গত পর্বে লেখার সময় একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গার কথা লিখতে ভুলে গেছি। সেটা হলো তাওয়াং থেকে তেজপুর আসার পথে সেলা টুইন টানেল অতিক্রম করা। পৃথিবীর
সবচেয়ে লম্বা টুইন টানেল! গত নয়,মার্চ এই টানেল উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
এতে যাতায়াত প্রায় এক ঘন্টা সময় কমিয়েছে, তেজপুর আসতে। চীন ভারত সীমান্তে সৈন্য সরঞ্জাম, পরিবহন অনেকটাই দ্রুত হবে। প্রায় ১৩০০ ফুট উঁচু তে একটি ১৫৯৫মিটার, অপরটি ১০০৩মিটার!

টানেল এর কাছে চারিদিক বরফে ঢাকা! আসতে আসতে মুখের দিকে এলাম, অসাবধান হলেই পা হড়কে যাবে!
বোর্ডে লেখা আছে,১৯৬২ তে চিন ভারত যুদ্ধে যশোবন্ত সিং রাওয়াত একা বীরত্বের সঙ্গে এইখানে লড়াই করে ওদের ঠেকিয়েছিল, স্থানীয় দুই মোনাপা জাতির ছোট মেয়ের সাহায্যে। তাদের নাম সেলা আর

নূরা!যশবন্ত যুদ্ধে শহীদ হন। মরণোত্তর মহাবীর চক্র প্রদান করা হয়। সেলা ঐখানে মারা যায়। নূরা কে চাইনিজ
রা বন্দী করে। ওই সেলার নামেই এই টানেল রাখা হয়!
এই সাফারি জুন থেকে সেপ্টেম্বর বন্ধ থাকে।
এখন কাজিরাঙ্গায় লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। হাতির পিঠে সব বসার সিট ঠিকঠাক হতে দেরী হচ্ছে! আগে খবর নিয়েছি, এই সাফারি কয়েক জায়গায় হয়।
যেমন আমরা ওয়েস্টার্ন দিক যাব। তেমনি সেন্ট্রাল, ইস্টার্ন, পানবাড়ি এই সব দিকেও সাফারি হয়, বিভিন্ন সময়ে। সবচেয়ে ভিড় থাকে সেন্ট্রাল জোন এ, কারণ ঐখানে বাঘ দেখার সম্ভাবনা বেশি থাকে।
পাঁচটা প্রধান জন্তু এই জঙ্গলে বিখ্যাত! এক শৃঙ্গ
গণ্ডার!হাতি, বন্য মোষ, রয়াল বেঙ্গল বাঘ, আর সোয়াম্প হরিণ
এ ছাড়া গাউর, বুনো শুয়ার, বেজী, সাদা ভুরু গিবন, লাঙ্গুর, চিতা বাঘ, শজারু, ভাল্লুক এদেরও দেখা যায়! তবে বনে যারাই গেছেন তাঁরা জানেন কি দেখতে পাবেন সেটা আপনার ভাগ্য! এমনও হয়, কিছুই দেখতে পেলেন না! মুখ গোমড়া করে আপনি হোটেল ফিরে এলেন! হাঁসবেন না। সত্যি কথা। গির ফরেস্ট এই আমরা হাত দশেক দূরে পুরো সিংহ পরিবার দেখেছি অর্ধেক গাউর খেয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে। বাচ্চা গুলো মায়ের দুধ খাচ্ছে! আর একসঙ্গে বেরিয়ে অন্য দিকে একদল কিচ্ছু না দেখতে পেয়ে গম্ভীর, গোমড়া মুখে বসে চা খাচ্ছে!!
হ্যাঁ এবার এক একে ডাক পড়ল। একটু উঁচু প্লাটফর্মে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হবে। তার গায়ে পাশা পাশি দুজন কর্তা গিন্নি বসলাম! ও বাবা হাতি মহারাজ কে কিছু বলতে হল না, নিজেই ঘুরে অন্য দিকে দুজন কে নিয়ে নিল। সামনে লোহার একটা শিক আটকে দিল, আবার বলল এটা ধরবেন না, হ্যাঁ এই অরণ্যের কর্মচারী রা সাহায্য করছে!
অতঃপর দুলকি চালে মহারাজ চলতে থাকে! আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে! পূবের আকাশ সামান্য রাঙ্গা হয়েছে! মামা বাবু উঠতে গড়িমসি করছেন! আবার না উঠলেও সব অন্ধকার! বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে হালকা কুয়াশায় একটু ঝাপসা! ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে! আমি শীত কাতুরে, মাফলার দিয়ে নাক ঢেকেছি। পাশের জন বলছেন, কি সুন্দর ঠাণ্ডা! হাতি বাবু এত সুন্দর যাচ্ছেন, মনে হচ্ছিল হাতি কিনে চারবাতির চেম্বার যাব! হাতির খরচ ভেবে মাথা থেকে সরালাম!
কত ছোট বড় জলাশয়, এই ভোরেই এক পাখি ছো মেরে জল থেকে মুখে মাছ নিয়ে উড়ে গেল!
এই যাবার এক নির্দিষ্ট পথ আছে! আশে পাশে নানান ঝোপ ঝাড়, গাছ আর বড় বড় ঘাস! ইতিমধ্যে রবি মামা উঠেছেন! রঙের খেলা দেখাচ্ছেন! এই প্রকৃতির
বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নেই, বন্ধু সাহিত্যিক কাজী ইসলাম থাকলে দারুন লিখে ফেলতেন!

ধৈর্য ধরে থাকার পর, আমার হাতি ই দাঁড়িয়ে গেলো।
দূরে এক ফাঁকা মাঠে এক বুনো বিরাট হাতি মন মরা হয়ে যেন দাঁড়িয়ে আছে! সঙ্গী না থাকলে তাই তো হয়!
আমার হাতি যেন বলছে “দেখো একটা দেখলাম!”
আশ পাশের হাতি সোয়ারি আমাদের ফটো তুলছে আমিও তুলছি ওদের, একহাতে। আর এক সিট টা ধরে!
মনে হলো হাত থেকে না মোবাইল পড়ে যায়, এমন দুলুনি হচ্ছে। এবার একটু দূরে এক ঝাঁক হরিণ জড়ো হয়ে পাতা খাচ্ছে, আমাদের ছবি তোলা দেখছে !কিছু বড় গাছের মাথায় নানান পাখি ভোরের রোদ খাচ্ছে। বন্ধু সোমনাথ থাকলে সব পাখির নাম বলে দিত! এইবার একটা জায়গায় কার্নিক দিয়ে হাতি বাবা ঢুকলো, সেখানে বিরাট বিরাট গাছের ডাল শিশিরের ছোঁয়া দিয়ে গেল আমাদের শরীরে!
তার পরেই তিনি! মানে এক শৃঙ্গ গণ্ডার! বিপুল বপু নিয়ে কিছু নিয়ে প্রাতরাশ সারছে! সামনেই জলাশয়।
গিন্নি আছে, জলের মধ্যে। দুর থেকে খেয়াল রাখছে কর্তার!
প্রচুর কথা বলতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু না ,বনের ভেতর মুখ টিপে দেখতে হয়! কথা বলতে নেই! সবাই সেটা মেনেছে!
প্রায় ঘন্টা খানেক ঘুরে আবার ওই উঁচু জায়গায়
আসতে সবাইকে নামাতে সাহায্য করলো বনকর্মী।
শীতের ঠাণ্ডার সাথে রবি মামার হালকা রোদে অপূর্ব অনুভূতি হচ্ছিল, দুঃখ রইলো ঠিক মতো বর্ণনা দিতে পারলাম না!

গত কাল রাত্রে কোম্পানি গ্র্যান্ড ফিস্ট দিয়েছিল গ্র্যান্ড ফিস্ট নাম শুনলেই আমার বেনেপুকুর হোস্টেল এর কথা মনে পড়ে। ছেলেদের হোস্টেল এ সারা মাস যা ইচ্ছা খাওয়ায় কিছু মনে করে না। মাসের শেষ দিনে গ্র্যান্ড ফিস্ট দিতেই হবে! তবেই মেস ম্যানেজার এর নিষ্কৃতি। আর আমি নিজেই মাঝে মাঝে মেস ম্যানেজারের দ্বায়িত্ব পালন করেছি! তার গল্প পরে বলব।
কালকের মেনু টা শুনুন। ছোটো নান, মটর কড়াইয়ের ঘুগনি, পনির পাসিন্দা, ফিশ ফ্রাই, সাদা ভাত, মাছের কালিয়া, বাসন্তী পোলাও, নরম গরম পাঁঠার মাংস,
(যত খুশি) চাটনি, পাঁপড়, গরম পান্তুয়া, ফ্রুট সালাদ, লাস্ট এল জল জিরা, হজমি গুলি!!
তো পেটের অবস্থা বুঝতেই পারছেন! এবার হাতির পিঠে চেপে ঘুরবো বলে ভোর চারটে বেরিয়েছি! মানে রাত তিনটে থেকে জেগে!
এবার মজা করে হাতির পিঠে চেপে, কাজীরঙ্গা ঘুরে আনন্দ পেলাম খুব!
হোটেল ফিরে এসে একদম বিছানায় লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে হাতির দুলুনি অনুভব করছি! হঠাৎ সিদ্ধার্থ এসে ঠেলা দিয়ে তুলল! “ব্যানার্জি দা, বিহু দেখতে যাবেন না?”। হ্যাঁ হ্যাঁ যাব, যাব। আসামে এইচি, আর বিহু দেখবনি? নিশ্চয় দেখবো। বলে উঠে পড়লাম!
ভাবলাম হোটেলেই বিহু ড্যান্স হবে! সিদ্ধার্থ বলল লাঞ্চের পর গাড়ি আমাদের নিয়ে যাবে সরকারি সংস্কৃতির ভবনে। সেখানে মাথা পিছু আড়াইশো টাকা দিয়ে টিকিট কেটে দেখতে হবে!
যাইহোক শরীর সায় দিচ্ছে না, কিন্তু মন বলছে, এ সুযোগ পাবি না রে পাগলা, দেখে আয়!
মনের কথা মেনে বাইরে এলাম। হোটেলের উল্টো দিকে বিরাট চা বাগান। আসামের চা বিখ্যাত! ওখানে গিন্নি রা সবাই ছবি তুলতে লাগলো। ওখানেই জীবনে প্রথম মরিচ গাছ দেখলাম! লতানে গাছ, বড় গাছের গা জড়িয়ে উঠে গেছে। কিছু মরিচ পাড়লাম। এগুলো সবুজ, শুকিয়ে গেলে কালো হবে। বাড়ি এসে টেস্ট করেছিলাম, দারুন! আফসোস হচ্ছিল আরো খানিক জোগাড় করলে হতো!
এবার গাড়ী আসতে চললাম আসামের লোক নৃত্য, তার সাথে ভারতের সব চেয়ে বড় ক্যাকটাস সংগ্রহের বাগান!


সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, সেপ্টেম্বর ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]