
ঈশ্বরই ধ্রুবক(পর্ব ১২)
সময়ের রেখাপথ ধরে আমার-আপনার যৌথ যাপন সাক্ষী থেকেছে বহু ভাঙা-গড়ার, বহু জোয়ার-ভাঁটার, বহু উত্থান-পতনের। সে পথের বিভিন্ন মাইলফলকে দাঁড়িয়ে আপনি কিছু শিখিয়েছেন, আমি শিখেছি, আবার কখনো আমি-আপনি দু’জনে মিলে শিখেছি – প্রকৃতির থেকে, পরিস্থিতির থেকে, আবার কখনো বা অসামান্য মনীষীদের থেকে। কখনো সেইসব ক্ষণজন্মারা হদিশ দিয়েছেন নতুন কোনো ভাবনা শিখরের। সেই শিখর আরোহণ করে আমি-আপনি অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করেছি অজানা চিন্তাস্রোতের চকচকে রূপোলি গতিধারা। আবার কখনো বা তাঁরা পৌঁছে দিয়েছেন কোনো অদৃষ্টপূর্ব ভাবনা উপত্যকায়; যে উপত্যকায় জায়মান চিন্তারা নাম-না-জানা পাহাড়ি ফুলের সৌরভের মত আমাকে-আপনাকে উদাস করে দিয়েছে আর সেই উপত্যকার চারপাশে অবিচল পাহাড়ি প্রহরা আমার-আপনার সেই উদাসী মুক্তচিন্তায় বেড়ি পড়াতে চেয়েছে…
সেই যে নবম পর্বে স্বপ্নের ঘোরে, প্লেটোর অ্যাকাডেমিতে মুগ্ধ বিস্ময়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বরূপ আবিষ্কার করেছিলাম, তারপর থেকে গত দুই পর্বে ঘোরাফেরা করছিলাম আদিম সেই দিনগুলোতে, যেখানে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছিল মানবজাতির চিন্তা-চেতনার ভিত, সমাজ-সংস্কৃতির বুনিয়াদ। এবারে আবার একটু সেই মহান দার্শনিকদের পদধূলি ধন্য গ্রীসের মাটিতেই ফিরে আসি…
এথেন্স নগরীর বহির্বৃত্তে অবস্থিত প্লেটোর অ্যাকাডেমি থেকে বেরোতেই আপনার সাথে দেখা। প্লেটোর শব্দজালের মৌতাতে তখনও মজে আছি, আপনি চেনা হাসি বিনিময় করে বললেন, ‘কিহে, অনেক তো প্লেটোর ভাববাদী কথা শুনলে, চলো, একটু অন্যরকম কথাও শুনে আসি…’। আমার জবাবের অপেক্ষা না করেই আপনি এথেন্স নগরীকে ডান হাতে রেখে দক্ষিন-পশ্চিম পানে চলতে শুরু করলেন। অগত্যা, আমাকেও আপনার পিছু নিতে হল। একটু পরেই পরিষ্কার হল তখনকার মত আপনার গন্তব্য – পিরেইয়াস, এথেন্সের বন্দর। সেখানে জাহাজ প্রস্তুতই ছিল। আপনার চোখের ইশারায় আপনার সাথে আমিও জাহাজে চেপে বসলাম।
এজিয়ান সাগরের স্বচ্ছ নীল জলে আমাদের পালতোলা কাঠের জাহাজ ভাসছে, আপাতত উত্তর দিকে তার গন্তব্য। সুনীল আকাশে সিগালের দল হামেশাই ইতিউতি ছোটখাটো দ্বীপের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করছে। সমুদ্রের এলোমেলো হাওয়ায় অগোছালো চুলে আঙুল চালাতে চালাতে আপনি খোলসা করলেন আমাদের আসল গন্তব্য। আমরা চলেছি আবডেরা, গ্রীসের উত্তর-পূর্ব দিকে এজিয়ান উপকূলে অবস্থিত প্রাচীন নগর। সেখানে আমরা যাচ্ছি দিকপাল দার্শনিক ডেমোক্রিটাসের সাথে দেখা করতে।
‘বুঝলে, ডেমোক্রিটাস মানুষটা ভারি আমুদে। বাপের অগাধ অর্থ ছিল। শোনা যায়, পারস্যসম্রাট জেরেসিস নাকি একবার পুরো পাইক বরকন্দাজ সমেত ওনার বাড়িতে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন! তা এহেন পয়সাওলা বাপ ফৌত হবার পর, ছেলে বাপের বিপুল অর্থকড়ি নিয়ে কী করল জানো? সে বহু দেশ বিদেশ ঘুরে বেরিয়ে প্রচুর জ্ঞান, সঙ্গে পুঁথিটুথি সংগ্রহ করে ফিরল। লোকে বলে – সে নাকি ভারতবর্ষ নামে এক আশ্চর্য দেশেও গিয়েছিল…’, আপনার থেকে মানুষটার প্রাথমিক পরিচয় পেয়ে কৌতূহল যেন আরেকটু বেড়ে গেল…
আবহাওয়া অনুকূল হওয়ায় কয়েকদিনেই আমরা আবডেরায় পৌঁছে গেলাম। বন্দর থেকে সোজা আমরা ডেমোক্রিটাসের সাক্ষাৎপ্রার্থী হলাম। আপনার কথা শুনে মনে মনে আশা করেছিলাম, বৈভব, প্রাচুর্যের ঘেরাটোপে মানুষটিকে দেখব। কিন্তু সদাহাস্যময় মানুষটির সহজ, অনাড়ম্বর জীবনশৈলি আমার চিন্তার দৈন্যকে যেন আরো একবার নিজের কাছে প্রকট করে দিল।
প্রাথমিক কুশল বিনিময়ের পর তিনি আমাদের বলতে শুরু করলেন, ‘দেখো বাপু, এত দেশ-বিদেশ ঘুরেছি, অনেক গুণীমানুষের সঙ্গ করেছি। তাদের থেকে যতটা পারি, জ্ঞান সংগ্রহ করার চেষ্টা করতে করতে এটাই বুঝেছি, আসল সুখ এইসব সম্পদে নয়, তা লুকিয়ে আছে আমাদের নিজেদের মধ্যে… সততা এবং বিবেকবোধ যদি নিজেদের মধ্যে জাগিয়ে তুলতে না পারো, জ্ঞানের আলো দিয়ে যদি অন্তরাত্মাকে জাগিয়ে তুলতে না পারো, তাহলে কিস্যু হবে না… কী পাপ, কী পুণ্য, কিছুই বোঝার ক্ষমতা তৈরি হবে না… হা হা হা…’
ওনার প্রাণখোলা হাসি শুনে বুঝলাম কেন আপনি ওনাকে ‘লাফিং ফিলোসফার’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। একটু ইতস্তত করে আমাকে দেখিয়ে আপনি বললেন, ‘মায়েস্ট্রো, আমার সঙ্গীটি কিছুকাল প্লেটোর সঙ্গ করেছে… তাই মনে হল, ভাববাদী দর্শনের সাথে সাথে বস্তুবাদী দর্শনের সাথেও একটু পরিচয় হওয়া দরকার। আপনি ছাড়া এ বিষয়ে ভরসাযোগ্য আর কে আছে, বলুন!’
‘বাঃ, বাঃ, প্লেটোর সঙ্গ করেছ তুমি… খুব ভালো, খুব ভালো! প্লেটো আমার চেয়ে বয়সে কিছুটা ছোটই… তা প্লেটো কী শিখিয়েছে? যে পৃথিবীতে সবকিছুর পেছনেই একটা উদ্দেশ্য আছে… কী তাইতো?’, আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে হাসতে কথাগুলো বললেন ডেমোক্রিটাস।
প্লেটোর অ্যাকাডেমিতে থাকাকালীন শিখেছিলাম – আসলে এই পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে চলেছে, তার পেছনে কারণ আছে, উদ্দেশ্য (Purpose) আছে। প্লেটো আমাদের শিখিয়েছিলেন, আমরা চারপাশে যা কিছু দেখছি, আসলে তা আদর্শ, নিখুঁত রূপের বাস্তব, ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য প্রতিরূপ মাত্র! একদিন তিনি আমাদের মধ্যে থেকে একজনকে একটি ফুল সংগ্রহ করে আনতে বললেন। ফুলটি হাতে পেয়ে তিনি আমাদের সেটি দেখালেন – একটি অপূর্ব সুন্দর লাল গোলাপ। তিনি আমাদের জনে জনে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন – ফুলটি সুন্দর কিনা? সবার ইতিবাচক উত্তর শুনে তিনি দ্বিতীয় প্রশ্ন করলেন – এর থেকে সুন্দর ফুল এর আগে কখনো দেখেছি কিনা? এবার সবাই একটু ইতস্তত করতে লাগল। তখন তিনি তার তৃতীয় এবং শেষ প্রশ্ন করলেন – চোখ বন্ধ থাকা অবস্থায় ফুলের কথা শুনলে মনের মধ্যে কোন ফুলের ধারণা আসে? সেদিন উনি বুঝিয়েছিলেন – ফুলটি সুন্দর কিনা, এটি একটি আপেক্ষিক মতামত। কতটা ত্রুটিমুক্ত হলে পরে বা কতটা সুন্দর হলে পরে তাকে সুন্দর বলা যাবে, তা ব্যক্তিমত সাপেক্ষ। অথচ ফুলটির সৌন্দর্য আছে – এবিষয়ে আমরা সকলেই একমত ছিলাম। তাই সুন্দরের চেয়ে সৌন্দর্য অনেক বেশি বাস্তব, পরম এবং সর্বজনীন। একইভাবে, চোখ বন্ধ করলে ফুলের যে ধারণা আমাদের মনের মধ্যে ফুটে ওঠে, সেটাই আসলে ফুলের আদর্শ রূপ (Ideal Form)। এই আদর্শরূপ ইন্দ্রিয়সীমার বাইরে আমাদের মননে অবস্থিত। সেই রূপেরই প্রতিচ্ছবি বাস্তবের গোলাপ ফুলটি…
প্লেটোর সেই ভাববাদী ব্যাখ্যা আমাকে নিরন্তর ভাবায়। তাই ডেমোক্রিটাসের প্রশ্নে ঘাড় নাড়লাম।
‘শোনো বাপু, ওসব আদর্শ রূপ, উদ্দেশ্য – এসব আমি মানিনা। ধরো তুমি একটা গোলাপ ফুল দেখতে পেলে, তার গন্ধ পেলে। কেন পেলে? তার কারণ ওই ফুল থেকে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কণা আমাদের চোখে, নাকে যখন এসে পৌছুঁল, তখন সেই ফুল আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হল… এই যে চারিপাশে যা কিছু আমরা দেখতে পাচ্ছি, তাদের রূপ-গুণ আলাদা হতে পারে, কিন্তু আখেরে তারা সকলে এক… তারা অসংখ্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিভিন্ন আকারের কণা দিয়ে তৈরি। সেই কণাগুলিকে আর ভাঙা যায় না, তারা অকাট্য – a-tomos; তাই তাদের নাম দিয়েছি atom!’, বলতে বলতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল বৃদ্ধ দার্শনিকের চোখমুখ।
‘অ্যাটম, একেই কি লোকে আপনার পরমাণুবাদ তত্ত্ব বলে?’, আপনার সজাগ প্রশ্ন ডেমোক্রিটাসের উদ্দেশে ধেয়ে গেল।
‘রহু ধৈর্যং বন্ধু…’, একগাল হেসে বলে উঠলেন ডেমোক্রিটাস। আমাদের প্রতি অপাঙ্গে তাকিয়ে বৃদ্ধের দৃষ্টি এবার শূন্যে নিবদ্ধ হল।
‘শুধু অ্যাটম নয়, আমাদের এই মহাবিশ্বের নির্মিতির পিছনে আছে আরেকটি উপাদান – শূন্যতা, void… এই শূন্যে পরমাণু নিরন্তর ভেসে বেড়াচ্ছে। মনে রাখবে, অ্যাটম সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না। নানান আকার, গতি, বিন্যাসের মাধ্যমে সে কেবল তার রূপ বদলায় এবং তাতেই আমাদের কাছে এই পরম বৈচিত্রময় বিশ্বের আদল ধরা দেয়! এবার তোমার প্রশ্নের উত্তরে আসি…’, বলে ডেমোক্রিটাস আপনার দিকে তাকিয়ে হাসলেন এবং আবার বলতে শুরু করলেন,
‘আমাদের এই স্থূল খাঁচাটার ভেতরে কী আছে জানো? আত্মা। আর এই আত্মাও আসলে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরমাণু দ্বারা নির্মিত। আত্মাই আমাদের মধ্যে চেতনা, বোধ, উপলব্ধি, প্রাণের অন্যান্য লক্ষণগুলিকে সযত্নে লালন করে…’ একটু বিরতি নিয়ে ডেমোক্রিটাস আবার শুরু করলেন – ‘এই যে গোলাপ ফুলের কথা বললাম… সেই ফুল থেকে প্রতিনিয়ত পারমাণবিক প্রতিচ্ছবি নির্গত হয়। সেই প্রতিচ্ছবির আমি নাম রেখেছি আইডোলা (Eidola)। এরা বাতাসে ভেসে যখন আমাদের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়, তখন তা আমাদের অনুভবের সীমারেখায় ধরা দেয়। এরপর যখন সেই অনুভূতি আমাদের আত্মায় সঞ্চারিত হয়, কেবলমাত্র তখনই আমরা সেই বস্তুটির অস্তিত্ব নিজেদের মধ্যে ধারণ করার অবস্থায় পৌঁছই… আমাদের আত্মা তাকে উপলব্ধি করতে পারে…’
এই শেষের কথাগুলি আত্মার কথাগুলো শুনতে শুনতেই যেন এক নিমেষে চোখের থেকে একটা পর্দা সরে গেল। যে তথাকথিত বস্তুবাদ রঞ্জিত দার্শনিক উপলব্ধির কথা ডেমোক্রিটাস এতক্ষণ আমাদের শোনাচ্ছিলেন, তা যে আমরা বহুযুগ ধরে শুনে আসছি… বস্তুত, যবে থেকে আত্মা আমাদের প্রণিধান দাবি করতে শুরু করেছে, তবে থেকেই গোচরে-অগোচরে আমরা এমন একটি ভাবনাকেই তো জল-হাওয়া দিয়ে বড় করে তুলেছি… আপনার সাথে দৃষ্টিবিনিময় হতেই বুঝতে পারলাম, আমার ভাবনাপথ আপনার অনুবর্তী। আমরা যেন নিমেষে ফিরে গেলাম পুরোনো সেই দিনগুলিতে…
রহস্যময় ছায়া বৃত্ত, নিদ্রাসুপ্তির আড়ালে স্বপ্নাবেশ, নিদ্রামগ্ন মানুষের সাথে মৃত মানুষের আপাত সাদৃশ্য – এই অবোধ্য ব্যাপারগুলো যখন আমাদের ভাবনার জগতে ঝড় তুলছিল, তখন আপনার কাছেই আমরা প্রথম আত্মা নামক আশ্চর্য অস্তিত্বটির খোঁজ পেয়েছিলাম। আত্মা নামক সেই অলীক আরশিনগরের সুলুক পাওয়া ইস্তক আমাদের কৌতূহলি মনোজগতে সে বিষয়ে নানান প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল। প্রথমেই যে ভাবনাটি আমাদের সকলের মনোযোগ দাবি করল, তা হল – আত্মা থাকে কোথায়?
হয়তো এমনই এক বর্ষামুখর দিন ছিল সেদিন। মেঘের ‘পরে মেঘ জমছিল আকাশে। আচম্বিতে মেঘপুঞ্জের তীব্র উচ্ছাস-ঝলকে মুখরিত হয়ে উঠল আকাশ… চমকে উঠলাম আমি, ততোধিক চমকিত আমার সঙ্গিনীটি। সভয়ে সে মুখ গুঁজল আমার রোমশ বক্ষপুটে। একসময় শান্ত হয়ে এল চারিপাশ। ততক্ষণে তার পুলকিত তনুভারে হৃদস্পন্দন তীব্রতর হয়েছে আমার। সেই স্পন্দনের শব্দ বোধহয় প্রবেশ করে বক্ষলগ্না সঙ্গিনীর কর্ণকুহরে! সম্ভবত সেই প্রথম মানুষের অন্তরের নিবিড় ছন্দময় আলোড়ন ধরা পড়ে যায় অন্য কারোর কানে, সেই মৃদু অথচ গম্ভীর তরঙ্গধ্বনিতে বিস্ময়াবিষ্ট সঙ্গিনীটির ভুবনমোহিনী চোখের আবেদনে ভেসে যেতে চাই আমি… কিন্তু সে আমার কান চেপে ধরে তার উদ্ভিন্ন বক্ষের বামপাশে, অনুভব করাতে চায় তার নিজস্ব প্রাণের স্পন্দন… সেই নতুন আবিষ্কারের অনুরণনে ভেসে যায় চরাচর…
সেই নতুন আবিষ্কারের উল্লাস একে একে আমাদের সকলের মধ্যেই সঞ্চারিত হয়। আমরা অচিরেই অনুধাবন করলাম – বেঁচে থাকার সাথে এই আওয়াজ ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। কারণ জেগে থাকলে তো বটেই, নিদ্রিত বক্ষেও কান পাতলে যে জীবনের দুন্দুভি টের পাওয়া যায়, মৃত মানুষের ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ নিঃশব্দ, নিশ্চল। আরো একটি জীবনের লক্ষণ আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করলো – নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস। এটিও যে বেঁচে থাকার একটি আবশ্যিক শর্ত, তা আমরা ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম। একজন দুর্বল মানুষের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস ক্রমশঃ ক্ষীণতর হতে হতে যখন একেবারেই স্তব্ধ হয়ে যায়, তখন যে সে মৃতের দলে নাম লেখায় – তা আমাদের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে ধরা দিয়েছিল।
এর আশেপাশেই কোনো এক সময়ে আপনি কয়েকজনের সাথে শিকার ধরতে বেরিয়েছিলেন। আচমকাই আপনাদের ওপর আক্রমণ করে বসে একটি বেপরোয়া ভাল্লুক। তার ক্ষুরধার নখে আপনাদের এক সঙ্গীর বুক চিরে ফালাফালা হয়ে যায়। যতক্ষণে সেই ভাল্লুককে তাড়ানো সম্ভব হয়, তখনো সেই আক্রান্ত সঙ্গীটির শেষ নিঃশ্বাস পড়েনি। সেই নিশ্চিত মৃত্যু-পথযাত্রী সঙ্গীটির উন্মুক্ত বুকের অন্তরালে দৃশ্যমান পাঁজরের ফাঁকে আপনি দেখতে পেলেন একটি আশ্চর্য গোলাপি মাংসল পিন্ড। সেটি তখনো ধীর অথচ নিয়মিত লয়ে ওঠানামা করছে। একসময় আপনাদের চোখের সামনেই সেই ওঠানামা থেমে গেল… এবং সেই এক মূহুর্তে আপনার জ্ঞানচক্ষুর উপর থেকে সকল পর্দা সরে গেল। প্রাণবায়ু, বুকের ভেতর থেকে আসা ঢিবঢিব শব্দের সাথে যে এই মাংস পিন্ডটি একই সুতোয় বাঁধা, তা বুঝতে আপনার বাকি রইল না। হৃদয় স্থিত সে পিন্ডটির আপনি নাম দিলেন – ‘হৃদপিণ্ড’ এবং আমাদের সকলকে বোঝালেন – হৃদপিন্ডই হল আত্মার ঠিকানা!
এরপর পরিবেশ, পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করল। অলৌকিকতার কুটিল মেঘ এমনভাবে আমাদের সহজ সরল জীবনের ওপর ঘনাতে শুরু করল, যে আমাদের সেই আগেকার অনাবিল নীলাকাশ দেখার আর কোনো সুযোগ রইল না! আত্মার ভূয়োগামিতা, সে সশরীরী হোক বা অশরীরী, আমাদের সিধেসাধা জীবনধারণকে আর তেমনটা থাকতে দিল না। চারিপাশ থেকে নানান সংস্কার ঘিরে ধরতে শুরু করে আমাদের চিন্তা ভাবনাকে। মৃত্যুর সাথে যেহেতু আত্মার সরাসরি সম্পর্ক স্থাপিত হল, তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই ইহলোক এবং পরলোকের একটা আবছা ধারণা আমাদের মধ্যে আসন পেতে বসতে শুরু করল। পরলোকগত পূর্বপুরুষরা আরো ঘন ঘন আমাদের লৌকিক জীবনপদ্ধতির সাথে সংযোগ ঘটাতে শুরু করল। মৃত্যুর পরেও যেসব আত্মা আমাদেরকে সুপরামর্শ দিতে থাকল, অন্তত যাদের ক্ষেত্রে আমাদের তেমনটা মনে হল, তাদেরকে আমরা আমাদের আরাধ্য হিসাবে দেখতে শুরু করলাম। আর কিছু কিছু মানুষ, যাদের জীবদ্দশায় হয়তো আমরা যেকোনো কারণেই হোক, তাদের ভয় পেতাম, মৃত্যুর পরেও আমাদের অবচেতনে তাদের অশরীরী আত্মা মাঝেমাঝেই উদয় হয়ে আশংকা এবং ভয়ের জানান দিয়ে যেত। তাদের আমরা প্রেতাত্মা হিসাবে বিবেচনা করতে শুরু করলাম।
এই সূত্রেই আরেকটি অত্যন্ত্য গুরুত্ববাহী এবং চিরন্তন ধারণার উন্মোচন হল আমাদের কাছে। এর আগে আমরা দেখেছিলাম, মানুষ ছাড়াও অন্যান্য প্রাণী মায় গাছপালা, পাহাড়, মেঘ – সবেরই ছায়া পড়ে। তাই আমাদের মধ্যে এদের নিয়ে একটা সংশয় ছিলই। তার মধ্যেই আমাদের স্বপ্নপথেও এরা অনায়াসে দেখা দিতে থাকল। ফলতঃ আমাদের বিক্রিয়াশীল চিন্তা আমাদের বোঝালো – এদের মধ্যেও নিশ্চিত আত্মা আছে! প্রানীদের মৃত্যুর সাথে আমরা সমধিক পরিচিত ছিলাম, কিন্তু বাকিগুলোর ক্ষেত্রে একটু বাধো বাধো ঠেকল, কারণ আত্মা থাকলে সেখানে প্রাণেরও একটা সম্ভাবনা তৈরি হয় বৈকি। কিন্তু তারা তো আমাদের মত অমন হেঁটেচলে বেড়ায় না! আপনি তখন আমাদের বোঝালেন – ‘ভালো করে চারপাশে চেয়ে দেখ, দেখবে গাছেরাও আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে, ডালপালা মেলছে, আবার কখনো শুকিয়ে মরো যাচ্ছে’। অতএব আমরা নিশ্চিত হলাম – গাছেদের মধ্যে আত্মা অবশ্যই আছে! কিন্তু বাকি পাহাড়, পাথর, ঝর্ণা, নদী, মেঘ – এদেরকে তো জীবণ-মরণের চেনা ছকে ধরা যাচ্ছে না! অথচ এদের মধ্যে আত্মা যে আছে, সে ব্যাপারে আমরা একপ্রকার নিশ্চিত, নতুবা কীভাবেই বা তারা আমাদের স্বপ্নলোকে ধরা দেয়!
আরো একবার আপনার অব্যর্থ প্রজ্ঞার পরিচয় পেলাম আমরা। আপনি ব্যাখ্যা করলেন – পাহাড়, পাথর, ঝর্ণা, নদী, মেঘ… এদের আত্মার কোনো ব্যত্যয় নেই, তা অজর, অমর, অব্যয়! তারা আর পাঁচটা আত্মার সমতুল নয় – তারা শ্রেষ্ঠ, সুতরাং আরাধ্য। নিজ আত্মাকে সেই পরমাত্মাদের অনুসারী করে তুলতে পারাই আমাদের জীবনের মোক্ষ হওয়া উচিত, এই সুর বেঁধে দিলেন আপনি। সে এমন এক অমোঘ সুর, যার শুরু আছে, শেষ নেই। সে এমন এক মায়াবী সুর, যার নানান আলাপ, নানান বিস্তার, নানান ঝালার রকমারি চৌম্বকত্বে যুগ যুগ ধরে বুঁদ হয়ে থাকবে মানব সমাজ, আগামী দিনগুলির সভ্যতা…
একদিকে যেমন আমাদের ভাবনার জগতে নানান ক্রিয়া-বিক্রিয়া ঘটে চলেছিল, তেমনই আমাদের প্রায়োগিক জ্ঞানও ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছিল। শিকারে সংগৃহিত পশুর চামড়া যে পোশাক হিসাবে ব্যবহার করা যায়, তা আমরা আস্তে আস্তে বুঝতে শিখলাম। এতে বিশেষত শীতের দিনগুলিতে আমাদের বিশেষ সুবিধে হল। আমাদের আয়ুধ সম্ভারও আরো ফুলে ফেঁপে উঠছিল। কুঠার ছাড়াও আমরা ধীরে ধীরে তীর-ধনুক, পাথর দিয়ে বানানো ছুরি এবং বর্শা – ইত্যাদি অস্ত্র ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিলাম। সেইসব অস্ত্র শিকারে বেরোনোর সময় নিজেদের সাথে বহন করার জন্য আমরা নানান অস্ত্রবন্ধনীর উদ্ভাবন ঘটাতে শুরু করেছিলাম, যাতে আমাদের হাত দুটি শিকারের সময় সুবিধেমত ব্যবহার করা যায়। এই অস্ত্রবন্ধনীগুলি কখনো হাতে বা পায়ে, কখনো কোমরে আবার কখনো বা গলায় ঝোলাতে ঝোলাতে অজান্তেই সেগুলি আমাদের শরীরের বর্ধিত অংশ হয়ে যেতে শুরু করল। শিকার ব্যতীত অন্যসময়গুলিতে সেগুলি হার, বাজুবন্ধ, কোমরবন্ধনী, বালা, পায়ের মল ইত্যাদি গহনায় রূপান্তরিত হল। শীঘ্রই এইসব ভূষণ আমাদের অভিজ্ঞানের জরুরী উপাদান হিসাবে বিবেচিত হতে শুরু করল…
এই অনুষঙ্গে আরেকটি উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা আমাদের ধারণাপ্রবাহকে নতুন দিশা দেখাল। স্বপ্নে পরলোকগত যেসব আত্মীয়রা দেখা দিল, তারা কেউই নিরাবরণ বা নিরাভরণ রইল না। ফলতঃ আমাদের বিশ্বাস হল – প্রতিটি বস্তুসামগ্রীর মধ্যে আত্মা বিদ্যমান। মৃত্যু পরবর্তীতে আত্মার সাথে সাথে মৃতের ব্যবহৃত বস্তুসামগ্রী সংশ্লিষ্ট আত্মাও দেহত্যাগ করে। এর ফলে আমাদের পরলোক ধারণায় বিপুল পরিবর্তন হল, মৃত দেহের সৎকার পদ্ধতিতে রদবদল হতে শুরু করল। শেষ পারাণির কড়ি বিভিন্ন বিশ্বাসের আতর মেখে, বিভিন্ন আচার-সংস্কারের প্রসাধনে ভূষিত হয়ে ক্রমাগত রূপান্তরিত হতে থাকল…
আজকের পাঠক যদি ভেবে দেখে, তাহলে আশা করি আমার-আপনার সাথে একমত হবে যে, বর্তমান কালে যেকোনো সংস্কৃতি, যেকোনো ধর্ম, যেকোনো আচার-অনুষ্ঠান, যেকোনো রীতি-নীতির গোড়ায় যদি ফিরে যাওয়া যায়, তাহলে কিন্তু সেই অ্যানিমিজম অর্থাৎ সবকিছুতেই আত্মা বিরাজমান, এই আদি বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দুতেই উপনীত হতে হবে। সেই আদি বিশ্বাস হয়তো কালের নিয়মে পরিবর্তিত, পরিশীলিত হয়েছে, কিন্তু মানবজাতির অবচেতনে তা একই থেকে গেছে। সেই সাক্ষ্য এখনো বহন করে চলেছে মানবশিশু। শৈশবের দিনগুলিতে সে যখন তার আশেপাশের নির্জীব বস্তুসামগ্রীর সাথে আধো আধো ভাষায় নিরন্তর বার্তালাপ করে চলে, তখন কিন্তু সে ভেবে নেয়, ওই বস্তুগুলিরও বুঝি প্রাণ আছে!
ডেমোক্রিটাস সে’দিন আমাকে-আপনাকে যা বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন, যে অ্যাটম বা পরমাণু দ্বারা নির্মিত বস্তু থেকে প্রতিচ্ছবি নির্গত হয়ে যখন বাতাসের মধ্যে দিয়ে বাহিত হয়ে আমাদের চেতনায় ধরা দেয়, তখনই আমরা সেই বস্তুকে অনুধাবন করতে পারি। আসলে এই ধারণা তো বহুযুগ আগে থেকে আমরা নিজেদের মধ্যে ধারণ করে আছি। ডেমোক্রিটাসের ভাবনায় যা আইডোলা (Eidola), যার মাধ্যমে বস্তু আমাদের সাথে সংযোগ স্থাপন করে, তাকেই আমরা অতীতে বস্তুটির আত্মা বলে চিনতে শেখেছি। যে ক্লীবাত্মা আমাদের সাথে বহুযুগ ধরে শয়নে, স্বপনে, জাগরণে, জনমে, মরণে নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে, তাকেই ডেমোক্রিটাস নতুন নামের মোড়কে পরিবেশন করতে চেয়েছেন… এভাবেই এক ভাবনা অন্য ভাবনায় বদলে বদলে যায়। সর্বপ্রাণবাদ অর্থাৎ অ্যানিমিজমের স্থান নিতে চায় ধর্মের পরিভাষা, পরলোক ভাবনার স্থান নিতে চায় সংস্কারের অনুশাসন, কখনো বা আস্থার প্রেক্ষিতে নিজের স্থান বুঝে নিতে চায় যুক্তিবোধ, অন্ধবিশ্বাসের স্থান নিতে চায় বিজ্ঞান…
ভালো থাকবেন। আপাতত পরের পর্ব অবধি আমার-আপনার প্রতীক্ষার পালা, আশা করি পাঠকদেরও বটে…


চমৎকার লাগছে লেখাটি। “সুন্দর” আর “সৌন্দর্য” নিয়ে আলোচনা মন ছুঁয়ে গেলো। লাল গোলাপের সৌন্দর্য আপেক্ষিক। এটাও তো দর্শক সাপেক্ষ। “আমারি চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ/চুনি উঠলো রাঙা হয়ে/গোলাপের দিকে চেয়ে বললাম ‘সুন্দর’/সুন্দর হলো সে।” আত্মা নিয়ে ধারণার জন্ম, তার ব্যপ্তি পড়তে পড়তে ভেসে যাচ্ছি। লেখা এগিয়ে চলুক। লেখকের জন্য অনেক ধারণার বিস্তৃতি হচ্ছে। তাঁকে ধন্যবাদ।
পাঠকের এমন মতামত অনেকটা উৎসাহ দেয়, ভরসা যোগায়… অনেক অনেক ধন্যবাদ।