
নীল অরণ্য
অফিস থেকে যখন বেরোলাম, তখন রাত প্রায় এগারোটা। রাস্তা সুনশান। গাড়ি পেলে হয়। কি ভাগ্য! একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়ালো সামনে।
ক্লান্ত শরীরটা সীটে এলিয়ে দিয়ে বললাম — ‘ঢাকুরিয়া’। একটু ঝিমুনি আসছিল। হঠাৎ রীতিমতো চমকে উঠলাম — ড্রাইভারের মাথার পেছনে ঘাড়ে , চুলের আড়ালে , উল্কি করে লেখা একটা নম্বর দেখে। একি সেই ? লেখা রয়েছে — 90013. আবার ভালো করে দেখলাম। না কোনো ভুল নেই।
আড়চোখে আয়নায় তাকালাম। ড্রাইভার ঘন দাড়ি-গোঁফে ঢাকা মুখটা সামান্য হেলালো। কেঁপে উঠে বললাম — ‘ আপনি… ‘হ্যাঁ, স্যার, আমিই। সাজ্জাদ হোসেন।’
সাত- আট বছর আগের কথা। ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে সবে চাকরিতে ঢুকেছি। সিনিয়র আর্কিটেক্ট অরুনিমা-দি, আর জিএম– পি.এন.বাসু। একজন সুন্দরী বিদুষী ; আরেকজন সম্ভ্রান্ত, বিবাহিত। দুজনের গোপন রোমান্সের গালগল্প নিয়ে অফিস তখন একেবারে সরগরম। বিশেষত মেয়েদের মহলে।
অরুণিমা-দি অফিসে আসতেন-যেতেন একটা বাঁধা ট্যাক্সিতে। ড্রাইভারের নাম সাজ্জাদ হোসেন। রোজ দুবেলা দেখতে দেখতে, ট্যাক্সির নম্বরটাও আমাদের মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল—WBT 99013, আর বাসু-সাহেবেরতো, নীজের গাড়ি ছিলই । দুজনে কখনোই একসঙ্গে বেরোতেন না, তবু নানা গুজব হাওয়ায় ছড়াতো, যেমন — দুজনকে নাকি মাঝেমাঝেই রাতের দিকে দেখা যায় পার্ক-স্ট্রিট এলাকায়, বা অন্য কোথাও। এইসব নিয়ে হাসাহাসি, কানাকানি লেগেই থাকতো।
তবে, ঐপর্যন্তই।

কিন্তু হঠাৎ একদিন যা ঘটলো, তার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিলনা। এককথায় অকল্পনীয়। দুজনে রাতারাতি একসঙ্গে নিখোঁজ হয়ে গেলেন —যাকে রহস্যময় বললে, নিতান্তই কম বলা হয়। যেন উবে গেলেন হাওয়ায়।
পুলিশ, ডিটেকটিভ, সাংবাদিক বিস্তর হয়েছে। কিন্তু না , সে রহস্যের কিনারা হয়নি আজও। এইটুকু শুধু জানা গেছে যে দুজনকে শেষ দেখা গিয়েছিল একটা ট্যাক্সিতে। কিন্তু সে ট্যাক্সিরও হদিশ মেলেনি। পুলিশের অনুমান এটা জোড়া সুইসাইডের কেস। কিন্তু তারও কোনো প্রমাণ মেলেনি।
আমি নিজের চোখ- কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কোনরকমে উত্তেজিতস্বরে জিজ্ঞেস করলাম — ‘ওনারা এখন কোথায় সাজ্জাদ? ‘
—‘বিসোয়াস করুন স্যার, সেকথা আমি জানিনা। তবে হাঁ… আমি যা জানি… সাজ্জাদ বলতে লাগলো … বাসু-সাহেবের শ্বশুরবাড়ির লোকেরা বহুৎ খতরনাক আদমী সব। তারা অরুণিমা ম্যাডামকে ফোনে গালাগালি দিচ্ছিল, হুমকি দিচ্ছিল । তারপর একদিন, গুন্ডা দিয়ে আমার পকেটে জোরজবরদস্তি কিছু টাকা গুঁজে দিল। বদলে, আমাকে বলল … দো-দিন পর ম্যাডামকে ভুলিয়ে -ভালিয়ে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে। বুঝতেই পারছেন, খুব খারাপ মতলব ছিল বদমাশ গুলোর। ‘ সাজ্জাদ একটু থামলো।
আমি শিউরে উঠে বললাম… বলছো কি? তারপর?
ও নিজের বুকে চাপড় মেরে বললে —‘সাজ্জাদ হোসেন জানের পরোয়া করেনা। পরদিন রাতেই বেরিয়ে পড়লাম সাহেব আর ম্যাডামকে নিয়ে। পাগলের মত গাড়ি চালালাম সারারাত। পয়লা হল্ট একদম ভোরবেলায়। একেবারে ঝাড়খন্ডের বর্ডারে। দলমা পাহাড় আর গাছের ফাঁকে তখন সবে সূর্যদেব উঁকি মারছে। মাঝখানে আঁকাবাঁকা মেঠোপথ। আমার প্রিয় মানুষ দুজন, চলে গেলেন হাত নেড়ে। ও হাঁ, যাবার আগে একটা খামে অনেক টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন আমাকে। আমি ট্যাক্সির ভোল পাল্টে, ভেগে গেলাম মুলুক ছেড়ে। শুধু পুরোনো নম্বরটা লিখে রাখলাম উল্কি করে। ম্যাডামের সঙ্গে যদি আবার কোনদিন দেখা হয়, আমায় চিনে নিতে পারবেন। ‘ থামলো সাজ্জাদ। গোঁফের কোনে একটা মৃত্যুহীন হাসি।
পাথরের মতো বসেছিলাম। ঢাকুরিয়ায় আমাকে নামিয়ে দিয়ে সাজ্জাদ ট্যাক্সি ঘোরালো। দেখলাম প্লেটে বিলকুল অন্য নম্বর। চাপা গলায় বললাম ‘সাবধানে থেকো সাজ্জাদ ভাই। ‘ ও হাতটা তুললো শুধু।
ট্যাক্সি মিলিয়ে গেল অন্ধকারে।

