত্রিত কঠোর যাপনের মধ্যে নিয়ে গেলেন। দিনে একবার খাওয়া। বিকেলে বিশ্রাম না নিয়ে ক্লাস করা। রাতে সামান্য জলযোগ। জল নয়, দুধ খাচ্ছেন শুধু। রোগে আক্রান্ত হলেও তিনি তত বেশি ধ্যানমগ্ন থাকতেন। ভোর চারটেয় সবাইকে ঘুম থেকে তুলে গঙ্গাস্নান করে ধ্যানে বসেন। নিবেদিতাও আসেন সকাল-সকাল। বসেন ধ্যানে। সবসময় তাঁর সজাগ দৃষ্টি স্বামীজির প্রতি। আর অবসরে ব্রহ্মানন্দ ও অন্যান্য সন্ন্যাসীদের সঙ্গে গল্প করে করে শোনেন তাঁর অনুপস্থিতিতে স্বামীজির গল্প ও কথা। কী করতেন, কারা কারা আসতেন—এইসব।

সেবার কলকাতায় কংগ্রেসের ভারতীয় জাতীয় মহাসভার অধিবেশন ডিসেম্বরের শেষ দিকে। কলকাতায় গিজগিজ করছে মানুষ। মোড়ে মোড়ে পুলিশ। বাড়ি বাড়ি ভলান্টিয়াররা যাচ্ছে প্রচারকাজে। নিবেদিতা সাধারণভাবে যোগ দিয়েছেন জাতীয় মহাসভায়। বহু নেতার সঙ্গে আলাপ হয়েছে। গান্ধীজিও এসেছেন, মহাসভার কর্মী হিসেবে নন, এসেছেন সাধারণভাবেই। অনেক নেতাই আসছেন বেলুড়ে। তাঁদের কাছে স্বামীজি ‘দেশপ্রেমিক সন্ন্যাসী’। বিকেলের দিকে কলকাতা শহর থেকে একটু দূরে গঙ্গার পাশেই সবুজ গাছগাছালিতে ঘেরা বেলুড় মঠে দেখা গেল অনেক নেতাই আসছেন স্বামীজির কাছে। ভারতের মুক্তির পথ সম্পর্কে শুনছেন স্বামীজির কথা। নিবেদিতা থাকেন সেই সময়। স্বামীজির প্রতি নজর রাখেন, আবার আলোচনায় অংশ‌ও নেন। বালগঙ্গাধর তিলক একদিন এলেন স্বামীজির কাছে। গঙ্গার ধারে পায়চারি করতে করতে কথা বলছেন স্বামীজি ও লোকমান্য তিলক। সবাইকে আশ্চর্য করে বিবেকানন্দ ঘণ্টাখানেক পায়চারি করেছেন। মুখে খুশি ও তৃপ্তির রেশ। নিবেদিতা পিতার পাশেপাশেই আছেন। সবাই অবাক। চা-পানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তিলক বলে উঠলেন, ‘মহারাষ্ট্রের লোকেরা সব আমার সঙ্গে, আর সুরেন্দ্রনাথের সঙ্গে আছে বাংলার লোকেরা।’

স্বামীজি হেসে বললেন, ‘জনসাধারণের জায়গা কোথায়? ধর্মে আঘাত না দিয়ে জনসাধারণের উন্নয়নই হল সকল আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য। মানুষ তৈরি করো, মানুষ তৈরি করাই আমার কাজ। গোঁড়া হিন্দুরা প্রাচীন ঋষিদের দোহাই দিয়ে তাঁদের প্রবর্তিত আচার-অনুষ্ঠানগুলি কেবল মানে। অথচ মানুষের মধ্যে যে নারায়ণ আছে, তা দেখতে পায় না। এর চেয়ে গুরুতর অপরাধ আর কিছু আছে কি?’

স্বামীজি কিছুটা মজার ছলেই লোকমান্য তিলককে বললেন, ‘সন্ন্যাস নিয়ে কলকাতায় এসে বাংলার জন্য কাজ করুন আর আমি বোম্বাই গিয়ে কাজ করব।’

অধিবেশনের প্রায় প্রতিদিনই যেন আরেকটি অধিবেশন বসতে দেখা গেছে বেলুড় মঠে। স্বামীজি উৎফুল্ল হতেন নবভারত জাগ্রত করার নানাবিধ আলোচনায়। কংগ্রেসের নেতারা বুঝতেন এই সন্ন্যাসীর রাষ্ট্রচেতনা গঠন, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, শিক্ষার প্রসার, জাতীয় স্বাস্থ্য ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা শুধু নয়, সুদূরপ্রসারী প্রয়োগকারী পরিকল্পনাও সুষ্পষ্ট। অবাক হতেন তাঁরা।

স্বামীজির সঙ্গেই ধ্যানে বসেছেন নিবেদিতা। সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে রাতের দিকে ঢলে পড়ছে। কারও খেয়াল নেই। নিবেদিতা চোখ খুললেন। বসে আছেন চুপ। স্বামীজি চোখ খুললেন বেশ কিছুক্ষণ পড়ে। তারপর ধীরে বললেন, ‘মার্গট, ধ্যান করতে বসে দেহবোধ হারিয়ে ফেললাম। দেখছি সব শূন্য… একেবারে ফাঁকা… চন্দ্র -সূর্য, দেশ-কাল, মহাব্যোম সবই একসা হয়ে গেল, তারপর মিলিয়ে গেল!’

নিবেদিতা শোনেন। ভয় হয়। তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে বসে থাকেন। একেক সময় যেন শিশুর মতন অভিমানে চোখ জলে ভরে ওঠে স্বামীজির— ‘কেন আমায় ডাকলে? কেন ডাকলে আমায় মার্গট! আমি সাড়া দিতে পারি না… আমি যে মহাসঙ্গমের পথে পা বাড়িয়েছি।’

নিবেদিতার‌ও দু’চোখ বেয়ে অনর্গল জলধারা নেমে আসে। গুরু ও শিষ্যা, পিতা ও কন্যা, দু’জনের চোখেই জল। নিঃস্তব্ধ চারপাশ। বড় জানালা দিয়ে রাতের আকাশ ছেয়ে ফেলে ঘর। দেওয়াল ভেঙে পড়ে। মহাব্যোমে হারিয়ে যেতে থাকে গুরু ও শিষ্যা। কৃষ্ণগহ্বরে হারিয়ে যায় রথ ও রথী। নৌকা ডোবার সময় এগিয়ে আসছে। পড়ে থাকবে এই দেহ খোলসের মতো! কোনও কষ্ট নয়। কোনও দুঃখ নয়। শুধু অমৃত-যাত্রার অপেক্ষা!

নিবেদিতা দু’হাতে চোখের জল মোছেন। তরুণ ব্রহ্মচারী নৌকায় উঠে দাঁড়িয়ে তীরের দিকে তাকায়। গোপালের মা আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখের জল মোছেন। অদূরে দেখা যাচ্ছে বেলুড় মঠের ঘাট। লোক সমাগম হয়েছে মঠে, দেখা যাচ্ছে। চোখের জল বাধা মানছে না। নৌকা এগিয়ে চলে। ছলাৎ ছল, ছলাৎ ছল।

গরম পড়ছে। শুকনো হাওয়া। মার্চ মাস। নিবেদিতা সন্ধ্যায় ফিরে আসছেন দ্রুত বাগবাজারে। প্রিয় জো-কে দ্রুত জানিয়ে দিতে হবে সংবাদটি। ঘরে এসেই চিঠি লিখতে বসেন। খুব জরুরি এই খবরটি জানিয়ে দেওয়া দরকার। জো-কে জানালেই জো নিশ্চয়ই সবাইকে সতর্ক করে দেবে। দোয়াতের কালিতে কলম ছুঁইয়ে লিখতে শুরু করেন।
Calcutta
March 3, 1902
To
Miss MacLeod

It is so uncomfortable to feel that I cannot express myself at all affectionately or freely because I have received a warning that the police have taken authority to open my letters, and I do not care to write to you for their eyes. The very possibility puts a restraint.

It has suddenly grown hot, and I am afraid our party* may break up.

( *Marginal pencil note says – ‘Leftist party in Congress. Letters of Sister Nibedita, page – 458 )

চিঠিটি লেখা শেষ হতে না দমকা বাতাসে সেজবাতি গেল নিভে।
নিবেদিতা চিৎকার করেন, ‘কুসুম, কুসুম, তাড়াতাড়ি আলো নিয়ে আয়!’
কুসুম অন্ধকার থেকে উত্তর দেয়, ‘ঝড় উঠেছে! জানালা, দরজা বন্ধ করতে হবে!


সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জুলাই ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

5 1 ভোট
Article Rating
6 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Abhijit Sengupta
Abhijit Sengupta
1 year ago

দুর্দান্ত লেখা পড়ছি প্রথম দিন থেকে। অনির্বচনীয় আনন্দে মনে ভরে উঠছে। কতো নতুন তথ্য জানতে পারছি। বই প্রকাশ কবে হবে সেই অপেক্ষায় থাকছি অধীর আগ্রহে।

Rajat Chakraborti
Rajat Chakraborti
1 year ago

থাকুন সঙ্গে। ভালো লাগে আপনাদের প্রতিক্রিয়া।

শিপ্রা ভৌমিক
শিপ্রা ভৌমিক
1 year ago

১২৩ বছর পিছিয়ে গিয়ে সময়টাকে দেখতে পাচ্ছি! বিপ্লবী নিবেদিতার সঙ্গে নিবিড় পরিচয় হচ্ছে আমাদের!দৃশ্যকল্প অনবদ্য! সাঁকোটা দুলতে থাকুক!

নবনীতা দে ।
নবনীতা দে ।
1 year ago

ঋষি প্রতিম জগদীশ চন্দ্র বসু প্রমাণ করে দিলেন সেই সত্য কে, যা ভাগীরথীর তীরে উচ্চারিত হয়েছিল বহুদিন আগে । বেদান্ত, বিজ্ঞান একাকার!!বহুর মধ্যে ঐক্য! যা এই ভারতবর্ষের জীবন দর্শন।
যত জানছি তত এক ঘোরের মধ্যে পড়ে যাচ্ছি ।
বিবেকানন্দ বলছেন ধর্ম কে আঘাত না দিয়ে মানুষের উন্নতির কথা , প্রকৃত মানুষ গড়ার কথা ! নিবেদিতা বুঝেছেন তরুণ দের আগে জাগাতে হবে , কারা আসবেন এই ডাকে !!
ও দিকে লিনিয়ার সোসাইটি তে কি হতে চলেছে !! অনেক আগ্রহ নিয়ে জানার অপেক্ষায় আছি ।

RAJAT KANTI CHAKRABORTI
RAJAT KANTI CHAKRABORTI
1 year ago

সঙ্গে থাকুন। এই একটা আশ্চর্য সুন্দর সময় আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। দর্শনের পারস্পরিক বিরোধিতা থাকলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ সমাজকে কতটা সৃজনশীল করে তোলে কতটা সমৃদ্ধ করে তোলে এই সময়টা সেটাকেই চিহ্নিত করে।

Piyali Mukherjee
Piyali Mukherjee
1 year ago

বারীণ ঘোষ এর ব্যাপারে জানতে আগ্রহী রইলাম।অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে জানছি,ভালো লাগছে।পরবর্তী র জন্যে আগ্রহী রয়েছি।