যুদ্ধবিঘ্নিত মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চয়তা ভরা আকাশপথ পেরিয়ে এই বছর অর্থাৎ ২০২৬ এর ২২ শে মার্চ ইটালি এসেছি মেয়ের কাছে। এরমধ্যে যদিও বেশিরভাগ সময় কাটছে উত্তর ইতালির ছোট্ট ছবির মত শহর রেজিও এমিলিয়াতে তবুও তারমধ্যে ঘুরে এলাম ইটালি আর স্পেনের কয়েকটি শহর। ২৬শে মার্চ গিয়েছিলাম স্পেনের তিন নদী নারভিওন, ইবাইজাবাল এবং ক্যাডাগুয়ার মোহনায় অবস্থিত বিলবাও শহরে। ওখান থেকে ২৭শে মার্চ গেলাম স্পেন এবং ফ্রান্সের সীমান্তে অবস্থিত ঐতিহাসিক সমুদ্রশহর সাঁ-জাঁ-দ্য-লুজ-এ।


সাঁ-জাঁ-দ্য-লুজ ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিমে বাস্ক কান্ট্রি অঞ্চলে স্পেন সীমান্ত থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে আটলান্টিক উপকূলে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক এবং জনপ্রিয় বন্দর শহর। বহুযুগ আগে এই ছোট্ট সুন্দর শহরটি জলদস্যুদের আস্তানা ছিল বলে কথিত।


আসলে সাঁ-জাঁ-দ্য-লুজ-এর খ্যাতি ফ্রান্সের সম্রাট চতুর্দশ লুই এর সঙ্গে স্পেনের রাজকন্যা মারিয়া থেরেসার ঐতিহাসিক বিবাহের জন্য। ১৬৫৯ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী কার্ডিনাল মাজারিন দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন এই শহরে এবং প্রায় প্রতিদিন বিদাসোয়া নদীর উপর ফিসান্ত দ্বীপে যেতেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী এবং কূটনীতিকদের সঙ্গে শান্তি আলোচনার জন্য। দীর্ঘ সাতমাস আলোচনার পর পায়ারনিস চুক্তির মধ্য দিয়ে ফ্রান্স এবং স্পেনের প্রায় ত্রিশ বছর ধরে চলে আসা শত্রুতা এবং যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ফ্রান্সের ২২ বছর বয়সী সম্রাট চতুর্দশ লুই-এর সঙ্গে স্পেনের সম্রাট চতুর্থ ফিলিপের কন্যা মারিয়া থেরেসার বিবাহ স্থির হয়। কার্ডিনাল মাজারিন কেবলমাত্র ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না তিনি ছিলেন চতুর্দশ লুই-এর পালকপিতার সমান। চতুর্দশ লুই-এর পিতা ত্রয়োদশ লুই ১৬৪৩ খ্রিস্টাব্দের বসন্তে নিজের মৃত্যুর আশঙ্কায় ফ্রান্সের পরবর্তী সম্রাট হিসাবে পঞ্চবর্ষীয় শিশু চতুর্দশ লুইকে মনোনীত করে যান। চতুর্দশ লুই-এর যখন জন্ম হয় তখন তার পিতা এবং মাতার বিবাহিত জীবনের তেইশ বছর অতিক্রান্ত । চতুর্দশ লুই-এর মাতা মহারাণী অ্যানি এই সময়ের মধ্যে চারটি মৃত সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। অসুস্থ ত্রয়োদশ লুই উত্তরাধিকারের অনুপস্থিতিতে যখন প্রায় অর্ধোন্মাদ তখনই মহারাণীর কোল আলো করে জন্ম নেয় চতুর্দশ লুই। মৃতপ্রায় সম্রাট ত্রয়োদশ লুই এর পর আরও পাঁচবছর বেঁচে ছিলেন। ফ্রান্সের রাজপরিবারের নিয়ম অনুযায়ী ত্রয়োদশ লুই-এর মৃত্যুর পর মহারাণী অ্যানি পঞ্চবর্ষীয় সম্রাট চতুর্দশ লুই-এর রিজেন্ট নিযুক্ত হন এবং নাবালক সন্তানের পক্ষে ফ্রান্সের রাজত্ব পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।মহারাণী অ্যানি কার্ডিনাল মাজারিনকে প্রধানমন্ত্রীপদে নিয়োগ করেন। রাজ্য পরিচালনা এবং যুদ্ধ সংক্রান্ত সমস্ত দায়িত্ব কার্ডিনাল মার্জারিনের হাতে সমর্পণ করে তিনি চতুর্দশ লুইকে দেখাশোনার, শিক্ষাদানের এবং সম্রাটের যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত করেন। ১৬৫৯ সালে পায়ারনিস চুক্তি যখন স্বাক্ষরিত হয় তখনও রাজকার্য সম্বন্ধে যাবতীয় সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার কার্ডিনাল মার্জারিনের উপরই ছিল। ১৬৬১ সালে কার্ডিনাল মার্জারিনের মৃত্যুর পর চতুর্দশ লুই রাজ্য এবং যুদ্ধ পরিচালনার সম্পূর্ণ দায়িত্বের অধিকারী হন।


৭ই নভেম্বর,১৬৫৯ পায়ারনিস চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে ফ্রান্স এবং স্পেনের হয়ে স্বাক্ষর করেন যথাক্রমে চতুর্দশ লুই এবং চতুর্থ ফিলিপ। এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সাঁ-জাঁ-দ্য-লুজ-এর চার্চে চতুর্দশ লুই এবং চতুর্থ ফিলিপের কন্যা মারিয়া থেরেসার ঐতিহাসিক বিবাহ সম্পন্ন হয় ৯ই জুন, ১৬৬০। চতুর্দশ লুই এবং মারিয়া থেরেসা উভয়েরই বয়স তখন ২২। মারিয়া ছিলেন চতুর্দশ লুই-এর থেকে মাত্র পাঁচদিনের ছোট। মারিয়া থেরেসা এবং চতুর্দশ লুই ছিলেন দূর সম্পর্কের ভাইবোন। চতুর্দশ লুই-এর বাবা ত্রয়োদশ লুই ছিলেন মারিয়া থেরেসার মা-এর সম্পর্কে ভাই। আবার মারিয়ার বাবা চতুর্থ ফিলিপ ছিলেন চতুর্দশ লুই-এর মা মহারাণী অ্যাানির সম্পর্কে ভাই। প্রাথমিক ভাবে এই বিবাহের প্রস্তাবে রাজি হননি চতুর্থ ফিলিপ। কিন্তু এই প্রস্তাব সরাসরি নাকচ না করে তাঁর সিদ্ধান্ত পরে জানাবেন বলে জানান চতুর্থ ফিলিপ। এই দীর্ঘসূত্রতায় বিরক্ত হয়ে কার্ডিনাল মার্জারিন কপট রাগ দেখিয়ে জানান যে তিনি স্যাভয়ের রাজকুমারীর সঙ্গে চতুর্দশ লুই-এর বিবাহ স্থির করতে চলেছেন। এ খবর শুনে বিচলিত হয়ে পড়েন চতুর্থ ফিলিপ এবং তড়িঘড়ি নিজের সম্মতি জানিয়ে দেন। বিবাহের আলোচনা এবং শর্তাবলী বিশদভাবে আলোচিত হতে থাকে দুই দেশের কূটনীতিকদের মধ্যে। যেহেতু দুটি দেশ একত্রিত হতে চলেছে এবং স্পেন সমমর্যাদাসম্পন্ন হলেও কার্যত ফ্রান্সের অধীনস্থই থাকবে তাই স্থির হলো যে স্পেনের স্বাধীনতা রক্ষার স্বার্থে সিংহাসনের উপর রাজকুমারী মারিয়া থেরেসার এবং তার সন্তানদের কোনও অধিকার থাকবে না এবং তার পরিবর্তে মারিয়া থেরেসাকে বিবাহের যৌতুক হিসাবে স্পেনের রাজপরিবারের তরফ থেকে পাঁচলক্ষ স্বর্ণমুদ্রা দিতে হবে। যুদ্ধবিধ্বস্ত স্পেনের পক্ষে সেই যৌতুক দেওয়া সম্ভব না হওয়ার কারণে স্পেনের রাজসিংহাসনের উপর মারিয়ার অধিকার বহাল রইলো। রাজসিংহাসনের উপর মারিয়া থেরেসার অধিকার প্রসঙ্গে বলতে গেলে একটু পিছিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।


চতুর্থ ফিলিপের একমাত্র পুত্রসন্তান বালস্থার চার্লস ১৬৪৬ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ১৬ বছর বয়সে মারা যায়। মারিয়া থেরেসার বয়স তখন ৮ বছর। ভাই-এর অবর্তমানে স্পেনের সিংহাসনের একমাত্র দাবিদার এখন মারিয়া। যেহেতু মেয়েদের সিংহাসনে আরোহণ স্পেনে বৈধ সুতরাং চতুর্থ ফিলিপের পর সিংহাসন আরোহণের অধিকারের ক্ষেত্রে কোনও বাধা রইলো না মারিয়া থেরেসার। মারিয়াকে রাজ্য এবং যুদ্ধ পরিচালনার উপযোগী করে গড়ে তুলতে থাকলেও পুরুষ উত্তরাধিকারীর অভাব সবসময় চতুর্থ ফিলিপকে বিচলিত করে রাখতো। পুরুষতান্ত্রিক ক্যাথলিক রাজতন্ত্রে নারীর সিংহাসনের অধিকার স্বীকৃত হলেও পুরুষ উত্তরাধিকারীই ছিল সকলের কাম্য এবং বেশি গ্রহণযোগ্য। অনেক চিন্তা করে এবং কিছুটা বাধ্য হয়েই চতুর্থ ফিলিপ সম্মত হন দ্বিতীয় বিবাহের জন্য। প্রথম রাণী এলিজাবেথ দেহত্যাগ করেন ১৬৪৪ সালে। নিজের ভ্রাতুষ্পুত্রী চতুর্দশবর্ষীয়া মারিয়া আন্নার সঙ্গে ১৬৪৯ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেন চতুর্থ ফিলিপ। তার বয়স তখন ৪৪। প্রায় সমবয়সী সৎমায়ের সঙ্গে ভাব হয়ে গেল মারিয়া থেরেসার। ১৬৫১ সালের জুলাইমাসে মারিয়া আন্না জন্ম দেয় এক শিশুকন্যার যার নাম রাখা হয় মার্গারেট থেরেসা। মারিয়া থেরেসা ক্রমে ক্রমে মার্গারেটের ধর্মমাতা হয়ে উঠলো। তাদের এই সম্পর্ক অটুট ছিল মার্গারেটের মৃত্যু পর্যন্ত। ১৬৭৩ সালে মারা যায় মার্গারেট। সৎমা মারিয়া আন্নার সঙ্গেও সুসম্পর্ক ছিল মারিয়া থেরেসার। সেই সম্পর্কে ভাঙন ধরে ১৬৫৭ সালে যখন মারিয়া আন্না জন্ম দেয় স্পেনের রাজসিংহাসনের পুরুষ উত্তরাধিকারী যুবরাজ ফিলিপ প্রস্পারোর। এখন থেকে সিংহাসনের প্রথম দাবিদার ফিলিপ প্রস্পারো এবং তার অবস্থান দ্বিতীয়স্থানে জেনে ক্রোধে অন্ধ হয়ে উঠলো মারিয়া থেরেসা। নিজের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিল সৎমা আর সদ্যোজাত ভাইকে। এর কিছুদিন পরেই ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই এর সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল মারিয়া থেরেসার। এই রাজকীয় এবং রাজনৈতিক বিবাহ সম্পন্ন হলো সাঁ-জাঁ-দ্য-লুজ এর চার্চে। এই বিবাহের পর চতুর্দশ লুই-এর আদেশ অনুসারে চার্চের মূল দরজা চিরকালের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয় যাতে যে পথ ধরে তিনি বিবাহস্থলে গিয়েছিলেন সেইপথ ধরে আর কেউ যেন যেতে না পারে। এই বিবাহের পরিণতি মারিয়ার ক্ষেত্রে একদমই সুখকর ছিল না। ভার্সাইএর রাজপ্রাসাদে চতুর্দশ লুই-এর অজস্র উপপত্নীর মাঝখানে বিপন্ন হয়ে গিয়েছিল তাঁর অস্ত্বিত্ব। তাঁর ২২ বছরের বিবাহিত জীবনে রাজপরিবারে মহারাণীর যোগ্য স্থান এবং সম্মান থেকে বঞ্চিত ছিলেন সারাজীবন। তাঁর ছ’টি সন্তানের মধ্যে পাঁচজনের অকালমৃত্যু তাঁকে একেবারে বিধ্বস্ত করে দিয়েছিল। মাত্র ৪৪ বছর বয়সে এক দুরারোগ্য ব্যধিতে তাঁর মৃত্যু হয়।


যখন মূল দরজার পাশের দরজা দিয়ে চার্চের অভ্যন্তরে গিয়ে দাঁড়ালাম এই ইতিহাস যেন জীবন্ত হয়ে উঠলো আমার সামনে। চার্চের পাশের রাস্তা দিয়ে একটুখানি হেঁটে গেলেই চোখে পড়বে আদিগন্ত নীল সমুদ্র। সমুদ্রের ধার দিয়ে হেঁটে এলে দেখতে পাওয়া যাবে ১৬৬০ সালে ঐ ঐতিহাসিক বিবাহ উপলক্ষ্যে স্থাপিত একটি ছোট্ট দোকান –অ্যাডামস। ঐ বিবাহ উপলক্ষ্যে এই দোকানেই প্রথম তৈরি হয়েছিল প্রখ্যাত ফরাসি মিষ্টান্ন- ম্যাকারন। ম্যাকারনের জন্মস্থল থেকে একবাক্স ম্যাকারন নিয়ে রওনা দিলাম অপেক্ষমান বাসের দিকে। যাওয়ার পথে বিবাহের সময় যে বাড়িতে চতুর্দশ লুই ছিলেন সেই বাড়ির সামনে বসে একটা ছবি তুলে নিলাম।

১৬৬০ সালে এই চার্চেই সম্পন্ন হয়েছিল চতুর্দশ লুই এবং মারিয়া থেরেসার রাজনৈতিক বিবাহ।

ম্যাকারনের জন্মস্থল সাঁ-জাঁ-দ্য-লুজ-এ চতুর্দশ লুই-এর অস্থায়ী বাসস্থান।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, মে ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]