
খলনায়ক উত্তমকুমার
উত্তমকুমারের অভিনয়ের একটি বিশেষ উত্তমকুমারের জন্ম শতবর্ষ পূর্ণ। শতবর্ষে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি।
উত্তমকুমারের অভিনয় শৈলী নিয়ে নানান সমালোচক নানান কথা বিভিন্ন সময় বলেছেন। ভবিষ্যতে আরও লেখা হবে সে কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
খলনায়ক হিসেবে তাঁর সাফল্য এই লেখার প্রতিপাদ্য বিষয়। হ্যামলেটের মুখে শোনা যায়: ‘One may smile and smile and be a villain’. উত্তমকুমার বাংলা সিনেমার ধ্রুপদী শয়তান। কারণ তিনি হাসতে হাসতে শয়তানি করেছেন। ভিলেন হয়েও বেশির ভাগ ছবিতে ট্র্যাজিক হিরোতে উত্তীর্ণ। যেন বলতে চান: ‘খারাপ আমি-টাকে মরতে দাও। ভাল আমি-টাকে তোমাদের স্মৃতিতে বাঁচতে দিও’।

অভিনয়ের সেই প্রথম যুগে ‘বসু পরিবার’ ছবিতে প্রায় শেষ পর্যন্ত দর্শককুল যখন তাঁর অভিনীত সুখেন চরিত্রকে চোর প্রতিপন্ন করে উদ্বেগে অস্থির, এমনকি তাঁর ভাই সত্যেনও দাদাকে চোর বলতে দ্বিধা করেনি ঠিক তখনই শেষ মূহুর্তে জানা গেল সুখেন তাঁর উপন্যাস বিক্রি থেকে যথেষ্ট অর্থ পেয়ে সংসারের কাজে লাগিয়েছেন। অফিসের টাকা চুরি করেছে অন্য এক অন্তরঙ্গ বন্ধু। ঘাম দিয়ে চোর অপবাদের ঘোরলাগা কাটে। এক মূহুর্তে ভিলেন থেকে হিরো সকলের কাছে।
পরিচালক পীযূষ বসুই মূলত তাঁকে বেশি পরিসর দিয়েছিলেন খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করে প্রমাণ করতে যে নায়ক এবং খলনায়ক দুই ভূমিকাতে তিনি সমান পারদর্শী। সত্যজিৎ রায় পরিচালিত ‘নায়ক’ পৌঁছে গিয়েছিল হলিউডের এলিজাবেথ টেলর পর্যন্ত। ততবড় পরিচালক পীযূষ বসু না হলেও তাঁর পরিচালিত ‘দুটি মন’ ছবিতে সুযোগ দিলেন একইসঙ্গে ভাল এবং খারাপ বা নায়ক এবং খলনায়ক দুটি চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ করে দিয়ে।
১৯৭০ সালে বিনয় চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনি নিয়ে দ্বৈত চরিত্রে উত্তমকুমার রুদ্র এবং তাপস। রুদ্র তার যৌবনে এক হার্মাদের কাছে থেকে চুরি ছিনতাই ডাকাতি ইত্যাদি যত রকম খারাপ কাজ আছে তাতে হাত পাকায়। গুরুর আশ্রয় প্রশ্রয়ে থেকে বেশ চলছিল কিন্তু হঠাৎ গুরু মারা যেতে পথে বসার যোগাড় রুদ্রর। কোনো এক সময় তারই মতো দেখতে এবং তারই মতো বয়সের তাপসের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল এবং বন্ধু পাতিয়েছিল। তাপস একজন লেখক এবং সৎ চরিত্রের। এক দূরুহ রোগভোগে তাপস মারা গেলে রুদ্র নিজেকে তাপস পরিচয় দিতে থাকে। তাপসের প্রেমিকাও রুদ্রকে তাপস ভেবে মেলামেশা করে কিন্তু একদিন প্রেমিকা ঠিক বুঝতে পারে যে এই তাপস একজন নকল ব্যক্তি যে মানুষ হিসেবে মোটেই সুবিধের নয়। সুপ্রিয়া চৌধুরী সুখেন দাস সুপর্ণা সেন প্রমুখ থাকলেও মোটামুটি সফল হয়েছিল ছবির কাটতি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গীত পরিচালনায়। কিন্তু উত্তমের অভিনয় ছিল সাবলীল।

সুশীল মজুমদার পরিচালিত এবং সলিল চৌধুরীর সঙ্গীত পরিচালনায় ‘লালপাথর’ কিন্তু বেশ সাড়া জাগিয়েছিল ১৯৬৪ সালে প্রশান্ত চৌধুরীর কাহিনি নিয়ে এই ছবি । এখানে উত্তম প্রতিহিংসাপরায়ণ খলনায়ক।
এই ছবিতে কুমারবাহাদুরের ভূমিকায় উত্তমকুমার। কয়েক যুগ আগে তাঁর পূর্বপুরুষ এক আদিবাসী মহিলাকে জোরপূর্বক বিয়ে করায় সেই রমণী অভিশাপ দেয় যে তাঁদের এই কদর্যতা বংশপরম্পরায় বর্তাবে। সেটাই যেন প্রমাণ করতে চেয়েছেন পরিচালক। এই অভিশাপ থেকে রেহাই পেতে কুমারবাহাদুরকে এলাহাবাদে রেখে পড়াশুনো করিয়েছিলেন কলকাতার রাজবংশ ওরফে জমিদার। কিন্তু মাঝে একদিন কলকাতায় থাকাকালীন শিকারে বেরিয়ে একটি মেয়েকে ( সুপ্রিয়া চৌধুরী) পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করেন। তাঁকে কাছে রেখে নিজের মতো গড়তে চেয়েছেন কুমার কিন্তু গ্রামের সহজ সরল মহিলা তাঁর মতো করে কুমারকে ভালোও বেসেছেন।

কিন্তু কুমারের চাপিয়ে দেওয়া পরিবর্তন নিতে পারেননি পরিবর্তিত নাম মাধুরি। একটি সঙ্গীতানুষ্ঠানে দেখা হয় সঙ্গীতবিশারদ নাচের শিল্পী সৌদামিনীর ( নবাগতা শ্রাবণী বসু)সঙ্গে। তারপর যা হওয়ার তাই হল। প্রেম ও বিয়ে। তবে সৌদামিনীর প্রেমিক অম্বরিশ ইতিমধ্যে বিদেশ থেকে ফিরেছেন। তিনি কুমারবাহাদুরের বন্ধুও বটে। অম্বরিশের ভূমিকায় নির্মলকুমার ( দুবছর পরে তাঁরও জন্মশতবর্ষ, জীবিত)। তাঁদের প্রেম জেগে উঠতে পারে এই ভয় সর্বদা কাজ করতো কুমারবাহাদুরের মনে। এদিকে মাধুরির আত্মমর্যাদায় ঘা লেগেছে সংসারে তাঁর কর্তৃত্ব নেই বলে। সব মিলিয়ে একেবারে দিশেহারা হয়ে বদগুণ চাগাড় দিল কুমারবাহাদুরের মনে। প্রতিহিংসা এমনই জেগে উঠল মনে যে এখন তাঁর হাতে বন্দুক থাকে। বন্ধুকে নিয়ে বেড়াতে যায় আগ্রা এবং ফতেপুর সিক্রি। পূর্ণিমারাতে কৌশলে সৌদামিনীকে নাচতে পাঠান কুমার। এদিকে বন্ধুকে দেখায় ভুতের আর্বভাব ঘটেছে। গুলি চালায়। মৃত সৌদামিনীকে কেউ পায় না তাঁর হিংসার বলি হয়ে। বৃদ্ধ বয়সে কুমার বেড়াতে গিয়ে এই গল্পটা বলছেন যে: এখানকার সব লালপাথরের ইতিহাস সব ভ্রামণিক এমনকি গাইডও জানেন না।

