
শোকযাত্রা

জয়মালা বেরচ্ছে, তখন পেছন থেকে ওর ছেলে ডাকল, “মা, সোমবার কিন্তু কলেজে ভর্তি হবার দিন।”
পিছন ফিরে তাকায় জয়মালা। হেসে বলে, “মনে আছে বাবা! তোকে ভর্তি না করিয়ে রাখব নাকি? এই রবিবার মাস শেষ হবে। আমি মায়না পেয়ে যাব। চিন্তা করিস না।”
এ বছর জয়েন্ট-এর ফল বেরতে অনেক দেরি হয়েছে। জয়মালার ছেলে সুজয় দাঁত চেপে বসে ছিল। জয়মালাও দিনরাত ঠাকুরকে ডেকেছে। সুজয়ের বাবা চলে যাওয়ার পর দশ বছর হতে চলল। সহস্র প্রলোভন পার করে, ছেলেকে একা মানুষ করে চলেছে, আজ এই দিনটা দেখবে বলে। সুজয় মেডিকেল পড়তে সুযোগ পেয়েছে, জয়মালার জীবনে এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর নেই। ছেলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, ট্রেন ধরতে ছুটতে থাকে। সাতটার মধ্যে পেশেন্টের বাড়ি না পৌঁছলে রাধাদি বড্ড মুখ করে।
জয়মালা আর রাধারাণী পালা করে অসিতবাবুর সেবা শুশ্রূষা করে। অশীতিপর অসিতবাবু আজ চার বছর শয্যাশায়ী। প্রথম প্রথম যদিবা একটু আধটু কথা বলার চেষ্টা করত, এখন শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। কোন কিছুতেই কোন সাড় নেই। কিন্তু তবু তো মানুষটা আছে। এতদিন ধরে যে সংসার তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন, তার একটা ঘর জুড়ে যেন নার্সিং হোমের কেবিন করা আছে। অক্সিজেন, স্যালাইন স্ট্যান্ড, বেডপ্যান, ওয়াটার বেড, বিপি মনিটর, গ্লুকোমিটার সব কিছু রয়েছে। অসিতবাবু দুই ছেলে এই বাড়িরই ওপরের তলায় থাকে। অফিস যাওয়ার আগে বা ফেরার পর নিয়ম করে বাবার সঙ্গে দেখা করে যায়। খোঁজখবর নেয়। অসিতবাবুর স্ত্রী প্রতিবার খাওয়ানোর সময়ে কাছে থাকে। ইদানিং রাইসটিউব দিয়ে খাওয়ানো চলছে।
Bengali short story. Nurse and her patient’s death.
[Bengali Short Story Love]

অন্য অনেক পেশেন্ট এতদিন থাকে না। রাধারাণী আর জয়মালার সেবাতেই অসিতবাবু এখনও রয়েছেন। বেল বাজাতে হয়নি, রাধারাণী খুলেই রেখেছে, নিজে বেরবে বলে। ওকে দেখে বলে ওঠে, “সকালের ডোজগুলো সব পড়ে গেছে। তুই দুপুর থেকে ধরে নিস। আমি আর দাঁড়ালাম না।”
“না তুমি যাও, আমি সব দেখে নেব।”
অসিতবাবুর বাড়িতে ঢুকে জয়মালা প্রথমেই চানঘরে যায়। হাত পা ভাল করে ধুয়ে মুছে, বাইরে শাড়ি ছেড়ে, নার্সের পোশাক পরে নেয়।
একে একে ছেলেরা বাড়ি ফেরে। ছেলে-বৌরা সন্ধের কাজ শেষ করে। জয়মালা মনে মনে ভাবে, সুজয় এবার ডাক্তার হবে। তারপর ছেলের পোশেন্টের নার্স হবে জয়মালা। গর্বে বুক ভরে ওঠে।
অসিতবাবুর শরীরটাকে নাড়িয়ে চাড়িয়ে ইষৎ উষ্ণ গরম জল দিয়ে বেডসোরের ক্ষতটা মুছে সুন্দর করে রাখে, চুল আঁচড়ে দেয়। অসিতবাবু শুধু তাকিয়ে থাকেন। খাওয়ানোর পর জয়মালা নিজেও বাড়ি থেকে নিয়ে আসা টিফিন কৌটো থেকে খাবার খেয়ে নেয়।
দিনটা ঠিকঠাকই পার হয়, রাত সাড়ে ন’টার দিকে হঠাৎই অসিতবাবুর যেন শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে মনে হয়। চটপট আঙুলে অক্সিমিটারের ক্লিপ লাগায়। দুটো সিলিন্ডার রয়েছে, মাস্ক পরিয়ে নব রেগুলেট করে। এঘরে এসি চলে সারাদিন। জয়মালা একটা চাদর গায়ে রাখে। দরজা খুলে বেরিয়ে, সামনে বড়বৌকে দেখতে পায়, “একটু বড়দাদাকে ডেকে দেবেন?”
বড়বৌ অবাক হয়ে বলে, “কী হল?”
“আমার ভাল ঠেকছে না, একবার ডাক্তারকে খবর দেওয়া যাবে?”
ডাকাডাকিতে সব ছেলে, ছেলের বৌ, অসিতবাবুর স্ত্রী এসে গিয়েছে। ওরা ঘরে এসে দেখে, অক্সিজেন মাস্কের ভিতরে অসিতবাবুর মুখ একটু হাঁ-করা বুকটা একটু জোরে ওঠানামা করছে। জয়মালা বড়ছেলের কাছে এসে বলে, “আমার ভাল ঠেকছে না। মনে হচ্ছে গ্যাস্পিং হচ্ছে।”
বড় ছেলে ফোন হাতে বেরিয়ে গেল। একটু পরে ফিরে এসে জয়মালাকে বলে, “ডাক্তার একটু বেশি রাতে, একবার ঘুরে যাবেন। তবে এখন হোয়াটস্যাপে ইংজেকশনের কথা বলে দিয়েছেন, আমি এনে দিচ্ছি।”
অসিতবাবুর এমন হঠাৎ হঠাৎ সঙ্কট গত চার বছর ধরে, মাঝে মাঝেই হয়। বাড়ির লোকেদেরও খানিকটা গা-সওয়া হয়ে গেছে।
[Bengali Short Story Love]

রাত বাড়লে, সবাই শুয়ে পড়ে। জয়মালা একটা ছোট রিডিংল্যাম্প জ্বেলে রোগী শিয়রে বসে থেকে মোবাইলে পাতা ওল্টায়, আর তাকিয়ে থাকে অসিত বাবুর দিকে। না, রাতে ডাক্তার আসতে পারেন নি। তবে তাঁর বলে দেওয়া ইংজেকশন নিয়ে রোগী খানিকটা শান্ত। জয়মালার একটানা বসে থাকতে থাকতে পিঠ ধরে আসে, একটু উঠে হাঁটা চলা করে। আলো ফুটতে বেশি দেরী নেই। বাইরের রাস্তায় মানুষের হাঁটাচলার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। ঠিক তখনই অসিতবাবুর গলা দিয়ে কেমন একটা গোঙানির মতো আওয়াজ পেয়ে ঘুরে তাকায়। একটা হেঁচকি তুলে আবার স্থির হয়ে যায় শরীর। জয়মালার অভিজ্ঞ চোখ। ছুটে এসে পাল্স দেখে। নেই। অক্সিমিটার লাগায়। অক্সিজেন রেগুলেট করে, দরজার বাইরে এসে দোতলার কলিং বেল বাজায়।
এই বেল মানেই কোন জরুরী তলব। ছেলেরা হুড়মুড় করে নেমে আসে। জয়মালা অস্ফুট গলায় বলে, “আমি পাল্স পাচ্ছি না।”
দুই ছেলে ঘরে ছুটে আসে। বুকে খানিক মাসাজ করে। অসিতবাবুর চোখ খোলা। জয়মালা মোবাইলের টর্চ জ্বেলে চোখে আলো ফেলে। মণি স্থির।
ডাক্তার আসে আরও ঘন্টা খানেক পর। ঘোষণা করে দেন, অসিতবাবু আর নেই। চার ঘন্টা পর ওঁর চেম্বার থেকে কেউ যেন গিয়ে ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে আসে।
মানুষটা চার বছর ধরে মৃত্যুর অপেক্ষায় ছিল। আজ সেই দিনটা অবশেষে এসে গেল। বাড়ির সদস্যদের মানসিক প্রস্তুতি ছিল। তাই তেমন শোকের বহিঃপ্রকাশ ধরা পড়ল না। আত্মীয় পরিজনকে ফোন করে খবর দেওয়া হল। ধীরে ধীরে ঘরে লোকজন আসতে থাকে। জয়মালা নার্সের পোশাক পাল্টে শাড়ি পরে নেয়। একবার ভাবে চলে যাবে, কিন্তু থেকে যায়। হাতে হাতে চা বানিয়ে, সাহায্য করে।
শেষ দেখা করতে অনেকেই হাজির হচ্ছে। অসিতবাবুর এক কলেজের বন্ধুও চলে এসেছেন। তিনি নিজেও বয়সের ভারে নড়বড়ে হয়ে গেছেন। জয়মালা অবাক চোখে সব দেখে, কেউ এখনও চীৎকার করে কাঁদেনি। শববাহী গাড়ির সঙ্গে, শ্মশানযাত্রীদের নিয়ে যাওয়ার জন্য আরেকটা ছোট মালবাহী গাড়ি এসেছে। ফুল দিয়ে সাজানো হল। ধীরে ধীরে অসিতবাবুকে গাড়িতে তোলা হল। শ্মশানে অনুগমন করার জন্য একে একে দশ বারো জন মালবাহী গাড়িতে ওঠে। বড় বৌ জয়মালাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কি যেতে চাও?”
ঘটনা প্রবাহে জয়মালা কিছুটা ভেসে ছিল। হঠাৎ যেন বাস্তবের মাটিতে পা ঠেকে। একটু ভেবে বলে, “এতদিন মানুষটার সঙ্গে থাকলাম, আমিও যাই।” দুটো গাড়ি, শ্মশানের উদ্দেশ্যে রওনা হল।
মালবাহী গাড়িতে দাঁড়িয়ে থাকা খুব কঠিন। ধরার কোন জায়গা নেই। এদিকে বর্ষার পর রাস্তা খানাখন্দে ভরে আছে। গাড়ি সমানে লাফাচ্ছে। একে অপরের শরীর ছুঁয়ে কোন রকমে নিজেদের সামাল দিচ্ছে। এমন সময় আকাশ ভেঙে বৃষ্টি এলো। মালবাহী গাড়িতে ঢাকা দেওয়ার জন্য ত্রিপল রাখা আছে। সামনের দিকে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন সেই ত্রিপল টেনে বার করে। সবাই হাত তুলে ত্রিপলে টেনে নিজেদের মাথা ঢাকে। মাল ঢাকার ত্রিপলে ভর্তি ময়লা। জয়মালা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে পছন্দ করে। নোংরা ত্রিপলে গা ঘিনঘিন করে ওঠে। কোন কোন জায়গাতে ফুটো হয়ে আছে। সেখান থেকে ঝর্ণার মতো জল পড়ছে। কোন রকমে চোখ কান বুজে জয়মালা একটা অন্য জগতে পৌঁছে যায়। আশেপাশের লোকজন অনেক রকম কথা বলছে। হাসাহাসি করছে। শোকের চিহ্ন নেই কোথাও। শুধু ওরই বুকের ভেতরটা মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে।
[Bengali Short Story Love]

Bengali short story. Nurse and her patient’s death.
ক্রমে দুটো গাড়ি শ্মশানে পৌঁছয়। আজ তেমন ভিড় নেই। কাউন্টারের কাজ সেরে ওরা চুল্লির কাছে এসে বসে। একটা বাঁশের চাটাইএর ওপর অসিতবাবুকে শোয়ানো হয়েছে। বিছানার চাদর আর বালিশটাও সরিয়ে নেওয়া হল। পুরোহিত এসে শেষকাজ করতে শুরু করে। জয়মালা বোঝে দাদা-রা কেউ এইসব নিয়ম পালনে আগ্রহী নয়। পুরোহিতও নিয়মরক্ষার মন্ত্র বলে শেষ করে। অতঃপর বাঁশের চাঁঙারি ধরে চুল্লির দরজার সামনে নিয়ে যাওয়া হল। জয়মালা একবার পা ছুঁয়ে মাথায় ঠেকায়। ডুকরে কেঁদে ওঠে। নিজেই অবাক হয়ে যায়, আর কেউ তো এমন শব্দ করছে না, শুধু ও কেন কান্না আটকাতে পারছে না? চুল্লির ডালা বন্ধ হয়ে গেলে জয়মালা ছুটে চলে যায় গঙ্গার ঘাটে। সেখানে তখন জোয়ার এসেছে। কান্নার দমকে তখন ফুলে ফুলে উঠছে, ফুঁসে ওঠা ঢেউগুলোর মতোই।
“কে হয়?”
কথা শুনে ফিরে তাকায় জয়মালা। দেখে সেই পুরোহিত হাতে একটা গাঁজার কলকে নিয়ে বসে আছে। জয়মালাকে তাকাতে দেখে আবার জিজ্ঞেস করে, “যে মারা গেছে, আপনার কে হয়?”
জয়মালা কান্না সামলে বলে, “আসলে, অনেকদিন সেবা করছিলাম। আমি ওঁর নার্স, ফ্যামিলির কেউ না।”
“ওর ছেলেরা তো কেউ কান্নাকাটি করেনি।”
“আমারও সেই প্রশ্ন ঠাকুরমশাই, আমার এত কান্না পাচ্ছে কেন? উনি কি আমার গতজন্মের কেউ ছিলেন?”
পুরোহিত কলকেতে টান দেয়, ধোঁয়াতে মুখ ঢেকে গেল। তারপর দম ছেড়ে বলে, “সারাদিন এমন অনেক দেখি। আসলে তুমি নিজের জীবনে বোধহয় খুব কষ্টে থাকো।”
“একলা বিধবার সংসার। একমাত্র ছেলে মানুষ করাই লক্ষ্য। কষ্ট ছাড়া আর কীইবা আছে?”
পুরোহিত হাসে, “আমাদের যার যেমন স্থিতি, তাতেই অভ্যাস হয়ে যায়। দুঃখেই তোমার জীবন, তার বাইরে যে অন্য পথ আছে, তোমার অন্তর সেটা বিশ্বাস করতে পারে না। তাই সবেতেই কষ্ট দেখতে পায়।”
জয়মালা পুরোহিতের কথা সবটা বুঝতে পারে না। কতকটা অন্যমনস্ক হয়ে গঙ্গার দিকে চেয়ে থাকে।

প্রায় পঞ্চাশ মিনিট পর চুল্লির ঘন্টা বেজে ওঠে। শ্মশান যাত্রীরা এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিল। কেউ চা খেয়েছে, কেউ জল, কেউ কেক কিনেছে। বড়বৌ জয়মালার খোঁজ করেছে, পায়নি। এবার অস্থি বিসর্জন দিতে সকলে গঙ্গার ঘাটে এসেছে। সেখানে জয়মালাকে আবিস্কার করে, বড় বৌ এগিয়ে এসে বলে, “তুমি এখানে? আমরা চা খেলাম, তোমায় খুঁজছিলাম।”
জয়মালার গলা বুঁজে আছে, কোন রকমে বলে, “আমার খেতে ইচ্ছে করছিল না।”
বড়বৌ বলে, “রাধারাণীকে খবর দিয়েছো?”
জয়মালার এসব মনেই আসেনি, মাথা নিচু করে। বড়বৌ বলে, “ঠিক আছে। আমি করে দিচ্ছি।”
কাজ মিটলে, ধীরে ধীরে সবাই আবার সেই গাড়িটার কাছে পৌঁছয়। বড় ছেলে জয়মালাকে জিজ্ঞেস করে, “তুমি কোথায় যাবে? আমাদের বাড়ি?”
বড়বৌ বলে, “সেখান গিয়ে আর কী করবে? তোমার ব্যাগ তো নিয়ে এসেছো?”
জয়মালা বলে, “আপনারা তো স্টেশন হয়েই যাবেন। আমাকে সেখেনেই না হয় নামিয়ে দেবেন।”
ফেরার পথে বৃষ্টি ছিলনা। অধঘন্টা মধ্যে স্টেশনের কাছে ওকে নামিয়ে দিয়ে গাড়িটা এগিয়ে গেল। শুধু বড় বৌ ইশারায় বলে, “ফোনে কথা হবে।”
গাড়ি থেকে নেমে কতকটা এলোমেলো হেঁটে স্টেশনে আসে জয়মালা। চারিদিকে কেমন একটা শূন্যতা ভরে গেছে। মাথায় পুরোহিতের কথাটা ঘুরছে। কী সব বলল! সুজয় বলেছে সোমবার কলেজে ভর্তি হবে। এখন তো হাত পুরো ফাঁকা! তার ওপর কাল থেকে তো, ওর কোন কাজও নেই! মাথার ওপর যেন একরাশ চিন্তা ক্রমে চেপে বসতে থাকে। জয়মালা এখন কী করবে বুঝতে পারেনা। তখন সিগন্যাল হয়ে গেছে। ট্রেনের খবর হল।
Bengali short story. Nurse and her patient’s death.

[লেখকের পরম্পরায় প্রকাশিত রচনা]
অন্যত্র প্রকাশিত কিছু গল্পঃ
- ভারতবর্ষ – ছোট গল্প
- শোক – ছোট গল্প
- বিষধর – ছোট গল্প
- বিলু শকুন – ছোট গল্প
- গল্পঃ ঘুড়ি
- ছোটদের গল্প: পুজো আসছে
- শাড়ি
- গয়না – ছোট গল্প
- পূর্বাভাস
- অভিযোগ
- জঙ্গলের প্রতিশোধ
- মানুষ
[পরম্পরা ওয়েবজিন, সেপ্টেম্বর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]
