“কোথাও যেন না থাকে কোনো রন্ধ্র” — রবীন্দ্রনাথের ‘জুতা-আবিষ্কার’ কবিতার এই লাইনটি যেন বর্তমানে বিজেপি নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারের অলিখিত মূলমন্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য তৈরি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোকে রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সরকার কোনো ফাঁক রাখতে চাইছে না। গত এক দশকে ভারতবর্ষে অদ্ভুত এক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে — পুরনো ও সুপ্রতিষ্ঠিত সরকারি প্রকল্পগুলোর নাম বদলে দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে মহাত্মা গান্ধী বা নেহেরু-গান্ধী পরিবারের নাম জড়িয়ে থাকা প্রকল্পগুলোকে নতুন নামে এবং নতুন রাজনৈতিক মোড়কে উপস্থাপন করা হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, এই নাম বদলানোর আড়ালে সত্যিই কি গুণগত কোনো পরিবর্তনের সদিচ্ছা রয়েছে, নাকি এটি শুধুই রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার ও আত্মপ্রচারের একটি কৌশল? রাজা হবুচন্দ্রের পা ধুলোমুক্ত করতে যেমন গোটা রাজ্য ঝেঁটিয়ে ধুলোয় অন্ধকার করা হয়েছিল, তেমনি বর্তমানের এই নাম-বদলের হিড়িকে জনকল্যাণের মূল লক্ষ্যটিই প্রচারের ধুলোয় ঢাকা পড়ে যাচ্ছে না তো? সেই প্রশ্ন তোলা আজ একান্ত জরুরি।

কিছু প্রকল্প ও প্রতিষ্ঠানের নাম-বদল

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন জনকল্যাণমুখী প্রকল্পের পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় নীতি-নির্ধারণী প্রতিষ্ঠানের নামের ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

 *মনরেগা নাম বদলে হয়েছে ‘ভিবি-জি রাম-জি’ (বিকশিত ভারত – গ্যারান্টি ফর রোজগার অ্যান্ড আজীবিকা মিশন – গ্রামীণ)। এটি গ্রামীণ অদক্ষ শ্রমিকদের বছরে নির্দিষ্ট দিনের কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেয়।

 *১৯৮৫ সালে শুরু হওয়া ইন্দিরা আবাস যোজনা প্রকল্পের নাম বদলে হয়েছে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা । এর লক্ষ্য ২০২৪ সালের মধ্যে সকলের জন্য পাকা ঘর নিশ্চিত করা।

 *১৯৯৫ সালে চালু হওয়া মিড ডে মিল স্কিম প্রকল্পের নাম ২০২১ সালে বদলে রাখা হয় পিএম পোষণ। এখানে শিশুদের পুষ্টির পাশাপাশি স্কুল গার্ডেনিং-এর মতো নতুন দিক যুক্ত করা হয়েছে।

 *ইউপিএ আমলের নির্মল ভারত অভিযান প্রকল্পটিকে ২০১৪ সালে স্বচ্ছ ভারত মিশন হিসেবে নতুনভাবে শুরু করা হয়।

 *ভারতের সর্বোচ্চ ক্রীড়া সম্মান রাজীব গান্ধী খেলরত্ন পুরস্কারকে ২০২১ সালে  ধ্যানচাঁদ খেলরত্ন পুরস্কার নামে পুনর্নামকরণ করা হয়।

 *১৯৫০ সালে গঠিত ভারতের উন্নয়ন কৌশলের মূল ভিত্তি ‘যোজনা কমিশন’ অবলুপ্ত করে ২০১৫ সালে নীতি আয়োগ  গঠন করা হয়, যা একটি বিশেষজ্ঞ পরামর্শদাতা সংস্থা বা থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক হিসেবে কাজ করছে।

নাম-বদলের উদ্দেশ্য

দেশের সরকার যখন কোনো প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে, তখন তার পেছনে মূলত দুটি উদ্দেশ্য কাজ করে—প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক।

প্রশাসনিক দিক থেকে সরকারের দাবি, নাম পরিবর্তন মূলত প্রকল্পের আধুনিকীকরণের জন্যই, যেখানে নতুন প্রযুক্তি (যেমন আধার সংযুক্তি, জিও-ট্যাগিং এবং ডিবিটি) ব্যবহারের মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়। এছাড়া, রিব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে প্রকল্পের প্রতি জনগণের মনে নতুন উদ্দীপনা ও সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করা হয় যাতে পুরনো প্রকল্পের একঘেয়েমি দূর হয়। পাশাপাশি, নেহেরু-গান্ধী পরিবারের বাইরে ভারতের অন্যান্য জাতীয় বীর ও মনীষীদের অবদানকে জনমানসে তুলে ধরা। সর্বোপরি, নাম পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রকল্পের লক্ষ্যমাত্রা ও কাজের পরিধি বৃদ্ধি করাকেও এই নামকরণের একটি আবশ্যিক কারণ হিসেবে দেখানো হয়।

সরকারি প্রকল্পের নাম বদলানোর পেছনে উন্নয়ন বা ডিজিটালাইজেশনের কথা বলা হলেও, এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক কৌশল ও ‘ব্র্যান্ডিং পলিটিক্স’। সমালোচক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় প্রতিটি প্রকল্পের সাথে ‘প্রধানমন্ত্রী’ শব্দটির সংযুক্তি মূলত ব্যক্তিত্ব কেন্দ্রিক প্রচারের একটি মাধ্যম, যা সরাসরি সর্বোচ্চ নেতৃত্বের কৃতিত্বকে প্রতিষ্ঠিত করে। একইসাথে মহাত্মা গান্ধী বা নেহেরু পরিবারের নাম সরিয়ে দীনদয়াল উপাধ্যায় বা অটল বিহারী বাজপেয়ীর মতো আইকনদের নাম আনা মূলত জাতীয় স্মৃতি থেকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ইতিহাস মুছে ফেলে নতুন আদর্শগত দর্শন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা বা ‘ইতিহাসের পুনর্লিখন’। রাম জি, আয়ুষ্মান এই ধরণের নামকরণ, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ভাবাবেগ সৃষ্টি করে তৃণমূল স্তরে একটি বিশেষ রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এই নাম পরিবর্তনের রাজনীতি অনেক সময় বিপুল অর্থের অপচয় ঘটায়, প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করে এবং কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের ফলে সাধারণ মানুষের প্রাপ্য সুবিধাকে অনিশ্চিত করে তোলে।

নাম-বদলের নেতিবাচক প্রভাব

রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রীয় প্রকল্পের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। সরকারি তথ্য ও বিভিন্ন জনস্বার্থ মামলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের রিব্র্যান্ডিং ও প্রচারের পেছনে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৮০০ থেকে ১,০০০ কোটি টাকা খরচ হয়। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা হয় মূলত টেলিভিশন বিজ্ঞাপন, আঞ্চলিক ও জাতীয় সংবাদপত্রে রঙিন পাতা দখল এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারের জন্য। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিজ্ঞাপনের পিছনে এই বিশাল ব্যয়ের কোনও উৎপাদনশীলতা নেই। কাজেই এই বিপুল অর্থ অনুৎপাদনশীল খাতে খরচ না করে সরাসরি কয়েক লক্ষ অতিরিক্ত শৌচালয় নির্মাণ বা হাজার হাজার গ্রামীণ ঘর তৈরিতে ব্যবহার করলে দেশের উন্নয়ন হত। পরিকাঠামো উন্নয়নের চেয়ে ব্র্যান্ডিংয়ে এই অগ্রাধিকার গ্রামীণ অর্থনীতির বুনিয়াদি উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার বদলে শ্লথ করে দেয়। নাম পরিবর্তনের এই প্রক্রিয়াটি নিচুতলার প্রশাসনেও ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দেশজুড়ে বিস্তৃত লক্ষ লক্ষ পঞ্চায়েত অফিস, ব্লক এবং সরকারি ভবনের সাইনবোর্ড পরিবর্তন, নতুন সিলমোহর তৈরি এবং স্টেশনারি নথিপত্র সংস্কার করতে যে বিশাল কর্মযজ্ঞ চলে, তা প্রকল্পের মূল বাস্তবায়নের সময় ও শ্রমকে কেড়ে নেয়। ডিজিটাল ইন্ডিয়ার যুগে এই ব্যয় আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়, কারণ প্রতিটি প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ এবং ডেটাবেস নতুন করে ডিজাইন ও রিব্র্যান্ডিং করতে কারিগরি খাতে কয়েকশ কোটি টাকার প্রয়োজন হয়। এর ফলে সরকারি অডিট সংস্থা বা সিএজি-এর পক্ষেও অনেক সময় পুরনো নথির সাথে নতুন তথ্যের সংযোগ স্থাপন করা কঠিন হয়ে পড়ে, যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে ব্যাহত করে।

প্রকল্পের নাম ও কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে সবথেকে বড় যে সংকটের সৃষ্টি হয়, তা হলো তথ্যগত বিচ্ছিন্নতা বা ‘ডেটা গ্যাপ’, যা দীর্ঘমেয়াদী প্রশাসনিক স্বচ্ছতাকে সরাসরি রুদ্ধ করে। বিশেষ করে গবেষণা বা অডিটের ক্ষেত্রে এটি একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়; কারণ ২০০৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গ্রামীণ কর্মসংস্থানের উন্নয়নের ধারা পর্যবেক্ষণ করতে গেলে, মাঝপথে নাম ও নিয়ম বদলে যাওয়ার ফলে পুরনো ‘মনরেগা’র তথ্যের সাথে নতুন ‘ভিবি-জি রাম-জি’ -এর ডেটা মেলানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে। এই প্রযুক্তিগত অসামঞ্জস্যতার সুযোগ নিয়ে অনেক সময় সরকার প্রকল্পের প্রকৃত ব্যর্থতাকে আড়াল করে ফেলে। কারণ তখন একটি অভিন্ন মাপকাঠিতে সাফল্যের বিচার করা যায় না। এছাড়া, প্রায়শই নাম বদলের সময় প্রকল্পের মূল কার্যকারিতা মাপার সূচকগুলো বদলে দেওয়া হয়, যার ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে প্রকল্পের প্রকৃত উন্নতি বা অবনতি বোঝা দুষ্কর হয়ে ওঠে। তথ্যের এই অভাব কেবল গবেষকদের বিভ্রান্তই করে না, বরং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা রূপায়ণের ক্ষেত্রেও ভুল সিদ্ধান্তের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে তোলে। একই সঙ্গে, জনগণের কাছে সরকারের দায়বদ্ধতার জায়গাকে দুর্বল করে দেয়।

এই নাম বদলের ফলে পুরনো নথি সংশোধন ও সফটওয়্যার আপডেটের মতো অনুৎপাদনশীল কাজে সরকারি আধিকারিক ও কর্মীদের ভালো সময় ব্যয় হয়ে যায়। এর ফলে মাঠ পর্যায়ের তদারকি ব্যাহত হয় এবং প্রশাসনিক স্থবিরতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা তৈরি হয়। এর পাশাপাশি, এই পরিবর্তন একদম প্রান্তিক ও নিরক্ষর মানুষদের মধ্যে তীব্র বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। হঠাৎ নতুন নাম শুনে সুবিধাভোগীরা ধন্দে পড়ে যান। ভাবতে থাকেন তাঁরা আগের সুবিধাগুলো আর পাবেন কি না। তথ্যের এই অস্পষ্টতার সুযোগ নিয়ে গ্রাম্য দালাল ও ফড়েরা সক্রিয় হয়ে ওঠে; তারা সাধারণ মানুষকে ভুল বুঝিয়ে বা ভয় দেখিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়। ফলে সরকারের ঘোষিত ‘স্বচ্ছতা’র দাবি অনেক ক্ষেত্রেই মুখ থুবড়ে পড়ে।

‘মনরেগা’ থেকে ‘ভিবি-জি রাম জি’

ভারতের গ্রামীণ অর্থনীতির রক্ষাকবচ হিসেবে পরিচিত ‘মনরেগা’ প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে ‘ভিবি-জি রাম-জি’ রাখা বর্তমানে সবথেকে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সরকারি দৃষ্টিভঙ্গিতে এই পরিবর্তনের ইতিবাচক দিক হলো—কাজের গ্যারান্টি ১০০ দিন থেকে বাড়িয়ে ১২৫ দিন করা এবং মজুরি বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি। তবে বছরে ৬০ দিনের ‘ম্যানডেটরি ব্রেক’ বা বাধ্যতামূলকভাবে কাজ বন্ধ রাখার নতুন নিয়মটি তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বছরের এই নির্দিষ্ট সময়ে সরকারি কাজ বন্ধ থাকায় প্রান্তিক শ্রমিকেরা কম মজুরিতেই বড় কৃষকদের জমিতে কাজ করতে বাধ্য হন—যা মূলত বড় কৃষকদের জন্য সস্তায় শ্রমিকের জোগান অক্ষুণ্ন রাখারই একটি পরোক্ষ কৌশল। এই পরিবর্তনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো – আগে এই প্রকল্পের ব্যয়ের সিংহভাগ কেন্দ্রীয় সরকার বহন করলেও, নতুন নিয়মে এখন কেন্দ্র ও রাজ্য উভয়কেই অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এর ফলে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা রাজ্যগুলোর ওপর বাড়তি চাপের সৃষ্টি হবে এবং প্রকল্পের বাস্তবায়ন ব্যাহত হতে পারে। এছাড়া প্রকল্পের নাম থেকে মহাত্মা গান্ধীর নাম সরিয়ে দেওয়াকে অনেকেই রাজনৈতিক সংকীর্ণতা ও ইতিহাসের অবমাননা হিসেবে দেখছেন। ফলে এই পরিবর্তন কেবল প্রশাসনিক সংস্কার নয়, বরং একটি সুগভীর আদর্শগত ও আর্থিক সংঘাতের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রকৃত সংস্কার নাকি রিব্র্যান্ডিং?

প্রকল্পের এই নাম বদল কি সত্যিই কোনো বড় পরিবর্তন আনবে, নাকি এটি শুধুই চালাকি করে মোড়ক বদল? সরকারি দাবি অনুযায়ী, আধার সংযোগ ও ডিরেক্ট বেনিফিট ট্রান্সফারের ফলে ‘স্বচ্ছ ভারত’ বা ‘প্রধানমন্ত্রী আবাস’ যোজনায় দুর্নীতি অনেকটা কমেছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে এই দাবির কোনো সারবত্তা খুঁজে পাওয়া যায় না; সেখানে দুর্নীতি ছিল রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এ প্রসঙ্গে সমাজবিজ্ঞানীদের প্রশ্নটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ—এই আধুনিকীকরণ কি পুরনো নাম বজায় রেখেই সম্ভব ছিল না? যদি লক্ষ্য কেবল প্রশাসনিক মানোন্নয়নই হতো, তবে নামকরণের জন্য এই বিপুল ব্যয়ের প্রয়োজন পড়ত না। ফলে এই নাম পরিবর্তনের আড়ালে পরিকাঠামোগত উন্নয়নের চেয়ে রাজনৈতিক কৃতিত্ব নেওয়ার আকাঙ্ক্ষাটিই অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত

ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলো মূলত কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ অংশীদারিত্বে পরিচালিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক এক দশকে প্রকল্পের নাম পরিবর্তনের এই প্রবণতা ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। কেন্দ্র যখন একতরফাভাবে কোনো প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে রাজনৈতিক ‘ব্র্যান্ডিং’ করার চেষ্টা করে, তখন বিরোধী-শাসিত রাজ্যগুলো পাল্টা নামকরণের কৌশল অবলম্বন করে। এই রাজনৈতিক ‘ইগোর’ লড়াই শেষ পর্যন্ত এক ভয়ংকর প্রশাসনিক অচলাবস্থার সৃষ্টি করে। লোগো ব্যবহার বা নামের অসঙ্গতি নিয়ে বিতর্কের জেরে কেন্দ্র দীর্ঘকাল ধরে বেশ কিছু রাজ্যের উন্নয়নমূলক প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ আটকে রেখেছে, যা সেইসব রাজ্যের কোষাগারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। রাজনীতির এই অহেতুক লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষই জয়ী হয় না। উল্টে চরম দুর্দশার শিকার হন সাধারণ দরিদ্র মানুষ, যাঁদের মাথার ওপরের ছাদ বা দুবেলার খাবারের জন্য সরাসরি এই সরকারি প্রকল্পগুলোর ওপরই নির্ভর করে থাকতে হয়। নাম বা লোগোর এই বিতর্ক উন্নয়নমূলক কর্মযজ্ঞকে ছাপিয়ে শেষমেশ একটি ‘ক্রেডিট ওয়ার’ বা রাজনৈতিক কৃতিত্ব নেওয়ার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ঠিক এই জায়গাতেই মনে হয় প্রকল্পের নাম বদল আসলে রাজনৈতিক মেকওভার —যা স্পষ্ট করে দেয়, আসল উদ্দেশ্য জনকল্যাণ নয়, বরং রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি করা।

পরিশেষে বলা যায়, প্রকল্পের সার্থকতা তার নামে নয়, বরং তার বাস্তবায়নে। নাম পরিবর্তন করে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু তাতে যদি প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বা মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়, তবে তা গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ডিজিটালাইজেশন এবং তদারকিতে কিছু উন্নতি ঘটলেও, নাম পরিবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক কৃতিত্ব নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা জনকল্যাণের মূল লক্ষ্যকে বেশিরভাগ সময়ই ছাপিয়ে যাচ্ছে। তাই দাবি ওঠা উচিত – নামের চমক নয়, প্রকৃত কাজই হোক উন্নয়নের মাপকাঠি।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, অগাস্ট ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য