
শেষে দিল রা -সতেরো

যত মানুষ আসেন, তাঁদের সকলেরই যে মারাত্মক সব মনের রোগ আছে তা নয়। কেউ অল্পদিনেই ভালো থাকেন,আর আসার তেমন দরকারই পড়ে না। কেউ কেউ দীর্ঘ সময় ধরে বিচ্ছিন্ন ভাবে আসা যাওয়া করলেও আশানুরূপ ফল পান না। তবে কি এর আড়ালে অন্য কারণও থাকতে পারে?
চিকিৎসার দিক থেকে দেখলে নন- অ্যাধেয়ারেন্স, অর্থাৎ ওষুধ পত্র ইচ্ছে মতো বন্ধ করে দেওয়া, নির্দিষ্ট ডোজের বাইরে নিজের নিজের মতন করে ওষুধ খাওয়া,সাইড এফেক্টস এর ভয়ে খুশিমতো পথ বেছে নেওয়া, বাড়ির লোকের চাপ, মনের অসুখের হাজার স্টিগমা সবই থাকলেও একটা জরুরী বিষয় আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়, সেটা ব্যক্তিত্বের বিকার বা পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার।

মানুষের ব্যক্তিত্বের একটা ধরন থাকে,এক এক জনের এক এক রকম। কেউ সাংঘাতিক কিপটে, কেউ এতটাই উদার যে নিজের ভাগের টাও অকাতরে অন্যের হাতে তুলে দেয়। কেউ রাগ হলে সারাজীবন পুষে রাখে, কেউ আরামসে সেসব ঝেড়ে ফেলে দেয় অনায়াসে। কেউ ভিতু ভিতু, কেউ আবার দুঃসাহসী।
কাউকে বর্ননা করতে হলে আমরা সচরাচর তিনটে শব্দের মধ্যে ঘোরাফেরা করি — পার্সোনালিটি, ক্যারেক্টার আর টেম্পারামেন্ট!
এদের মধ্যে ‘পার্সোনালিটি’ শব্দে আমরা একজন মানুষের প্রবণতা, আচরণ, ব্যবহার, আবেগের প্রকাশ, চাপের মুখে সে কি করে, এইসব বোঝাই। ‘পার্সোনা’ শব্দের অর্থ ‘ মুখোস’। একটা সময় এই বাইরে থেকে দেখা ধরনটাকেই ব্যক্তিত্ব ধরে নেওয়া হতো। ক্রমে ভিতর বাইরের তফাৎ রইল না।
বয়ঃসন্ধির পর থেকে সারাজীবনই একজন মানুষের ক্ষেত্রে এটা প্রায় একই রকম থেকে যায় — সর্বত্রই লোকটা একইরকম! চোখ টানার মতো ব্যক্তিত্বের লোককে আমরা বহু সময় ‘কী পার্সোনালিটি দেখেছিস!’ যেমন বলি,তেমনি ‘ ওর কোনো পার্সোনালিটিই নেই!’ এমনও বলে থাকি।
এই বলাটার মধ্যে নিশ্চয়ই ভুল আছে, কারণ পার্সন থাকলে পার্সোনালিটিও থাকবে।
‘টেম্পারামেন্ট’ বিষয়টা বায়োলজিক্যাল, একটা জৈবিক ধরন। এর ভিত্তিতে কাউকে আমরা ‘রগচটা’ বলি, কেউ ‘মিনমিনে’!
আবার ‘ক্যারেক্টার’ শব্দটায় কেমন যেন আঁশটে গন্ধ! এ একটা সামাজিক জাজমেন্ট।
কোত্থেকে হয় এসব? একই বাড়ির ছেলেমেয়েদের ধরন ধারণে এমন তফাৎই বা হয় কেন? এ নিয়ে মনোবিজ্ঞানীরা ঢের মাথা ঘামিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, বংশগতি আর কম বয়সের পরিবেশ, ইন্টারাকশন, নানান ঘটনার ছাপ আমাদের পার্সোনালিটি ডেভেলপমেন্টে যথেষ্ট ভূমিকা নেয়।
এদেশে সত্ত্ব,রজ,আর তম গুণের উপস্থিতির হেরফের কাউকে সাত্ত্বিক, রাজসিক অথবা তামসিক করে বলে মনে করা হতো।
বিদেশে হিপোক্রেতিসের তত্ত্ব আবার নানান পিত্ত অর্থাৎ বাইল জাতীয় পদার্থের তারতম্যে কেউ ভীষণ রকম প্রত্যয়ী, কেউ তিরিক্ষি, কেউ বা নড়বড়ে হয় বলে দাবি করে।
আজকের যুগে এদের পার্সোনালিটি ট্রেইটস্ ই বলব আমরা। সব মিলিয়ে
স্বাভাবিক ব্যক্তিত্বের মানুষের এই ভিতর বাইরের প্রকাশটা কিন্তু নমনীয়, পরিস্থিতি অনুযায়ী একটা মিলিয়ে জুলিয়ে চলার লক্ষ্য থাকে সেখানে। তবে সব মানুষের এই ফ্লেক্সিবিলিটি বা নমনীয়তা থাকে না। তাঁরা ব্যক্তিত্বের বিকারের একটা ছকে আটকে যান, ফলে নিতান্ত কাছের মানুষ তো বটেই চেনা পরিচিতের অনেক মানুষের কাছেই তাঁরা বেশ দূর্বোধ্য এবং অস্বস্তিকর।
পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার শব্দবন্ধটা প্রযোজ্য হয় এখানেই।

প্যারানয়েড সিজোফ্রেনিয়ার কথা আমরা অনেকেই জানি। অকারণ ভয়, কেউ পিছু নিয়েছে, সারাক্ষণ নজর রাখছে, ফিসফিস করে কথা বলছে কানে কানে, বাস্তবের বাইরে এরকম অসংখ্য ডিল্যুশন বা হ্যালুসিনেশনের উদাহরণ সেখানে থাকলেও উপযুক্ত চিকিৎসায় থাকলে এসবের সম্পূর্ণ অথবা আংশিক নিরাময় সম্ভব।
কিন্তু সংসারে এমন বহু মানুষ আছেন যাঁদের এইসবের কিছুই না হলেও কোথাও যেন তাঁরা আলাদা। সারাজীবনই তাঁদের রকমটা এমনই।
যে কোনো বিষয়েরই অন্য একটা মানে বের করবেনই এঁরা। ঠাট্টা তামাশা কেও এঁরা বিদ্রুপের মতো ভাবেন।
পাড়া পড়শী নিকটাত্মীয়, ঘরের লোক, কাউকেই বিশ্বাস করেন না। এঁদের সঙ্গে কথা বলার মুশকিলটা হলো, অতি সাধারণ কথাবার্তারও একটা উল্টো অর্থ করতে পারেন। তাঁর বিরুদ্ধেই যেন গোটা পৃথিবীর সবকিছু। সারাজীবন ধরে রাগ পুষে রাখেন। থানা পুলিশ, মামলা মোকদ্দমাও এসে পড়ে অকারণেই।
সন্দেহ বাতিকও থাকে, বিশেষতঃ স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে। যদিও যে কাউকেই সন্দেহের চোখে দেখাটাই এঁদের স্বভাব। যে কোনো কাজের,সে যত ভালো কাজই হোক না কেন একটা অন্তরালের বদ উদ্দেশ্য বের করতে সিদ্ধহস্ত এনারা । এ হলো প্যারানয়েড পার্সোনালিটি। চিকিৎসার কথা বলার সাহস আর কেই বা দেখাবেন এঁদের।
সম্পর্কের সমস্যা নিয়েও যাঁরা আসেন, তাঁদের অনেকেরই এমন হয়। কেউ কেউ অন্যের উপর এমন নির্ভর করেন, যে অন্য মানুষটাকে ধরে রাখতে সবরকমের অন্যায় অত্যাচারও সহ্য করে নেন। এঁরা ডিপেন্ডেন্ট পার্সোনালিটি র মানুষ। বোধ করি এঁরা একা একা জীবনটা কাটাতে পারবেন না, নির্ভর করার মতো কাউকে না কাউকে লাগবেই এটাই বিশ্বাস করেন।
আরও এক ধরনের মানুষ নিজের অস্তিত্ব নিয়েই এতো অস্বস্তিতে থাকেন যে পারতপক্ষে যে কোনো জমায়েত, সোস্যাল মিক্সিং এড়িয়ে যান। বাইরে থেকে দেখতে সোস্যাল ফোবিয়ার মতো হলেও দ্বিতীয় দলটা কিন্তু পরিচিত গন্ডিতে ঠিকই থাকে।
খুঁতখুঁতে লোকে এখন ছেয়ে গেছে। এমনিতেই তো একটা কমপালসিভ দুনিয়ায় বাস করছি আমরা। এদের কেউ কেউ এক্সট্রিম পর্যায়ের। তবে সেজন্য তাদের নিজেদের কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হয় বলে মনে হয় না। ছোঁওয়া ছুঁয়ি বা ধোওয়া ধুয়ির ওসিডি না থাকলেও তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের সবটাই এমন “চলো নিয়মমতে” যে বাকিদের উপর বড্ডো চাপ!
ছোটবেলায় পাড়ার নিত্য খুড়ো কে দেখতাম বিয়ে বাড়িতে সবসময় ফার্স্ট ব্যাচে । খুড়ো বিয়ে করেননি। সবকিছু টিপটপ তাঁর। যেখানকার জিনিস সেখানে না পেলেই অনর্থ! এদিকে ঘড়ির কাঁটা মেপে সবকিছু। দু এক মিনিটের হেরফেরে না জানি কোন্ মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে! কোনো জিনিস ফেলা যাবেনা। শেয়ারবাজারে বেশ কিছু টাকা করলেও সাংঘাতিক কিপটে! আড়ালে আবডালে অ্যানানকাস্টিক পার্সোনালিটির এমন মানুষ আজও কম নেই।
তবে সমাজের সব স্তরে যেটা চোখে পড়ার মতো বেড়েছে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় তাদের ক্লাস্টার “বি” পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার বলে। মানবিক সম্পর্কের যেটা সারবস্তু, সেই সমানাভূতি বা এমপ্যাথিটাই অনুপস্থিত এখানে। ফলে মনের কানেকশনটাই তৈরি হয় না।
একদল মানুষ এমন সব কথা বলেন, এমন কাজ করেন, যেখানে মানুষের স্বাভাবিক বোধ এবং অনুভবের কোনো দায়ই যেন নেই । বাইরে থেকে দেখলে এরা চার্মিং, কথাবার্তায় আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব হলেও এ অনেকটা ডক্টর জেকিল আর মিস্টার হাইডের মতো। এদের ডান হাত বাম হাতের খবর জানতে পারে না। লোককে ব্যবহার করে ছুঁড়ে ফেলে দিতে এক মিনিটও লাগেনা এদের। অবশ্যই কৃতকর্মের জন্য বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই এখানে, উল্টে জাস্টিফিকেশন আছে।
গবেষকদের মতে আঁতেপ্রেনিয়ে বা সেলিব্রেটি, রাজনৈতিক নেতা বা ক্ষমতাবান অনেকেরই পার্সোনালিটির গড়নটা এমনই । কে জানে, রবিঠাকুর বুঝি ‘নির্মম চেতনাহীন পরান ‘বলতে এমনই ভেবেছিলেন!
এমপ্যাথির অভাব শুধু এখানেই নয় আত্মকেন্দ্রিক নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি তেও প্রবল।
এদের প্রতিটা কথায়, কাজে, কেবলমাত্র আমি কি করেছিলাম! আমি, আমি আর আমি।
এতো ইনসিকিওরিটি আসে কোথা থেকে? সর্বত্র নিজেকে জাহির করার সত্যিই কতটা প্রয়োজন হয়?

কমবয়েসী দের মধ্যে এখন বর্ডার লাইন পার্সোনালিটি র কথা যথেষ্ট শোনা যায়।
ঝোঁকের মাথায় কাজ, সম্পর্কের অনিশ্চয়তা, সাংঘাতিক রাগ, শরীরের বিভিন্ন অংশে ব্লেড চালানো, কখনও প্যানিক, চারপাশে কান পাতলেই অনেক শুনতে পাবেন।
এসব হয় কেন?
দেখুন, এসবের কোনোটাই কিন্তু সিজোফ্রেনিয়া বা অন্য কোনো মেজর মেন্টাল ডিসঅর্ডার নয়। এমনকি অনেকে এইসব সমস্যা কে মনের রোগ বলেই গ্রাহ্য করবেন না। তবুও হচ্ছে তো!
সমাজ যে ভরে গেল এতে, অগ্রাহ্যই বা করি কিভাবে? মনের রোগের সঙ্গেই কি জুড়ে থাকছে না এসব?
সমাধান চাইছি সকলেই, বুঝছি কি বিষয়টা জানা চেনার মধ্যেই অন্তত অর্ধেক সমাধান লুকিয়ে আছে?

