মনের রোগ যাঁরা দূর থেকে দেখেন, তাঁদের দেখায় এর অদ্ভুত ,অনিশ্চিত দিকটাই ধরা পড়ে। নিজেদের জীবনে এবং পরিবারে এমন রোগের প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী মানুষের অসহায়তা এর চেয়ে আলাদা।

যাঁদের বিষয়ে বলছি তাঁদের বেশির ভাগই সিভিয়ার মেন্টাল ডিসঅর্ডার এর রোগী,যাঁদের কারও কারও সারাজীবন ধরেই চলছে সমস্যা, কারও বা কিছুদিন অন্তর অন্তর একটা করে দশা আসে। আগে বলা হতো ম্যানিক ডিপ্রেসিভ ইনসানিটি, এখন বাইপোলার ডিসঅর্ডার, এদের এমন দশান্তর হতে থাকে। কখনও প্রখর রোদের মতো উৎসাহ, উৎফুল্ল ভরপুর ম্যানিক দশা, আবার কখনও বিষাদ ভরা মেঘবেলা! কভি খুশি,কভি গম ।

এই ম্যানিক অবস্থায় বাড়তি এনার্জি, অনেক বড়ো কিছু একসঙ্গে করার প্রবণতা, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এসবের একটা সংক্রমক শক্তি আছে। লোকটাকে বিশ্বাস করতে না পারলেও মনে হয়,এই তুরীয় আনন্দেই বা আছে কয়জনা? এসব অবশ্য খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়না! তবুও যতক্ষণ থাকে, ততক্ষণই জানান দিয়ে যায় “আমি আছি”! এ অবস্থায় অন্তত পঞ্চাশ শতাংশ রোগীর বাহ্য জ্ঞান লুপ্ত হয়– কি করছে, এই ঘোরের মধ্যে সব টাকা পয়সা, জিনিস পত্র দরাজ হয়ে কাকে কোথায় বিলিয়ে দিচ্ছে,এই দশা কাটলে তবেই টের পাওয়া যায়।

এক মাস্টারমশাই আসতেন একটানা অবসাদ নিয়ে। কখনও বেশি, কখনও কম। মূলত ডিপ্রেশন, নেগেটিভ কথাবার্তা চলতেই থাকত তাঁর। এই নিয়েই চলছিল একরকম, হঠাৎ করেই একদিন তাঁর স্ত্রী ফোন করলেন, ডাক্তার বাবু, ওকে তো আর ঘরে রাখাই যাচ্ছে না। এই কয়েক সপ্তাহে অনেক কিছু করেছেন তিনি। স্ত্রীর কথা না শুনে একটা বড়সড় দামি কমপ্লেক্সে দু আড়াই হাজার স্কোয়ার ফিটের ফ্ল্যাটের অগ্রিম জমা করেছেন বেশ কয়েক লাখ টাকার। প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা তুলে দামি গাড়ির ডাউন পেমেন্ট করেছেন। স্ত্রীর বারণ,মেয়ের কান্না কাটি কিছুই থামাতে পারেনি তাঁকে। বাধা পেলেই গালিগালাজ, রাতে একফোঁটা ঘুমোচ্ছে না, বাড়িতে প্র্যাকটিক্যালি থাকছেনই না তিনি।
পরের সপ্তাহে মাস্টারমশাই এর সঙ্গে মোলাকাত হলো আমার, তখন তিনি পা আর পাঁজর ভেঙ্গে নার্সিং হোমে ভর্তি। অনভিজ্ঞ হাতে সদ্য কেনা গাড়ি চালাতে গিয়েই এমন পরিনতি।
অনর্গল কথা বলে চলেছেন তখনও। তার মধ্যেই অবশ্য কিছু কিছু কথা ঠিকই বলছেন মাস্টারমশাই।
রিসেপশনে অপেক্ষা করছিলেন স্ত্রী। চোখ ছলছল, শুনলাম,মাস দুয়েক আগে ওষুধ খাওয়াও বন্ধ করে দিয়েছিলেন নিজে নিজেই, মদ্যপানের অভ্যাসও চালু হয়েছিল।
স্ত্রীর কথায়, অ্যাক্সিডেন্টটা না হলে বোধহয় এখানে ওকে আনতেই পারতাম না!
ওষুধ চালু হলো, মাস্টারমশাই পরবর্তী কয়েক মাসে অনেকটা স্বাভাবিকও হলেন।

আরও একজনের কথাও মনে পড়ছে। বছর পঁয়তাল্লিশের ভদ্রমহিলা। পুরসভার কোনো একটা কাজ করতেন। বিয়ে থা করেন নি,সতের আঠারো বছর বয়স থেকেই মাঝেমাঝেই এমন এক একটা ফেজ আসে। খর্বকায় মানুষ, ঠিক সুশ্রী বলা চলে না। অন্যসময় নিজেকে একটু গুটিয়েই রাখতেন। বড়দি নিয়ে আসত ফলো আপে, বলতেন, ডাক্তারবাবু,আর ওরকম হবে না তো?
সব ওষুধ সহ্য হতো না,সুগারও ছিল। ভালো থাকলে ওষুধ দিব্যি বন্ধ করে দিতেন। তাই আমিও যে খুব আশ্বাস দিতে পারতাম,তাও না।
শুরু হয়ে যেত হঠাৎ করেই।
খানিকটা রঘু ডাকাতের চিঠিতে জানান দেওয়ার মতো করে পাতার পর পাতা চিঠি। ব্রাউন পেপারের খামে আসত তারা। ক্লিনিকে ঢুকতেই অজিতদা ধরিয়ে দিতেন হাতে, স্যার, শুরু হয়ে গেল!
কি লেখা থাকতো তাতে?
বিভিন্ন ভাষায় নিজের নাম, নামের আগে “ডক্টর” বসানো। দুনিয়ার যাবতীয় ডিগ্রি, অন্তত তাঁর যা জানা আছে, সব্বাই বসত নামের পিছনে।
বিভিন্ন অনুষ্ঠানের খবরও থাকতো অবশ্য। পুরসভার অনুষ্ঠান, যার মধ্যভাগে আমার রোগিনীর অবস্থান। তাঁকে কেন্দ্র করেই যাবতীয় অনুষ্ঠান কিনা!
কদিন পরেই সে আসতো। আবার ওষুধ, আবার কিছুদিন চলল। তখন এসব বললে লজ্জা পেত। লজ্জায় সামনের উঁচু দাঁত দুটোকে হাত চাপা দিয়ে ঢাকত।
তবুও রোগের এই অবস্থাটা বোধ হয় ওর মনের চাপা কষ্ট, অবদমিত ইচ্ছে গুলোকেই বের করে আনতো। যা হতে পারেনি, কোনো দিন হবেনা, এই প্রবল মুক্তির জলোচ্ছ্বাসে যেন ক’টা দিন সব ভাসিয়ে দিত।

ছাত্র অবস্থায় একদিন স্যারের পাশে বসে আউটডোরে পেসেন্ট দেখছি। এক বয়স্ক রোগীকে নিয়ে চার পাঁচ জনের একটা দল ঢুকলো। ষাটের ওপর বয়েস, পরনে আলখাল্লার মতো একটা পোষাক। খালি পা। মুখে একটাও কথা নেই,সহবত দারুণ। আলখাল্লার পকেটে হাত ঢুকিয়ে আখরোট, কিসমিস, এইসব বের করে আমাদের প্রত্যেকের হাতে হাতে দিতে থাকলেন। স্যারের ইঙ্গিতে আমরাও নিতে থাকলাম সেগুলো, একটু ভয়ে, একটু কৃতার্থ হওয়ার মতো করে।
রোগীর মুখে কিন্তু কোনো কথা নেই, আমরা মোটামুটি ফিউসড,কী ব্যক্তিত্ব রে বাবা!
নীরবতা ভেঙে স্যারই হিন্দিতে জিগ্যেস করলেন,
আপনার জমি জমা তো অনেক! কতটা হবে?
ধুলো মাখা সম্রাট বাম হাতের পাঁচটা আঙ্গুল তুলে ধরলেন স্যারের মুখের সামনে।

–কতটা হবে! পাঁচ একর?
আরও একটু খোঁচান স্যার।

জলদগম্ভীর একটা আওয়াজ এলো এবার,
করিব্ পান’শ একর হোগা!!

এরপর আর তাকে ঘাটানো যায় কি?

পরবর্তী জীবনে নিজেরও এমন বহু অভিজ্ঞতা হয়েছে।

দুই মেয়ে এসেছে ক্লিনিকে, তাদের বাবা কে দেখাতে চায়, অথচ আনা অসম্ভব চেম্বারে। বললাম, বাবা কে বলো, ডাক্তার বাবু ই ওনার সাথে একটু জরুরি পরামর্শ করতে চেয়েছেন, যদি একটু সময় দেন উনি।
কাজ হয় তাতে। এলেন ভদ্রলোক। ঝড়ের মতো এলেন পরের দিনই।
— বলুন ডাক্তারবাবু,কি সেবা করতে পারি আপনার!! একটু তাড়াতাড়ি বলবেন, আমার আবার কাল ভোরের ফ্লাইটে ইউ এস এ যাওয়ার আছে! শুনলাম, আপনি নাকি বহুত দূরে বদলি হয়ে গেছেন? আমি বলে দেবো, ডোন্ট ওয়ারি, সামনের মাসেই এখানে চলে আসবেন আপনি!!
আমি বিগলিত হবার ভাব করি। এ তো মহান সুযোগ!
তারপর কেমন করে যেন আমার সাথে একটু ভাবও হচ্ছে এমন ভাবনার মধ্যেই ধা করে দৌড় মারেন আমার ত্রাতা, ফিরেও আসেন মিনিট দশেকের মধ্যেই। পিছনে আট দশজনের একটা দল, উত্তেজিত তাঁরাও।

— এই যে ডাক্তারবাবু, এইটা আপনার কাছেই থাকবে! আপনি ই এর যোগ্য মানুষ!

একটা বেশ বড় সরস্বতী র মৃন্ময়ী মূর্তি আমার টেবিলে বসিয়ে দেন তিনি। সম্ভবত বাড়ির ঠাকুরঘর থেকে তুলে এনেছেন।
ইশারায় বাকিদের থামাই।

সে যাত্রা ভর্তি করতে হয়েছিল ওনাকে। বাড়ি ফিরেছিলেন উনি, সরস্বতী মূর্তি তো তার আগেই বাড়ি ফিরেছে।

এইসব দেখি আমি।
তরঙ্গ প্রবাহিত হয়।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জুলাই ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য