ঔপন্যাসিক বুদ্ধদেব গুহ ‘কোয়েলের কাছে’ উপন্যাসের এক জায়গায় লিখেছিলেন, “হাজার হাজার বছর ধরে আমরা প্রকৃতির সঙ্গে বিপরীতমুখী ছুটে, তার সঙ্গে লড়াই করে যে পার্থক্য অর্জন করেছি, তার গালভরা নাম দিয়েছি সভ্যতা।” এই সভ্যতার রাস্তা ধরে এতটা পথ হাঁটার পর আমরা যদি পিছন ফিরে তাকাই, তাহলে দেখব – আসলে এই সভ্যতা আমাদেরকে ক্রমাগত প্রকৃতি থেকে অপসারী করেছে, মানবজমিনের সহজ সরল বনেদ সভ্যতার জটিল সমীকরণে ক্রমাগত দুর্বল হয়েছে, বলিয়ান হয়েছে সামাজিক বৈষম্য! কিন্তু একটা সময় এর’মটা ছিল না – বিশ্বাস করুন। বিশ্বজনীন অর্থনীতির চাহিদা অনুসারে যে সাম্যবাদ আজ ব্রাত্য, পরিত্যজ্য – যখন মানুষ তথাকথিত সভ্যতার চাদর মুড়ি দিতে অভ্যস্ত হয়নি, তখন কিন্তু সেই সাম্যবাদই ছিল তার জীবনচর্যার মূল আধার।

সময়ের চাকা বদলাতে শুরু করল সেদিন থেকে, যেদিন মানুষ প্রথম কৃষিকাজ শিখল। খাদ্যের জন্য যাকে এতদিন প্রকৃতির মুখাপেক্ষি থাকতে হত – শিকার ধরতে পারলে, কিম্বা ভালো ফল ধরেছে, এমন গাছ খুঁজে পেলে যে নিজের এবং নিজ গোষ্ঠীর সকলের পেট ভরাতে পারত, হঠাৎ আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপের মত তার কাছে খুলে গেল জমি আবাদ করার, খাদ্য উৎপাদন করার এক আজব চাবিকাঠি। যে খাদ্য এতকাল ছিল অনিশ্চিত এবং সময়বিশেষে অপ্রতুল, তাই এখন হয়ে উঠল সুনিশ্চিত এবং উদ্বৃত্ত। বদলে গেল মানুষের জীবনস্রোতের অনাবিল মন্দমধুর রুপোলি রেখা – আচমকাই তা পাহাড়ি নদীর মত চপল বেগে বেয়ে চলতে শুরু করল সভ্যতার মোহনা-উদ্দেশে!

যা কিছু উদ্বৃত্ত, তাই উত্তরাধিকার সাপেক্ষ। ফলত যা হবার, তাই হল – বদলে যেতে লাগলো মানুষের জীবন, পরিবারের সংজ্ঞা, সম্পর্কের বুনোট, মূল্যবোধের রেখাচিত্র, সর্বোপরি, সমাজের ক্যানভাস। যে মানুষের ভিতরে এককালে সাম্যবাদের চারা মহীরূহ হবার দিন গুনছিল, তাই আচমকা সভ্যতার নোনা হাওয়ায় শুকিয়ে যেতে শুরু করল। তার বদলে মাথাচাড়া দিল নানাবিধ অসাম্য – সে নারী–পুরুষের ক্ষমতাই হোক, সম্পত্তি-প্রতিপত্তির জটিল মানদন্ডই হোক কিম্বা অধিকার-অস্বীকারের সাপ-লুডো খেলাই হোক – মানুষই হয়ে উঠল মানুষ তথা প্রকৃতির পরম শত্রু! ক্ষমতা দখলের অশ্বমেধ যজ্ঞে, সংখ্যা-সম্পদ-সংগঠনের টানাপোড়েনে মানবসভ্যতা ক্রমশ তার দাঁত-নখ বার করতে শুরু করল! যুগে যুগে বদলে যেতে লাগল সভ্য সমাজের স্বরূপ, ক্ষমতার মানে, রাজনীতির অভিঘাত, অর্থনীতির চালচিত্র…

আচ্ছা, আজকাল খেয়াল করে দেখেছেন – সমাজের সর্বোচ্চ স্থানে যারা বসে আছেন, সে ধর্মই হোক বা রাজনীতি, পুরুষই হোক কিম্বা নারী, যাদের সামান্য অঙ্গুলিহেলনে বিপুল সংখ্যক মানুষ মুহূর্তে প্রভাবিত হন, তারা ব্যক্তিগত জীবনে বা বলা ভালো সর্বসমক্ষে প্রতীয়মান ব্যক্তিগত জীবনে নিজেদের অবিবাহিত হিসাবে প্রতিপন্ন করতে কীরকম আগ্রহী! কিন্তু এমনটা তো হবার কথা ছিল না – জীবজগতের দিকে যদি আমরা তাকাই, বা আমাদের নিজেদের ক্ষেত্রেও যদি আমরা পিছন ফিরে তাকাই, তাহলে দেখব – ক্ষমতাশালী হবার অন্যতম সুবিধাটিই ছিল অবাধ যৌনতার সুযোগ, পক্ষান্তরে যা সন্তান উৎপাদন তথা বংশবৃদ্ধির স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়াকে সূচিত করে। কিন্তু কোন এক মন্ত্রবলে তা যেন বদলে গেল এক্ষেত্রে – জনমানসে ভাবমূর্তি নির্মাণ তথা নিজেকে সৎ প্রতিপন্ন করার তাগিদ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করল জীবনের সহজাত প্রবৃত্তিতে! ক্ষমতার রাজনৈতিক অলিন্দে এমন পাঠ প্রথম দিলেন যিনি – তিনি আমাদের পূর্বালোচিত পিথাগোরিয়ান সোসাইটির সঙ্গ করেছিলেন বেশ কিছুকাল, দর্শনের ইতিহাসে তিনি প্রাতঃস্মরণীয় নাম – অ্যারিস্টোক্লেস, নিজের শালপ্রাংশু চেহারার জন্য যার ডাকনাম ছিল – ‘প্লেটো’! তার অবিস্মরণীয় সৃষ্টি – ‘রিপাবলিক’ আমাদেরকে এক আদর্শ রাষ্ট্রের চিত্রকল্প পেশ করে, যেখানে সমাজনীতি এবং রাজনীতির এক অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটান তিনি। যদিও সেই সমাজনীতিতে বৈদিক সমাজব্যবস্থার ছায়া অনেকাংশেই দেখতে পাওয়া যায়, তবুও আলোচ্য পরিসরে আমরা পাশ্চাত্য পরিধিতেই সীমাবদ্ধ থাকব। ভারতীয় অনুষঙ্গ আপাতত ভবিষ্যত পর্বের জন্য তোলা থাক…

ঈশ্বর ভাবনা অনেকাংশেই ধর্মীয় অনুশাসন দ্বারা সংশ্লিষ্ট। ধর্ম ঠিক করে দেয় – কীভাবে ঈশ্বরকে আমরা পাবো, কীরূপে পাবো, কখন পাবো এবং না পেলে – কেন পাবো না! সেই ধর্মীয় যাঁতাকলে নির্মাণ হয় আমাদের ঈশ্বরকল্প। এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমাদের অজান্তেই আমাদের চেতনার চৌহদ্দিতে ধর্মব্যবসায়ীরা এঁকে দেন এক অমোঘ লক্ষ্মণরেখা। আমরা ভয় পাই সেই রেখা পেরোতে – না জানি কোন অজানা বিপদ ওঁত পেতে আছে অপর পারে, না জানি কোন পাপে দেবতা রুষ্ট হন, না জানি কোন অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয় ধর্মপতিদের কোপদৃষ্টিতে পড়ে! আর জনসাধারণের অন্তঃসলিলা এই ভয়টিই হল ধর্মব্যবসায়ীদের মূলধন আর সেই ভয়কে নিয়ন্ত্রণের দ্বারা অর্জিত ক্ষমতাটিই হল আসল সুদ! তাই ইতিহাসের পৃষ্ঠায় তাকালে পরে দেখা যায় – শাসকের রাজসভায় বরাবর রাজনীতি ও ধর্ম পাশাপাশি আসন গ্রহণ করেছে এবং একে অপরের পরিপূরক হিসাবে নিজেদের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রেখেছে। বলা বাহুল্য, সমকালেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি! তাই বিজ্ঞান এবং ঈশ্বরভাবনাকে একসাথে জারণ করতে হলে আধুনিক বিজ্ঞানের গতিপথ আলোচনার পাশাপাশি সমসাময়িক রাজনীতি তথা ধর্মপুষ্ট জীবনচর্যাতেও আলোকপাত জরুরি।

দেশ এবং রাষ্ট্রের মধ্যে যে তফাত, তা অনেকের কাছেই হয়তো আজকের দিনেও স্পষ্ট নয়। দেশ মানচিত্রের উপর শুধুমাত্র এক খন্ড ভূগোল নয়, দেশ আসলে সেই ভৌগলিক খণ্ডে অবস্থিত মানুষ, তাদের লোকাচার, লোকসংস্কৃতি, আবেগ-ভাবনার সাথে সম্পৃক্ত। বিপরীতে রাষ্ট্র আসলে এক যন্ত্রব্যবস্থা, যা নিয়ন্ত্রণ করতে চায় সেই দেশের নাগরিকদের, সেই দেশের সকল সম্পদকে, পরিকাঠামোকে এবং তার মাধ্যমে নিজের সার্বিক অস্তিত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি বিস্তার ঘটাতে চায় নিজের সীমানার। প্রাচীন সভ্যতাগুলির দিকে তাকালে দেখা যাবে – সেখানে যেমন বৃহৎ রাষ্ট্রের সন্ধান পাওয়া যায়, তেমনই ক্ষুদ্র নগরকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থারও হদিশ মেলে। যেহেতু আধুনিক বিজ্ঞানের সূচনা গ্রীক সভ্যতার হাত ধরে হয়েছিল, তাই আমাদের আলোচনা আপাতত সেই সভ্যতাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। খ্রীষ্টপূর্ব পাঁচশো বছর আগে ভৌগোলিক কারণে গ্রীক সভ্যতায় নগরকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার আধিক্য দেখা যায়। এই ধরণের রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল সংক্ষিপ্ত – জনসংখ্যা এবং আয়তন, উভয় মাপদন্ডেই। খ্রীষ্টপূর্ব পঞ্চম এবং চতুর্থ শতাব্দী নাগাদ গ্রীক সভ্যতার উঠোনে উত্থান ঘটে এথেন্স নামক নগরকেন্দ্রিক রাষ্ট্রের। তখনও পর্যন্ত বিজ্ঞান এবং দর্শন একে অপরের হরিহর আত্মা। কিন্তু এবার সময় এসেছে – দু’জনার দুটি পথ দুটি দিকে বাঁক নেওয়ার…যে ধারার সূচনা করে গিয়েছিলেন পিথাগোরাস, বিজ্ঞান এবং অতীন্দ্রিয়বাদ – দুটি আলাদা শাখার দিকনির্দেশ করে, তারই পুনরাবৃত্তি তথা পরিমার্জন চোখে পড়ে – বস্তুবাদ থেকে দর্শনের ভাববাদী বিবর্তনের প্রক্রিয়ায়। আর এই বিবর্তনের প্রক্রিয়া পরিণতি পায় এথেন্স নগরে…

আগেই বলেছি, নগরকেন্দ্রিক রাষ্ট্রগুলির বৈশিষ্ট্য ছিল তার সংক্ষিপ্ততা যা রাষ্ট্রশাসনের ক্ষেত্রে কিছুটা অনুকূল পরিস্থিতির রচনা করে। তারই সর্বোত্তম প্রতিফলন দেখা যায় এথেন্সে, যেখানে সভ্য শাসনব্যবস্থার ইতিহাসে সর্বপ্রথম গণতন্ত্রের আবির্ভাব ঘটে। এথেন্সের নাগরিক সংখ্যা ছিল সীমিত, তাদের নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ট। গণতান্ত্রিক পরিবেশ রচনার ক্ষেত্রে যা অনুঘটকের কাজ করে। তবে চাঁদ থাকলে চাঁদের কলঙ্কও থাকবে – গণতন্ত্র থাকা সত্ত্বেও এথেন্সে দাসপ্রথা ছিল এবং বলাই বাহুল্য, শাসনব্যবস্থায় তাদের কোনো গণতান্ত্রিক অধিকার ছিল না। সমাজেও যথেষ্ট শ্রেণিভেদ ছিল – অভিজাত, ব্যবসায়ী, কৃষক এবং দরিদ্র। গণতন্ত্রবাদীরা চাইতো শাসনব্যবস্থায় সাধারণ নাগরিকদের আধিক্য। অপরদিকে, অভিজাত শ্রেণি স্বাভাবিকভাবেই শাসনব্যবস্থায় নিজেদের প্রতিপত্তি বজায় রাখার জন্য অন্যান্য শ্রেণির অংশগ্রহণ সীমিত রাখার চেষ্টা করত। ফলত গণতন্ত্র এবং অভিজাততন্ত্রের মধ্যে চাপা দ্বন্দ্বও সেখানে ছিল। সেই বিরোধের পালে হাওয়া লাগে যখন গ্রীকসভ্যতার অপর প্রধান নগররাষ্ট্র স্পার্টার সাথে এথেন্সের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হয় খ্রীষ্টপূর্ব ৪২৯ সালে, যা ইতিহাসে ‘পেলোপনেসিয় যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। প্রায় ত্রিশ বছর ধরে চলা এই যুদ্ধের ফলাফল এথেন্সের ক্ষেত্রে ছিল মারাত্মক। স্পার্টার শাসনব্যবস্থা ছিল সামরিকপন্থী। এথেন্সের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা স্পার্টার সামরিক অভিঘাত সামলাতে ব্যর্থ হয়, তার প্রভাব পড়ে নাগরিকদের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক জীবনে। এই সু্যোগেরই অপেক্ষায় ছিল অভিজাতরা। তারা এই ব্যর্থতার সমস্ত দায় চাপায় গণতন্ত্রীদের উপর। শুরু হয় ক্ষমতাদখলের চিরন্তন ঘাত-প্রতিঘাত; শেষ অবধি খ্রীষ্টপূর্ব ৪১১ সালে ক্ষমতা দখল করে অভিজাতরা, যা ইতিহাসে ‘৪০০ নেতার শাসন’ নামে পরিচিত। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আবার ক্ষমতার দখল নেয় গণতন্ত্রীরা। আবার পালা বদল ঘটে খ্রীষ্টপূর্ব ৪০৪ সালে – স্পার্টার হাতে চরমভাবে পর্যদুস্ত হয় এথেন্স, আর সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে দেরি করে না অভিজাতরা, ক্ষমতায় আসে ‘ত্রিশ স্বৈরাচারী’ নামে পরিচিত স্বৈরতান্ত্রিক শাসকদল। ততদিনে এথেন্সের অর্থনৈতিক দুরাবস্থা চরমে, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যা স্বাভাবিক। ধনী এবং সাধারণ নাগরিকদের অর্থনৈতিক ব্যবধান তুঙ্গে, দাসপ্রথার শিকড় আরো গেড়ে বসেছে। এর মধ্যে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন যে বেশিকাল চলতে পারে না, তা বলাই বাহুল্য। আবার এক বছরের মধ্যে ফিরে এল গণতন্ত্রীরা।

এরকমই এক দ্বন্দ্ববিক্ষুব্ধ রাজনৈতিক সময়ে এথেন্সের মাটিতে আবির্ভাব ঘটল, প্লেটো যাকে নিজের গুরু বলে মানতেন – সক্রেটিসের (জন্ম – খ্রীষ্টপূর্ব ৪৬৯ সালে) । নিতান্তই এক ভাস্করশিল্পীর সন্তান সক্রেটিস যদিও পেলোপনেশীয় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তাকে ভাবিয়ে তুলেছিল সেই যুদ্ধের নাগরিক জীবনে প্রভাব, শাসনতন্ত্রের আদর্শহীন কঙ্কালসার চেহারা, নাগরিকসমাজের অবক্ষয়, যুক্তিবোধের অভাব, শিক্ষার দৈন্যতা। গভীর চিন্তাশক্তি, বাগ্মীতা, যুক্তিবিস্তারের ক্ষমতা ছিল তার সহজাত। স্বভাবতই কায়েমি শাসনব্যবস্থার (ঘটনাচক্রে তার জীবনকালের অধিকাংশ সময়েই যা ছিল গণতান্ত্রিক) বিভিন্ন অনৈতিক কার্যকলাপের বিরূদ্ধে তিনি আজীবন আপোষ করেননি। বস্তুবাদী দর্শন তার হাত ধরেই ভাববাদী দর্শনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। প্রতিটি শব্দের অর্থ, তার ব্যবহার অর্থাৎ ‘লজিক’ যে বস্তু সাপেক্ষে অধিকতর গুরুত্বশীল – তা সক্রেটিসের মাধ্যমে সকলের গোচরে আসে। বস্তুত তিনিই ‘ফিলোসফার’ অর্থাৎ জ্ঞানপ্রেমিক শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন। এবং জ্ঞানের প্রেমসাগরে ভাসতে ভাসতে সক্রেটিস অচিরেই উপলব্ধি করেন – ‘একমাত্র প্রকৃত জ্ঞান হল তুমি কিছুই জানো না, তা জানা’! আহা, এই না হলে দার্শনিক…

হাটে-বাজারে, নগরকেন্দ্রে বা সভাসমিতিতে সক্রেটিস উপস্থিত হতেন যুক্তির উপস্থাপক হিসাবে। মানুষের জীবনে প্রতিটি করণীয় এবং অকরণীয় সম্পর্কে তার অভিমত তুলে ধরতেন সকলের সামনে। কিন্তু সেই অভিমত প্রকাশের উপায়টি ছিল অন্যন্য – সংলাপ, প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে তিনি অপরপক্ষকে নিজ অভিমতের অভিসারী করে তুলতে পছন্দ করতেন। কোনো কেউকেটা নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করছে, বা কোনো এক সাধারন নাগরিক নিজের অজ্ঞতা বা অন্য যেকোনো কারণেই হোক, কোনো বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করছে, তাকে সরাসরি আঘাত না করে, ক্রমাগত প্রতিপ্রশ্ন, যুক্তি বিস্তারের মাধ্যমে সক্রেটিস তাকে শেষ অবধি উপনীত করাতেন অভীষ্ট সত্যে। যেহেতু সংলাপের মাধ্যমে সত্য উদঘাটনের এই পথে শ্রোতা নিজে অংশগ্রহণ করত, তাই সেই সত্যে পৌঁছে তার মনে হত না – এ সত্য বা অভিমত তার উপরে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে; বরং সেই সত্য বা জ্ঞানের প্রতি তার নিজস্ব অধিকারবোধ জন্মাত। সক্রেটিস মনে করতেন জ্ঞান বাইরে থেকে দান যোগ্য নয়, যতক্ষণ না মানুষের মধ্যে ভালোত্ব, সততা, মূল্যবোধ জেগে উঠছে, ততক্ষণ আত্মাকে জ্ঞান অভিমুখি করে তোলা যায় না। একজন প্রকৃত শিক্ষকের কাজই হল শিক্ষার্থীকে সঠিক পথে চালিত করা যাতে তার মধ্যে সেই জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হয়। আর সেই সঠিক পথ হল সংলাপ বা ‘ডায়ালগ’ যেখানে শিক্ষার্থী সত্য উন্মোচনের প্রতিটি স্তর প্রত্যক্ষ্য এবং উপলব্ধি করে। একমাত্র তখনই তা বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো অলীক সত্য বা পরের মুখের ঝোল টানা পরোক্ষ সত্য হয়ে ওঠে না…সে সত্য হয় অর্জিত সত্য! এবং সে সত্যে পৌঁছানোর একমাত্র রাস্তাই হল জ্ঞান, তাই তিনি এথেন্সবাসীদের শিখিয়েছিলেন – ‘জ্ঞানেই ধর্ম, জ্ঞানেই মুক্তি’।

স্পষ্টবক্তা সক্রেটিস স্বভাবতই রাষ্ট্রিক শাসনযন্ত্রের প্রিয়পাত্র কোনোকালেই হয়ে উঠতে পারেননি। যে মানুষ জনসাধারণকে জ্ঞানের পথে চালিত করে, রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে সেই যে সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে উঠবে – তাতে আর আশ্চর্য কী! উদয়ন পন্ডিতদের শাসক কোনোকালেই ভালো চোখে দেখেনি। আগেই বলেছি, গণতন্ত্রের সমর্থক তিনি ছিলেন না। অপরদিকে তরুণ সম্প্রদায় ছিল তার গুণমুগ্ধ, যাদের অন্যতম প্লেটো নিজে। সেইসব তরুণদের মধ্যে অভিজাতরাও ছিল। ঘটনাচক্রে, পরবর্তীতে তাদের মধ্যে অন্তত দুজন ‘ত্রিশ স্বৈরাচারী’ শাসকদলের অংশ ছিল। এখন, যেকোনো শাসকদলই চায় – নিজেদের অনৈতিক কার্যকলাপে কোনো না কোনো ভাবে বুদ্ধিজীবি মানুষদের সামিল করতে, যেমন আমরা সমকালীন রাজনীতিতে আকছার দেখতে অভ্যস্ত। সক্রেটিস ছিলেন সমগ্র এথেন্সের সবচেয়ে ন্যায়পরায়ণ, জ্ঞানী ব্যক্তি। তাই নিজেদের অপকর্মে সামিল করার উদ্দেশ্যে ‘ত্রিশ স্বৈরাচারী’ শাসকদল সক্রেটিসের উদ্দেশে ফরমান জারি করে – গণতন্ত্রপন্থী সহনাগরিকদের কাঠগড়ায় তুলতে। স্বভাবতই সেই ফরমান মানতে অস্বীকার করেন তিনি। যেমনটা আগেই বলেছি, কিছুদিনের মধ্যেই উৎখাত হয় ‘ত্রিশ স্বৈরাচারী’, ক্ষমতায় ফিরে আসে গণতন্ত্রীরা। এবং ফিরে এসেই তারা সক্রেটিসের মুক্তচিন্তা, যুক্তিবোধ, নীতিপরায়ণতা এবং সর্বোপরি তরুণদের আকৃষ্ট করার ক্ষমতাকে চিরতরে সরিয়ে দিতে উদ্যোগী হয়।

সক্রেটিসের বিরূদ্ধে অভিযোগ আনা হয় – তিনি এথেন্সের তরুণদের অনৈতিক পথে চালিত করেছেন এবং ধর্মদ্রোহিতা করেছেন! আহা, কী নিদারুণ অভিযোগ, এক্কেবারে রাষ্ট্রীয় শাসনযন্ত্রের উপযুক্তই বটে! সক্রেটিস স্বভাবতই এই অভিযোগদ্বয় অস্বীকার এবং বিরোধিতা করেন। কিন্তু মনে রাখবেন – রাষ্ট্রীয় শাসনযন্ত্র, সে গণতান্ত্রিক, ধনতান্ত্রিক, সামন্ততান্ত্রিক, আমলাতান্ত্রিক, রাজতান্ত্রিক বা অন্য যেকোনো তান্ত্রিকই হোক না কেন, যদি কোনো ব্যক্তি বা অন্যকোনো বিষয়কে সে তার স্বার্থের পরিপন্থী মনে করে, তাহলে যেকোনো মূল্যে সেই পথের কাঁটাকে সরাতে পিছপা হয় না। সক্রেটিসের ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি। সম্পূর্ণ ভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত, পূর্বপরিকল্পিত এবং পূর্বনির্ধারিত বিচারে সক্রেটিসকে সোপর্দ করা হয়। ধর্মদ্রোহিতার জন্য অন্যতম অভিযোগকারী সহনাগরিক মেলেটাসের প্রস্তাবে সক্রেটিসের প্রাণদন্ড ধার্য হয়! হয়তো সক্রেটিস চাইলে কিছুটা লঘুদন্ড পেলেও পেতে পারতেন, কিন্তু স্থিরপ্রজ্ঞ সক্রেটিস সেই অনুকম্পা ভিক্ষা করতে চাননি…আর চাননি বলেই ইতিহাস তাকে মনে রেখেছে – দর্শনের প্রথম এবং সবচেয়ে বিখ্যাত শহিদ হিসাবে।

খ্রীষ্টপূর্ব ৩৯৯ সালে অন্ধকার কুঠুরিতে বসে সক্রেটিস যখন হেমলকের গেলাসে চুমুক দিচ্ছিলেন, হয়তো তিনি আশা করেছিলেন – একদিন ভাবীকাল বুঝবে রাজনীতি আর ধর্ম আসলে একে অপরের সম্পূরক। যে সত্যের পথে অবিচল থেকে পরবর্তী প্রজন্মকে তিনি জ্ঞানের আলোয় আনতে চেয়েছিলেন, সেই আলোকেই যতটা সম্ভব সুদৃশ্য অথচ দুর্ভেদ্য পর্দার আড়ালে ঢেকে রাখতে এই দুই শক্তি কোনো কসুর বাকি রাখবে না, তা যদি সেদিনের নীলকণ্ঠ জানতে পারতেন…!

নতুন বছর সবার ভালো কাটুক, জ্ঞানের আলোয় সকল খারাপ নিপাত যাক, সকল অশুভের বিনাশ হোক… সবাই ভালো থাকবেন, নববর্ষের শুভেচ্ছাসহ, অলমিতি।।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জানুয়ারি ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]