কাক শালিখে যেমন টালির চালের ফাঁকে খাবার টাবার, বাসা বাঁধার তার অথবা গেরস্থ বাড়ির কলতলা থেকে চুরি করে আনা চামচ টামচও লুকিয়ে রাখে, মানুষেরও কতকটা অমনই স্বভাব– কারও কারও বেলায় অবশ্য এই জমিয়ে রাখা সম্পত্তির বেশিরভাগটাই অকাজের।
আর সেই সঞ্চয়ের পাহাড়ের বোঝা ঠেলাটা মারাত্মক হয়ে পড়ে ঘরের লোকের কাছে।
শুনতে সহজ হলেও বিষয়টা সহজ সরল নয়।

একটু বিশদ করা যাক!
ক’দিন আগেই এক বয়স্ক ভদ্রলোক এলেন আমার কাছে। সঙ্গে আরেক ভদ্রমহিলা। দুয়েক মিনিট একথা সেকথার পর ভদ্রলোক বললেন, পেসেন্ট আমার ছেলে,সে কিন্তু আসেনি ডাক্তারবাবু ,আদৌ আসবে কিনা তাও জানিনা!
বুঝতেই পারছেন, ছেলে অ্যাডাল্ট, এই আমার বৌমা! আমরা কোনও উপায় খুঁজে না পেয়েই আপনার পরামর্শ নিতে এসেছি– জানি,আপনি রুগী না দেখে ওষুধ দেন না, তবু আপনার সাজেশনটা জরুরী!
সত্তরোর্ধ মানুষ, ধীরেসুস্থে কথাগুলো বলেন।

শুনতে হয়,এটা আমার কাজ।
ছেলের বয়েস সাঁইত্রিশ, পেশাগত যোগ্যতায় উকিল হলেও বেশ কয়েক মাস হ’ল কোর্টের ধারেকাছে যান না ,বাড়িতেই সারাক্ষণ।
বৌমার স্কুলের চাকরি। ভদ্রলোক বিপত্নীক, অতএব দিনের বেশিরভাগ সময়টা উনিও বাড়িতেই। আর সেখানেই হ’ল সমস্যা! ছেলের সঙ্গে নিত্য খটখটি।

–নেশা করে নাকি?
জিগ্যেস করি।

–পান, সুপুরি, জর্দ্দা, বিড়ি, সিগারেট কিচ্ছু না! তবে যা করে, সেটা নেশা কিনা আপনিই বলবেন স্যার!

— শেষ হয়ে গেলাম স্যার!
পাশ থেকে এবার কথা বলে বৌমা। ভদ্রমহিলার স্বামী, যিনি আপাতত অনুপস্থিত, তাঁর স্বভাবই হ’ল জিনিসপত্র জমানো। কোনও কিছুই ফেলবেন না তিনি। সেটা পুরোনো ভাঙা তানপুরাই হোক অথবা চাবি হারানো তালা । পুরোনো রেডিও, গাড়ির ব্যাটারি, বইখাতা, ইলেকট্রিক বাল্ব,টাইপরাইটার,পুরোনো পাখার আর্মেচার, সব আছে সে সংগ্রহে। জমতে জমতে এমন হয়েছে যে খাটের তলা, ঘরের কোন্ ছাপিয়ে তা এখন খাট পালঙ্কও ভরিয়ে দিয়েছে– কোথাও পা রাখবার জায়গাটুকুও নেই।

–আমি এখন বারান্দায় দুটো বেঞ্চি জড়ো করে ঘুমোই, জানেন? আমার পৈতৃক বাড়ি, সবকটা ঘরই এখন গুদাম ঘর হয়ে গেছে!
শুরুতে অনেক বলেছি, শেষে যেদিন নিজেদের খাটে শোওয়ার জায়গাটাও হারালাম, সেদিন একটু উত্তেজনাই হ’ল, আমার গায়ে হাত তুলল সেদিন আমারই ছেলে! এরপর আর চেষ্টা করিনি!
কিন্তু,আর কতদিন এমন চলবে ? ও তো সুস্থ নয় ডাক্তারবাবু!
লুকিয়ে কোনও ওষুধ দেওয়া যায়না?

ভদ্রলোকের আকুলতা বুঝি।
এই ডিসট্রেসটাও বুঝি আমি।

ওনার যা হয়েছে ডাক্তারীর ভাষায় তা হোর্ডিং ডিসঅর্ডার, কমবেশি অনেক মানুষেরই এমন আছে। সবকিছুই জমিয়ে রাখবেন তাঁরা, সবটাই কাজের, কখন কোনটা লাগে, কোনওটার আবার সেন্টিমেন্টাল সংযোগসূত্র, তাই ফেলা যায়না! কত স্মৃতি! এরকম না হলেও অনেকে শাড়ি, জামাকাপড় ফেলতে পারেন না, কারও বা বই জমে পাহাড়! পড়া হয়, না জমানোটাই আসল?
এ একধরনের সিকিউরিটি!
তারপর কালের নিয়মে বিশৃঙ্খলা।
পরিচিত এক বন্ধুর ছেলে মোবাইলের চার্জার রেখে দেয়, ঘর বোঝাই চার্জার তার!
আরও একটি মেয়ের কানের দুল কিনতে হয় রোজ।
জমায়, গোছায়, দেখে, অথচ কোথাও যায়না, কখনও পরে না সেসব দুল! ফেলতে গেলেই তুলকালাম। অদ্ভুত একটা ইনসিকিওরিটি থাকে আড়ালে।

উপস্থিত আমার সামনের দুটি মানুষকে বলি–
এভাবে না, এও একরকম অবসেসিভ কমপালসিভ রোগ! অতএব সাহায্য করব ভাবলেও ওনাকে আসতে হবে! যে অসুবিধাটা সকলেই বুঝছেন, সেটা উনি কতটা অনুভব করছেন, কতটা আগ্রহে এর থেকে বেরিয়ে আসতে চান, অথবা আদৌ চান না, তা না বুঝে তো সত্যিই কোনও চিকিৎসা হবে না!
অবশ্যই এর চিকিৎসা আছে, তবে তাতে রোগীর অংশ নেওয়াটা জরুরী!
এখনও অবদি ফিরে আসেননি তাঁদের কেউ। হয়ত আসবেন, অথবা আসবেন না, জাস্টিফাই করবেন, ‘আমি কি পাগল?’ বলে।

অনিত্য এই সংসারে কিছুই তো স্থায়ী নয়, তবুও জলের ওপর আলপনা কিম্বা মেঘের ওপর সোনাঝরা রোদ্দুরকে চিরটাকাল ধরে রাখতে কে না চাই ?

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, ফেব্রুয়ারী ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য
Dr Dipak Banerjee
Dr Dipak Banerjee
4 months ago

ভাই OCD নিয়ে খুব ভালো লিখেছ। অনেকের ঘরে এইরকম মানুষ বা মহিলা আছেন। তোমার লেখা পড়ে,
তারাও জানবে, এটা এক ধরনের মানসিক রোগ!