তিনি বলতেন: ‘আমার জীবনগঠনের মূলে রয়েছেন প্রধানত তিনজন। একজন হলেন কর্ণেল লিউকিস, কলকাতা মেডিকেল কলেজের ইংরেজ প্রিন্সিপ্যাল। আমার চিকিৎসার ভিত তৈরি করে দিয়েছিলেন তিনিই। আর আমার রাজনীতির গুরু হচ্ছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন। তাঁর কাছেই আমার রাজনীতি ও সংসদীয় কার্যকলাপের হাতেখড়ি। এর পরে আসে তৃতীয় ব্যক্তির কথা, তিনি হলেন মহাত্মা গান্ধি। তাঁর সত্য ও অহিংসার নীতি আমাকে যে যথেষ্ট প্রভাবিত করেছিল সন্দেহ নেই। তাঁর কাছে আমি এ-ও শিখেছিলাম, নিজের জীবনেই হোক, আর রাষ্ট্রের ব্যাপারেই হোক দৈনন্দিন সমস্যা বিষয়ে কী করে এই নীতির প্রয়োগ করা সম্ভব।


হয়তো বুঝতে পারছেন অনেকেই কার কথা বলছি। অবশ্যই ডা. বিধানচন্দ্র রায়। তাঁর জীবন মানেই রাজ্যজুড়ে উন্নয়নের নানাস্বাদের গল্প। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু বলতেন, বিধানচন্দ্র নিজেই ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠানবিশেষ। আবার কেউ তাঁকে বলতেন হিতকারী এক নায়ক। একই সত্তায় তিনি ছিলেন বহির্মুখী এবং অন্তর্মুখী। যখন তিনি এই পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হলেন, তখন তাঁর উত্তরপ্রদেশের রাজ্যপাল হবারও সুযোগ ছিল। তিনি রাজ্য পরিচালনার কঠিন দায়িত্বই কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। কঠিন, তার কারণ সময়টা নানা দিক থেকেই ছিল জটিল। পশ্চিমবঙ্গ বলে আরও অনেকটাই জটিল। কারণ সেইসময়ে এই রাজ্যকে দেশভাগের জন্য উদ্বাস্তুস্রোতের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। তার সঙ্গে আছে রাজ্যের নব রূপায়ণ।
মুখ্যমন্ত্রিত্বের দায়িত্বও নিয়েছিলেন বিশেষ একটি দিনে। নেতাজি সুভাষচন্দ্রের জন্মদিনে, ১৯৪৮ সালে। সাধারণত, যে বয়সে বেশিরভাগ মানুষ রাজনীতিতে আসেন, তার চেয়ে বেশি বয়সেই, বিয়াল্লিশ বছর বয়েসে রাজনীতিতে এসেছিলেন বিধানচন্দ্র রায়। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পেয়েছেন আরও পরে। পঁয়ষট্টি বছর বয়সে। তারপর সাড়ে চোদ্দো বছর তিনি রাজ্য পরিচালনা করতে পেরেছিলেন। প্রথম দায়িত্ব পেয়েই তিনি আক্ষেপের সুরে বলেছিলেন: ‘কাজ করার জন্য বড়ো অল্প সময় মিলবে।’ কিন্তু এই সময়ের মধ্যেই রাজ্যকে ঘিরে তাঁর স্বপ্ন দেখা, তা বাস্তবে পূরণ করার যে নজির রেখেছেন, তার জন্য তাঁর সম্পর্কে ‘পশ্চিমবঙ্গের রূপকার’ বিশেষণটি ব্যবহার করতে তাঁর বিরুদ্ধবাদীরাও কার্পণ্য করেন না।
রাজ্যে নতুন চারটি বিশ্ববিদ্যালয়, শিল্পনগরী দুর্গাপুর ইস্পাতপ্রকল্প, তৈল শোধনাগার, দ্বিতীয় হুগলি সেতুর পরিকল্পনা, ভারতের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে, ময়ূরাক্ষী প্রকল্প, ফরাক্কা জলাধার, কলকাতা রাষ্ট্রীয় পরিবহণ, হরিণঘাটা দুগ্ধপ্রকল্প-এমনকী পরবর্তীকালে রূপায়িত হওয়া সল্টলেক উপনগরী-সবই ছিল তাঁর স্বপ্ন ও পরিকল্পনার ফসল।
দেশের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু তাঁর ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ বন্ধু হতে পারেন, কিন্তু রাজ্যের স্বার্থে তিনি যুক্তি দিয়ে দাবি আদায়ে কঠিন ভাষা ব্যবহারেও পিছপা হতেন না। রাজ্যে সেইসময়ে উদ্বাস্তু সমস্যা ছিল প্রকট। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ন্যায্য পাওনার জন্য ন্যায়সঙ্গত যুক্তি দিয়ে লড়তে হয়েছিল তাঁকে।
ষোলো লক্ষ উদ্বাস্তুর ত্রাণ ও পুনর্বাসনের বিপুল ব্যয় নিয়ে রাজ্য সরকার যখন হিমসিম খাচ্ছে, তখন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় লক্ষ করলেন: পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত উদ্বাস্তুদের জন্য যা যা করা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের উদ্বাস্তুদের জন্য তা করা হচ্ছে না। ১৯৪৯ সালের পয়লা ডিসেম্বর তিনি নিদারুণ ক্ষোভে জওহরলালকে দীর্ঘ চিঠিতে লিখলেন: ‘তোমার চিঠিতে যে এত উপসংহার টানা হয়েছে, তার জন্য যে যুক্তি দেখানো হয়েছে, তা আমার মনে একেবারেই দাগ কাটল না বলে আমি দুঃখিত। তোমার ধারণা, তোমার সরকার ত্রাণ ও পুনর্বাসন বাবদে আমাদের মোটা টাকা দিয়েছে। কিন্তু তুমি কি জানো, এই বাবদ অনুদান যা তোমার সরকারের কাছ থেকে পাওয়া গেছে গত দুই বছরে, তা হচ্ছে তিন কোটি টাকার কিছু বেশি, আর বাকি প্রায় পাঁচ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে ঋণ হিসেবে। পাঞ্জাবে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত উদ্বাস্তুদের জন্য যা খরচ করা হয়েছে, তার তুলনায় এই টাকাটা যে নগণ্য, তা কি তুমি জানো? আমি তুলনা করতে চাই না, কারণ তুলনা ব্যাপারটা সবসময়েই বিদ্বেষ সৃষ্টিতে সহায়ক হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু একথা আমি বলতে চাই, ষোলো লক্ষ উদ্বাস্তুর পক্ষে এই অনুদান অতি সামান্য। এই অঙ্ক দুই বছরে জড়িয়ে হিসেব করলে দাঁড়ায় মাথাপিছু প্রায় কুড়ি টাকা। একে কি তুমি মোটা টাকা বলবে?’-ওই যুক্তির সত্যতা মানতে বাধ্য হয়েছিলেন জওহরলাল।


ডা. রায়ের একাশিতম জন্মদিন পালনের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ১৯৬২ সালের পয়লা জুলাই রাষ্ট্রপতি ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণও এসেছিলেন কলকাতায়। কিন্তু জন্মদিনেই নিভে গেল বিধানচন্দ্রের জীবনদীপ। জন্মদিনের পুষ্পস্তবক অর্পিত হলো শবাধারে। জন্ম ও মৃত্যু একাকার হয়েছিল সেদিন।

[বেতারে সম্প্রচারিত- ১ জুলাই ২০০৪]

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জুলাই ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]