
অরুণাচল ভ্রমণ (পর্ব- ৩)

সকাল সকাল প্রাতরাশ সেরে গাড়ি তে বসলাম সবাই, যাব দিরাং এর দিকে। আরো উত্তর দিকে ১২৯.৫ কি মি
দূরে। পাহাড়ি রাস্তায় অনেকের বমি ভাব হয়, কেউ কেউ বমি করে, আমার কিন্তু খুব ভালো লাগে। বেশ মজা পাই। ঘুরতে ঘুরতে পাহাড়ি রাস্তায় চলেছি
বাম দিকে পাহাড় কখন, আবার ডান দিকে পাহাড় কোনো সময়! পাহাড়ের দিকে নানান পাহাড়ি গাছ, লতা পাতা, গুল্মের ঝোপ! এগুলো কিন্তু খুব প্রয়োজন পাহাড়ি এলাকায় ধস আটকাতে! আর রাস্তার অন্য পাশে তখন অনেক নিচে দেখাচ্ছে ছোট ছোট গ্রাম, বাড়ি, পাহাড়ি চাষ, সরু হয়ে যাওয়া নদী, ঝোরা, ঝর্ণা!
একেবারে ছবির মত।
খানিক চোখ টা এঁটে গেছল! হঠাৎ ঘাড়ে তীক্ষ্ণ নখের খোঁচা! প্রথমে ভাবলাম বাজপাখি ঘাড়ে বসে ঠোকরালো!
“এই যে ড্রাইভারের পাশে বসে ঘুমোচ্ছো কেন?”
মানবের মালাদির হাই পিচ গলা!
“কে বললে ঘুমুচ্ছি? আমি তো একটু ধ্যান করছিলাম। সকাল বেলা মা কালীর ধ্যান করছিলাম, মা
আমাদের দেখো মা!”
“ও সব ভুরকি বাজি অনেক জানি তোমার! ঘাড়
হেলে যাচ্ছে! সোজা তাকিয়ে থাক!”

কি মুশকিল বলুন, ইদানীং আমার পেট ভর্তি হলেই, খানিক বাদে চোখ বুজে আসে! এটা কোন রোগ কিনা আমার চক্ষু বিশারদ বাল্য বন্ধু ডাক্তার সুশোভন অধিকারী বলতে পারবেন! একবারে ডাইরেক্টলি প্রোপর স্যানাল ! আর হবে নাই বা কেন, গরম গরম তিনটে পরোটা, আলু ফুলকপি ধনেপাতার তরকারি, আর গরম পান্তুয়া! এই ঠাণ্ডায় কি করে গরম খাওয়াচ্ছে, ভাবা যায় না। আবার মানব চোখ টিপে বলল দাদা পান্তুয়া একটা খেতে নেই, তাই আর একটা নিলাম। এর খানিক পরে যাত্রা, তাহলে ঘাড় তো হেলবেই!
সিদ্ধার্থ বললো দিরাং ভারি সুন্দর জায়গা। পশ্চিম কামেং জেলার সাব ডিভিশন হেড কোয়ার্টার। এখানে
মান্ডলা বলে একটা জায়গা থেকে ট্রেক করে যেতে হয়, একজায়গায় প্রচুর পাখি দেখা যায়! বার্ড ওয়াচার রা
যায়!
খানিক পর এলাম এক বিরাট মনেস্ট্রি (আপার, বোমডিলা)
বেশ ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে! চত্বর টা ভারী সুন্দর সাজানো!
যে সময় গেলাম, তখন সার সার বৌদ্ধ সন্ন্যাসী আসনে বসে এক সুরে মন্ত্র উচ্চারণ করছে! সমবেত কণ্ঠের ওই মন্ত্র মনে ভক্তি ভাব এনে দেয়! একদম প্রথমে বিরাট বুদ্ধের মূর্তি। তার একটু নিচে দলাই লামার ছবি।
আর মাটিতে, আসনে ওই ভক্ত বৃন্দ!
অনেক ছোট ছোট লামা ছোটাছুটি করছে! ওখানেই ওরা আবাসিক। তাই নিজেদের মধ্যে খেলা, ছোটাছুটি তো করবেই। ওদের বৌদ্ধ ধর্মের নানান শিক্ষার মধ্যে চলতে হয়। অনেক ফটো তোলা হল।
এর পর সৈনিকদের সংগ্রহ শালা ও স্মৃতি কক্ষ আছে!
সেগুলো দেখে আমরা জামিরি পয়েন্ট হ্যাঙ্গিং ব্রিজ এ
ছবি তোলার জন্য দাঁড়ালাম। এক পাহাড়ি নদীর ওপর
লোহার দোলায়মান ব্রিজ। একসঙ্গে দশ জনের বেশি উঠতে মানা!
এক রাউন্ড গরম কফি খাওয়া হল এখানে।
রীতিমতো ঠান্ডা অনুভব করতে করতে, সন্ধ্যে নাগাদ দিরাং এ হোটেল প্রবেশ করলাম।
আজ যাব তাওয়াং এর দিকে, সেলা পাস হয়ে। দিরাং থেকে তাওয়াং প্রায় ১৩৯.২ কিলোমিটার।
ভারতের সুন্দর শৈল শহরের মধ্যে অবশ্যই তাওয়াং পড়ে! এই শহরের উচ্চতা ১০,২০০ ফুট। লাদাখের
লেহ শহর ছাড়া, আর কোন পাহাড়ি শহর এই উচ্চতার
নেই।এই সেলা পথে কখন কি আবহাওয়া থাকবে বলা যায় না। একদম সকাল সকাল ঠিক থাকে, বেলা বাড়লেই জটিল হতে আরম্ভ করে।
আজ আর ড্রাইভারের পাশে বসিনি! গরম গরম রুটি, আলু কপির তরকারি, ডিম সেদ্ধ, মিষ্টি আর চা! পেট ভালই ভর্তি। যেতে সময় লাগবে।, রাস্তা তেই লাঞ্চ এর ব্যবস্থা হবে! এইবার একটা কথা মনে আসতে হাঁসি পেল। প্রথমে ভেবেছিলাম,এই৩৬ জনের দলে আমিই
একমাত্র ডাক্তার! তাহলে কিছু দায়িত্ব তো থাকবে,
তাই এক ব্যাগ ঔষধ (স্যাম্পল ফাইল) নিয়েছি, কার কি দরকার পড়ে তো বলা যায় না! তার পর
নেবুলাইজার আনুষাঙ্গিক ওষুধ (কিনে) ব্যাগের ওজন বাড়িয়েছি!
একটু মনের মধ্যে গ্যাসের বেলুন একটা ফুলেছিল!
সেটা ফুস স স করে চুপসে গেল! জানি আমার
ভায়েরা বিখ্যাত মনের ডাক্তার গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়, সার্জন সুকুমার মাইতি, ফিজিশিয়ান সিদ্ধার্থ মুখোপাধ্যায়, সব হাঃ হাঃ হাঃ করে হাসবে! চুপসে গেলাম, যখন জানলাম এই ট্যুর এ আরো ছয় জন ডাক্তার আছেন!
বেকার সব বয়ে বেড়ালাম কারুর কোন কাজে লাগলাম না! শুধু আমার লেগেছে পরে বলবো।
গাড়ির মধ্যে জোর কদমে অন্তাক্ষরি চলছে। মানবের দিদি, নন স্টপ ডিস্কো চালাচ্ছে! হো হো হা হা তে গাড়ি যেন বেঁকে যাচ্ছে! কি করে আর ধ্যান করি!. হেঁড়ে
গলায় গাইতে লাগলাম!
সেলা পাস পার হলাম। বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা টানেল, পশ্চিম ক্যামেং জেলার সঙ্গে তাওয়াং কে যোগ করেছে।
সেলা পাস ধরে এগোলে পরপর অনেক সেনা শিবির রয়েছে। লোয়ার
সাঙ্গে, আপার
সাঙ্গে, বৈশাখী ও সাংগ্রিলা তে। সেনা রা কোন দুর্যোগে পর্যটক রা পড়লে, সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে আসেন।
সেলা পাশের বাম দিকে সেলা লেক! অপূর্ব লাগছে ওপর থেকে দেখতে! কিন্তু কনকনে ঠান্ডা বাতাস, কাঁপন ধরিয়ে দিচ্ছে! এখানে সব লেক কে পবিত্র মানা হয়, তাই জলে নামা, নোংরা ফেলা কঠোর ভাবে বারণ।
প্রতি জায়গায় জায়গায় বৌদ্ধ দের পবিত্র ছোট ছোট পতাকা দিয়ে, দড়িতে বাঁধা! তীব্র হাওয়ায় পত
পত করে উড়ছে, দেখতে ভারী ভালো লাগে! অনেক জায়গায় উঁচু বাঁশে ও বাঁধা আছে!
এর পর আশ্চর্য এক জলপ্রপাত এর কাছে এলাম।
জুঙ্গ ফলস! চারপাশে পাহাড়ের শোভা, আর তার মাঝ খানে প্রায় তিনশ ফুট ওপর থেকে মোটা হয়ে জল পড়ছে! বাষ্পের ওপর রামধনু হচ্ছে! ওপর থেকে দেখে ঠিক আশ মিটছে না, প্রায় তিনশ সিঁড়ি ভেঙে নিচে গেলে, অপূর্ব দৃশ্য! জয় মা কালী, বলে নামতে থাকলাম,
একজনের বারণ উপেক্ষা করে!
ভালো মতো উপভোগ করে, ওঠবার সময় পুরো কুত্তার মতো হাঁফাতে লাগলাম! যাইহোক উঠতেই
ম্যানেজার আমূল এর লস্যি প্যাকেট দিল! পরান টা জুড়ালো!
আবার রওনা দিয়ে এলাম যশোবন্ত গড় ওয়ার মেমোরিয়াল।১৯৬২ সালে চীনের সঙ্গে যুদ্ধে, একা লড়াই করে শহীদ হন। তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে এই স্মৃতি মন্দির। ভেতরে নানান ম্যাপ, যুদ্ধের ছবি, ইত্যাদি আছে।

এর পর যাত্রা শুরু করে এলাম তাওয়াং মনাস্ট্রি।
এর বয়স প্রায় চারশ। বিরাট এলাকা জুড়ে। সিঁড়ি দিয়ে ধাপে ধাপে উঠে যেতে হয়! চারিদিকে চোখ
জুড়ানো প্রকৃতির সৌন্দর্য! ওপরে উঠে যেতে দেখলাম ২৬ফুট উঁচু বুদ্ধমূর্তি! ওপর থেকে নানান সুদৃশ্য সিল্কের কাপড় ঝুলছে! সারা মন্দির চত্বর এক অদ্ভুত প্রশান্তি! মন্দিরের দেওয়ালে বুদ্ধ জীবনের নানান পর্ব চিত্রিত হয়ে আছে!
ক্রমশ সন্ধ্যে নামছে, আমরা দুপুরে এক ভালো
জায়গায় সব গরম গরম সুস্বাদু খাবার খেয়ে নিয়েছি। প্রতিদিন
বড় বড় মাছের পিস! চাইলে দুটো ও পাওয়া যাবে।
সব শেষে বড় আপেল, হাতে হাতে!
এসে পৌঁছালাম টাকসাং হোটেল!
ম্যানেজার জয়ন্ত ভালো বুদ্ধি করছিল, একটা প্লাস্টিক প্যাকেট এ সব চাবি আছে, না দেখে একটা তুলুন, যার যে নাম্বার, সেই ঘরে সে যাবে।
আমি বেশ নাড়িয়ে নাড়িয়ে তুলতে সবাই হেঁসে উঠলো।
দেখলাম ৩০৫, ব্যাগ নামানো হয়েছে, চক দিয়ে যে যার রুমের নম্বর লিখে দাও, মাল চলে যাবে!
গিন্নি কে নিয়ে লিফটের দিকে এগুলাম।

