(পেন্ডুলাম)

ড্রাইভারের দরজাটা উল্টো দিকে খোলে। এক ঝটকায় দরজাটা খুলেই ড্রাইভার হুপ করে সীটে উঠে আসে, তারপর স্টিয়ারিং ঘোরায়। ছেলেটাও গাড়ি চালাবে। প্যাঁকু-প্যাঁকু করে হর্ণ বাজাবে। সব্বাই ভয়ে দূরে সরে যাবে। রাস্তা আটকে শুয়ে থাকা গোরুগুলোও হুড়ুমদুড়ুম করে উঠে চোঁ-দৌড় দেবে। ভুউউউম ভুউউউউম করে অনেকক্ষণ ধরে গাড়ি চলতে থাকবে। চলবে তো চলবেই। কিছুতেই স্টিয়ারিং ছাড়া যাবে না। খোলা দরজার এক্কেবারে নিচের সিঁড়িটায় দাঁড়িয়ে থাকবে একটা লোক। অল্পক্ষণ বাদে-বাদেই মাথার উপরের দড়িটা টানবে, অমনি গাড়ির ভিতরের দেয়ালে লাগানো বেল টুং-টুং করে বাজবে। গাড়ি থামবে। রাস্তায় দাঁড়ানো লোকগুলোর হাতে টিনের সুটকেস, কারো হাতে আবার কাপড়ের পুঁটুলি। বাচ্চাদের আগে বাসে ওঠাবে। বাসের ভিতরে দরজার কাছের লোকগুলো বাচ্চাদের টেনে তুলবে। সব্বাই ভিতরে ঢুকেই সামনে পিছনে তাকাবে। সীট খুঁজবে। বাচ্চাগুলোর দুই নাক দিয়ে জলের মত কফ ঝরবে। মুখেও ঢুকে যাবে। তখন খুব ঘেন্না লাগবে। উল্টোদিক থেকে ট্রাক আসছে। এ-এ-এ, মাত্র দু’জন লোক। ট্রাকের মুখটা তোবড়ানো নাকের মতো। মুখের দু’পাশে আবার কানও আছে। সবাই বলে এগুলো ‘শক্তিমান’ ট্রাক। কী ঝঝ্ঝর শব্দ করে! মনে হয় এক্ষুনি সবকিছু খুলে পড়বে। এমন লজঝরে ট্রাকের নাম ‘শক্তিমান’ হয় কেন!

বড়ঘরে অনেকগুলো জানালা। বিছানায় উঠে সামনের জানালার শিক ধরে দাঁড়াতে কী ভালো লাগে। গাড়ির মত না? বাড়ির সামনের রাস্তায় কত লোক এদিক-ওদিক যাচ্ছে আর আসছে। জানলায় ঝুলে-দাঁড়িয়ে সব্বাইকে দেখা যায়। ডানদিকের বড় দরজাটা খোলা। দাদু (ঠাকুর্দা) কাঠের ডিসপেনসারি ঘরে— ঘড়িদাদুর সাথে গল্প করছে। ঘড়িদাদু রোজ আসে। বিকেল হলেই কালজানি নদীর ওপার থেকে কাঠের ডাঁটওয়ালা ছাতা হাতে হেঁটে আসে। একটা ঝোলাও থাকে। ঝোলার ভিতরে অনেকগুলো যন্ত্র। সরু চিমটে, কাঠের ছোট্ট হাতুড়ি, অনেক রকমের স্ক্রু। গোল চাকতির মতো ছোটো একটা জিনিস। চাকতির পাতটা খুব সরু আর গুটিয়ে রাখা। স্প্রিং এর মতো এই চাকতিটা। চেপে ধরে ছেড়ে দিলেই পুড়ুং শব্দ করে ছিটকে যায়। ঐ শব্দটা শুনতে ইচ্ছে করে খুব। ছেলেটা দাদু আর ঘড়িদাদুর গল্প শোনে। মেঝেতে দাঁড়িয়ে কাঠের টেবিলে দুই কনুই রেখে, ভাঁজ করে হাত দুটোকে গাছের মতো করে মেলে দেয়। অরণ্যদেবের গাছবাড়ির মতো করে মাথাটা দুই হাতের মাঝখানে রাখে। হাতের ছড়ানো তালুর উপর থুতনি রেখে গল্প শোনে। ঘড়িদাদু বিকেলের অল্প আলোয় চোখের উপর আর নিচের পাতার মধ্যে কাচের বোতলের মুখের ঢাকনার মতো কী একটা জিনিস পরে নেয়। বাবার নস্যির ডিব্বের মতো দেখতে অনেকটা। ওটায় আবার আঁতস কাচ লাগানো। ঘড়িদাদুর চোখটা কী বড় লাগে! চোখের মণিটা ঘোলাটে। মণির দুইপাশে লাল লাল কতগুলো শিরা। সব স্পষ্ট দেখা যায়। চোখের নিচের পাতার ভিতরটা কেঁচোর গায়ের মতো গোলাপি-লাল। গা গুলিয়ে ওঠে। আচ্ছা, ঘড়িদাদুর চোখে খচখচ ক’রে খোঁচা লাগে না?

দেয়ালে ঝোলানো বড় কাঠের ঘড়িটা নামিয়ে টেবিলে শুইয়ে রেখেছে দাদু। ঘড়ির দরজা খুলে ভিতরের যন্ত্রগুলোকে দেখছে ঘড়িদাদু। ছোট্ট ব্রাশ আর চিমটে দিয়ে ঘড়ির মেশিনটায় খুটুরমুটুর করছে। টেবিলের উপর একটা চাকতি, সেটায় আবার ছোট্ট লাঠি লাগানো। লাঠির মাথায় ছোটো ফুটো। ঘড়ির মেশিনের তলায় একটা আংটার মধ্যে চাকতি সহ লাঠিটা লাগিয়ে দিলে ওটাই ডানে-বাঁয়ে দিন-রাত দুলতে থাকে। ওটা হ’ল ঘড়ির পেন্ডুলাম। একঘন্টা পরপর ঢং-ঢং করে শব্দ করে। রাতে ঘুমানোর সময় দেয়ালে টাঙানো ঘড়ির শব্দটা কী অসহ্য লাগে! তখন লেপ টেনে কান ঢাকতে হয়। এক-দুইদিন বাদে বাদেই দাদু টুলের উপর দাঁড়িয়ে, ঘড়িতে একটা চাবি ঘুরিয়ে দম না দিলে ঘড়ির সময় বিগড়ে যায়। অবশ্য ঘড়িদাদু তো রোজই আসে। ছেলেটা বিয়েবাড়িতেও ঐরকম চাকতি দেখেছে। টোপর মাথায় ধুতি পরা বরের হাতেও অমন চাকতি থাকে। সব বরগুলোই তো চাকতি হাতে বিয়ে করতে আসে। আচ্ছা, হাতে যদি চাকতি না থাকে, তাহলে বরের বিয়ে হবে না? বিয়ে করতে এলে সবাই কি বাড়ির ঘড়ি থেকে পেন্ডুলাম খুলে নিয়ে আসে? যদি কারো বাড়িতে দেয়াল ঘড়ি না থাকে, তাহলে তার বিয়ের কী হবে ?

জানালায় দাঁড়িয়ে কত কথাই না সে ভাবে। রাস্তায় যেতে যেতে কেউ বা তার সাথে একটা দুটো কথা বলে। কেউ বা শিকের ভিতর হাত ঢুকিয়ে গাল টিপে দেয়। রাস্তার লোকেরা নিজেদের মধ্যে কত কথা বলে। ছেলেটা কথাগুলো মন দিয়ে শোনে। নতুন কোনো কথা শুনলেই দাদুকে কথাটির মানে জিজ্ঞেস করে।
সেদিন দুটো লোক ঝগড়া করতে করতে যাচ্ছিল। ঝগড়া দেখলে এমনিতেই বুক ধুকপুক করে। তবে, ঘরের ভিতর ব’লে ভয় একটু কম লাগে। লোকদুটো চিৎকার করে কথা বলছিল আর তুমুল ঝগড়া করছিল…

— একটা লোক অন্য লোক-কে বলল ; তুই একটা ‘বাল’। অন্য লোকটা আরও জোরে বলল; — তুই ‘বাল’

— দাদু, ‘বাল’ মানে কী? — দাদুভাই এসব কথা বলতে হয় না। — বলো না দাদু, ‘বাল’ মানে কী?
— দাদুভাই, এই কথাটা বলতে হয় না। বলবে না আর। বললে এরপর মার খাবে কিন্তু…

— দাদু তুমি একটা ‘বাল’। ঘড়িদাদু তুমিও একটা ‘বাল’। কাকাই, তুমি ‘বাল’। কালোদিদা, তুমিও একটা ‘বাল’…ছেলেটা সদ্য শেখা নতুন কথাটি বাড়িতে যাকে সামনে পাচ্ছে, তাকেই সমানে বলে যাচ্ছে। আনন্দে আর উত্তেজনায় ডিসপেনসারির দরজায় চলে এসেছে। রাস্তা দিয়ে তখন কেউ একজন যাচ্ছিল। ছেলেটা মহানন্দে তাকে বলল ; ও কাকু, কাকু, তুমি না একটা ‘বা*ল’…

অমনি, পিঠের উপরটা জ্বলে উঠল। চিড়বিড় করে উঠল যন্ত্রনায়। কী ব্যথা লাগছে! কানটাও কটকট-ঝনঝন-টনটন করে উঠল। ভ্যাঁ করে সে কেঁদে ফেলল। মাথা ঘোরাতেই দেখতে পেল দাদুর মুখ লাল, দেয়াল ঘড়িটার পেন্ডুলামের মতো করে হাতে দুলছে— নস্যি রঙের সেই ‘গব্বর সিং’ চপ্পল!

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জানুয়ারি ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Nandini Adhikari
Nandini Adhikari
5 months ago

ধ্বন্যাত্মক শব্দেরা ছবি আঁকল। খুব ভালো লাগছে পড়তে এ শৈশবযাপন। প্রসঙ্গত বলি আমারো একজন চোখে ঠুলি পরা ঘড়িদাদু ছিলেন। তাঁর চোখের ঠুলি নিয়ে কম বিস্ময় ছিল না।