আত্মা নামক আশ্চর্য ধারণাটির সাথে প্রাণের যে সমীকরণ তৈরি হল, তার ফলাফল হল অতলান্তিক। মৃত্যু – যেকোনো প্রাণীর জীবনে অনিবার্য পরিণাম। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে তা আর তার নিজস্ব সহজ, সরল, স্বাভাবিক আদলটিকে ধরে রাখতে পারল না। নানান অলৌকিকতার প্রসাধন মেখে এবং নিয়ম ও সংস্কারের অলংকার চাপিয়ে মৃত্যু ক্রমশঃ এক বহুরূপী ধাঁধায় পরিণত হল…

আজকের বিদগ্ধ পাঠকরা নিশ্চয়ই একমত হবেন, সারা বিশ্ব জুড়ে এক অদ্ভুত অস্থিরতা বর্তমান সময়কে গিলে খাচ্ছে। মানুষ এখন গলাগলির বদলে দলাদলি কিম্বা হাতাহাতি, মারামারিতেই বেশি উৎসাহী। মানবিক সম্পর্কগুলোর টান যেন ক্রমশঃ আলগা হয়ে পড়ছে। যে সমাজ মানুষ যুগ যুগ ধরে গড়ে তুলেছে, তার ভিতটাই কেমন যেন নড়বড়ে হয়ে উঠছে আজকাল। যে সমাজ বলতে আমরা শুধু মানুষ বুঝতাম, যে সমাজ একদিন মানুষকে সমান খাওয়ার, সমান পরার, সমান থাকার, সমান যাপনের শিক্ষা দিয়েছিল, সেই সমাজে আজ আর সেই আদিম সাম্যবাদের সামগান শোনা যায় না… অথচ যদি পিছন ফিরে তাকানো হয়, তাহলে দেখা যাবে – সমাজের বুনন যখন ধীরে ধীরে শুরু হয়েছিল, তখন তার প্রাথমিক দায়িত্বটি পালন করেছিল সাম্যবাদ।

প্রথমের সেই দিনগুলোয় সাম্যবাদ যদি না থাকতো, তাহলে কোনোভাবেই গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনের বুনোট তৈরি হত না। আহার্য হোক কিম্বা সঙ্গী নির্বাচন, সমান ভাগের অনুশীলনই সমাজ গঠনের জন্য দায়ী ছিল। সেই আদিম যুগে ‘এটা আমার’, এই ভাবনা আমাদের কদাচিৎ বিচলিত করতো। নিতান্তই দিন গুজরানের জন্য যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকুনিতেই আমাদের চলে যেত। একথাও অবশ্য সত্যি, সেই প্রয়োজন এতটাই সাদামাটা ছিল, যে প্রকৃতিতে সেই চাহিদার তুলনায় যোগান ছিল অফুরান। তাই সেই সাম্যবাদ চর্চাও ছিল বাধাহীন। কিন্তু সেই বস্তুকেন্দ্রিক সাম্যবাদের গোড়ায় প্রথম আঘাত আনলো ‘আত্মা’ নামক গোলমেলে ধারণাটি। তার জটিল, অলৌকিক, রহস্যঘন রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মানুষ কালে কালে সাম্যবাদের সহজপাঠ বেমালুম ভুলে গেল…

গোলমালটা প্রথম হল, যখন আমাদের মনে হল – আত্মা শুধুমাত্র প্রাণীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বাকি সবকিছুর মধ্যেই আত্মা আছে। কারণ আমাদের স্বপ্নে শুধুমাত্র যা কিছু জীবিত, তারাই ফিরে ফিরে আসে না; তাদের সাথে সাথে নদী, আকাশ, পাথর, মাটি, গাছ, পরণের পোষাক মায় সামান্য গলার হার পর্যন্ত আসে! তাহলে আত্মা কেনই বা দ্বিচারী হতে যাবে! ফলতঃ খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম – প্রাণীদের মত এদের মধ্যেও অবধারিত ভাবে আত্মার উপস্থিতি আছে।

কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আবার উসখুসানি শুরু হয়ে গেল আমাদের মধ্যে। সকলের মধ্যেই যদি আত্মা থেকে থাকে, তাহলে কেন সকলের প্রকাশ একরকম নয়? কই, আকাশ তো আমাদের মত খাবার খায় না, কই পাহাড় তো আমাদের মত ফৌত হয়ে যায় না, কই গাছেরা তো আমাদের মত কথা বলে না! তা সত্ত্বেও তারা যেহেতু আমাদের স্বপ্নে আসে, অতএব তাদের মধ্যেও আত্মা যে আছে, তা অনস্বীকার্য। তাহলে কোথায় আমাদের সাথে তাদের তফাত! ওদিকে আবার প্রাণীরা কতকটা আমাদের মত আচরণ করে বটে… কিন্তু ততদিনে আমাদের মধ্যে একটা জাত্যাভিমান বোধ গড়ে উঠতে শুরু করেছিল। তাই আমরা বুঝতে পারছিলাম, এইসব প্রাণীদের পেশিশক্তি হয়তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের থেকে বেশি হতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই তাদের চিন্তাশক্তির দৌড় আমাদের চেয়ে বেশি নয়। যে কারণে আমাদের সীমিত দেহশক্তি থাকা সত্ত্বেও হামেশাই এইসব প্রাণীরা আমাদের কাছে পরাস্ত হয়! ফলতঃ যদি আত্মা সবের মধ্যে থেকেই থাকে, তাহলে মানুষের সাথে বাকিদের কোথায় পার্থক্য!

ততদিনে, একদিকে যেমন আমাদের মগজের ভিতরে এইসব নানান ক্রিয়া-বিক্রিয়া ঘটতে শুরু করেছে, তেমনই তার একটা ছাপ আমাদের মুখাবয়বেও পড়তে আরম্ভ করেছিল। প্রথম দিককার সেই বিশাল হনুমার্কা মুখের বদলে কোথায় যেন একটা পরিমার্জিত মুখের আভাস ফুটে উঠতে শুরু করেছিল আমাদের মধ্যে… আগুন আবিষ্কারের ফলে খাদ্য হয়ে উঠেছিল সহজপাচ্য, ফলে আগের মত অত বড় চোয়াল আর প্রয়োজন হচ্ছিল না। ওদিকে আবার আমাদের পরিণত বুদ্ধিবৃত্তিকে সামাল দিতে গিয়ে মগজ হয়ে উঠছিল স্ফীতোদর, ফলতঃ তাকে সামলাবার জন্য করোটির উপরের অংশটিকে আর আগের মত ক্ষীণকায় থাকলে চলছিল না। ফলস্বরূপ আমাদের মুখের উপরিভাগ বেশ একটা বর্তুলাকার ধারণ করল। এর ফলে মাথার চুল আর চোখের মধ্যবর্তী কপাল আর আগের মত ঢালু রইল না, স্পষ্ট ললাট উন্নত বুদ্ধিবৃত্তির স্বাক্ষর বহন করতে উদ্যত হল। ইত্যবসরে পরিবর্তনের ছোঁয়া নয়নপথগামী হওয়াতে আমাদের কুতকুতে চোখ দু’খানিও ধীরে ধীরে পটলচেরা হবার দিকে এগোতে থাকল। সুরসিক পাঠককুল নিশ্চয়ই সহমত হবেন, তা যদি না হত, তাহলে হয়তো যুগ যুগ ধরে পুরুষ হৃদয় বিলোললোচনা নারীর কটাক্ষে অমন বিদ্ধ হত না! চোখের ঠিক উপরেই ভুরুটিও ক্রমশ রামধনুর মত বিকশিত হয়ে উঠল, অমন খাড়া কপাল বেয়ে নেমে আসা ঘাম যাতে সরাসরি চোখে না পড়ে। নাকটিও আর আগের মত খ্যাদা রইল না। উন্নত নাসিকা যে আমাদের মুখমন্ডলটিকে আরো মনোময় করে তুলল, তাই নয়, আমাদের নাসারন্ধ্রটিও বিভিন্ন আবহাওয়ায় টিকে থাকার জন্য বিশেষ উপযোগী বলে প্রমাণিত হল। কথা বলার তাগিদের আমাদের পুরোনো পুরু ঠোঁটটিকে বিসর্জন দিতে হল, অমন মোটা ঠোঁট নাড়িয়ে কথা বলা মোটেই সুবিধেজনক ছিল না! বদলে স্থান পেল ওষ্ঠ বিম্বাধর, যার মোহিনী আবেদনে সাড়া দিতে গিয়ে বারেবারে উত্তরপুরুষ পরাভূত হল! সেই সাথে মুখের সবচেয়ে নিচের অংশ – চিবুক, সেটিও কালে কালে পরিপুষ্ট হয়ে উঠল। তার পেলব কিম্বা কঠিন গড়নের সাথে কীভাবে জানি মানুষের মনের ভিতরটাও আমরা আন্দাজ করতে শিখে নিলাম! মোট কথা, আগেকার মত সবার মুখশ্রী বাকি সবার মত আর রইল না, বরং নিজ নিজ সৌষ্ঠবসহ তারা নিজের নিজের মত হয়ে উঠতে শুরু করল…

এই মুখমন্ডলের বিষয়টিও আমাদের মধ্যে সেই প্রাথমিক উসখুসানিটাকে আরো একটু উস্কে দিল। কেনই বা একজনের মুখে অন্য মৃত জনের আদল ফুটে উঠছে! এ তো খুব একটা সামান্য বিষয় নয় – একজন মারা গেছেন কোনকালে, তা সত্ত্বেও গোষ্ঠীর কারোর মধ্যে তার সাথে শরীরী মিল দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। কীভাবে একজন মৃতের সাথে আরেকজন জীবন্ত মানুষের মিল থাকতে পারে? আবার এমনটাও নয়, যে সব মৃত মানুষেরই শরীরী আদল গোষ্ঠীর সকলের মধ্যে চারিয়ে যাচ্ছে। এ এক অদ্ভুত কালান্তক সংকটের সামনে আমরা এসে দাঁড়ালাম।

সব সংশয়, জিজ্ঞাসা নিয়ে আমরা আবার আপনার দ্বারস্থ হলাম। এর আগের বার যখন এমন মানসিক সংকটের সামনাসামনি হয়েছিলাম, তখনও আমরা আপনার কাছেই গিয়েছিলাম। সেবারে আপনার থেকে আমরা পেয়েছিলাম এমন এক সমাধানসূত্র, যা আমাদের চিন্তার জগতকে আনখশির বদলে দিয়েছিল। ‘আত্মা’ নামক সেই সংজ্ঞা তবে থেকে আমাদের চিন্তাভাবনাকে সম্পূর্ণ নতুন খাতে বইয়ে দিয়েছে। আমাদের লৌকিক বস্তুবাদী ভাবনাজগত ছিল জটিলতামুক্ত, সাদামাটা, অকপট। কিন্তু আত্মার ধারণাই প্রথম সেই মনোজগতে অলৌকিকতার এক নতুন জানলা খুলে দেয় — সেই জানলা দিয়ে ঢুকে আসে অতীন্দ্রিয় আলো-হাওয়া, আর নতুন মননের সম্ভাবনায় ভেসে যায় এতদিনের অনাবাদী জমিন! এবারেও আমরা এমন একটা কিছুর আশা নিয়েই আপনার কাছে হাজির হয়েছিলাম। কিন্তু আমরা বুঝতে পারিনি, এবারে আপনার থেকে যে হদিশ আমরা পেতে চলেছি, তা আমাদের ইহজগতকেই চিরতরে বদলে দেবে! আর সেই বদলে যাওয়া জগতে আপনার মার্জিত নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যেতে শুরু করবে, সেই জায়গায় উদ্ভব হবে এক নতুন শ্রেণির… ভুঁইফোঁড় সেই শ্রেণি এরপর থেকে ক্রমশঃ হয়ে উঠবে আমাদের দন্ডমুন্ডের কর্তা। আস্তে আস্তে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি চিন্তাভাবনার বকলমা তারা নিজে থেকেই নিজেদের কাছে নিয়ে নেবে। এবং বলতে দ্বিধা নেই, আমাদের মধ্যে বেশিরভাগই নিজেদের বোধ, বুদ্ধি, যুক্তি, চিন্তা সব কিছুকে এই শ্রেণির পদতলে গচ্ছিত রেখে শুধু নিজেদের সুরক্ষিত মনে করবে তাই নয়, বরং মনে মনে আত্মপ্রসাদও লাভ করবে!

যেসব প্রশ্ন নিয়ে আমরা সে’বার দল বেঁধে আপনার কাছে হাজির হয়েছিলাম, তা যে আপনাকেও আগে থেকেই ভাবিয়ে তুলেছিল, তা আপনার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল… সেদিনে আপনার শান্ত তথাগত রূপখানি যেন আজও চোখের সামনে ভাসে… আপনার গভীর কন্ঠস্বর যেন আজও কানে বাজে –

‘তোমাদের প্রশ্নগুলো আমাকেও নিরন্তর ভাবিয়ে তুলেছে। এর আগে যখন আত্মার সন্ধান দিয়েছিলাম, তখন তোমাদের বলেছিলাম, আত্মাই আসলে প্রাণের প্রতিরূপ। আত্মা আছে বলেই প্রাণ আছে, চেতনা আছে, সংবেদনশীলতা আছে। আত্মা থাকার কারণেই আমরা অনুভব করতে পারি, অনুধাবন করতে পারি। কিন্তু তাই বলে আত্মা যে সবসময় আমাদের শরীরের মধ্যেই আবদ্ধ থাকে, এমনটা নয়। সে অনায়াসে দেহ থেকে যেমন বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে, আবার একইভাবে তেমন প্রবেশও করতে পারে। কিন্তু যদি সে একেবারেই দেহত্যাগ করে, তাহলে আমাদের প্রাণপাখিটিও দেহের খাঁচা থেকে মুক্ত হয়ে যায়… তখন শুধু এই অসাড় দেহখানিই পড়ে থাকে, যাকে আমরা শবদেহ বলে থাকি। এই আত্মার অস্তিত্ব শুধু আমাদের মধ্যেই আছে, তা নয়। বাকি জন্তু-জানোয়ারদের মধ্যেও আছে, তাই তারা প্রাণী; তাদেরও আমাদের মত জীবন-মৃত্যু আছে…’

এতখানি বলে আপনি আমাদের দিকে একবার তাকিয়ে আবার তলিয়ে গেলেন দূরাগত কোনো ভাবনায়। ভাবনারাই পথ যোগায়… আপনার একান্ত সেই ভাবনাগুলোই শব্দস্রোতে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিল, ছুঁতে চেয়েছিল আমাদের, ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিল আমাদের…

‘এই যে আমরা এখন মনে করছি, প্রাণী বাদে বাকি সকলের মধ্যেও আত্মা আছে; এখানেই গোলমাল বাঁধছে, হিসেব মিলছে না! এই যে পাহাড়, এই যে পাথর, এই যে গাছপালা, এই যে নদী, এই যে মাঠঘাট, এদের মধ্যে যদি আত্মা থাকে, তাহলে প্রাণও থাকবে, জীবন-মৃত্যুও থাকবে। অথচ সবার মধ্যে তার প্রকাশ একরকম নয়। এই যেমন ধরো এই নদী, গ্রীষ্মকালে সে শুকিয়ে যাচ্ছে, তার মৃত্যু হচ্ছে। কিন্তু তার শরীরটা পড়ে থাকছে। আবার সেই মরা শরীরেই বর্ষা শেষে প্রাণের জোয়ার আসছে, আবার সে জেগে উঠছে। একইরকম ভাবে ওই যে গাছটা দেখছ, শীতের শেষে শুধু তার কঙ্কালটাই পড়ে থাকবে। আবার তার মধ্যেই প্রাণের স্পন্দন ফিরে আসবে বসন্তের গোড়ায়। এই যে আসা-যাওয়ার পালা, সেখানে তাদের শরীরী কোনো পরিবর্তন ঘটছে না। তাহলে পাহাড়, পাথর, মাটি – এদের ক্ষেত্রে কী হচ্ছে? ওদের তো অমন জন্ম-মৃত্যুর পালা চোখে পড়ছে না। তাহলে এদের মধ্যে যে আত্মা আছে, তাদের কি বিনাশ নেই?’

সত্যি বলতে কি, এতটা তলিয়ে ভাবার মত ক্ষমতা আমাদের ছিল না বলেই আপনার কাছে আসা। আমরা জানতাম, পথের হদিশ আপনার থেকেই পাবো…

‘আবার এও তোমরা দেখবে, আমাদের মধ্যে কেউ কেউ মারা যাচ্ছে, কিন্তু আবার তারা ফিরে আসছে। কিন্তু সবাই ফিরছে না। ভেবে দেখো, যখন শরীর খারাপ হয়, আমরা অচৈতন্য হয়ে পড়ি। তখন কিন্তু আমাদের জীবিত না মৃত, সঠিক ভাবে বলা যায় না। আত্মা যে তখন আমাদের শরীরের বাইরে বেরিয়ে যায়, সে আমরা বেশ বুঝতে পারি। কিন্তু আবার যখন সে আমাদের শরীরে ফিরে আসে, আমাদের চেতনাও আবার ফিরে আসে… এ বড় আজব ব্যাপার। কেউ ফিরছে, কেউ ফিরছে না… না ফিরলে যাচ্ছে কোথায়?’

আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছি আপনাকে… এরপরই আপনি আমাদের সেই যুগান্তকারী পথের সন্ধান দেবেন। এ সেই পথ, যে পথে হাঁটতে শুরু করার পর থেকে আমরা আর কখনো থামবোনা। বস্তুত, ইতিহাস সাক্ষী—আদিম সমাজ আপনার দেখানো সেই পথে হাঁটতে হাঁটতেই কবে যেন সভ্যতা নামক এক মায়ানগরীতে এসে পৌঁছেছিল। সেই মায়ানগরীর অলিগলিতে ঘুরতে ঘুরতে, দিশেহারা আমরা কবে যে আমাদের আদিম সহজাত প্রবৃত্তিগুলিকে হারিয়ে ফেলেছি!

‘অনেক ভেবেচিন্তে আমার যেটা মনে হয়েছে, সেটাই তোমাদের বলছি – আমরা যে এই বেঁচে আছি, আমাদের আশেপাশে সবকিছু দেখতে পাচ্ছি, ছুঁতে পারছি… এই যা কিছু আমাদের চারিপাশে আছে, যেসব আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অথচ ক্ষণস্থায়ী, তা সবকিছু আছে ইহলোকে। কিন্তু আত্মা, সে তো ক্ষণস্থায়ী নয়, তাকে ততক্ষণ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বলতে পারি, যতক্ষণ সে আমাদের দেহে বাস করছে, যতক্ষণ আমরা জীবিত। তারপরে তো সে আর আমাদের ইন্দ্রিয়ের পরিসীমায় ধরা দেয় না… কিন্তু তা সত্ত্বেও সে আছে, তাকে আমরা অনুভব করতে পারি। তাই আমার বিশ্বাস – ইহলোক ত্যাগ করে সে তখন বিচরণ করে নতুন এক জগতে, নতুন এক লোকে, যে লোকের নাম ভেবেছি – পরলোক!’

‘পরলোক’ – এ আমাদের কাছে এক আশ্চর্য অনুভূতির সৃষ্টি করল। এতদিন পর্যন্ত যা কিছু জাগতিক, লৌকিক – আমাদের বোধের সীমারেখায় সেই সব কিছুই বিচার্য ছিল। আত্মা ছিল বটে, কিন্তু তার জন্য আমাদের নতুন কোনো স্থান সংরক্ষণের প্রয়োজন মনে হয়নি। কিন্তু এখন পরলোক নামক বিষম এক জগতের সন্ধান পেয়ে আমাদের শরীরে যেন এক অজানা শিহরণের সঞ্চার হল! কিন্তু আমাদের তখনও বিস্মিত হবার বাকি ছিল…

‘দেহত্যাগ অর্থাৎ ইহলোক ত্যাগ করার পর আত্মারা পরলোকে স্থান নেয়। আত্মারা আমার-আপনার দেহ ত্যাগ করে সেখানে যায় বটে, কিন্তু তার সমস্ত গুণাগুণ সে বহন করে পরলোকে। আত্মার বিনাশ নেই, সে অবিনশ্বর। সে সেই পরলোকে বসবাসকালে আবার ইহলোকে ফিরে আসতে চায়। তখন সে সন্ধান করে নবজাতকের। কখনো সেই নবজাতক মনুষ্যসন্তান হতে পারে, আবার কখনো বা ব্যাঘ্র কিম্বা হরিণ শাবক, আবার কখনো বা অন্যকোনো প্রাণী বা গাছ বা নদী। অর্থাৎ আত্মা আবার জন্ম গ্রহণ করে, যাকে আমরা এবার থেকে পুনর্জন্ম বলব!’

‘পুনর্জন্ম’ – এক লহমায় আপনি ভবিষ্যতের জন্য এক নতুন কল্পদিগন্তের সম্ভাবনা তৈরি করে দিলেন আমাদের সামনে। এত অবধি যা কিছু ছিল অবোধ্য, তাকে ব্যাখ্যা করার জন্য আপনি একে একে যে-সব ধারণার জন্ম দিয়েছিলেন, সেগুলির সঙ্গে কোথাও না কোথাও যেন আমাদের অভিজ্ঞতার সাযুজ্য ছিল। স্বপ্ন – আমরা দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম, আত্মা – মানুষের দেহে কোথায় থাকে বা যখন তা বেরিয়ে যায়, তাহলে কী হতে পারে; এসবই আমাদের জানা ছিল। কিন্তু এই প্রথম আপনি আমাদের সামনে এমন দুটি পরিকল্পনা পেশ করলেন – ‘পরলোক’ এবং ‘পুনর্জন্ম’; এ যাকে বলে, একেবারে আলটপকা, আনকোরা ধারণা। আমাদের অভিজ্ঞতার সাথে দূর দূর অবধি এর কোনো সম্পর্ক ছিল না!

যা কিছু অজানা, অচেনা, বরাবর তা আমাদের কাছে আশংকা, সংশয়, অনিশ্চয়তার বাতাবরণ তৈরি করে। এক্ষেত্রে আপনি এমন ধারণার খোঁজ দিলেন, যা হয়তো চিরকাল আমাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় অনাবিস্কৃত থেকে যাবে। আর সময়ে সময়ে সেই অনিশ্চয়তাকে সুবিধেমত কাজে লাগাবার উদ্দেশ্যে উদয় হবে একদল ছিদ্রান্বেষি, ক্ষমতালোভী ভুঁইফোড়। কিছু অলীক দাবি, কিছু আজগুবি তত্ত্বের ভিত্তিতে তারা আমাদের ফলনশীল মানসজমিনে নানান অবাস্তব কাঠামো বানানোর কাজে উদ্যোগী হবে। বলা বাহুল্য, কালক্রমে তাদের মধ্যে কিছু কাঠামো পাকা ইমারতে পরিণত হবে এবং চিরস্থায়ী হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করবে। এইভাবেই যুগ যুগ ধরে সেই উর্বর বহুফসলি জমিতে ‘সভ্যতা’ নামক এক মায়ানগরীর পত্তন হবে…

প্রথমেই সেই ভুঁইফোড়ের দল পরলোকের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের মনগড়া দাবি করল এবং এমনভাবে তা আমাদের মধ্যে চারিয়ে দিল যে আমরা বিশ্বাস করে বসলাম যে তারাই বুঝি পরলোকের সাথে সংযোগ স্থাপনের একমাত্র মাধ্যম এবং সেই বিশেষ ক্ষমতার বলে তারা আমাদের ইহলোকের তর্কাতীত পরিচালক। যেহেতু আমাদের বোধবুদ্ধি ছিল সীমিত, তাই ঠিকবেঠিক যাচাই করার ক্ষমতা আমাদের ছিল না। অবশ্য বর্তমান যুগে এসেও সে ক্ষমতা আধুনিক মনুষ্যজাতির তৈরি হয়েছে কিনা, তা চিন্তাশীল পাঠকসমাজের বিবেচনাধীন! যাই হোক, নিজেদের পরলোককে সুনিশ্চিত করার জন্য আমরা আমাদের ইহকালকে ওইসব লোকেদের হাতে সঁপে দেওয়াই শ্রেয় বলে মনে করলাম! তারাও আমাদের এই সূক্ষ্ম নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতিটিকে যথাসম্ভব পারদর্শীতার সাথে কাজে লাগালেন এবং জাদু, টোটকার এক লাভজনক বেসাতি ফেঁদে বসলেন।

সেই জাদুবিদ্যা আসলে ছিল ভিন্ন ভিন্ন প্রাকৃতিক ঘটনা, দুর্ঘটনা, সমাপতন ইত্যাদির মনগড়া ব্যাখ্যা এবং তার সাহায্যে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করার একটি চমৎকার কার্যকরী পদ্ধতি। বাস্তবে আমরা কেউই সেইসব জাদুর পিছনের কারণ বা ব্যাখ্যা বুঝতাম না। যে কারণে জাদুবিশারদদের চমকপ্রদ অপব্যাখ্যায় আমরা যারপরনাই প্রভাবিত — বলা ভালো, ভীত ও বিভ্রান্ত হতাম; এবং শেষমেশ তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় পড়ে থাকত না…

যতদিন আপনি আমাদের দিগদর্শকের ভূমিকা পালন করেছিলেন, ততদিন তার পরিবর্তে আপনি কোনো বিশেষ মর্যাদা দাবি করেননি। বরং আপনার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ছিল অনায়াস, স্বতঃস্ফূর্ত। কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই ভুঁইফোঁড় ব্যক্তিসকল কদাপি আপনার মত উদারমনা ছিলেন না, তারা চেয়েছিলেন আমাদের শ্রদ্ধার আসনটিকে ছিনিয়ে নিতে… ক্ষমতার মসনদে গদীয়ান হয়ে বসতে… এতে যা হবার, তাই হল। সবাইকে সমান ভাবার যে শিক্ষায় আমরা অভ্যস্ত ছিলাম, তা আর টিকে রইল না, পরিণামস্বরূপ সাম্যবাদের শীতলপাটিটিও আর দীর্ঘজীবি হল না…

শারদোৎসব সকলের ভালো কাটুক। যতই সাম্যবাদ না টিকুক, উৎসবের দিনগুলো অন্তত সবার মুখে হাসি বজায় থাকুক, সেখানে যেন কোনো অসাম্য, ভেদাভেদ না থাকে… সবাই ভালো থাকবেন।

আপাতত, অলমিতি।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, অক্টোবর ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য