
দেখে এলাম স্তালিন মিউজিয়াম, জর্জিয়া
পৃথিবীর ইতিহাসে যতজন বিতর্কিত নেতা আছেন বা ছিলেন,তার মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা স্তালিনের নাম একেবারে প্রথম সারিতে আসবে। সেই ছোট থেকে, যখন ইস্কুলে পড়ি, তখন থেকে স্তালিনের নাম শুনে আসছি। বলা যায় লেনিন-স্তালিন শুনে বড়ো হয়েছি। পরে কলেজ জীবনে স্তালিনের নাম বহুবার শুনলেও ওনার সম্বন্ধে কিছুই জানতাম না। যদিও অদম্য কৌতুহল ছিল জানার, কিন্তু খানিকটা অলসতায় আর অধিকাংশই নিজের গাফিলতিতে এ প্রসঙ্গে কোনোদিন যাই নি। তাই কদিন আগে যখন স্তালিনের জন্মভূমি জর্জিয়া যাব বলে স্থির করলাম, তখন মনস্থির করলাম যে করেই হোক মহান নেতার জন্মস্থানটা অন্তত দেখব আর ওনার সম্বন্ধে জানব। আর তার প্রকৃষ্ট উপায় হল জর্জিয়ার গোরিতে স্তালিন মিউজিয়াম দেখা।
ইউরোপ তার দক্ষিণ প্রান্তে, যেখানে এশিয়ার হাত ছুঁইছুঁই করছে, সেখানে একটি ছোট্ট দেশ জর্জিয়া। দক্ষিণে আর্মেনিয়া আর তুরস্ক, পূর্বে আজেরবাইজান,পশ্চিমে কৃষ্ণসাগর আর উত্তর ও পশ্চিমে বর্তমান রাশিয়া। বহুবছর সোভিয়েত রাশিয়ার অঙ্গরাজ্য থাকলেও ১৯৯১ তে জর্জিয়া স্বাধীনতা লাভ করে। কিছুটা জর্জিয়ার ককেশাস পর্বত মণ্ডলীর তুষার রাজ্য দেখার লোভে, কিছুটা জর্জিয়ার ঐতিহাসিক চার্চগুলো দেখার লোভে, গত অক্টোবর মাসে চলে এলাম জর্জিয়া। লন্ডন থেকে পাঁচ ঘন্টার বিমানপথ, ওখানে কুরা নদীর ধারে এক অপূর্ব সুন্দর হোটেল মেরকিউরি টিবলিসিতে আশ্রয় নিলাম চার রাতের জন্য। ছবির মত ঘন নীল আকাশ,অজস্র গাছ,পাহাড় সব মিলে দারুন। আমাদের হোটেলটি পুরাতন টিবলিসিতে- চারিদিকে অজস্র গির্জা । তাদের ঐতিহাসিক মূল্য অসীম। পঞ্চম শতাব্দী থেকে এই টিবলিসি শহর গড়ে উঠেছে, কাজেই অধিকাংশ গির্জাই পঞ্চম থেকে একাদশ শতাব্দীর মানে জর্জিয়ার স্বর্ণযুগের আমলের। হোটেলের ঘর থেকে মেটেকি গির্জার স্নিগ্ধ রূপ, কুরা নদীর টলটলে জল আর অদূরে ব্রিজ অফ পিসের ঝলমলে শোভা দেখে মন ভরপুর।
প্রথম দুদিন ককেশাস পাহাড়, অনেক ঐতিহাসিক স্থান, পুরানো বাজার এইসব দেখে তৃতীয় দিনে গাড়ি নিয়ে চললাম গোরি- স্তালিনের জন্মস্থান। গোরি এখন জর্জিয়ার এক শহর। টিবলিসি থেকে গোরি ১২০ কিলোমিটার পথ। দারুণ সুন্দর ও ঝকঝকে রাস্তা। পথে ক্রনিকাল অফ জর্জিয়া, ৫০০০ বছরের পুরানো গুহা শহর- যেখানে পৃথিবীর প্রথম ওয়াইন বানানো শুরু, সেটা দেখে ও পাহাড়ের মাথায় গোরিজভারি গির্জা দেখে গোরির স্তালিন মিউজিয়ামে এলাম তখন বেলা দুটো।
গোরি দারুন সুন্দর এক জায়গা। চারিদিকে পাহাড়, দূরে কাজবেগ পিক সদর্পে তার ১৬০০০ ফুটের ধপধপে সাদা বরফ মাখা মাথা উঁচিয়ে আছে আর আছে অজস্র গাছ। গোরি আজ শহরের রূপ নিয়েছে কিন্তু স্তালিন যখন জন্মগ্রহণ করেন তখন গোরি ছিল নিছকই এক গ্রাম।
কুড়ি লরি(জর্জিয়ান মুদ্রা) করে টিকিট কেটে মিউজিয়ামে ঢুকলাম। বিরাট এক দোতলা বাড়ী।

প্রথমেই চলে এলাম দোতলায়। সিঁড়িতে ওঠার মুখেই স্তালিনের পূর্ণাঙ্গ মূর্তি।

এখানে স্তালিনের ছোটবেলা থেকে বড়ো হয়ে ওঠার কাহিনী আছে,আছে অনেক লেখা ও ছবি। আছে স্তালিনের ব্যাবহৃত বিভিন্ন জিনিষ। জানলাম অনেক কিছু, যার কিছুটা লিপিবদ্ধ করা যাক।
১৮৭৬ সালের ১৮ ই ডিসেম্বর এক ভরা শীতের দিনে ইযোসেফ (বা জোসেফ) জন্মগ্রহণ করেন এখানে। তখন এটা ছিল এক ছোট চালাঘর, সাথে খানিক খালি জমি। ওনার জন্মের নাম ছিল জোসাফ ভিসারিওনোভিছ জুগাসভিলি(Iosif (Joseph) Vissarionovich Dzhugashvili)
পুরানো বাড়ির এখন একটি অংশ শুধু রাখা আছে। আর আছে একটি মডেল পুরানো বাড়ির।

স্তালিনের(তখন তাঁর নাম জোসেফ) জন্ম অত্যন্ত গরীব ঘরে । বাবা টুকটাক চামড়ার কাজ করেন জুতো, ব্যাগ বানানোর আর মা করেন কাপড়কাচার বা ধোপানীর কাজ। তাতেও সংসার চলে না। সংসার না চলার আরো একটা কারণ হল বাবার অতিরিক্ত মদ্যপানে আসক্তি, ফলে রোজগারের অনেকটাই খাবারের বদলে খরচ হয় সুরায়। স্তালিনের অন্য ভাই বোন ছিল, কিন্তু তারা অনাহার ও রোগে ভুগে ছেলেবেলাতেই মারা যায়। বাড়িতে তিনজন লোক কিন্তু তাতেও সংসার চলে না। বাবা মা সকালেই বেরিয়ে যান, ছোট জোসেফ বাড়িতে একলাই থাকে। এর ওপর সাত বছর বয়সে জোসেফ হল জল বসন্তে আক্রান্ত। প্রাণে বেঁচে গেলেও মুখে কিছু দাগ চিরকালের জন্য থেকে গেল। এর সাথে বাঁ হাতও কিছুটা কমজোরি হয়ে যায় রোগে ভুগে।


বাইরে খেলার সুযোগ নেই কেননা অন্যান্য ছেলেপুলেরা জোসেফকে দেখলেই কারণে অকারণে তার পিছনে লাগে, মারধোরও করে। ফলে প্রায়ই মার খেয়ে বাড়ি আসে জোসেফ। ক্রমে বাইরে বেরুনোটাই জোসেফের কাছে হয়ে ওঠে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। কিভাবে ওদের মোকাবলা করবে এই ভাবনা নিয়ে বড়ো হতে থাকে জোসেফ । বাড়ি এসেও নিষ্কৃতি নেই- বাবার বদ মেজাজ, তার সাথে চড়-চাপড় মার। আবার কখনও বা নীরব চোখ মেলে দেখা মার ওপর বাবার অকথ্য অত্যাচার। আর সেই থেকে শুরু জোসেফের বিদ্রোহী ও বিপ্লবী মনোভাব।
জোসেফের মা ছিলেন খুব ধার্মিক মহিলা। দারিদ্রতা, স্বামীর অত্যাচার, কোনো কিছুই তাঁকে দমাতে পারে নি। জোসেফের পিতা-মাতা উভয়ই ছিলেন অর্থোডক্স খ্রিস্টান। তখন জর্জিয়াতে অর্থোডক্স ক্রিশ্চিয়ানিটির রমরমা, যার কিছুটা আজও আছে। তখন তা পূর্ণ মাত্রায় বিরাজমান আর পাদ্রীদের প্রতাপও অনেক। তাই জোসেফের মা-র প্রবল ইচ্ছা ছেলে একজন পাদ্রী হয়ে উঠুক, কিন্তু তার জন্য চাই উপযুক্ত শিক্ষা। ওদিকে জোসেফের বাবার ইচ্ছা ছেলে চামড়ার কাজ শিখুক, সংসারের উপকারে লাগুক। কাজেই চলল টানাটানি। এর ফলে জোসেফের বাবা মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। জোসেফের মা একাই ধোপানীর কাজ করে ছেলের লেখাপড়া চালিয়ে যেতে থাকেন।
জোসেফ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র আর ছিল দারুণ স্মৃতিশক্তি । কোনো জিনিষ একবার দেখলেই সেটা ওনার মাথায় চিরকালের জন্য গেঁথে যেত। ফলে তিনি উত্তরোত্তর স্কুলের পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করতে থাকেন।
জোসেফের লেখাপড়ার সাথে সাথে অন্য প্রতিভারও আভাষ পাওয়া গেল। জোসেফের গানের গলা চমৎকার, বক্তৃতা দিতে পারেন চমৎকার। এছাড়া কবিতা ও গল্প লেখেন ভালো, ফলে ক্রমে জোসেফ জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন অন্যদের কাছে।
স্কুলে থাকাবস্থায় স্তালিন প্রচুর অন্য বই পড়তেন। এই ফাঁকে জোসেফের মা এক প্রকার জোরাজুরি করেই ১৮৯৫ সালে জোসেফকে পাঠালেন রাজধানী টিবলিসে- ধর্ম শিক্ষার জন্য। টিবলিস হল জর্জিয়ার প্রাণকেন্দ্র।
তখন জর্জিয়া ছিল সোভিয়েটের এক অঙ্গরাজ্য – শাষণকর্তা জার বা রাজা। দিনের পর দিন জারের অপশাষণতে গরীবরা আরো শোষিত হচ্ছে, আরো গরীব হওয়ার দিকে এগুচ্ছে, আর রাজা ও তাঁদের সাঙ্গপাঙ্গরা আরো ফুলে ফেঁপে উঠছে। দেশ জুড়ে চাপা অসন্তোষ আর রাজধানী টিবলিসে সেটা ব্যাপক ভাবে প্রকাশিত।
১৮৯৮ সালে এক নতুন দল জন্মগ্রহণ করে- নাম রাশিয়ান সোসাল ডেমোক্রেটিভ পার্টি (Russian Social Democratic Party (RSDP)। বিভিন্ন কমিউনিষ্ট মনোভাবাপন্ন দল একজোট হয়ে এই দল তৈরি হয়, যার উদ্দেশ্য ছিলো জারের স্বৈরতন্ত্রর অবসান ঘটানো ।
জোসেফের তখন উনিশ বছরের তাজা রক্ত ধমনীতে বইছে। সাধারণ লোকেদের ওপর এই অত্যাচার দেখে জোসেফের বিপ্লবী মন টগবগ করে ফুটতে থাকে।
স্কুলে থাকাবস্থায় স্তালিন প্রচুর অন্য বই পড়তেন। যেখানে যা পেতেন, পড়ে ফেলতেন। এখানে তিনি একটি গোপন ক্লাব খুঁজে পান, যেটি ছিল জারের অপশাষণ থেকে মুক্তির কথা ভাবার মনোভাবাপন্ন যুবকেদের । তিনি সেই ক্লাবে যোগ দেন, এদের কাছে ছিল প্রচুর কমিউনিজমের বই। এরই মধ্য দিয়ে ওনার প্রথম পরিচয় ঘটে যায় কার্ল মার্ক্সের বইয়ের সাথে ও আগ্রহী হয়ে উঠেন সমাজতন্ত্রের ওপর। ভাবনা শুরু করেন কিভাবে জারের শাষণ থেকে মুক্ত করে দেশকে সমাজতন্ত্রর দিকে এগিয়ে নেওয়া যাবে । বিপ্লবের দিকে যত উনি এগোন, ততটাই পিছিয়ে আসেন এই ধর্মশিক্ষার থেকে। এর সাথে সাথে জোসেফের পাদ্রী হওয়ার বাসনা ক্রমে কমতে থাকে। জোসেফ পাদ্রীদের বিভিন্ন প্রশ্নে প্রশ্নে জর্জরিত করে তোলেন। দেশ যেখানে ধুঁকছে, লোকে খাবার পাচ্ছে না, সেখানে এই ধর্মশিক্ষার কোনো যুক্তি উনি খুঁজে পান না, ফলে পদে পদে ওনার সাথে সংঘাত বাধে পরিচালন মণ্ডলীর । তিনি প্রার্থনা করতেন না, মাথায় টুপি পরতেন না। মা-ও এই আচরণ মেনে নিয়ে পারেন নি, ফলে ঘরে বাইরে জোসেফ একলা। ১৮৯৯ সালে জোসেফ পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে টিফলিস স্পিরিচুয়াল সেমিনারি পরিচালক মন্ডলী তাঁকে বের করে দেয়, ফলে এই ধর্মশিক্ষার হাত থেকে জোসেফের ছুটি মেলে।
পেট চালাতে হবে, জোসেফ অনেক চেষ্টায় মিটিয়েরোলজিকাল অবজারভেটারি (Meteorological Observatory) তে করনিকের কাজ পান। ফলে পেটের চিন্তা কমে আর কাজের ফাঁকে ফাঁকে জোসেফ আরো বেশি মন দেন বিপ্লবের দিকে । জারকে ক্ষমতাচ্যুত করার আগ্রহ স্তালিনের মধ্যেও তীব্র হতে থাকে। তখন তিনি প্রায়ই গোপনে শ্রমিকদের সভায় যোগ দিতেন।
তিনি সমাজতান্ত্রিক মতবাদের বিভিন্ন গোপন মিটিংতে বক্তৃতা দিতেন, যোগ দিতেন এইজাতীয় সংগঠনের। তখন সমগ্র রাশিয়ান সাম্রাজ্যে সমাজতন্ত্রীদের সমর্থন বেড়েই চলেছে। আর তা দেখে জার আতঙ্কিত হয়ে উঠছে। জারের সিক্রেট পুলিশ বাহিনী সমগ্র রাশিয়ান সাম্রাজ্যে সমাজতন্ত্রীদের তন্নতন্ন করে খুঁজছে। ফলে জারের গোপন পুলিসের কাছে খবর চলে গেল জোসেফের। তক্কে তক্কে ছিল পুলিশ। ১৯০১ সালে টিবলিসিতে এক গোপন মিটিংয়ের সংবাদ পেয়ে পুলিশ সেখানে ধাওয়া করে জোসেফ ও সম্প্রদায়কে ধরার জন্য। জোসেফ কোনোক্রমে পালিয়ে যেতে পারলেও বেশ কিছু সাঙ্গোপাঙ্গ ধরা পড়ে। এই ঘটনার পর জোসেফের উপলব্ধি হয়—গোপনীয়তা আরো বৃদ্ধি করতে হবে, তা না হলে বিপ্লবের ইতি হয়ে যাবে।
স্তালিন; শব্দটির অর্থ ম্যান অব স্টিল, বাংলায় যাকে বলে লৌহমানব। যদিও নামটি তিনি ছদ্মনাম হিসেবে নিয়েছিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে বলশেভিকদের কাছে এই নামেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। জোসেফকে আমরা এখন থেকে স্তালিন বলেই ডাকব। স্তালিন এই ঘটনার পর আত্মগোপন করেন ও আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান।
আত্মগোপনে থেকেই তিনি সংগঠনের কাজ চালিয়ে যান। বিভিন্ন জায়গাতে, যেখানে শ্রমিক আন্দোলন সেখানেই উনি উস্কে দেন শ্রমিকদের, তাদের সংগঠিত করেন ও বিভিন্ন হরতাল ও বিক্ষোভের মাধ্যমে তিনি কর্তৃপক্ষকে ও জারের বাহিনীকে অতিষ্ঠ করে তুললেন। আর এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক নেতাদের মধ্যে প্রবল পরিচিতি পান তিনি। ১৯০১ সালে ‘রাশিয়ান সোশাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির’ কমিটির একজন প্রধান নেতা হয়ে ওঠেন স্তালিন।
১৯০১ সালের নভেম্বরে স্তালিন গোপন আস্তানা পাল্টান। উনি টিবলিসি থেকে জর্জিয়ার বন্দরনগরী বাটুমিতে (Batumi) চলে যান। সেখানে তিনি রথসচাইল্ড তেল শোধনাগারের স্টোরহাউসে (Rothschild oil refinery storehouse ) চাকরি করতে শুরু করেন। কিন্তু স্বভাব যাবে কোথায়? বিভিন্ন শ্রমিকদের দুঃখ-দুর্দশা দেখে দু দু খানি শ্রমিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন তিনি। এর সাথে জারবিরোধী আন্দোলনেরও নেতৃত্ব দেন তিনি। ফলে আবার পুলিশের নজরে পড়েন। আবার উনি আন্ডার গ্রাউন্ডে চলে যান। কিন্তু গোপনে থাকার পরও জারের সিক্রেট পুলিশ বাহিনী ১৯০২ সালের এপ্রিলে স্তালিনকে গ্রেফতার করে ও নির্বাসন দেয় সাইবেরিয়ার জেলে।
স্তালিন যখন সাইবেরিয়ায় কারাভোগ করছেন, তখন রাশিয়ান সোশাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ১৯০৩ তে দ্বিতীয় অধিবেশনে দু ভাগে ভাগ হয়ে যায়- বলশেভিক আর মিনসেভিক। বলসেভিকের নেতা লেনিন, যাঁর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল দেশে সমাজতন্ত্র আনা। মিনসেভিকদের নেতা জুলিয়াস মারটভ ( Julius Martov) ,যারা ছিল কিছুটা নরমপন্থি ও যাদের ধারণা ছিল সমাজতন্ত্র এক দেশে থাকবে, এক দেশে থাকবে না, এটা সম্ভব না, সমগ্র পৃথিবীতেই এটা ছড়িয়ে দিয়ে হবে। বলশেভিকদের গঠন ছিল অনেক মজবুত ও সুদৃঢ়, তুলনায় মিনসেভিকরা দুর্বল তো ছিলই, ক্রমে আরো দুর্বল হয়ে ওঠে।
সাইবেরিয়ায় প্রবল শীতে ও অত্যাচারে যখন স্তালিন বিপন্ন, তখন এই খবর তাঁর কাছে আসে। স্তালিন এটাই চেয়েছিলেন, কেননা ওনার মন ছিল বলশেভিক পন্থী। স্তালিন ভাবেন যে করেই হোক, এখান থেকে পালাতে হবে আর বলশেভিকে যোগ দিয়ে বিপ্লবকে সফল করতেই হবে। কিন্তু সাইবেরিয়ার জেল পালানো অত সহজ না। শুধু কি তাই? সাইবেরিয়ার ধারে কাছে কিছু নেই। মাইলের পর মাইল শুধু ধু ধু প্রান্তর। কাজেই ওখান থেকে পালিয়ে কি ভাবে নিকটবর্তী শহরে আসবেন, সেটাও এক চ্যালেঞ্জ। স্তালিন পালানোর চেষ্টা করেন বেশ কবার, ১৯০৩ সালে তো বেরিয়েই গিয়েছিলেন কিন্তু প্রবল শীতে বরফের জন্য ওনার শরীর ভেঙ্গে পড়ে ও আবার ধরা পড়েন। ১৯০৪ সালের জানুয়ারীতে উনি আবার চেষ্টা করেন পালানোর, এবারের চেষ্টা সফলতা লাভ করে। কখনও হেঁটে, কখনও ট্রেনে, কখনও গাড়ীতে করে এক দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে উনি চলে আসেন টিবলিসি। নিজেকে গোপন রেখে উনি যোগ দেন বলশেভিক পার্টিতে, যার নেতৃত্বে ছিলেন লেনিন।
এবার তিনি আরো বেশী করে ঝাঁপিয়ে পড়েন বিপ্লব সংগঠিত করতে। প্রোপাগান্ডা ছাপানো, শ্রমিকদের সংগঠিত করা, বাকুতে শ্রমিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া ইত্যাদিতে স্তালিন একজন প্রথম সারির নেতা হয়ে ওঠেন। এ ছাড়া স্তালিন জর্জিয়ান মার্ক্সবাদী পত্রিকায় সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। সংগঠনের কাজের জন্য টাকার দরকার, তাই বেশ কিছু অপরাধ মূলক কাজেও উনি উস্কানি দেন, যাতে টাকার জন্য কোনো কিছু আটকে না থাকে। ক্রমে বলশেভিক দলের জর্জিয়ার প্রধান নেতা হয়ে ওঠেন স্তালিন।
১৯০৫ সালে বলসেভিক দলের মিটিংতে জর্জিয়া থেকে পাঠানো হয় স্তালিনকে। এই সম্মেলনেই তিনি প্রথমবার লেনিনের সাক্ষাত পান। লেনিনের প্রতি তাঁর ভক্তি ও শ্রদ্ধা ছিল অসীম, কিন্তু কিছু বিষয়ে স্তালিন দ্বিমত পোষণ করেন, যার কিছুটা লেনিন মেনেও নেন।।

এই সম্মেলনের পর লেনিন, স্তালিনের সাংগঠনিক ক্ষমতা আর সাহসের প্রভুত প্রশংসা করেন। উনি বলেন যে স্তালিন যে ভাবে এগুচ্ছে, একদিন ও নেতৃত্বের পুরোভাগে আসবেই।
১৯০৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের অবস্থা আরো খারাপের পথে এগিয়ে যায়। জার দ্বিতীয় নিকোলাসের অটোক্রেসিতে তখন লোকে আরো গরীব হয়েছে, পেটে অন্ন নেই, কল কারখানাতে প্রচুর খাটুনি কিন্তু শ্রমিকরা মুজুরী পায় না, কাজের পরিবেশ অতি বাজে, মেশিন সব পুরানো ফলে দুর্ঘটনা রোজ লেগেই থাকে। সব দিক থেকে মার খাচ্ছে শ্রমিক- কৃষক- মজদুর , ফলে অসন্তোষ বেড়েই চলেছে। এর মধ্যে জাপানের সাথে যুদ্ধে সোভিয়েতদের পরাজয় দেশকে টেনে নিয়ে গেছে এক অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দিকে। এই সময় স্তালিন মন দেন গেরিলা আক্রমণের দিকে। লোককে বোঝান কিভাবে ছোট ছোট এই আক্রমণ বিপ্লবকে সহায়তা করবে। বিপ্লবের অভিপ্রায়ে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। এটি ১৯০৫ সালের রুশ বিপ্লব নামে পরিচিত।
১৯০৫ সালে পাদ্রী ফাদার জর্জি গাপোনের (priest Father Georgy Gapon) নেতৃত্বে বিরাট এক দল সেন্ট পিটারসবারগতে জমায়েত হয়, উদ্দেশ্য ছিলো জারকে এক পিটিশন দেওয়া। কিন্তু তার আগেই জারের সৈন্যরা জমায়েত ভাঙ্গার উদ্দেশ্যে লোক মারতে শুরু করে। লেগে গেল এক তরফা আক্রমন। জারের সৈন্যদের হাতে অস্ত্র, আন্দোলনকারিদের খালি হাত, ফলে মারা পড়ল কয়েক হাজার লোক, আহত হল হাজার হাজার। এই ঘটনা পুরো সোভিয়েত ইউনিয়নকে নাড়া দেয়, যদিও জার নিকোলাস এর পরেও টিকে যান।
১৯০৬ সালে তিনি সাতাশ বছর বয়সে পা দিলেন। যুবক স্তালিন বিয়ে করে সংসার পাতলেন কেতেভান সানিদজের (Ketevan Svanidze) সাথে। কেতেভান ছিলেন এক গরীব ঘরের মেয়ে এবং এক সংখ্যা লঘু সম্প্রদায়ের। দুজন ছেলে মেয়েও হয়-সভেটলানা আর ভ্যাসিলি ( Svetlana , Vassily)

বিপ্লব চলাকালে ও পরে স্তালিন জর্জিয়াতে বলশেভিকদের সংগঠনকে আরো মজবুত করে এক বাহিনী গড়ে তোলেন, চোরা গোপ্তা আক্রমন চালান সরকারি সেনাদের ওপরে। এ ছাড়া বেশ কিছু ডাকাতিতেও স্তালিনের নাম জড়িয়ে যায়। ১৯০৭ সালে ২৫০,০০০ রুবল ব্যাঙ্ক ডাকাতি তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। পুলিসের নজর এড়াতে স্তালিন পরিবার সহ পালিয়ে আসেন আজেরবাইজানের বাকুতে। দুর্ভাগ্যবশত, কিছুদিন পর তাঁর স্ত্রী টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। সঙ্গিনীহারা স্তালিন তখন মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত। তাই পুরোপুরি মন দেন বিপ্লবে।
স্তালিন বুঝেছিলেন ছেলে সহ বিপ্লব হয় না। তাই উনি শ্বশুর বাড়িতে ছেলে বৌ কে রেখে পুরোপুরি ঝাঁপিয়ে পড়েন বিপ্লবে। এই সময় উনি নাম নেন স্তালিন।
পরের সাত বছর শুধু স্তালিনের বিপ্লবকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া, জেল আর জেল পালানোর ইতিহাস। ১৯১০ সালে স্তালিন আবার পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। ওনাকে বাকুর বৈলভ জেলে পাঠানো হয়। তাতেও স্তালিনকে দমানো যায় নি। জেল থেকেই উনি বিভিন্ন বিপ্লবের নেতৃত্ব দিতে থাকেন। পরের বছর তাই ওনাকে উত্তর রাশিয়ার সল্ভিচেগস্ক(Solvychegodsk) জেলে নির্বাসনে পাঠানো হয় দু বছরের জন্য। কিন্তু তাতেও স্তালিনকে দমানো যায় নি। ১৯১১ সালের জুনে উনি জেল পালান ও আসেন সেন্ট পিটারসবারগতে। কিন্তু ওনার দুর্ভাগ্য, আবার ধরা পড়েন পুলিশের হাতে। এবার আরো কড়া শাস্তি -তিন বছরের জন্য ভলগদা (Vologda). তে নির্বাসন।
স্তালিনের বিভিন্ন আত্মত্যাগ ও সাংগঠনিক ক্ষমতা দেখে উনি ইতিমধ্যে লেনিনের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠছেন। লেনিন বুঝেছিলেন স্তালিনের মধ্যে প্রধান নেতা হওয়ার সব রকম গুন আছে। তাই জেলে থাকাকালীন অবস্থাতেও ১৯১২ সালের জানুয়ারীতে লেনিন ওনাকে বলশেভিক পার্টির সেন্ট্রাল কমিটিতে স্থান দেন। স্তালিন এতে অনুপ্রাণিত হয়ে মরীয়া চেষ্টা চালান জেল পালানোর । ১৯১২ সালে সে প্রচেষ্টা সাফল্য লাভ করে। স্তালিন ফিরে আসেন সেন্ট পিটারসবারগতে আর দায়িত্ব নেন বলশেভিক দের মুখপত্র প্রাভদার(Pravda)।
কিছুদিন পর, ১৯১২ সালের মে মাসে, স্তালিনকে আবার গ্রেফতার করে নির্বাসনে পাঠানো হয়। কিন্তু ওনাকে আটকে রাখার জন্য জেল যথেষ্ট ছিল না। কমাস পর তিনি আরেক বলশেভিক কর্মীর সাথে মিলে আবারও সাইবেরিয়া থেকে পালিয়ে আসেন। আবার ফিরে আসেন সেন্ট পিটার্সবার্গে। প্রাভদার জন্য বিভিন্ন লেখা ও সম্পাদনা করতে থাকেন।
১৯১৩ র জানুয়ারীতে উনি ভিয়েনা চলে যান আর ওখানে একটি আর্টিকেল লেখেন যার নাম “Marxism and the National Question,” লেখার পর স্তালিন ফিরে আসেন সেন্ট পিটারসবারগতে কিন্তু এরপরই ওনাকে আবার ধরা হয়, আর চার বছরের জন্য ফের সাইবেরিয়াতে নির্বাসন।
এর পরের ইতিহাস হল, স্তালিন সাইবেরিয়াতে নির্বাসিত, তারই মাঝে খবর আসে দেশের লোকেদের অবস্থা ক্রমে আরো খারাপের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিপ্লব দানা বাঁধছে একটু একটু করে, কিন্তু স্তালিন সাইবেরিয়াতে অসহায়, লেনিনের বা দেশের কোনো কাজেই আসতে পারছেন না।
১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারী-মার্চ মাসে ঘটে গেল রাশিয়ান বিপ্লব। লেনিনের বলশেভিক দলের নেতৃত্বে জনতা উলটে দিলো জারকে। এই বিপ্লবের মাধ্যমে রোমানভ রাজবংশের শেষ শাসক জার দ্বিতীয় নিকোলাসকে পদচ্যুত করা হয়। এর সাথে সাথে রাশিয়ান সাম্রাজ্যে রোমানভ রাজবংশের তিনশত বছরের শাসনের সমাপ্তি ঘটে। তবে, লেনিনসহ পার্টির প্রধান নেতারা বাইরে থাকায় আর স্তালিনের মতো দক্ষ সংগঠক জেলে থাকায় করায় এই বিপ্লবে বলশেভিকরা খুব একটা সামনে আসতে পারে নি। বন্দী হলেন জার ও তাঁদের পরিবার, জনতার তৈরি রাশিয়ায় নতুন লিবারেল সরকারের (অস্থায়ী সরকার) হাতে। জারের আমল হল শেষ, ক্ষমতা সাময়িক ভাবে গেল লিবারেল সরকারের হাতে, যার কিছুটা বলসেভিক। বিভিন্ন জেল থেকে মুক্তি পেলেন সবাই। স্তালিনেরও বন্দীদশা হল শেষ, উনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন সাংগঠনিক কাজে। স্তালিন নায়কের মর্যাদা পেলেন, যখন উনি লেনিকে উদ্ধার করেন জারের সৈন্যদল যখন ফিনল্যান্ডে লেনিনকে আটকে রেখেছিল।
জেল থেকে ছাড়া পেয়েই সেন্ট পিটার্সবার্গে এসে পুনরায় প্রাভদা পত্রিকার নিয়ন্ত্রণ নেন স্তালিন। এবার লেনিনের সঙ্গে একসাথে পথচলা শুরু হয় স্তালিনের। ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকেন।
ইতিমধ্যে স্তালিন আরো জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন শ্রমিকের মাঝে। এ সময় রাশিয়ান সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক লেবার পার্টির (বলশেভিক) নাম পরিবর্তন করে ‘কমিউনিস্ট পার্টি’ রাখা হয়। রাশিয়ার নতুন সরকার লেনিন সহ কোনো বলশেভিকদের পছন্দ ছিলো না। তাই পুনরায় বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে কমিউনিস্ট সরকার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন লেনিন।
১৯১৭ সালের ২৬ অক্টোবর বলশেভিকরা ক্ষমতা দখল করল অক্টোবর বিপ্লবে, লেনিন হলেন প্রধান নেতা। লেনিন ক্ষমতায় এসেই স্তালিনকে সেক্রেটারি (General Secretary) পদে নিযুক্ত করলেন। লেনিন দেশের নাম পালটে রাখলেন রাশিয়ান রিপাবলিক। (Russian Soviet Federative Socialist Republic (RSFSR) ) লেনিন নিজেকে নতুন সরকারের চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন। বলশেভিক বিরোধীরা এই সরকারকে সমর্থন করেনি। বলশেভিকদের ক্ষমতা দখলের পর তাদের বিরুদ্ধে ডানপন্থী, লিবারেল এবং সাম্রাজ্যবাদীরা একজোট হয়ে তৈরি করে ‘হোয়াইট আর্মি’। শুরু হয় রাশিয়ার গৃহযুদ্ধ- রেড আর্মি আর হোয়াইট আর্মি পরস্পরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। দেশে তখন অবস্থা আবার খারাপের দিকে। কিন্তু স্তালিন এই সুযোগে শ্রমিকদের সংগঠিত করে ক্রমশই লেনিন, ট্রটস্কির মতো প্রভাবশালী নেতা হতে থাকেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তখনও চলছে। গৃহযুদ্ধে সেনা অফিসার হিসেবে যোগদান করেন স্তালিন। যুদ্ধে বলশেভিকদের পক্ষে সেনাপতি হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন স্তালিন। যদিও এর আগে স্তালিনের কোনো সামরিক অভিজ্ঞতা ছিল না। গৃহযুদ্ধকালীন স্তালিন ছিলেন নির্দয়। কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে স্তালিন সন্ত্রাসের আশ্রয় নেন বিরোধীদের দাবিয়ে রাখতে। যেখানেই লাল ফৌজ বিপদে পড়েছে, সেখানেই স্তালিন তাদেরকে উদ্ধার করেছেন, এবং প্রয়োজন মতো চরম নিষ্ঠুর আচরণে হোয়াইট আর্মিকে আটকেছেন। স্তালিন কোনো সামরিক নেতা ছিলেন না কিন্তু তাঁর বুদ্ধি ছিল তীক্ষ্ণ, ফলে শত্রুপক্ষ ভাবার আগেই তিনি তাকে আটকে দিতে পারতেন। যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের জন্য ১৯১৮ সালের স্তালিনকে মিলিটারীর সেরা খেতাব ‘অর্ডার অব দ্য রেড ব্যানার’ পদকে ভূষিত করা হয়।
স্তালিন ক্রমেই লেনিনের ঘনিষ্ঠ হতে থাকেন। ট্রটস্কির মতো প্রভাবশালী নেতাকে পিছনে ফেলে স্তালিন তখন দু নাম্বার নেতা। স্তালিনের সাংগঠনিক দক্ষতার প্রতি ছিল লেনিনের প্রগাঢ় বিশ্বাস। দেশে বিরোধী পক্ষকে আটকানোর জন্য লেনিন গুপ্ত পুলিশবাহিনী গঠন করেন,শুরু হয় রেড টেরর রাজ আর স্তালিন ছিলেন তার তীব্র সমর্থক । ক্রমে সংখ্যালঘু জাতিসমূহকে তাঁদের প্রতি আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেন। এই সুযোগে অনেকগুলো জাতি স্বাধীনতা ঘোষণা করে দেয়। কিছুদিন পর, গৃহযুদ্ধ চলাকালে লেনিন আট সদস্যের একটি পলিটব্যুরো গঠন করেন, যেখানে স্তালিন ছিলেন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। কয়েকমাস পর রাশিয়ার রাজধানী সেন্ট পিটার্সবার্গ থেকে সরিয়ে মস্কোতে স্থানান্তরিত করা হয়।

১৯২১-২২ সালে রেড আর্মি খাদ্য সংকটে পড়ে। যুদ্ধকালীন খাদ্য সরবরাহকে নিরাপদ রাখতে স্টালিনকে দক্ষিণ রাশিয়ার খাদ্য সংগ্রহের দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়। তিনি খাদ্য সংগ্রহ কর্মসূচি নিশ্চিত করার জন্য ছলে বলে, না হলে অস্ত্রর জোরে খাবার সংগ্রহে নামেন। বেশ কয়েকটি গ্রামে অগ্নিসংযোগেরও নির্দেশ দেন খাবার না দেওয়ার জন্য, আর সেখানে বিরোধীতা মানেই মৃত্যু ।
এদিকে ক্রমেই স্তালিন ও ট্রটস্কি একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে থাকেন। বিভিন্ন বিষয় কেন্দ্র করে স্তালিন ও ট্রটস্কির মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়। এরপর থেকে স্তালিন ট্রটস্কির বিরুদ্ধে ফন্দি আটতে থাকেন ওনাকে আটকানোর।
অনেকদিন ধরেই সংসারবিহীন ছিলেন স্তালিন। ১৯০৭ সালে তার প্রথম স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তিনি আর বিয়ে করেননি। এ সময় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য নাদেজদা অলিলুয়েভার (Nadezhda Alliluyeva) প্রতি বেশ আকৃষ্ট হন তিনি। নাদেজদা ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য এবং স্তালিনের সেক্রেটারি। ১৯১৯ সালে স্তালিন ও নাদেজদা অলিলুয়েভা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
১৯২২ সালে রাশিয়ান ফেডারেশনের নাম পালটে রাখা হয় সোভিয়েট ইউনিয়ন (Soviet Union (USSR)), লেনিন চেয়েছিলেন নাম থাক ইউনিয়ন অফ সোভিয়েত রিপাবলিক (Union of Soviet Republics of Europe and Asia) কিন্তু স্তালিন প্রস্তাব দেন নতুন নামের – ইউ এস এস আর( the Union of Soviet Socialist Republics)।
১৯২৪ সালে লেনিন মারা যান । স্তালিনকে আর আটকানো যায় নি। ট্রটস্কিকে সরিয়ে স্তালিন লেনিনের জায়গাতে আসেন। ১৯২৪ সাল থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের জয়যাত্রা শুরু হয়।
” শুধু আমার দেশ নিয়ে আমি ভাবব, সমাজতন্ত্র আমার দেশে আসুক ” এটা ছিল জোসেফ স্তালিনের একটি নীতি, যেখানে বিশ্বজুড়ে বিপ্লবের উপর জোর না দিয়ে, শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সমাজতন্ত্রকে শক্তিশালী করার ওপর ছিলো ওনার নজর।
স্তালিনের পরের বছরগুলি মানে ১৯২৪ থেকে ১৯৫৩ হচ্ছে শুধু উত্থানের ইতিহাস- তাঁর নিজের তো বটেই তার সাথে সমগ্র সোভিয়েতের। বিরোধী বলে কিছু স্তালিন রাখতে চাইতেন না। তাঁর নির্যাতনের হাত থেকে বাদ যায়নি কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শবাদী শীর্ষস্থানীয় নেতা থেকে বেসামরিক আমলা এবং সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা পর্যন্ত। বহু কমিটি সদস্য, জেনারেলকে উনি সরিয়ে দিয়েছেন, যারা ওনার বিরোধিতা করতে এগিয়েছে। কয়েক লাখ লোক, যারাই কমিউনিজমের বিরোধিতা করেছে তাদের হয় সাইবেরিয়া পাঠিয়েছেন বা তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় নি। জারের অত্যাচার থেকে বাঁচতে যে মানুষগুলো একসময় কমিউনিস্টদের সমর্থন দিয়েছিল, পরবর্তীতে তারাই স্তালিনের আমলে জারের আমলের চেয়ে বেশি অত্যাচারিত হয়েছে।
স্তালিনের দ্বিতীয় বিয়ে কিন্তু সুখের হয় নি। নাদেজদার ওপর ওনার অত্যাচার ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছিল আর তার থেকে মুক্তি পেতে নাদেজদা আত্মহত্যার পথ বেছে নেন ১৯৩২ সালে, যদিও শোনা যায় স্তালিন এটা রোগে মৃত্যু বলে চালানোর চেষ্টা করেন। স্ট্যালিনকে সাধে কি আর লৌহ মানব বলে? ওনার ছেলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানদের হাতে ধরা পড়ে। যখন জার্মানরা বলেন ওনার ছেলের সাথে অন্য বন্দি বিনিময় করতে, স্তালিন রাজী হন নি। ওনার বিশ্বাস ছিল ছেলে স্বেচ্ছায় ধরা দিয়েছে তাই ওনার পাষাণ হৃদয় গলে নি। পরে ওনার ছেলে নাৎজি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে মারা যান ১৯৪৩ সালে।
১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে স্তালিন জার্মানির সাথে চুক্তি করেন যে জার্মানি আর সোভিয়েত পূর্ব ইউরোপ ভাগ করে নেবে, কেউ কাউকে আক্রমণ করবে না। ওনাকে অনেক নেতারা বারণ করা স্বত্বেও জার্মানির সাথে সংঘাতে যান নি। কিন্তু জার্মানি ইউরোপে অপরাজেয় থাকায় ওরা পুরো ইউরোপের দখল পেতে পোলান্ড হয়ে রাশিয়া আক্রমন করে বসে। সোভিয়েত এর কিছু অঞ্চল অচল হয়ে থাকে, সংকট দেখা যায়। এই ঘটনা স্তালিনকে প্রবল বিচলিত করে, তাই উনি অর্ডার দেন, যে কোনো মূল্যেই হোক জার্মানিকে আটকাতে হবে। ততদিনে জার্মানি সৈন্যরা মস্কোর দোরগোড়ায়। সবাই স্তালিনকে বলেন মস্কো ছেড়ে যেতে কিন্তু উনি অটল থাকেন- বলেন হয় ওরা মরবে না হলে আমরা। আমার লাল ফৌজের এক জন সেনাও যদি বেঁচে থাকে, আমি আটকাব জার্মানদের। আমরা এক পা-ও পিছু হটব না। স্তালিন ও লাল ফৌজের প্রবল চাপে ও ছাড়ব না মানসিকতায় জার্মানদের পরাজয় ঘটে ১৯৪৫ সালে। এর পর থেকে সোভিয়েতদের আবার এগিয়ে চলা। কৃষি, রেল, শিল্প সব দিকেই ওরা এগিয়ে চলেছে তরতরিয়ে। ১৯৪৯ সালে আণবিক বোমা পরীক্ষার সাথে সাথে ইউরোপ আমেরিকার সাথে মন কষাকষির শুরু।

স্টালিনের শাসনকালে, বিশেষ করে যুদ্ধের সময়, রেলওয়ের কৌশলগত গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। স্তালিন রেলে চাপতে খুব ভালো বাসতেন, ওনার একটি ব্যক্তিগত, অত্যন্ত সুরক্ষিত রেল কোচ ছিল, যেটা মিউজিয়ামের বাগানে সংরক্ষিত আছে, তার একটি ছবি দিলাম।

ওনার সাথে থাকত এক সুটকেস। তার ছবি দিলাম।

১৯৫০ সাল থেকে স্তালিনের শরীরের অবনতি হতে থাকে। ১৯৫১ সালে উনি ডাক্তার দেখালে ডাক্তার বলেন ওনার ইতিমধ্যে একটা স্ট্রোক হয়ে গেছে তাই কাজ ছেড়ে বিশ্রাম নিতে। এতে স্তালিন মনে করেন ডাক্তার হচ্ছে বিদেশের গুপ্তচর ও তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য এটা এক চক্রান্ত। ফলে ডাক্তারের ভাগ্যে জুটল কারাবাস। স্তালিন মানতে চাইতেন না তাঁর শরীর খারাপ হতে পারে।
এরপর থেকে উনি একটুতেই সন্দেহ করতেন সবাইকে। ফলে ওনার সঙ্গে অনেকের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে।
অবশেষে ১৯৫৩ সালের ৫ মার্চ স্তালিনের জীবনের অবসান ঘটে। স্তালিনের মৃত্যু সেসময় সারা দুনিয়ার খবর হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। ১লা মার্চ স্তালিন বন্ধুদের সাথে সারারাত মদ্যপান করেন, তার পর ভোর প্রায় ৫টার দিকে স্তালিন নিজের কক্ষে প্রবেশ করেন। এরপরই তাঁর স্ট্রোক হয়। পরদিন তাঁর কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে একজন তাঁর ঘরের দরজা খুলে ভেতরে স্তালিনকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেন। তখনই তিনি আংশিক প্যারালাইজড ছিলেন এবং তাঁর জ্ঞান ছিলো না বললেই চলে। ডাক্তারদের অনেক চেষ্টার পরও ৫ মার্চ দিনের শেষভাগে স্তালিন মৃত্যুবরণ করেন।
মিউজিয়াম দেখা শেষ। অনেক জানলাম,বুঝলাম। এত বড় এক নেতা, কিন্তু কি বিতর্কিত অথছ কর্মময় জীবন!
গাড়ি চেপে রওনা হলাম টিবলিসির দিকে। সাথে রইল স্তালিনের স্মৃতি আর মনে ভাসছে স্তালিনের ওপর লেখাঃ
A human can not live forever, so I will die as well. What will be the verdict of people and history be? There were lot of mistakes but we has success as well. The mistakes will be ascribed to me, my grave will be hurled by rubbish, but the day will come when the wind of history will throw away the rubbish.

কৃতজ্ঞতা স্বীকার
১। https://www.historytoday.com/archive/months-past/death-joseph-stalin
২।https://www.bbc.co.uk/teach/articles/zhv747h
৩।https://archive.roar.media/bangla/main/biography/biography-of-stalin-part-one
৪।https://archive.roar.media/bangla/main/biography/biography-of-stalin-part-two
৫। ছবি- স্তালিন মিউজিয়াম থেকে তোলা

[পরম্পরা ওয়েবজিন, ডিসেম্বর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]
