নতুন বছরের কয়েকদিন আগে থেকেই হালখাতার নেমন্তন্ন নিয়ে কার্ড আসতো বাড়িতে। এখন কার্ড বলতে আমরা যেটা বুঝি, তখন বিষয়গুলো এত দর্শনধারী ছিল না। হলুদ পোস্ট কার্ড এর মত মোটা চৌকো কার্ড তার মাথায় মাঝখানে সিদ্ধিদাতা গণেশ এর ছবি । কখনও একটা খেরোর খাতার ছবি , পাশে দোয়াতের ভেতর শরের কলম ডুবানো। কোন কার্ডে আবার বা লক্ষ্মী গণেশের একসাথে ছবি । কোথাও উপরে লেখা থাকতো শুভ নববর্ষ ,কোনোটাতে বা গনেশায় নমঃ । সেই কার্ডগুলো গুনে গুনে জমিয়ে রাখতাম আমরা। যত বেশি কার্ড তত মজা।

সূর্য পশ্চিমের বাঁশঝাড়ের মাথা ছুঁতো কি ছুঁতো না, বাবা আমাদের তিন ভাই বোনকে নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন গঞ্জের বাজারে হালখাতা করতে।
ধুলো মাটির রাস্তা, দু’ধারে আদিগন্ত ধানের ক্ষেতে বোরো ধানের সবুজ গালিচা বিছানো। রাস্তার ধারে এক আধটা বাবলা, খেজুর বা ঐজাতীয় গাছ। যার তলায়  দুদণ্ড জিরিয়ে নেওয়া যায় না।
 বাবা তাড়া লাগান ,চলো চলো তাড়াতাড়ি পা চালাও।
পথের ধুলো তেতে আগুন হয়ে আছে। হাওয়াই চটি পরা পায়ে সেই উত্তাপ জড়িয়ে যাচ্ছে গভীর আশ্লেষে। তিন ভাই বোনের মধ্যে আমি ছোট। কাজেই বাবার হাত ধরার হক আমার আছে। সামনেই দাদা দিদি চটিতে তুমুল ধুলো ওড়াতে ওড়াতে এগিয়ে চলেছে। আমারও খুব ইচ্ছে ওইভাবে ধুলো ছিটিয়ে হাঁটি। বাবার হাতে ঈষৎ টান দিতেই বাবা শক্ত মুঠিতে ধরে ফেললেন আমার হাত।
 ঘামে সর্বাঙ্গ ভিজে গেছে আমাদের।
রোদ্দুরে তাতে মুখ লাল। আমি বাবাকে বললাম হাইস্কুলের কলে একটু জল খাব বাবা।
তোকে নিয়ে বেরোলেই এক জ্বালা, এখন জল খেতে গেলে আবার দেরি হয়ে যাবে তো, দিদি ধমকে উঠল।
বাবা অবশ্য স্কুলের টিউবকলে পাম্প করে আমাদের তিন ভাই বোনকেই জল খাওয়ালো, অঞ্জলি করে জল নিয়ে মুখে ছেটালাম।

সাঁওতালপাড়া ,রথতলা, ঘোলার পাড়, টোলপাড়া ,রাসতলা বাজার … তারপর ব্যাস ওই তো এসে গেছে দোলগোবিন্দ কাকুর দোকান, ‘সুধাময়ী বস্ত্রালয়’।
আরে ,আসুন আসুন মাস্টার মশাই, এসো এসো বাবারা । তারপর মিছরি ভেজানো ঠান্ডা রঙিন জল। শালপাতার ঠোঙায় নিমকি দরবেশ… ভীষণ খুশিতে আর লজ্জায় আমাদের মুখে তখন অচেনা রঙের কারিকুরি।


দিদি কানে কানে সতর্ক করে দেয়, নতুন জামায় ফেলবে না যেন।
লজ্জা লজ্জা চোখ মেলে এদিক-ওদিক তাকাই আমরা। কোন্ দোকানে রঙিন কাগজের শিকলি ঝুলছে তো কোনো দোকানে আম পাতার মালা করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। সব দোকানের প্রবেশ পথে দুদিকে ঘট। তাতে সিঁদুরে স্বস্তিক চিহ্ন আঁকা, তার ওপর আম্র পল্ল বে ডাব বসানোআছে। পাশেই কলা গাছ । কচি কলা গাছের খোঁজে বারবারই গরু এসে হাজির হচ্ছে। দোকানের মানুষজন নানা ব্যস্ততার মাঝেও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছে গাছ যেন গরুতে খেয়ে না চলে যায়।

দাদা ফিসফিস করে বলল, জানিস বীরুকাকুর দোকানে বোতলে ঠান্ডা রঙিন জল দেয়,নিলু বলেছে।
দিদি মুখটা একটু বিমর্ষ করে বলল, আমাদের কার্ড দেয়নি।
দোল কাকুর দোকানে আমাদের বসিয়ে বাবা আরো চার-পাঁচটা দোকানে হালখাতা করতে বেরোলেন।
ইতিমধ্যে আকাশ কখন অন্ধকার করে এসেছে আমরা কেউ খেয়াল করিনি । হঠাৎ গরমের তাপ কমে যেতেই ওপর দিকে তাকিয়ে চমকে গেল সবাই। ধরণীর পরে বিরাট ছায়ায় ছত্র ধরেছে আসন্ন কালবৈশাখী।
চলো চলো চলো, আর একটুও দেরি নয়।
বাবা দ্রুত হাতে জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে, আমাদের নিয়ে গ্রামের দিকে যাত্রা করলেন। আমাদের তিনজনের হাতে মিষ্টির প্যাকেট ক্যালেন্ডার। 

গঞ্জের সীমানা ছাড়িয়ে খোলা মাঠে এসে হাজির হয়েছি আমরা সবে ,শো শো শব্দের ছুটে এলো কালবৈশাখী ঝড়। মুহূর্তে ধুলোয় ঢেকে গেল চারপাশ। বাবা দুহাত বাড়িয়ে আমাদের তিন ভাই বোনকে কাছে টানার আগেই আমি ছিটকে পড়লাম। দিদি দৌড়ে এসে আমাকে তুলতে গিয়ে সেও পড়ল আছাড় খেয়ে। তারপর কোনক্রমে বাবা দাদা আমাদেরকে ধুলো থেকে তুলে দাঁড় করালো । গাছ থেকে যেভাবে ঝুড়ি নেমে আঁকড়ে ধরে মাটি আমরা সেভাবে বাবাকে জড়িয়ে ধরে মাটি আঁকড়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
কে যেন ড্রাম ড্রাম কালো আলকাতরা ঢেলে দিয়েছে আকাশের শরীরে । সাদা বকের দল এতক্ষণ কোথায় ছিল কে জানে ,সবাই ডানা মেলে উড়তে উড়তে নজরের বাইরে চলে গেল । ওরা কোথায় থাকে কে জানে ! ভাবনাটা শেষ হবার আগেই আকাশের এ প্রান্ত থেকেও প্রান্ত চমকে দিয়ে ঝলসে উঠল বিদ্যুৎ আর বাজ । মোটা মোটা ফোঁটায় ঝাঁপিয়ে পড়ল বৃষ্টি । সাথে শীল পড়তে লাগলো টপাটপ।
অসহায় বাবা দুটো হাত দিয়ে আমাদের তিনটে মাথা আড়াল করবার আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকেন।
আচমকা আসা কালবৈশাখী ঝড় হঠাতই থেমে গেল আবার। সবাই ভিজে ঝুপ্পুস হয়ে গেছি একেবারে। পরস্পরকে দেখে আমরা নিজেরাই যেন চিনতে পারছি না।


ধুলো কাদা মেখে আমরা থিতু হয়ে দাঁড়িয়ে আবিষ্কার করলাম, হাতের ক্যালেন্ডার গুলো সব ভিজে গেছে। লক্ষী ,গণেশ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, গ্ল্যাক্সো বেবি সব কাদার প্রলেপে যেন কালো ক্যানভাস।
আমাদের হাতের কাগজে ঠোঙার মিষ্টি গড়াগড়ি খাচ্ছে কাদায়। হা ক্লান্ত বাবা আমাদের তিনজনকে নিয়ে বাড়ির পথ ধরলেন ।
বরাদ্দ মিষ্টি ছাড়াও আমার হাতে দুটো দরবেশ শালপাতায় মুড়ে দিয়েছিল দোলগোবিন্দ কাকুর বড় ছেলে। সাত রাজার ধন এক মানিকের মত তাকে আঁকড়ে রেখেছিলাম মুঠোর ভিতর। ঝড় বৃষ্টির দাপটে কখন যে মুঠো খুলে গেছে খেয়ালই করিনি। বাড়ি নিয়ে যাবার মত একটা দানা মিহিদানাও আর অবশিষ্ট নেই কারোর হাতে।
নিজের শূন্য মুঠোর দিকে তাকিয়ে আমি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম- -আমার দরবেশ।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, মে ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]