
কারেন্ট নুন
কালো কালো গুঁড়ো, জিভে দিলেই, মনে হয় ইলেক্ট্রিক শক্ লাগল, আর তখনই ওরা টাকরাতে জিভ ঠেকিয়ে চক্ করে শব্দ করে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠে! ঝাল টক্ আশ্চর্য তীব্র স্বাদ! প্রথম খেতে শিখিয়েছিল কৌশিকী। ক্লাস সেভেনে যখন তাদের ছোট্ট মফঃসল শহরের একমাত্র ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল থেকে দোয়েল এই সাদামাটা সরকারী স্কুলে ভর্তি হল, তখন বেশ একটা হৈ চৈ শুরু হয়ে গেল ওকে ঘিরে। তার আগে ওর মতো নটি বয় জুতো , ধোপ দুরস্ত ডিভাইডেড স্কার্ট আর টেরিকটের সার্ট পরা, বয় কাট চুল, চোস্ত ইংরাজী বলা মেয়ে, এই স্কুলে কেউ দেখেনি। পরীক্ষার ফল আর পরিকাঠামোর নিরিখে দেখলে, শহরের তিন নম্বরে থাকা এই আধা সরকারি মেয়েদের বাংলা মিডিয়াম স্কুলের বেশীর ভাগ ছাত্রী চটি আর সস্তার সাদা কাপড়ের, ইস্তিরি ছাড়া, জামা পরে স্কুলে আসত।
প্রথম দিকে, উঁচু ক্লাসের দিদিরা, দোয়েলকে ডেকে পাঠাত, ওকে দেখার জন্য! তার ওপর, ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া দোয়েল যখন ক্লাস টিচারের বিস্ময় উদ্রেক করে শুদ্ধ বাংলায় রীতিমতো সাহিত্য গুণ সম্পন্ন রচনা আর ভাব সম্প্রসারণ লিখে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিল, তখন, টিচারস রুমেও, তাকে নিয়ে আলোচনা হতে আর বাকি রইল না।
অথচ এই সব কারণেই, দোয়েলের নতুন স্কুলের দিনগুলো, ক্রমশঃ ভীষণ একা আর অস্বস্তিকর হয়ে উঠছিল। স্কুলের পরিবেশের আকস্মিক এত পরিবর্তন, সকালে মর্নিং প্রেয়ারের বদলে লাইন করে বাংলা গান, চিল্ডরেন থেকে মেয়েরা সম্বোধনে অভ্যস্ত হওয়ার সঙ্গে,
“সিস্টার” নয়, শিক্ষিকাদের নাম ধরে “দিদি” ডাকা, হুড়মুড় করে এই সব এসে ওর পৃথিবীটা এলোমেলো করে দিচ্ছিল। এ ছাড়া, বাংলায় লেখার অনভ্যেসের দরুণ, পরীক্ষায়, সময়ের মধ্যে লেখা শেষ করা তার পক্ষে ছিল বেশ কঠিন। বিজ্ঞানের সংজ্ঞার ক্ষেত্রে ইংরাজীর বদলে বাংলা প্রতিশব্দ প্রায়সই মনে পড়ত না। এ সব চ্যালেঞ্জ তো ছিলই, উপরন্তু সবার আলোচ্য ও দ্রষ্টব্য হয়ে ওঠায় ও নিজেকে ক্রমশ গুটিয়ে নিচ্ছিল। আসলে ওদের সদ্য প্রতিষ্ঠিত আগের স্কুলের, ওরা ছিল প্রথম ব্যাচ।
স্কুল বোর্ডে সেই স্কুলের স্বীকৃতি সম্পর্কে তখনও অনিশ্চয়তা থাকায় ওর মা বাবা, ঝুঁকি নিতে চাইলেন না। বছরের মাঝখানে স্কুল বদলের সিদ্ধান্তের কারণে, শহরের দুটি বাংলা মিডিয়াম নামী সরকারী স্কুল কিছুতেই প্রবেশিকা পরীক্ষা নিতে রাজীও হল না। অগত্যা, এক বছরের জন্য, ভর্তি হতে হল এই স্কুলে। ভর্তির সময় ওর মন খারাপ দেখে বাবা বলেছিলেন,
“এখানে তো একটা বছর, দেখ না, দেখতে দেখতে কেটে যাবে। সামনের বছর ভাল স্কুলে এডমিশান টেস্ট দিয়ে পেয়ে যাবি তুই, ব্যাস!”

সে কিছু বলেনি। শুধু বাবার কথার উত্তরে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিল। কিছুদিন পর, , দোয়েল অবাক হয়ে অনুভব করল, আগের স্কুলের ঝকঝকে স্মৃতি ভেদ করে, ক্রিস্টমাসের বদলে, সরস্বতী পুজো, বাসকেটবল আর ক্যারলের বদলে, খো খো র সঙ্গে, কখন ওর মনে, চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঢুকে পড়েছে, শহরের তিন নম্বর স্কুলের, রং চটা স্কুল বাড়ি আর মলিন মুখের বন্ধুরা।
ঠিক সেই সময়, জীবনে এল কারেন্ট নুন! ঝালমুড়ি আর টোপা কুলের পর, স্লগ ওভারে ওভার বাউন্ডারির মারল সে! উঃ – এরকম একটা জিনিষ, এতদিন জানাই ছিল না! ওর আগের স্কুলের ত্রিসীমানায় এসব বিক্রি করতে দেওয়াই হত না। ওরা বক্সে টিফিন আনত। এখানে অনেকে টিফিনে গেটের বাইরে কিনেও খায় আর স্কুল থেকেও দেয় , মুড়ি রসগোল্লা কত কি ! এই ব্যাপারটা
বেশ লাগে দোয়েলের!
কৌশিকী প্রথম দোয়েলকে, একদিন টিফিনটাইমে কাছে ডেকে বলেছিল,
“খেয়ে দেখ।“
“কি এটা ?”
দোয়েল কাগজের টুকরোয় এগিয়ে দেওয়া কালো গুঁড়োগুলো সন্দেহের চোখে দেখছিল।
“খেয়েই দেখ না! একে বলে কারেন্ট নুন!”
দোয়েল এক চিমটি ততক্ষণে তুলে জিভে দিয়েছে। ও কৌশিকীকে বিশ্বাস করে। কৌশিকী প্রথম ওর পাশে দোয়েলকে বসতে দিয়ে, বন্ধুত্ব করেছিল। ওর সবকিছু ছিল একটু অন্যরকম। দোয়েল পরে আস্তে আস্তে জেনেছিল, শীর্ণ চেহারা আর বড় বড় মায়াবী চোখের কৌশিকী, শহরের বাইরে ওর দাদুর বাড়িতে থাকত। ওর মা বাবা থাকতেন, অনেক দূরে,বীরপাড়ায়। কেন কে জানে, সে নাকি ছোট থেকেই, দাদুর বাড়িতে মানুষ। তার বাঙলা হাতের লেখা ছিল মুক্তোর মতো। বাঙলায় সবার চেয়ে বেশী নম্বর নিয়ে, পরীক্ষায় প্রথম তিন চার জনের মধ্যে বরাবর থাকত সে।
কি একটা ছিল, তার বিষণ্ণ হাসি মুখে, মনে হত যেন সে সবার চেয়ে বড়! এত বড়, যে দুঃখ লুকোতে শিখে গেছে! নতুন স্কুলে প্রথম পরীক্ষায়, অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে, দোয়েল যখন বাংলাতেও সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে কৌশিকীকে পিছনে ফেলে দিল, সে অদ্ভুত স্নেহের হাসি হেসে ওকে অভিনন্দন জানিয়েছিল। দোয়েলের মনে হয়েছিল, কৌশিকী যেন জানতই যে হেরে যাবে। সে যেন এমনি করে নিজের জায়গা ছেড়ে দিতেই অভ্যস্ত ছিল।
কৈশোরের সহজাত অনসূয়া অহৈতুকি উষ্ণতার সম্পদে আর বাউল মনের উদাসীনতায় , এ সব সত্ত্বেও, ওদের বন্ধুত্ব ক্রমে আরও দৃঢ় হয়েছিল।
পরবর্তী কয়েক মাসে, দোয়েল আস্তে আস্তে ক্লাসের সবার মধ্যে নিজের জায়গা করে নিচ্ছিল। একটু একটু করে সহপাঠিদের সঙ্গে প্রাথমিক জড়তা আর দূরত্ব কাটছিল ওর। এই সব কিছুর মধ্যে, কৌশিকী কিন্তু নীরবে ওর পাশে ছিল। কৌশিকীর শান্ত, স্বল্পভাষী উপস্হিতিতে দোয়েলের নিশ্চিন্ত নির্ভরতা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত।
ছুটির পরে, স্কুল গেটের কাছে, দুলু কাকুর গাড়ি থেকে হজমী গুলি কিম্বা আলু কাবলী খাওয়ার মতো, কিছু বিশেষ মুহূর্ত ওরা প্রায় রোজ দুজনে একান্তে ভাগ করে নিত। এ ছাড়াও ছিল, ভেরেন্ডার ডালে ফুঁ দিয়ে বুদবুদ ওড়ানো কিম্বা কারেন্ট নুনের মতো বিস্ময়!
“কখনও ঝগড়া হলে, যদি কারেন্ট নুন খাওয়াস, ভাব করে নেব।“
কথাটা বলে হো হো করে হেসে উঠেছিল দোয়েল __
সেদিন ছিল বার্ষিক পরীক্ষার আগে ওদের শেষ ক্লাস। এরপর একসপ্তাহ স্টাডি লিভ। কৌশিকী ও হাসল,
“তুই মা বাবার কাছে যাবি এখন ?”
“নাঃ। মা হয়তো আসবে, জানি না।“
দোয়েলের প্রশ্নের উত্তরে, অন্যমনস্ক ভাবে বলল কৌশিকী।
“আসলে – “
“আসলে কি ?”
“ও তুই বুঝবি না!”
সেই বিষন্ন হাসিটা,বিকেলের রোদ্দুরে ওর চোখ থেকে ঠোঁটে গড়িয়ে নামছিল।
“কেন ? বল না! বলেই তো দেখ।“
দোয়েলের জোড়াজুড়িতে,কৌশিকী বলল,
”আসলে, একজন লোক আছে। আমাকে পড়া দেখিয়ে দেয়। “
“টিউটার ? “
দোয়েলের শিক্ষক মা বাবা টিউশানের ঘোর বিরোধী।
“ঐ আর কি! বলছিলাম না বুঝবিনা!”
এবার শব্দ করে হাসল কৌশিকী, হাত বাড়িয়ে দোয়েলের হর্সটেলটা দুলিয়ে দিল।
ওকে অচেনা লাগছিল সেদিন।
“ মিস করব।“
দোয়েলের কথার উত্তরে, চোখ বড় বড় করে ওর দিকে তাকাল কৌশিকী
“কি ? কি মিস করবি ? “
“কারেন্ট নুন”
গাড়িতে উঠতে উঠতে,কথাটা ছুঁড়ে দিল দোয়েল।
ওরা দুজনেই শব্দ করে হেসে উঠল।
পরীক্ষার কটা দিন, আলাদা সেকশানে সিট পড়ায় খুব একটা দেখা হল না।
রেসাল্ট বেরোলে দেখা গেল দোয়েল ক্লাসে প্রথম হয়েছে, কৌশিকী তৃতীয়।
নতুন করে ক্লাস শুরু হয়ে গেল।
প্রায়ই ক্লাসে আসে না কৌশিকী। মাঝে মাঝেই অসুস্হ থাকে। দিন দিন যেন আরও রোগা আর চুপচাপ হয়ে যাচ্ছিল ও।এমনকি বাংলার টিচার কৃষ্ণাদিও একদিন জিজ্ঞাসা করলেন ওর শরীরের কথা! দোয়েল লক্ষ্য করছিল ওকে। কেমন একটা ছাড়া ছাড়া ভাব।
“কি হয়েছে তোর ? আমাকে বলবি না ? “
ওর কথা এড়িয়ে গেল কৌশিকী।
“কিচ্ছু না। “
“বেশ বলবি না তো ? “
খুব অভিমান হল দোয়েলের।
“আমি যাই, দিদার শরীর ভাল না। “
কৌশিকী তাড়াহুড়ো করে চলে যেতে ওর কথা ভাবছিল দোয়েল। কেন ওর মা বাবার কাছে থাকে না ও! ওর মায়ের মন খারাপ করে না ওর জন্য! ওর নিশ্চই করে! এইসব ..ভাবতে ভাবতে রাতে ঘুমিয়ে পড়ল সে।
পরদিন কৌশিকী স্কুলে এল না, তার পরদিনও নয়। এক সপ্তাহ কেটে যেতে টিচাররাও ওর খোঁজ করতে লাগলেন ক্লাসে। ক্লাসে কেউ ওর দিদার বাড়ির ঠিকানা জানত না। দোয়েলের মন খারাপ করছিল।
খবরটা এনেছিল ক্লাস টেনের শ্রীলেখাদি। কৌশিকীর দাদুর বাড়ির কাছেই ওদের বাড়ি। কৌশিকী নাকি পুড়ে গেছে! তার দাদু বলেছেন গ্যাসে চা করতে গিয়ে তার জামায় আগুন লেগে যায়, কিন্তু পাড়ার সবাই বলছে, আত্মহত্যা করতে চেষ্টা করেছিল সে। বয়সে অনেক বড়, বিবাহিত, গৃহ শিক্ষকের সাথে প্রেমের সম্পর্কে সে জড়িয়ে পড়েছিল, তার জেরেই এই পরিণতি।
শ্রীলেখাদি যেদিন ওদের ক্লাস টিচারকে কৌশিকীর ছুটির এপ্লিকেশান দিতে এসেছিল, সেদিন দোয়েলের জ্বর হওয়ায় স্কুলে যায়নি ও। পরদিন, ক্লাসে, মৌমিতা, ওর হাতে একটা কাগজ গুঁজে দিল।
“ কৌশিকীর চিঠি, তোকে লেখা।শ্রীলেখাদি কাল তোকে খুঁজছিল।“
সারা ক্লাসে কৌশিকীকে নিয়ে গুঞ্জন চলছে, দোয়েলের মাথা কাজ করছিল না। কেন এরকম করল কৌশিকী! একবার ফুলঝুরি জ্বালাতে গিয়ে ছ্যাঁকা খেয়েছিল সে। কি ভীষণ জ্বালা করছিল! আর কৌশিকী! ওর সারা শরীর পুড়ে গেছে! উঃ!
শ্রীলেখাদি নাকি বলেছে, বিছানায় শুয়ে শুয়ে চিৎকার করে যন্ত্রনায় কাঁদে সে।
কাগজটার ভাঁজ খুলতে, অক্ষরগুলো ঝাপসা লাগছিল।সেই মুক্তোর মতো হাতের লেখা!
“প্রিয় , দোয়েল ..
কৌশিকী লিখেছে
“বিছানায় শুয়ে আছি বোকা আমি। খুব কষ্ট। ঘুমোতে পারি না।তোর কথা মনে পড়ছে খুব।জানিস, আমার মা এসেছে। আমার কাছে আছে অনেকদিন। দু বেলা ইঞ্জেকশান চলছে আমার। দাদু হাসপাতালে যেতে দেয়নি। নিশ্চই তুই শুনেছিস আমার কথা ? ভাবছিস, কি খারাপ মেয়ে কৌশিকী তাই না ? তুই কি আমাকে ভুলে যাবি দোয়েল ?”
আর পড়তে পারেনি ও। ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেছিল।
এর চারদিন পর কৌশিকীর মৃত্যুতে শোকসভা করে ওদের ক্লাসের ছুটি হয়ে গেলে স্কুলের গেটে বিলুদার গাড়িটা দেখে আবার নিজেকে সামলাতে পারেনি দোয়েল। বিলুদাও কাঁদছিল।
ড্রাইভারকে ইশারায় গাড়ি পার্ক করতে বলে, ধীর পায়ে গেটের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন ডঃ মিত্র।
এই শহরে চাকরিসূত্রে ফিরেছেন তিনি। মাঝখানে বত্রিশ বছর! স্মৃতির সঙ্গে মিলছে না কিছুই।স্কুল গেট থেকে বিল্ডিং সব বদলে গেছে। এখন নাকি এই স্কুলের ,পরীক্ষার রেজাল্ট শহরের মধ্যে এক নম্বরে।
পরের বছর অন্য স্কুলে চলে যাওয়ার পর, আর কখনও এখানে আসা হয়নি। আজ কেন কে জানে, চেম্বারে যাওয়ার পথে কি এক অমোঘ টানে স্কুল গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন! গেটের বাইরে অপেক্ষমাণ কারপুল আর অটো বুঝিয়ে দিচ্ছে, ছুটির সময় আসন্ন। ফুচকা, হজমীগুলির, একটাও দোকান চোখে পড়ছে না। কোয়ালিটি আইসক্রীমের বোর্ড আর ওয়াও মোমোর দোকান খুলে গেছে উল্টো দিকে। কি খুঁজছিলেন ডঃ মিত্র ? গাড়িতে বসতেই, জানালার কাঁচে গেটের ওপারে একটা শীর্ণ মেয়ে বড় বড় চোখে হাসি নিয়ে তাঁকে দেখছে।

“সমীর,এখানে কারেন্ট নুন পাওয়া যায় ?”
তাঁর প্রশ্নের উত্তরে বছর চব্বিশের ড্রাইভার ছেলেটি হাঁ করে তাকাল।কারেন্ট নুন! এরকম নাম কখনও শোনেনি সে।
কৌশিকী লিখেছিল
“একটু বেশী খেয়ে ফেলেছি রে। তাই সব পুড়ে গেছে! বলতো কি ? কারেন্ট নুন।
ইতি ;
একটা খারাপ মেয়ে ..”
চশমার কাঁচ মুছে, চোখ বুঁজলেন ডঃ মিত্র। যেতে হবে এবার, চেম্বার থেকে দুবার ফোন এসে গেছে।

