ভূমিকা

লেখিকা
লেখিকা (১৮৬২-১৮৯৪) ভারতীয় মহিলা হিসেবে প্রথম ইংরেজি উপন্যাস রচয়িত্রী। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘সগুনা’ এবং এই উপন্যাস (১৮৯৪) ইংল্যাণ্ডের পাঠক মহলে সাড়া ফেলেছিল। ‘সগুনা’ ছিল আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। ইংল্যাণ্ডের রানি তাঁর উপন্যাস সম্পর্কে উচ্ছসিত প্রশংসা করেছিলেন। সাত্থিয়ানাধান বাংলার কবি তরু দত্তের সমসাময়িক ছিলেন। তরু দত্ত জীবিত কালে তাঁর রচনা গ্রন্থিত হিসেবে দেখে যেতে পারেননি। সেই দিক থকে সাত্থিয়ানাধান ভাগ্যবতী। কিন্তু তিনিও বেশি দিন বাঁচেননি। জন্মসূত্রে তিনি ছিলেন মারাঠি। তাঁর স্বামী স্যামুয়েল সাত্থিয়ানাধান একজন খৃষ্টান মিশনারী, লেখক এবং সমাজ সংস্কারক ছিলেন।

উপন্যাস
সমাজ থেকে দূরে বনে বসবাসকারী এক তপস্বীর ঘরে কমলার জন্ম হয়। এই জন্য, সে তদানীন্তন ঐতিহ্যগত এবং রক্ষণশীল সমাজ অন্তর্গত সাধারণ মেয়ের জীবনের সঙ্গে অভ্যস্ত ছিল। সে এক ধরনের আদর্শ পরিবেশে বাস করত — প্রকৃতির রাজ্য, এবং জীবন বেদনা ও দুঃখের বিষয়ে অজ্ঞাত একটি নিষ্পাপ শিশু হিসাবে বেড়ে ওঠে। তার বাবা, সন্ন্যাসী নারায়ণের কাছে এক বাক্স গহনা ছিল যা তিনি বিবাহের সময় তাকে যৌতুক হিসাবে দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি ভেবেছিলেন যে তাতে কমলা সত্যিকারের ভালবাসা এবং গৃহজীবনের বিশুদ্ধ আনন্দ থেকে বঞ্চিত হবে যা সম্পদের উপর নির্ভরশীল নয়। কমলা বুঝতে পারে যে এই সম্পদ প্রকৃতপক্ষে জাগতিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়, যখন পরবর্তী কালে সে তার স্বামীর আবাস ত্যাগ করে শ্বশুরবাড়িতে ফিরে আসে। তখন তাকে শ্বশুর-শাশুড়ি সম্মানের সাথে আচরণ করেন কারণ, তাঁর মৃত্যুর আগে তাঁর বাবা তার কাছে “তার মায়ের গহনার বাক্স” পাঠিয়েছিলেন। তবে, কমলা নতুন-আবিষ্কৃত গয়নাগুলির মধ্যে কোন সান্ত্বনা খুঁজে পায়নি। সে বোঝে সম্পদ নিছক বিনাশ করার উপায়। তার শ্বশুরবাড়ির খারাপ আচরণ, সাঁইয়ের সাথে তার স্বামীর বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্ক, কমলাকে ব্যভিচারী বলে স্বামীর সন্দেহ, এবং তারপরে তার পিতার মৃত্যু, অতঃপর স্বামীর এবং অবশেষে একমাত্র সন্তানের মৃত্যু, এসব সত্ত্বেও কমলা খণ্ড খণ্ড হয়ে যায়নি. সে বিচলিত হয় কিন্তু, ভেঙে পড়ে না।
তাকে আরও একটি পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। সন্ন্যাসী রামচন্দর, সন্ন্যাসী নারায়ণের একজন প্রাক্তন শিষ্য, যাকে কমলার মা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তিনি কমলাকে কনে হিসেবে পাবেন “অনন্ত প্রেম ও পূজার” প্রতিশ্রুতি নিয়ে। এক সময় রামচন্দর সমস্ত তপস্কার্য [কঠোর আধ্যাত্মিক অনুশীলন] এবং বনস্পতি [উদ্ভিদ] জগতের সঙ্গে তার পরিচিতি “মূল্যবান নয়” বলে মনে করেন। তিনি কমলাকে বলেন যে তিনি “একজন ভক্তের জীবনের সমস্ত অর্থহীন হাস্যকর পরিণতিতে ক্লান্ত”; এবং তাঁর সমস্ত “উপবাস এবং তপস্যা” তাঁকে ঈশ্বরের নিকটবর্তী কাউকে এনে দেয়নি — ভালো এবং মন্দের মহান উৎস — জগতের আলো। তাই তিনি কমলার কাছে এসেছেন তার রূপকে “অজ্ঞতার ভার”, “কুসংস্কার”এবং “প্রথা ও ঐতিহ্যের ধাক্কা”থেকে “মুক্ত”করতে। তিনি বলেন, “তুমি আমার সাথে মুক্ত হবে — যেমন মুক্ত পর্বতের বাতাস মুক্ত, তেমনি তোমার চারপাশে থাকবে প্রকৃতির খেলা ও সূর্যের আলো”। কমলার চেয়েও তাঁর প্রয়োজন বেশি যা তাঁর আন্তরিক মিনতি থেকে স্পষ্ট। কমলার প্রতি তাঁর তীব্র ভালবাসা উপন্যাসের নিম্নলিখিত অংশ থেকে অনুভব করা যায়:
আমরা আমাদের নিজস্ব একটি পৃথিবী তৈরি করব এবং কেউ আমাদের আনন্দকে বাধা দেওয়ার সাহস করবে না। আমার আয়ত্তে আমার কাছে এমন উপায় আছে যা সম্পর্কে তুমি কিছুই জানো না; এবং ভালবাসা তোমাকে নতুন পৃথিবীতে স্বাগত জানাবে, এমন ভালবাসা যা তুমি কখনও স্বপ্নেও দেখোনি; আমার অবিরাম ভালবাসা এবং পূজাকে, আমাকে এবং তোমার স্বাধীনতাকে গ্রহণ কর এবং আমার সাথে চলে এসো এবং কেউ এর কিছুই জানবে না।
রামচন্দরের জবাবে কমলার হৃদয় স্পন্দিত হয় কিন্তু সে ভুলে যেতে পারে না যে সে ব্রাহ্মণ বর্ণের একজন হিন্দু বিধবা। সে মনে করে যে সে “নারীদের মধ্যে অভিশপ্ত”। সে এখনও অন্ধকারে নিমজ্জিত; কিন্তু সে শীঘ্রই জয়লাভ করবে: “তাঁর ধর্ম, যেমন ছিল অশোধিত, তেমন তাঁর বিজয় হয়েছিল”। সে বুঝতে পারে যে রামচন্দরের প্রেমের স্বীকৃতি তার জীবনকে “অন্তহীন অনুশোচনা এবং দূঃখে” ভরে তুলবে। রামচন্দরের বিশাল অপ্রতিরোধ্য প্রভাব:
তাঁর ভালবাসা থেকে সে পরিত্রাণ পেতে পারেনি কারণ তা ইস্পাতের মতো সত্য ছিল কিন্তু তার পথে পড়ে থাকা সূর্যের আলোর মতো ছিল এবং তার জীবনকে উজ্জ্বল করেছিল। সে এটা জেনে খুশি হয়েছিল যে কেউ নিজস্ব ক্ষুদ্র জগতে ঘৃণিত এবং অধঃপতিত তার মত এক নারীকে ভালোবেসেছিল।
উনিশ শতকের ভারতীয় ইংরেজি উপন্যাসে উপস্থাপিত বেশিরভাগ হিন্দু বিধবা বা বিবাহ বহির্ভূত প্রেমে বিবাহিত নারী চরিত্রের মতো, কমলাও ভারতীয় সমাজের সময়োচিত মূল্যবোধের বিরুদ্ধে না গিয়ে ত্যাগের জীবন বেছে নায়। বঙ্কিমচন্দ্র চ্যাটার্জির ‘রাজমোহনের স্ত্রী’তে (১৮৬৪) মাতঙ্গিনী যদিও ঠিক একজন বিধবা নন, কিন্তু একজন বিবাহিত মহিলা। তাঁর স্বামীকে কারাগারে পাঠানোর পর মাধব ঘোষের সঙ্গে থাকেননি। তিনি ত্যাগের জীবন গ্রহণ করেন। বঙ্কিমচন্দ্রের বাংলা উপন্যাসও এর ব্যতিক্রম নয়। এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, একজন বৃহত্তর প্রথাবিরোধী মনোভাবের একজন লেখক, বিনোদিনীকে (চোখের বালি, ১৯০২) একটি আদর্শগত সুখী সমাপ্তির দিকে নিয়ে যাননি। বিনোদিনী, একজন বিধবা, যিনি মহেন্দ্র, একজন বিবাহিত পুরুষ এবং বিহারীর প্রতি তাঁর জ্বলন্ত প্রেমের মধ্যে ছিন্নভিন্ন, শেষ পর্যন্ত শেষোক্ত ব্যক্তিকে প্রেমিক হিসেবে খুঁজে পান। কিন্তু তাঁদের প্রেম বিবাহ বন্ধনে পরিপূর্ণ হয় না। তিনি পরের জন্মে তাঁর প্রেমিকের সাথে পুনর্মিলনের আশায় সান্ত্বনা খুঁজে পান এবং নির্জন জীবনে পালিয়ে যান। ক্ষেত্রপাল চক্রবর্তীর ‘সরলা’ (১৮৯৭) উপন্যাসে ইন্দুমতী একজন বিবাহিত ব্যক্তি হেম চন্দ্রকে ভালোবাসেন। তিনিও সন্ন্যাসীর জীবন যাপন করেন এই আশায় যে তিনি পরের জন্মে তাঁর ভালবাসা পাবেন। কে কে সিনহার ‘দ্য স্টার অফ সিক্রি’ (১৮৯৩) উপন্যাসে, নায়িকা অবিবাহিত কিন্তু তাঁর প্রেমিকা একজন বিবাহিত পুরুষ। তিনি একটি করুণ মৃত্যুতে মারা যান কিন্তু তাঁর সান্ত্বনা আবার পরের জন্মে মিলনের আশা্র মধ্যে নিহিত।
ক্রুপাবাই সাত্থিয়ানাধনের উপন্যাসে কমলার এমন কোনো আশা নেই। কমলা এবং রামচন্দর উভয়েই সমাজের জন্য উপযোগী জীবনযাপন করে: রামচন্দর বনস্পতি সম্পর্কে তাঁর জ্ঞানকে ভাল কাজে লালাল্ল্য; এবং কমলা তার গয়নাগুলো অভাবী ও দরিদ্রদের কল্যাণে লাগায়। সে এমন একজন সাধ্বী হয়ে ওঠে যার “অদেখা হাত এখনও দরিদ্রদের ত্রাণ দেয় এবং দুর্ভাগাদের রক্ষা করে”।
বিস্তারিত জানতে উপন্যাস পড়তে হবে। আশা করি মূল উপন্যাস এবং আমার অনুবাদ পাঠকদের কাছে সাদরে গৃহীত হবে।

পঙ্কজকুমার চট্টোপাধ্যায়।

অধ্যায় ১

ভারত এক নিখুঁত স্বর্গ না হতে পারে। কিন্তু সেই দেশে আছে অতীব সৌন্দর্যপূর্ণ এবং মহিমান্বিত কিছু স্থান। দাক্ষিণাত্যের নাসিক জেলার পাহাড়ি অঞ্চল, যেখান থেকে গোদাবরী নদীর উৎপত্তি, তেমনি একটি স্থান। এখানে প্রকৃতি অপূর্ব মহিমায় প্রজ্বলিত। পাহাড়ের পিছনে পাহাড় উঠেছে। পাহাড় কোথাও সবুজে মোড়া, আবার কোথাও নগ্ন এবং বন্ধ্যা। পাদদেশে রয়েছে ছোটবড় নানান গুহা, যাদের মধ্য দিয়ে বর্ষাকালে দুরন্ত বেগে স্রোতস্বিনীর জলধারা নেমে আসে। গরিমান্বিত পশ্চিমঘাটের এই পর্বত-শৃঙ্খলের অদূরে অবস্থিত এক পবিত্র শহর, যার নাম শিবগঙ্গা।
এখন সন্ধ্যা। পড়ন্ত সূর্যের আলোয় প্রজ্বলিত মেঘরাশি বিশাল মুক্তাঞ্চল আবরিত করে ছেয়ে আছে। মাইলের পর মাইল সে অঞ্চল শুষ্ক মরুভূমির মতো। একদিকে রয়েছে প্রাচীন, খর্বাকৃতি, বাত্যাতাড়িত বৃক্ষরাজি এবং পাথুরে পর্বত। অপরদিকে যতদূর চোখ যায় দেখা যাচ্ছে শিবগঙ্গা শহর। সেই শহরের বুকে গম্বুজ, ঝলমলে জলাশয় এবং জীর্ণ বাড়িগুলির ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। সবকিছুই এখন সন্ধ্যারাগে রঞ্জিত। অদূরে, ছোট্ট টিলার উপর কিছু গাছ দেখা যাচ্ছে, যাদের শাখা প্রস্থানপর আলোর বলয় আঁকড়ে রেখেছে। সবকিছুর ভিতর দিয়ে সন্ধারাগের আভাস চোখে পড়ছে। গাছের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত আলোয় একটি ছোট্ট মেয়ের অবয়ব ফুটে উঠেছে। সে বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের মেয়ে কমলা। টিলার চূড়ায় অবস্থিত ধ্বংসপ্রায় মন্দিরের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। মুখের নিচে তার দুটি হাত। চোখে এক অবসন্ন অভিব্যক্তি। মনে হচ্ছে সে নিচের নীল সমতলভূমির দিকে তাকিয়ে আছে। অবশেষে এক দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল, অস্ফূটে সে বলে উঠল:–“বাবাকে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না। কখন সে ফিরবে কে জানে?” বিরাট প্রাচীন বিগ্রহ তার দিকে তাকিয়ে আছে আর মাথার উপরে গাছের শোকার্ত মর্মরধ্বনি শোনা যাচ্ছে। বেচারা মেয়ে! কীভাবে সে ব্যক্ত করে তার ভাবনার কথা! তার ঠাকুমা, এক বৃদ্ধা মহিলা, একটু খিটখিটে ধরনের মানুষ। তার ক্রোধ এবং পূজারিদের কোলাহল থেকে বাঁচানর মত বাবা এখন এখানে নেই। মন্দিরের নিকটে বাস করা পূজারিদের মধ্যে মন্দিরের সংগৃহীত অর্থ নিয়ে বচসা বেঁধেই থাকে। বাবা কোন পথ দিয়ে আসবে, সে জানে। বাবার সঙ্গে সে প্রায়ই শহরে যায় সবজি এবং দানাশস্য কিনতে। সন্ধ্যায় যখন তারা ফেরে তখন ধানক্ষেত এবং তার মাঝে বিক্ষিপ্ত জলরাশির উপর পড়ন্ত সূর্যের আলো ঝিলমিল করে ওঠে। সেই সময় সে দূরে তার গ্রামের টিলাটিকে চিনতে পারে—আকাশের গায়ে তার কালো ছায়া দেখে। মেয়েটি বাবার গলা জড়িয়ে পিঠের উপর বসে থাকে। সে ভাবতে থাকে ধেয়ে আসা সন্ধ্যার মাঝে গাছের উপর আলো তখনও ঝিলমিল করছে কি না, তার বন্ধু এবং খেলার সঙ্গী বাতাস এখনও আছে কি না। এও ভাবতে থাকে খিটিখিটে অথচ বিচক্ষণ বৃদ্ধা কী করছেন। স্বাগত জানানো আলো তার দেহে এক সুখের শিহরণ বইয়ে দেয়। সে ভাবে তার বন্ধু কথা রেখেছে এবং তার জন্য অপেক্ষা করে আছে কি না। সে আনন্দে হাততালি দিতে থাকে এবং বাবার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়ে। আহা! পরবর্তী বছরগুলিতে তার স্মৃতিপটে এসব কি লেখা থাকবে! মেয়েটিকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। সে দেখতে পেল, দূরে ধানক্ষেতের মধ্য দিয়ে একটি শরীর এগিয়ে আসছে। বাবা কাছে আসতেই সে আনন্দের সঙ্গে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। বাবা মেয়েকে তুলে নিলেন এবং তাকে কাঁধের উপর বসালেন। ভালোবাসার অনুভূতিতে কমলা বাবার গলা দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল এবং কম্পিত গলায় বলল:–“তিন দিন, বাবা, তিন দিন ধরে আমি অপেক্ষা করছি আর তোমার দেখা পাচ্ছি না। দিনের আলো নিভে যায় এবং বিগ্রহ আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। একাকি পেঁচার ডাক শুনি।”
“চুপ, বাছা! বাড়ি এসে গেছি।”
বাড়ি একটি ছোট্ট কুঁড়ে ঘর। গাছের ছায়ায় ঘেরা বারান্দা নিপাট গোবর জলে লেপা। আঙ্গিণার সামনে এক বেদির উপর তুলসী গাছ। এক ধারে একটি কুয়ো, যার চারপাশে চকচকে জলের পাত্র রাখা আছে।
বাবা আর মেয়ে ঘর ঢুকতেই বৃদ্ধা গর্জন করে উঠলেন:–“আমি দেখি মেয়ে কী করে! ছোট্ট দুষ্টু মেয়ে। তুমি জানতে বাবা আসছেন?”
বাবা স্মিত হাসলেন। মেয়ে বাবার কাঁধের পিছনে অর্ধেক মুখ লুকিয়ে ঠাকুমার দিকে তাকাল। বাবা স্নেহের সঙ্গে বললেন:–“ও কি খারাপ মেয়ে?”
উত্তর এল:–“যথেষ্ট খারাপ। সবই তোমার আস্কারায়। ছেলের থেকেও বেশি আদর কেন সে পাবে?” এই বলে বৃদ্ধা খাবার আনতে ঘরের ভিতরে গেলেন। এই অবসরে বাবা কুয়োতে হাত-পা ধুয়ে নিলেন। মুখে এক অদ্ভূত আশাভরা অভিব্যক্তিতে মেয়ে বাবার জন্য অপেক্ষা করতে থাকল। তখন কলাপাতা বিছান হল, তার উপর ঠাকুমা পরিবেশন করলেন খাবার। বাবা আর মেয়ে সাধারণ খাদ্য ডাল-ভাত উপভোগ করে খেল।
যে টিলার- যাকে ঢিবি বলা ভালো—উপর ব্রাহ্মণের বাড়ি অবস্থিত তা তীর্থযাত্রীদের কাছে বিখ্যাত এই পর্বতমালার অংশ। এখানে প্রায় প্রতিটি টিলার উপরে কোন না কোন মন্দির আছে। চারিদিকে দৃশ্যাবলী সুন্দর অথচ ঘরোয়া। কিন্তু আমাদের এই টিলাটি একটু অদ্ভূত এবং নির্জন। এই বিশিষ্ট শ্রেণীর মানুষদের নিজস্ব এই মন্দিরটি প্রায় ধ্বংসের মুখে। গাছগুলো খর্বকায়, বাড়িগুলি মন্দিরের ধ্বংসের উপর গড়ে ওঠা কুটিরগুলি থেকে সামান্য ভালো। পার্বত্য ঝরণাদ্বারা পুষ্ট স্বচ্ছ জলাশয়টির পাড় উপচে পড়ে উপত্যকার নিচের দিকে বয়ে যায়। পড়ন্ত জলধারা এক গীতিময় ছন্দের সৃষ্টি করে। তীব্র দমকা হাওয়া মন্দিরের গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে খোলা উপত্যকার উপর সশব্দে আছড়ে পড়ে। গাছের ডালপালায় এক বিভ্রান্তিকর মর্মরধ্বনি রণিত হয়ে পাহাড়ের গাত্র পেরিয়ে জলাশয়ের উপর দিয়ে এগোতে এগোতে এক বিষাদের সুর বয়ে আনে। বাতাসের আর নির্ঝরের যৌথ ঐকতান মনে শিহরণ জাগায়। পাহাড়ের গুহার মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছোটবড় পাথরগুলি দেখে বোঝা যায় একদিন এখান দিয়ে স্রোতস্বিনী বয়ে যেত, যা এখন শুকিয়ে গেছে। গুহার কাছেই মেয়েটির কুটির। নিম গাছটির কাছাকাছি অন্য কুটিরগুলোও গড়ে উঠেছে। এখানেই বাতাসের শিস ধ্বনি সবচেয়ে জোরাল। ফলে দিনে বা রাত্রে কেউ নিজেকে একাকি মনে করে না। শহরের দিক থেকে একটি রাস্তা মূল পাহাড়ের উপর উঠে এসেছে, সেই পবিত্র পাহাড়েই জটলা করে আছে চকচকে গম্বুজ, গলিপথ এবং থামওয়ালা দালান সহ সব মন্দিরগুলি। দূর রাস্তা থেকে টমটম, ঘন্টা এবং গীতবাদ্যের শব্দ শোনা যায়।
ছোট্ট মেয়ে কমলা একমাত্র কন্যা। সে বাবার খুব আদরের পাত্র। খুব ছোট বেলায় সে মাকে হারিয়েছে, মায়ের স্মৃতি তার কাছে খুবই আবছা। স্বপ্নে মাঝে মধ্যে সে এক আয়ত চোখের দীর্ঘাঙ্গী মহিলাকে দেখতে পায়। তার মনে পড়ে যায় পুরনো অস্পষ্ট কিছু স্মৃতি, যখন মা তাকে মিষ্টস্বরে ডাকত, গায়ে কোমল হাত বুলিয়ে আদর করে দিত। সে তো আজ অনেকদিনের কথা, তাই তার মনের পর্দায় শুধু মায়ের এক জোড়া আয়ত চোখই আঁকা আছে। সেই চোখের মিষ্টি নরম আলো স্বপ্নে তার চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। তখনই সে একজনের উপস্থিতি অনুভব করে। সেই আশীর্বাদপুষ্ট বিভ্রমের আবহে সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে যায়।
কমলার আগের জীবন বেশ ঘটনাবহুল ছিল। কাছের মন্দির থেকে ভেসে আসা শব্দে রোজ ভোরে তার ঘুম ভাঙত। সেই শব্দে ছিল মন্দিরের ঘন্টাধ্বনি, ব্রাহ্মণদের দীর্ঘ প্রার্থনা সঙ্গীত। মাঝে মাঝে পুজারির উচ্চারিত মন্ত্র এবং কিছু টুকিটাকি নির্দেশ। এই আবহে নিচের শহরে ঘুম ভাঙত, ধীরে ধীরে জেগে ওঠা জীবনের কলতান মেয়েটির কানে ভেসে আসত। পাখিদের কুজন মেয়েটির কাছে খুব প্রিয় ছিল, তবে সবচেয়ে প্রিয় ছিল ব্রাহ্মণদের পূজা সঙ্গীত। তার আত্মা ভক্তিতে ভরে উঠত। এইভাবে ঘুম থেকে জেগে উঠে সে ব্যস্ত হয়ে পড়ত একান্ত নিজস্ব পূজায়। জীবনের সবচেয়ে বেশি সুখের যা কিছু ছিল মেয়েটির হৃদয়ে। শূদ্র মেয়েদের সে সবচেয়ে ভালোবাসত, যারা সকালে গোরু ও ছাগল চড়াতে বেরোত তার কুটিরের চারপাশে। তার ঘরকরনার অনেক কাজ সেই মেয়েগুলো করে দিত। তার সঙ্গে সঙ্গে কুসংস্কারের বিষয়েও সে তাদের কাছে জানতে পারত। আর শুনত আশপাশের গ্রামের নানা বিচিত্র কাহিনির অতিরঞ্জিত বিবরণ। কিন্তু তার মন জুড়ে সর্বদা থাকত তার বাবা। ঠিক মনে ক’রে সে বাবার তামার পাত্রে জল ভরে রাখত, খাবার জন্য কলাপাতা ধুয়ে প্রস্তুত রাখত, তুলসী গাছে জল দিত। এছাড়া বৃদ্ধা ঠাকুমার নির্দেশ মেনে ঘরের অন্যান্য কাজও করত। ঠাকুমাকে সে ডাকত ‘ঠাম্মা’। দিনের বেশিরভাগ সময় কাটত বাবাকে নিয়ে। বাবা গাছের ছায়াবৃত মন্দিরের বারান্দায় বসে থাকতেন। কাছে কাছে থেকে সে বাবার মুখে জ্ঞানের কথা শুনত—কারণ তার বাবা ছিলেন এক পণ্ডিত ব্যক্তি। এইভাবে বেড়ে ওঠা মেয়েটি অন্য মেয়েদের তুলনায় অনেক লাজুক, আত্মস্থ এবং নিরীহ ছিল।
মাঝে মাঝে শহরে বাবার সঙ্গে যাবার মাধ্যমে যে বিরামগুলি সে পেত সেগুলি ছাড়া একটি বিশেষ ঘটনা তার এই একঘেয়ে জীবনে এক বিরতি নিয়ে এসেছিল। সেটি হল নিকটস্থ মন্দিরের বিগ্রহের সম্মানে আয়োজিত এক উৎসব। উৎসবের দিন খুব সকালে একদল মেয়ে বর্ণাঢ্য পোশাকে সজ্জিত হয়ে বৃদ্ধা মহিলা এবং বিধবাদের সঙ্গে এই টিলার উপর উঠেছিল। এই উৎসব বায়ুর দেবী অঞ্জনির সম্মানে প্রতি দশ বছরে একবার অনুষ্ঠিত হয়। মন্দিরের চারদিক ঘিরে মণ্ডপ বাঁধা হয়েছিল। মন্দির থেকে শহর পর্যন্ত পথের উপর অস্থায়ী শামিয়ানা রাতে খাটান হয়েছিল। বিগ্রহের গরিমা প্রচার করে মন্দিরের সঙ্গীত বাজছিল। সঙ্গীত থামলেই শোনা যেন টমটমের আওয়াজ। সেই দিন অদ্ভূত ভাবে অন্যান্য দিনের থেকে তীব্র ভাবে বাতাস পাহাড়ের দিকে ধেয়ে আসছিল। সাধারণ দিনে যে টিলা নির্জন থাকে আজ সেখানে এক আনন্দের দৃশ্য রচিত হয়েছে, যেখান এসে মিশেছে আনন্দোল্লাসে মত্ত মানুষের ঢল।
স্থানীয় উৎসব বলে এর বিশাল গুরুত্ব ছিল না। কিন্তু নিচের শহরের মহিলারা ভক্তি সহকারে এই উৎসব পালন করত। বাতাস, বৃষ্টি এবং সূর্যরশ্মির এই দেবীর প্রতি অর্ঘ নিবেদন না করে তারা আগামী দশক শুরু করত না। ঝরণায় স্নান করে তারা মন্দিরের পরিষ্কার জলে চেম্বু (জলপাত্র) ভরে নিত। মেয়েরা ফুল, চাল, কুমকুম এবং অন্যান্য সামগ্রীর অর্ঘ নিয়ে আসত। সেই অর্ঘ নীরব ভক্তি সহকারে মঙ্গল কামনা করে তারা ফিরে যেত। ধর্মীয় ভিক্ষুক মারগোসা গাছের চারিদিকে শিঙা ফুকিয়ে বিচিত্রভাবে এবং নানা রঙ্গভঙ্গ করে নাচছিল। এর বিনিময়ে সে হাস্যরত দর্শকদের ছুঁড়ে দেওয়া তামার পয়সা পাচ্ছে। মন্দিরের কাছে বৈরাগী আর গোঁসাইরাই বেশি মাত্রায় উপস্থিত। প্রত্যেকে হাতে তামার থালা নিয়ে নানা বাদ্যযন্ত্রের আওয়াজে এক কোলাহলমুখর পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। মন্দিরের অন্ধকার গর্ভগৃহে, যেখানে বিগ্রহ অধিষ্ঠিত, সেখানে গম্ভীর এবং দুরধিগম্য পুজারি কপালে বিশাল চিহ্ন মেখে পূজা করছেন। পুরুষ এবং মহিলারা দেখা যাচ্ছে মন্দির দ্বারের নিকটে মাথা নত করে বা সাষ্টাঙ্গে প্রণিপাত করছে। অন্ধকার গর্ভগৃহে প্রদীপের আন্দোলিত আলোয় পরিবেশ গম্ভীর হয়ে আছে।
কী করতে হবে বুঝতে না পেরে কমলা তার কুটিরের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার একান্ত নিজস্ব এই মন্দিরে এত লোকের সমাবেশ সে আগে কখনও দেখেনি। অন্য অনেক জায়গায় সে উৎসব দেখেছে। কিন্তু তার মন্দিরের এই বিশেষ উৎসবে সে মনে করে তারও এক বিশেষ ভূমিকা পালন করার আছে—কারণ তার বাবা কি এখানকার সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি নন এবং তার বাবাকে কি সবাই সম্মান করে না? এই ভাবনা তার নিজের মধ্যে এক মর্যাদার ভাব এনে দিল এবং সে সবচেয়ে ভালো পোশাক পরিহিত হয়ে বের হল। সমবয়সি মেয়ের দলকে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে লজ্জা পেল। তার চারদিকে ঘিরে না দাঁড়ালে এবং প্রশ্ন না করতে শুরু করলে সে হয়ত নিজেকে লুকিয়ে ফেলত। তারা তার পোশাক এবং গয়না দেখছিল এবং তার অনুভূতির কোন তোয়াক্কা না করে মন্তব্য করে যাচ্ছিল। “তুমি কোথায় থাক?” “তুমি কোথা থেকে আসছ?”—এই সব প্রশ্ন চারদিক থেকে ধেয়ে এল। “তুমি নিশ্চয়ই সন্ন্যাসীর মেয়ে নও।” “তোমার বয়স কত?” “তোমার বিয়ে হয়নি?” “সারাজীবন তুমি কি এখানেই আছ?” কী অদ্ভূত পোশাক তুমি পরেছ?”
তার প্রতি এত মনোযোগে ছোট মেয়েটি স্তব্ধ এবং হতচকিত হয়ে গেল। জলভরা চোখে সে চারদিকে ঘুরতে লাগল, যখন অন্যদের থেকে পৃথক সমব্যথী একটি বড় মেয়ে তাকে সরিয়ে নিল। অন্য মেয়েদের সে বলল:–“তোরা ওকে ভয় পাওয়াচ্ছিস কেন?” তখন মেয়েদের মধ্যে একজন জিজ্ঞাসা করল:–“এটা কি সত্যি যে তুমি তোমার বাবার সঙ্গে শহরে বাস করতে আসছ?” “আমি জানি না। বাবা তো কখনও এমন বলেননি।”
“বাবা! সেই বৃদ্ধ লোকটি নিশ্চয়ই তোমার বাবা নন,”—দুষ্টুমিভরা চোখে বয়সে বড় একটি মেয়ে তাকে বলল। “হয়ত তিনি তোমাকে কোথাও পেয়েছেন।”
এই কথায় কমলার চোখ আবার জলে ভরে গেল এবং কম্পিত অথচ ক্ষুব্ধ স্বরে সে বলল:–“তিনি আমার বাবা এবং কেউ যেন না বলে যে তিনি আমার বাবা নন।”
“তোমার মা কোথায়?”
“মা! মা নেই, ঠাকুমা আছে।”
“হা! হা! হা!” মেয়েরা হেসে বলল। “তুমি বলতে চাও এই বৃদ্ধা তোমার ঠাকুমা? আমরা ভাবতে পারি না। আমরা তাকে ভালো চিনি: তিনি গণেশের ঠাকুমা।”
কমলা এই কথায় হতাশ বোধ করল। তাকে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত দেখাল—মেয়ের দল তখনও তার দিকে বিদ্রুপ ছুঁড়ে চলেছে। বড় মেয়েটি আর একবার কাছে টেনে নিয়ে তাকে উদ্ধার করল। সে বলল:–“কিছু মনে কোরো না, তুমি জান না। ওই বৃদ্ধা তোমার ঠাকুমা নন।”
“তাহলে তিনি আমার মায়ের ঠাকুমা,” ঘুরে কমলা উজ্জ্বলভাবে এবং দ্বিধার সঙ্গে তার দিকে তাকিয়ে বলল।
এতে উপহাসের ঝড় বয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে তা অবদমিত হল—কারণ বড় মেয়েটি তাদের দিকে খুব অসন্তোষের সঙ্গে তাকিয়ে তাদের থামিয়ে বলল:–“বোকার মতো হাসছ কেন? দেখতে পাচ্ছ না, মেয়েটি কিছু জানে না।” এই বলে সে মেয়েটির গলা জড়িয়ে ধরল এবং নরম স্বরে তাকে জিজ্ঞেস করল কোথা থেকে সে তার গলার চকমক করা মুক্তা পেয়েছে। সে এও জিজ্ঞেস করল:–“তুমি কি জান ওগুলো আসল?”
এই গলার হারটিই মেয়েটির একমাত্র গয়না। তার বাবা বেশি কিছু না ভেবেই তাকে পরার অনুমতি দিয়েছেন।
“মুক্তো!” সব মেয়েরা হার ধরে বলল:–“কী! এগুলো সত্যিই আসল?”
কিন্তু কমলা কাশী নামের বড় মেয়েটির গা ঘেঁষে দাঁড়াল এবং সরলভাবে বলল:–“এগুলো সর্বদা আমার গলায় থাকে। মনে হয় এগুলো নিয়েই আমি জন্মেছি।এগুলো নিয়েই আমি খেলা করি।” তারপর ঘিরে থাকা মেয়ের দল থেকে মুখ ঘুরিয়ে সে বিস্ময়ের সঙ্গে বলল:–“ওই দেখ বাবা আর মায়ের সঙ্গে ছেলেমেয়েরা।” সে হাসল, অন্য মেয়েরাও হাসল। তারা বড় মেয়েটির কাছে তাকে ছেড়ে দিল। বড় মেয়েটি কমলার কাছ থেকে কথা আদায় করল, সে যেন শহরে এসে তার সঙ্গে দেখা করে। “তোমার বাবাকে বলো, রামকৃষ্ণ পন্তের মেয়ে আমার বন্ধু, তাহলে তোমার বাবা তোমাকে আমার কাছে নিয়ে আসবেন। তিনি আমার বাবাকে চেনেন।” কমলা কাশীর চোখের দিকে এমন এক প্রশ্নালু এবং বিশ্বস্ত দৃষ্টিতে তাকাল যে কাশী কমলার বাহুতে হাত দিয়ে আদর না করে পারল না।

অধ্যায় ২

শহরে কাশীনাথ পন্তের বাড়ির পিছনে অবস্থিত এক কুয়োতে এক দল ছোট মেয়ে দেখা যাচ্ছে। কুয়োর চারপাশ বরাবর পাথুরে মেঝেতে তাদের পিতলের পাত্র রাখা আছে। আপাতভাবে তাদের মধ্যে উত্তেজনাকর আলোচনা চলছে এবং সেই উত্তেজনা তাদের অঙ্গভঙ্গিতে স্পষ্ট। তারুণ্যের আবেগের পূর্ণতায় তাদের কথাবার্তা থেকে মাঝে মাঝেই হাসির তরঙ্গ ভেসে আসছে। কাঁখে বড় পাত্র নিয়ে একটি বড় মেয়ে তাদের সঙ্গে যোগ দিল। সবাই তাকে স্বাগত জানিয়ে বলল, “ভাগীরথী, এসো, এসো। তুমি এলে আমরা সাতজন হলাম।”
“তারাদের মধ্যে কি সাত বোন আছে, রাজার সাত কন্যা? আর আমরা এখন সাতজন হলাম, “ আড় দৃষ্টিতে একটি মেয়ে বলল।
“দুর্ভাগ্যের সাত দৈত্য, বরং সাত রকমের প্লেগ,” আর একজন হেসে বলল। “ইন্দ্র কেন সংখ্যা সাতকে ভয় পেতেন? তাই তিনি আট করতে অর্জুনকে সৃষ্টি করেছেন।”
“বিজ্ঞের মতো কথা থাক। তুমি অর্জুন বা বরুণের কিছু জান না,” শাস্ত্রীয় মেয়ে বলল।
হারনি নামের মেয়েটি প্রতিবাদ করল, “আমি বলছি আমি এই বিষয়ে জানি। গতরাতে, আমাদের বাড়িতে পুরাণ পাঠ হচ্ছিল। সেখানে আমাদের মতোই জমায়েত ছিল। আচ্ছা, তোমরা কি সন্ন্যাসীর মেয়ে কমলাকে দেখেছ? রামকৃষ্ণ পন্তের মেয়ে কাশী তাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে এসেছিল।
বঙ্কিম ঠোঁটে গর্ব এবং অবজ্ঞার হাসি নিয়ে অন্য একটি মেয়ে বলল, “আমি দেখেছি কমলা দারুণ বন্ধু এবং কাশী সেখানে গিয়েছিল আর তাকে সঙ্গে নিয়ে।”
“কেন! গতকাল রাতে আমার মায়ের মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছিল,” এক কু-প্রকৃতির স্থূলকায় মেয়ে গুঙ্গী উপহাসের ছলে বলল, “যে ভাবে সে ছোট পাগলিকে আদর করছিল আর তার চুলে ফুল লাগাচ্ছিল তা দেখে সত্যিই গা-জ্বালা করে। সারা সন্ধ্যে সে আমাদের বলতে থাকল কমলা কত মিষ্টি, তার মা নেই, এরকম আর কত কিছু। মনে হয় সে নিজেই মায়ের ভূমিকা নেবে।”
“হা! হা! হা! বরং শাশুড়ি হবে,” অন্য মেয়েরা হাসল, “তোমার এক ভাই আছে না- কোথায় যেন পড়াশুনা করছে? এই আর কি।”
গুঙ্গী উত্তর দিল, “সে আমার ভাইয়ের জন্য। কেন, আমি তাকে একদিনও আমাদের বাড়িতে সহ্য করব না।, দেখতে ভালো! কী এমন ভালো দেখতে কমলা? গাধার মতো লাজুক, ভীত এবং বোকা, যেন সে মনুষ্য সমাজে পালিত হয়নি।”
“যার বাবা অর্ধেক সময় জঙ্গলে কাটায় তার কাছ থেকে কী আশা করতে পার?” ভাগীরথী বলল। “আমার মনে হয় না সে সেরকম। আমার বাবা বৃদ্ধ ভদ্রলোকের কথা খুব ভাবেন। বেচারা মানুষটি! অনেকে বলে উনি একদিন খুব ধনী ছিলেন, কিন্তু কি জানি সত্যি কি না।”
মাথা ঝাঁকিয়ে গুঙ্গী বলল, “আমি এসবের একটা কথাও বিশ্বাস করি না।” জলে ভর্তি হওয়া কলসী উপরে উঠিয়ে নিয়ে কাঁখে রাখল এবং বাড়ি ফিরে গেল। উগ্র মেজাজের এই বহিঃপ্রকাশে অন্য মেয়েরা হাসতে লাগল। তারাও নিজের নিজের জল ভর্তি কলসি তুলে নিয়ে এমন গম্ভীর ভাবে বাড়ির দিকে যাত্রা করল, যেন তাদের মধ্যে আগে দেখা হয়নি।

  • * * *

এখন সন্ধ্যা—পাহাড়ি এলাকায় এমন সন্ধ্যাগুলো বড় একঘেয়ে, যেখানে পাহাড়ের চূড়ায় পড়া আলো চলে যেতে চায় না, চারিদিক অন্ধকারে গ্রাস করলেও। মাথার উপরের আকাশের বুক চিড়ে তারারা ফুটে উঠতে থাকে। গাছপালার ভীড়ে কমলা বড় একা, সেই গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে সে পশ্চিম দিকে তাকায়। ঘন হয়ে আসা গোধূলির আলোয় বাদামী পাথর এবং নগ্ন পর্বত-গাত্র রহস্যজনক ভাবে আকারে বড় হতে থাকে। তার কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনে গাছের মর্মর ধ্বনি অশুভ প্রতীয়মান হয়। তার চারদিকের নির্জন দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে সে কাঁপতে থাকে। তার সরল মনে প্রত্যেক গাছে এক রহস্যময় অধিষ্ঠাতা আছে। সাধারণভাবে সাহসী হলেও এই বিষয়ে সে কিছুটা ভীরু, কারণ আগে কখনও সে বাড়ি থেকে এত দূরে থাকেনি।
সতর্কভাবে পাথরের উপর এবং কাটাঝোপের মধ্য দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে এবং সামনের বিস্তৃত উপত্যকার দিকে তাকিয়ে সে চিৎকার করে উঠল, “দাদা! দাদা!” এক মেষপালক বালক তাকে বলেছে তার বাবা তার দিকে আসছে। বাড়িতে তিনজন অতিথি এসেছেন। তাদের একজন, মহিলা, তাকে দ্রুত বাবাকে ডেকে আনতে বলেছেন। প্রত্যেক বিষয়ই আরও অদ্ভূত এবং নির্জন হয়ে উঠছে। ঠিক ফিরে আসার মুহূর্তে, নিচের অন্ধকারময় স্থান থেকে এক মানুষের অবয়ব এগিয়ে এল। তিনি টিলার এক তীক্ষ্ণ বাঁকের পাশ থেকে উঠে এলেন। সহসা কমলাকে দেখে, তাঁকে বিস্মিত মনে হল। এক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে তিনি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে পড়লেন, যেন তিনি কিছু ভুলে যাওয়া বিষয় মনে করার চেষ্টা করছেন। মেয়েটিও তাঁর দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে থাকল কখন তিনি কথা বলেন। কিন্তু যখন তিনি কিছু বললেন না, সে শুধু বলল, “আমি বাবাকে খুঁজতে এসেছি। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। আপনি কি তাকে কোথাও দেখেছেন?”
“তোমার বাবা? ছোট্ট মেয়ে তুমি কে? আমি অনেক দূর থকে গাছড়া সংগ্রহ করতে এসেছি। নিচে তো কাউকে দেখিনি। তবে ভয় পেও না। আমি তোমার বাবাকে চিনি না, বল তিনি কে?”
“আমার বাবা সন্ন্যাসী। আমরা দুজন এখানে থাকি।”
“বিলক্ষণ নারায়ণ সন্ন্যাসীকে চিনি। তিনি যেখানে থাকেন সেখানে আমাকে নিয়ে চল। আমি বলতে পারি তিনি সেখানে পৌঁছে গেছেন। ভয় পেও না, আমি তোমার বাবার বন্ধু।”
কমলা কিছু বলল না। মনে এক খটকা নিয়ে সে তার মুখের দিকে তাকাল। কিন্তু শক্তিশালী পুরুষালি সেই মুখে এমন এক বিশ্বস্ততার ছাপ ছিল এবং এমন এক আনন্দময় দৃষ্টিতে তিনি তাকিয়ে আছেন, যে তার মনে সাহসের সঞ্চার হল। সে শুধু বলল, “আসুন।” লোকটি কমল পিছন পিছন চললেন।
তারা যখন কুটিরে পৌঁছল, তখন কমলার বাব ইতিমধ্যে বাড়ি এসে গেছেন। সে বাবার কাছে ছুটে গিয়ে বলল—“একজন তোমার খোঁজ করছেন। তিনি বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি সেই বাজপড়া গাছের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলাম, তখন আমি তাকে বাইরে দেখতে পাই।”
“অতদূরে যাওয়া তোমার উচিত হয়নি। হ্যাঁ, আমি অতিথিদের দেখেছি। কিন্তু, এই নতুন ব্যক্তি কে? গিয়ে দেখি।” এই বলে তিনি কুটিরের বাইরে গেলেন।
কমলার বাবাকে কেন এত আনত এবং বয়স্ক দেখাচ্ছিল? আর এই আগন্তুককে দেখার পর, পরক্ষণেই তাঁর মধ্যে কেন এমন পরিবর্তন হল? তাঁর মুখ উজ্জ্বল হল এবং চোখে আনন্দের দৃষ্টি দেখে এক মুহূর্ত আগে তিনি যেমন ছিলেন তার থেকে সম্পূর্ণ পৃথক মনে হল। আগন্তুকের মুখ দেখার মতো যথেষ্ট আলো ছিল। সেই আগন্তুক বন্ধুকে দেখে অত্যন্ত আনন্দিত মনে হল। বৃদ্ধ মানুষটি কাছের নিম গাছটি ধরে তরুণ নবাগতের দিকে দ্বিতীয়বার তাকালেন। তখন তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল:–“অবশেষে এলে! হায়! কেন এখন এলে?”
আগন্তুক বললেন, “চুপ! কথা বলবেন না। চলুন দূরের গাছগুলির দিকে যাই। এই কি আপনার ছোট্ট মেয়ে?”
আগন্তুকের কথাকে আমল না দিয়ে এক করুণামাখা স্বরে বৃদ্ধ মানুষটি স্বগতোক্তির মতো বললেন, “অনেক দেরি হয়ে গেছে। কী আর করব?”
“কেন বাবাকে এতটা ভাবিত দেখাচ্ছে? তিনি কী করতে পারতেন?” নিজের কাছে এই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে কমলা গুটি গুটি পায়ে বাবার কাছ ঘেঁষে দাঁড়াল। কিন্তু তিনি তাঁকে কঠোর ভঙ্গিতে চলে যেতে বললেন:–“ভিতরে যাও কমলা! একাকি সন্ধ্যাবেলা ঘুরো না।”
কিছুক্ষণ পরে বাবা বাড়িতে এলেন। কিন্তু, আগন্তুক সঙ্গে নেই। চুলার পাশে কমলা বৃদ্ধা মহিলার সঙ্গে বসে আছে। সে আগ্রহভরে রান্না দেখছে। কিন্তু বাবা এসে আকে বাইরে নিয়ে গেলেন। দুজনে বাড়ির সামনে উঁচু বেদিতে বসলেন। তখন রাত হয়ে গেছে। মাথার উপরে তারারা জ্বল জ্বল করছে। সামনে গাছগুলির উপর চাঁদের আলো আবছাভাবে ঝলসাচ্ছে। সঙ্গে স্রোতস্বিনীর শব্দ ছিল কর্কশ এবং উচ্চকিত। বৃদ্ধ মানুষটির হাঁটুর উপর কমলার মাথা রাখা ছিল। তিনি কমলার গায়ে আলতো টোকা দিতে দিতে গোপন কথাটি জানালেন:–“তোমার বিয়ে হতে যাচ্ছে। আমার হাত পা বাঁধা। কিছু কাল আগে এই বিয়ের কথা পাকা হয়েছিল। অতিথিরা আমার চেয়ে তোমাকেই দেখতে এসেছিল। আমাকে কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে। কিন্তু, এখন সব অতীত। তোমার শ্বশুরমশাই এক পণ্ডিত ব্যক্তি এবং আমার বিশেষ পরিচিত। আজ সন্ধ্যায় তাঁর স্ত্রী এখানে এসেছিলেন। কমলা, তুমি কি খুশি?” তাঁর কণ্ঠে ছিল বেদনার সুর।
বিবাহের ধারণা কমলার কাছে নতুন নয়। সে জানত একদিন তার বিবাহ হবে। কারণ বৃদ্ধা মহিলা বলতেন যে এটাই বিবাহের উত্তম বয়স এবং দেরি হয়ে হচ্ছে দেখে প্রায়ই গজর গজর করতেন। তাঁর বাবাও মজা করে কখনও কখনও বলতেন, “হায়! সে যথেষ্ট দুষ্টু, তাকে এবার অন্য কোথাও পাঠাতে হবে।”’
ছোট্ট মেয়েটির মনে প্রত্যাশা ছিল বিবাহের দিন হবে তার জীবনের এক বর্ণাঢ্য দিন। কিন্ত এমন ক্ষমাপ্রার্থীর মতো বাবা কথা বলছেন কেন? কেন তাঁকে বিব্রত দেখাচ্ছে? কেন তিনি বললেন, “আমার কোন উপায় নেই। আমার মনে অন্য ইচ্ছা ছিল। তোমাকে অন্য মেয়েদের মতো যেতে হবে। নিজের খাবার বানাতে হবে এবং অন্যে দয়ায় বাস করতে হবে।” কাজ! এতে নতুন কী আছে? এখনও পর্যন্ত সে কাজ করতে শিখে বেড়ে উঠেছে। রান্না করতেও কি সে জানে না? বিস্ময়ে ছোট্ট মেয়ের চোখ বড় হয়ে গেল এবং সে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল:–“হ্যাঁ, দাদা! আমি কাজ করতে জানি। ভয় পেও না!”
তিনি মেয়ের দৃষ্টি এড়িয়ে বললেন, “এভাবে তাকিও না”—এই মন্তব্য কমলা বাবার কাছে শুনেছে যখনই প্রশ্নালু দৃষ্টিতে সে তাঁর দিকে তাকিয়েছে। সে বিস্মিত হয় এই ভেবে যে তাঁর দৃষ্টিতে এমন কী আছে যে তাতে বাবা বিব্রত বোধ করেন। তিনি শুধু পিঠ চাপড়ালেন এবং বললেন, সে খুব ভালো মেয়ে। যেখানে সে যাবে সে বাবার মুখ উজ্জ্বল করবে।
পরের দিন বিবাহের প্রস্তুতি নেওয়া হল। যে মেয়েটি কমলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছিল সেই গুঙ্গীর মা হবেন কমলার শাশুড়ি। কাশী, যার সঙ্গে কমলা প্রায়ই দেখা করত, সে গুঙ্গীর পরিবারে তার বিবাহ পছন্দ করেনি। সে তার বাবাকে অনুরোধ করত যদি তিনি প্রভাব খাটিয়ে এই বিবাহ বন্ধ করে দেন। কিন্তু, সম্পর্কটা আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। তাই অনেক দেরি হয়ে গেছে।
বিবাহের দিন এগিয়ে আসছে, কমলার জীবনে এক মহান দিন এবং যার জন্য সে আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করে আছে। অনুষ্ঠানের সমারোহ এবং উত্তেজনা শিশুদের কাছে এক অদ্ভূত আকর্ষণ এনে দেয়, যদিও তারা বিবাহের প্রকৃতির বিষয়ে অজ্ঞ। তারা একে শুধু উৎসবের সঙ্গে তুলনা করে। তাই কমলা তার বিবাহের সমস্ত আয়োজনকে সাধারণ ভাবেই গ্রহণ করেছিল। ঘটনাবহুল প্রতীক্ষিত দিনের আগের সন্ধ্যা এল। সারা দিন খুব উত্তেজনার অধ্যে কেটেছে এবং আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু কমলা অনেক অসুবিধার মধ্যে বাড়ির বাইরে গেছে। সে যে বিষণ্ণ তাতে বিস্মিত হবার কিছু নেই। গত কয়েকদিন অবিরাম উত্তেজনা এক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। তার সঙ্গে তার হৃদয়ে যুক্ত হয়েছে অদ্ভূত অস্পষ্ট আশঙ্কা যে তার জীবনে এক পরিবর্তন ঘটতে চলেছে। ভাবি শাশুড়ি প্রায়ই এসেছেন এবং একাধিক বার তিনি কমলার অগোছাল ভাব এবং অজ্ঞতার জন্য তির্যক মন্তব্য করেছেন। তুলনামূলক ভাবে তিনি কমলার কাছ অপরিচিত। কিন্তু তাকে ভাবি শ্বশুরালয়ে নিয়ে যাবার কারণে সে বধূমাতা হিসেবে সেখানে কী ভূমিকা নিতে চলেছে তা বুঝে গেছে। এই কয়দিনের টানাপড়েনে তার উপরে এক ক্লান্তির ছাপ পড়েছে। মন্দিরের ধ্বংসের পাশে সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। যখন সে সামনের জলাশয়ের পরিষ্কার জল দেখল এবং বাতাস ও কাছের স্রোতস্বিনীর ও পাখির পরিচিত ডাক শুনতে পেল, তার চোখ জলে ভরে গেল। সে যেদিকেই তাকায় তার নিজেকে বিধ্বস্ত মনে হয়। যে ছোট্ট বাড়ি সে শীঘ্র ত্যাগ করবে তা তার কাছে এখন অনেক বেশি প্রিয় মনে হয় এবং সেই খিটখিটে বৃদ্ধা মহিলা তার কাছে এক নতুন ভালো লাগা নিয়ে এল। বাবার কথা ভেবে সে বুকে চাপা বেদনা অনুভব করল। তিনি এক অদ্ভূত পিতা। পিতার ভালোবাসার মতো সে কিছুই ভাবতে পারত না। তাকে ঘিরে থাকা তার ভালোবাসা কোন সাধারণ ভালোবাসা ছিল না। শৈশব থেকে তিনি তার সবকিছু—তার সেবক, বিশ্বস্ত বন্ধু এবং তার শিক্ষাদাতা। এখন, বেচারা মেয়েটি জানে না ভবিষ্যতে তার জন্য কী অপেক্ষা করছে। সে জানত নিচে অপর দিকে অবস্থিত শহরের অপরিচিতদের মধ্যে তাকে বাস করতে হবে। সেই শহর তার কাছে ভয়ানক ভাবে বড় এবং অবান্ধবোচিত। এই সব ভাবতে ভাবতে সে পাশের এক পাথরের উপর বসে রইল। কিন্তু বেশিক্ষণ একা থাকতে হল না। ভীষণ উত্তেজনায় ছোট শিশুরা তার কাছে এসে চিৎকার করে বলল—“কমলা! কমলা! তোমাকে ভিতরে ডাকছে।” গয়নাগুলো মাপসই হল কি না দেখতে হবে, এবং স্বর্ণকার সেইগুলির শেষ টান দেবার জন্য অপেক্ষা করছে। ফুল ইতিমধ্যে এসে গেছে। উৎসুক স্বর শোনা গেল—“বাবা, এ তো পাহাড়! কমলা কত লোক আসছে— সামনের মণ্ডপ এবং বাড়িঘেরা দুটো ছাউনি লোকে লোকারণ্য।”
একজন বলল, “রান্নার জায়গায় দেখ! পিছনে স্তূপাকার পিঠে এবং মিষ্টি বানানো হচ্ছে। আমি এক পলক দেখে এলাম। বস্তা বস্তা চাল আসছে। ইয়েশির গ্রামের লোকজন, দশরথের মুখিয়া এবং বৃদ্ধ মেষপালক—সবাই ডাল, চাল, ঘি কত এনেছে তার ইয়ত্তা নেই।” “এসো, এসো, অফুরন্ত মজা! টমটমের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে এবং টানা তিনদিন তা শোনা যাবে।”
ইতিমধ্যে আর একদল বেরিয়ে এসে শ্বাসরুদ্ধকর বার্তা শোনাতে শুরু করল। এইসব উত্তেজনা কমলার চোখে পড়ল এবং সে উচ্চস্বরে হেসে উঠল। সে দুজন ছোট শিশুর হাত ধরে দৌড়ে আসছিল। এখন তার চোখে পড়ল কাশী এবং তার মা আরও দুজন মেয়েকে নিয়ে নিচের রাস্তা থেকে তাদের বাড়ির দিকে আসছে। মেয়েগুলো কমলাকে দেখা মাত্রই তাকে ডাকল—“সঙ্গে এসো! সঙ্গে এসো! ওখানে কী করছ? কনে নিজেকেই লুকিয়ে রেখেছে। দেখ তোমার জন্য আমরা কী নিয়ে এসেছি।”
কমলা দৌড়ে তাদের কাছে গেল, এবং কাশীর পূজনীয় মাকে দেখেই নিজেকে গুটিয়ে ফেলল, মাথা ঢাকল এবং লাজুক সম্মানসূচক দৃষ্টিতে বৃদ্ধা মহিলার পায়ে নত হল—যেভাবে অন্য বৃদ্ধা মহিলা এবং উচ্চশ্রেণীর মানুষকে শ্রদ্ধা জানাতে হয়। “ওঠো ছোট মেয়ে। এত লজ্জা পেও না,” বৃদ্ধা মহিলা বললেন এবং তার পিঠ চাপড়ে দিলেন। সেই সময় মেয়েরা হাসতে হাসতে রূপার পাত্রে নিয়ে আসা চন্দনের লেই কমলার মুখে এবং হাতে মাখিয়ে দিল। বৃদ্ধা মহিলা বলে উঠলেন, “যথেষ্ট! যথেষ্ট! কাল এসব করার অনেক সময় পাওয়া যাবে। এখন এসো।” সবাই মিলে কমলার বাড়িতে প্রবেশ করলেন। তারা ভিতরে যেতেই সমবেত সমস্ত মহিলা কাশীর মাকে শ্রদ্ধা জানাল, কারণ তিনি এক মহান মানুষ শিবগঙ্গার রাজস্ব সংগ্রাহকের স্ত্রী। তারা তাকে নিয়ে সম্মানসূচক আসনে বসাল। সেখানে মণ্ডপের এক কোণে একটি বিশাল কম্বল এবং বড় একটি বালিশ রাখা আছে। সেই জায়গা পর্দা দিয়ে ঘেরা।
গুঙ্গীর মা বললেন, “আপনাকে এখানে এই অনুষ্ঠানে পেয়ে আমরা গর্বিত।”
“আরে! ও কিছু না। কমলা আমার নিজের মেয়ের মতো। আমরা সবাই তাকে এত ভালোবাসি। আমি উপস্থিত না থেকে তার বিবাহ সম্পন্ন হতে দিতে পারি না। দেখ, কাশী কমলার জন্য কী উপহার এনেছে।” এই কথা বলে তিনি গুঙ্গীর মায়ের হাতে একটি হার দিলেন।
“আপনার দয়া অপার। কমলা এসো জেঠিমাকে প্রণাম করে কৃতজ্ঞতা জানাও। কাশীবাঈ তুমি কমলাকে গর্বিত করবে।”
কমলা এগিয়ে এসে কাশীর মায়ের পা ধরে প্রণাম করল। তারপর তাঁর পাশে বসল। তার চোখে এমন এক বিষণ্ণতা এবং বিনয়ের ভাব যে বৃদ্ধা মহিলা কমলাকে কাছে টেনে নিলেন। তিনি বললেন—“বেচারা মেয়ে, তোমার মা বেঁচে থাকলে তোমার জন্য কী না করতেন?” কমলার মুখ তুলে ধরে তিনি বললেন—“এসো তোমাকে পরিয়ে দিই।”
তার গলায় অন্য গয়না পরা থাকলেও, মুক্তোর হার বৃদ্ধা মহিলার দৃষ্টি আকর্ষণ করল। তিনি বললেন—“ওর মা নিশ্চয় খুব ধনী ছিলেন। দরিদ্র মানুষ তাদের মেয়ের গলায় মুক্তোর হার পরাবে না। বিস্মিত হচ্ছি, অন্য গয়নাগুলো কোথায়?”
উপস্থিত এক অতিথি বললেন—“ওর বাবা এক বিচিত্র মানুষ। কেউ বলতে পারে না উনি কী করবেন।”
কমলাকে আদর করে বৃদ্ধা মহিলা ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, “কেন, তিনি কি পিতল আর সোনার পার্থক্য জানেন না। অর্থের ব্যাপারে এমন উদাসীন মানুষ দেখিনি। এটা ঠিক উনি সন্ন্যাসীর জীবন বেছে নিয়েছেন। তিনি ছেলের মতো কমলাকে মানুষ করেছেন। মেয়েও বাবার থেকে কিছু আলাদা নয়। বাবার কাছ থেকে শেখা অনেক গ্রন্থের বিষয় কিন্তু সে তোমাকে বলে দেবে।” সবাই কমলার দিকে তাকিয়ে হাসল।
মণ্ডপের সামনের দিকে পুরুষেরা বসে আছে—তাদের সামনে ট্রে ভর্তি মিষ্টি এবং পান পাতা। কমলার বাবাও সেখানে আছেন। কিন্তু দূরে পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন। কারণ, সন্ন্যাসী হিসেবে তিনি অতিথিদের আপ্যায়ন করতে পারবেন না। তবুও বিশিষ্ট অতিথিরা তাঁর সঙ্গ এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাইছিলেন। নির্জনবাসীর মধ্যে এক পরিবর্তন এল। আনত মাথা তিনি তুললেন। গভীর কপাল এবং কালো আগ্রহভরা চোখদুটোতে এক মর্যাদার আভা ফুটে উঠল।
{চলবে…]

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জানুয়ারী ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]