
সবুজ বিপ্লবের আদর্শগত বিচ্যুতি: কর্পোরেট দাসত্বে ভারতীয় কৃষি
ভারতে সবুজ বিপ্লবের শুরু হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে, যার প্রধান লক্ষ্য ছিল দ্রুত খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করে দেশের খাদ্য ঘাটতির মোকাবিলা করা এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। মূলত এটি ছিল উচ্চ-ফলনশীল বীজ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক এবং উন্নত সেচ নির্ভরশীল একটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। তৎকালীন সময়ের নিরিখে এই উৎপাদন-কেন্দ্রিক পরিকল্পনাটি অত্যন্ত সফল হয়। সরকার ব্যাপক ভর্তুকি দিয়ে কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করে, যার ফলে খাদ্যশস্যের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এই সাফল্যের কারণে ভারত শুধু খাদ্যের আমদানি-নির্ভরশীলতা থেকেই মুক্তি পায়নি, বরং কিছু ক্ষেত্রে খাদ্যশস্য রপ্তানিও শুরু করে। তবে, রাষ্ট্রের (সরকারের) আর্থিক সহায়তায় চালিত এই কৃষি বিপ্লবটি রাসায়নিক পদার্থের (সার ও কীটনাশক) উপর অত্যধিক নির্ভরশীল ছিল, তাই তা বহুজাতিক সার ও কীটনাশক সংস্থাগুলিকে (কর্পোরেট কোম্পানি) বাজারে প্রবেশ করার সুযোগ করে দেয়। পরবর্তীকালে বোঝা যায় ভারতীয় কৃষির কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণের দিকে যাওয়ার এটিই ছিল প্রথম পদক্ষেপ।

বর্তমানে আলোচিত ‘দ্বিতীয় সবুজ বিপ্লব’ সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এটি একটি বাজার-কেন্দ্রিক এবং কর্পোরেট-নেতৃত্বাধীন মডেল, যার প্রধান লক্ষ্য হলো কৃষিখাতকে বৃহৎ পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে উন্মুক্ত করা এবং সেখান থেকে মুনাফা অর্জন করা। প্রথম বিপ্লবে যেখানে খাদ্য নিরাপত্তা মূল লক্ষ্য ছিল, দ্বিতীয় বিপ্লবে বাজারের চাহিদা ও মুনাফাই মূল চালিকাশক্তি। এই মডেলে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড (জি এম) বীজ, ডেটা-নির্ভর প্রেসিশন ফার্মিং এবং চুক্তিচাষের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই কর্পোরেট-নেতৃত্বাধীন কৃষি সরকারি নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ অপসারণ করে কৃষির মূল কাঠামোতে বহুজাতিক পুঁজির একচেটিয়া আধিপত্য নিশ্চিত করতে চাইছে। এর ফলে, কৃষকদের স্বাধীনতা বিপন্ন হচ্ছে এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য গৌণ হয়ে যাচ্ছে।
কৃষি কাঠামোতে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ ও শোষণ
কর্পোরেট সংস্থাগুলি ভারতীয় কৃষিখাতে নিজেদের প্রভাব ও শোষণকে দীর্ঘমেয়াদী করার জন্য একটি সুপরিকল্পিত এবং বহুমাত্রিক কৌশল অবলম্বন করেছে। এই কৌশলগুলি অর্থনৈতিক, আইনি, জিনগত এবং সামাজিক ভাবে কৃষকদের স্বাধীনতা ও স্বনির্ভরতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
জিনগত নিয়ন্ত্রণ ও ‘বীজ দাসত্ব’: কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক ও জোরালো আঘাতটি আসে বীজ সার্বভৌমত্বের উপর। মনস্যান্টো, বেয়ারের মতন বহুজাতিক বীজ কোম্পানিগুলি বাজার থেকে স্থানীয় জাতের বীজ সরিয়ে দিয়ে পেটেন্ট করা এবং জেনেটিক্যালি মডিফায়েড বীজ চালু করেছে । এই পেটেন্ট করা বীজগুলির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলি সাধারণত একবারই ব্যবহার করা যায়। এর ফলে, বীজ সংরক্ষণ ও বিনিময়ের ঐতিহ্যবাহী প্রথা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে যায় এবং কৃষককে প্রতি বছর নতুন করে বীজ কিনতে বাধ্য করা হয়। এই বাধ্যতামূলক ক্রয়ের চক্র ক্ষুদ্র কৃষকদের ওপর স্থায়ী আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে এবং তাদের ক্রমশ কর্পোরেট বীজ কোম্পানিগুলির ‘বীজ দাসে’ পরিণত করছে। আইনি বৈধতা দিতে এর পিছনে ব্যবহার করা হয় কৃষি আইন এবং মেধা সম্পত্তি অধিকার সংক্রান্ত নিয়মকানুন।
উপরন্তু, কর্পোরেট মডেল একফসলি চাষকে উৎসাহিত করায়, স্থানীয় ও জলবায়ু-সহনশীল দেশি জাতের বিলুপ্তি ঘটছে। কৃষি বৈচিত্র্যের এই চরম হ্রাস কৃষি ব্যবস্থাকে রোগ, কীটপতঙ্গ এবং চরম আবহাওয়ার মুখে অত্যন্ত ভঙ্গুর করে তোলে। এর ফলে ফসল নষ্টের সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায় এবং কৃষকের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
চুক্তিচাষের ফাঁদ ও শ্রমদাসে রূপান্তর: কর্পোরেট পুঁজি সরাসরি জমিতে বিনিয়োগ না করেও চুক্তিচাষের মাধ্যমে কৃষকের উৎপাদন থেকে বিপণন সবটা নিয়ন্ত্রণ করে। চুক্তিচাষের শর্তাবলী সবসময় কর্পোরেট সংস্থার অনুকূলে তৈরি হয়, যেখানে কৃষকের দর কষাকষির ক্ষমতা প্রায় থাকেই না। চুক্তি অনুযায়ী ফসল উৎপাদন করার পরেও, কর্পোরেট সংস্থাগুলি প্রায়শই ‘গুণগত মান’, ‘আর্দ্রতা’, ‘আকার’-এর মতো অস্পষ্ট মানদণ্ড ব্যবহার করে ফসল প্রত্যাখ্যান করে বা দাম কমাতে চাপ সৃষ্টি করে। এই অবস্থায় কৃষক দ্রুত পচনশীল ফসল নিয়ে খোলা বাজারে যেতে বাধ্য হন এবং মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। অন্যদিকে, কর্পোরেট সংস্থাগুলি তাদের নিজস্ব কৃষি উপকরণ (বীজ, সার) ঋণের মাধ্যমে কৃষকদের সরবরাহ করে। যদি ফসল প্রত্যাখ্যাত হয় বা প্রাকৃতিক কারণে নষ্ট হয়, তবে ফসলের ব্যর্থতার সম্পূর্ণ আর্থিক ঝুঁকি কৃষকের উপর বর্তায়। অথচ কৃষি উপকরণ বিক্রির মাধ্যমে কর্পোরেট সংস্থাগুলির মুনাফা নিশ্চিত থাকে। এই ক্ষতি ও ঋণের চক্র কৃষককে পরবর্তী মরসুমেও একই কর্পোরেট সংস্থার সঙ্গে চুক্তি করতে বাধ্য করে, যা কৃষককে নিজের জমিতে কাজ করেও কার্যত শ্রমদাসে পরিণত করে।

কৃষি উপকরণের নিয়ন্ত্রণ ও শোষণ: বৃহৎ কৃষি-বাণিজ্যিক সংস্থাগুলি বিশ্বব্যাপী বীজ, সার এবং কৃষি রাসায়নিক বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের জোট, অনায়াসে এগুলির চড়া মূল্য নির্ধারণ করতে দেয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে ভারতীয় কৃষকদের উপর। কর্পোরেট সরবরাহকৃত কৃষি উপাদানের উচ্চ মূল্যের কারণে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকে। এই খরচের বৃদ্ধি কৃষকদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয় এবং তাদের ঋণগ্রস্ত করে তোলে।
জি এম বীজের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ, চুক্তিবদ্ধ শ্রমের মাধ্যমে শোষণ এবং বাজার দখলের মাধ্যমে অর্থনৈতিক আধিপত্য—ভারতীয় কৃষকদের উপর এই ত্রিমুখী নিয়ন্ত্রণ কর্পোরেট কর্তৃত্বকে স্থায়ী এবং অপরিবর্তনীয় রূপ দিচ্ছে।
কর্পোরেট আগ্রাসনে সরকারের ভূমিকা
কর্পোরেট পুঁজির এই অনুপ্রবেশ এবং শোষণকে রুখতে সরকার ব্যর্থ। সরকার যে নীতিগুলি তৈরি করছে, তা বরং সরাসরি বা ঘুরিয়ে কর্পোরেটকে সমর্থন করছে। সরকারের এই নেতিবাচক ভূমিকা কৃষকদের সুরক্ষার ব্যবস্থাগুলিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
সরকার নীতি তৈরি করার সময় প্রায়ই আন্তর্জাতিক সংস্থা বা বড় কর্পোরেটদের কথা বেশি শোনে। ফলে কৃষকের সুবিধার চেয়ে বাজারকে কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়াই মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। কৃষি বিপণন কমিটি বা এপিএমসি কৃষকদের জন্য একটি ঐতিহাসিক ঢাল হিসেবে কাজ করত। এর মাধ্যমে কৃষকরা স্থানীয় বাজারে ফসলের একটি নিশ্চিত দাম পেতেন এবং কেনাবেচায় স্বচ্ছতা থাকত। সরকার এখন এপিএমসি-এর মতো সুরক্ষার ব্যবস্থাগুলি ভেঙে ‘দেশজুড়ে এক বাজার’ তৈরির চেষ্টা করছে। এর ফলে কর্পোরেট পুঁজি সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে যত খুশি পণ্য কেনার সুযোগ পাবে। এপিএমসি-এর সুরক্ষা উঠে গেলে, ক্ষুদ্র কৃষকদের তখন বড় কর্পোরেট ক্রেতাদের দয়ার ওপর নির্ভর করতে হবে এবং ফসলের ন্যায্য দাম পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
চুক্তিচাষের মতো নীতিগুলিতে আইনি ব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে কৃষকরা কর্পোরেট সংস্থার বিরুদ্ধে সহজে মামলা করতে না পারেন। আইনে বলা আছে, বিবাদ হলে প্রথমে নিম্ন প্রশাসনিক স্তরে (যেমন সাব-ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট) তার নিষ্পত্তি হবে, যা কার্যকরভাবে কৃষকদের উচ্চ আদালতে যাওয়ার পথ বন্ধ করে দেয়। এই কর্পোরেট-অনুকূল নীতি বিচারের দিক দিয়ে কৃষকের সমান অধিকারকে বাধা দেয়।
সরকার প্রতি বছর কৃষি খাতে বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি দিলেও, এই অর্থ ঠিকভাবে খরচ হয় না। বরং এটি কর্পোরেট বীজ ও সারের ওপর কৃষকদের মুখাপেক্ষী করে তোলে এবং পরিবেশ বান্ধব চাষে বাধা দেয়। ইউরিয়া বা বিদ্যুতের ওপর যে ভর্তুকি দেওয়া হয়, তার মূল সুবিধা শেষ পর্যন্ত রাসায়নিক সার উৎপাদনকারী কর্পোরেট কোম্পানিগুলির মুনাফা বাড়াতে সাহায্য করে। এই ভর্তুকির ফলে বাজারে সস্তায় রাসায়নিক সার, কীটনাশক পাওয়া যায়, যা কৃষকদের রাসায়নিক উপকরণের প্রতি আসক্তি জন্মায়। এর ফলে প্রাকৃতিক বা জৈব চাষের মতো পরিবেশ-বান্ধব পদ্ধতিগুলি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে যায়। সরকার মুখে প্রাকৃতিক চাষের কথা বললেও, রাসায়নিক সারের ওপর বিপুল ভর্তুকি জিইয়ে রাখে। এই নীতিগত বিরোধ কৃষকদের কর্পোরেট উপাদানের ওপর নির্ভরতা বহুগুণে বৃদ্ধি করে তাদের ঋণগ্রস্ত করে। সরকারের উচিত এই রাসায়নিক ভর্তুকির টাকা সরিয়ে নিয়ে প্রাকৃতিক চাষের জন্য সরাসরি ব্যয় করা এবং ভালো কৃষি পরিকাঠামো (যেমন কোল্ড স্টোরেজ) তৈরিতে খরচ করা।
গ্রামাঞ্চলে, সরকারি ঋণের সমস্যা আজও প্রকট । ফলে ক্ষুদ্র কৃষকরা মহাজন বা বেসরকারি ঋণদাতার কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হন। এই সুযোগে খুব সহজেই কৃষিতে কর্পোরেট পুঁজির প্রবেশ ঘটে। কৃষক যখন সরকারি সুরক্ষা পায় না, তখন উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে কর্পোরেট বীজ ও ইনপুট কেনেন। ফসল খারাপ হলে এই ঋণের ফাঁদ তাকে জমি বিক্রি করতে বাধ্য করে, যা আসলে কর্পোরেট সংস্থাগুলিকে ঘুরপথে জমি দখল করতে সাহায্য করে।
মোটকথা, সরকার নীতিগতভাবে কৃষকদের সুরক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে দিচ্ছে, আইনি কাঠামোয় কর্পোরেটদের সমর্থন করছে এবং ভর্তুকির ভুল ব্যবহারের মাধ্যমে সরাসরি কর্পোরেট আগ্রাসনকে সাহায্য করছে। এর ফলে ভারতের কৃষি কাঠামোতে কৃষকদের শোষণ আরও স্থায়ী হচ্ছে।

মুক্তির উপায়: কৃষক-কেন্দ্রিক টেকসই মডেল
কর্পোরেট দখলদারির মোকাবিলা করতে হলে প্রয়োজন বাস্তুসংস্থান-কেন্দ্রিক এবং কৃষকদের হাতে নিয়ন্ত্রিত নতুন কৃষি ব্যবস্থা। এই মডেলে কৃষকদের স্বায়ত্তশাসন ও স্থানীয় জ্ঞানকে সম্মান জানানোর পাশাপাশি পরিবেশের স্থায়িত্ব নিশ্চিত হবে।
বীজ স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার ও জিনগত স্বায়ত্তশাসন: বীজ সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার করা অপরিহার্য, যা কর্পোরেট বীজ কোম্পানির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভেঙে কৃষকের জন্মগত অধিকার ফিরিয়ে আনবে। এই লক্ষ্যে, কমিউনিটি বীজ ব্যাংক, যেমন ‘বৃহি’ মডেল-এর মতো স্থানীয় উদ্যোগগুলিকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিতে হবে, যেখানে আঞ্চলিক ধানের জাত সংরক্ষণ করা হয় এবং কৃষকরা বিনামূল্যে বীজ বিনিময় করতে পারবেন। বহুজাতিক কোম্পানির পেটেন্ট-নির্ভরতা কমাতে সরকারি অর্থায়নে জনমুখী গবেষণার প্রসার ঘটাতে হবে। টিএনপিবি (ট্রান্সপোসন-অ্যাসোসিয়েটেড প্রোটিন বি) -এর মতো ভারতে উদ্ভাবিত পেটেন্ট-মুক্ত জিন-এডিটিং প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করা উচিত, যাতে কৃষি গবেষণা স্থানীয় মালিকানার অধীনে থাকে এবং কম খরচে ফসলের উন্নতি ঘটানো যায়।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং রাসায়নিক নির্ভরতা হ্রাস: এই মডেলের প্রধান লক্ষ্য হল কৃষকের উৎপাদন খরচের চাপ কমানো এবং ফসলের ন্যায্য দামের নিশ্চয়তা দিয়ে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বাড়ানো।
রাসায়নিক উপাদানের খরচ নাটকীয়ভাবে হ্রাস করতে জিরো বাজেট ন্যাচারাল ফার্মিং (জেডবিএনএফ ) মডেল অত্যন্ত কার্যকর। ‘জেডবিএনএফ’ কৃষকদের কেনা ইনপুটের উপর নির্ভরতা ৭ থেকে ১৫ গুণ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়, যা কর্পোরেট সার ও কীটনাশকের উপর নির্ভরশীলতা এবং ঋণের বোঝা সরাসরি হ্রাস করে। সরকারের উচিত এই প্রাকৃতিক চাষের ঝোঁক বাড়াতে কৃষকদের প্রত্যক্ষ আর্থিক সহায়তা দেওয়া।
ফসলের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করতে ‘ন্যাশনাল ফার্মার্স কমিশনের’ সুপারিশ অনুযায়ী সকল কৃষি পণ্যের জন্য আইনিভাবে গ্যারান্টিযুক্ত ন্যূনতম সহায়ক মূল্য (চাষের মোট খরচ হিসাব করার ক্ষেত্রে সমস্ত খরচের সঙ্গে জমির খাজনা এবং কৃষি মূলধনের সুদকেও যুক্ত করতে হবে। তার উপর অতিরিক্ত ৫০% চাপিয়ে এম এস পি নির্ধারিত হবে অর্থাৎ সি-২+ ৫০% ফর্মুলা) নির্ধারণ করা অত্যাবশ্যক। এটি কর্পোরেট ক্রেতাদের বাজারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ থেকে কৃষকদের মূল্য সুরক্ষা দেবে এবং তাঁদের আয়ে স্থিতিশীলতা আনবে।
বাজারের ঝুঁকি কমাতে কেরালা বা তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যে ব্যবহৃত বিকেন্দ্রীভূত সংগ্রহ পদ্ধতি অন্যান্য অঞ্চলে প্রয়োগ করা যেতে পারে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে ক্রয় নিশ্চিত হবে এবং কৃষকরা অভাবী বিক্রির হাত থেকে রক্ষা পাবেন।
সাংগঠনিক ক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা: মধ্যস্বত্বভোগী ও কর্পোরেট এজেন্টের প্রভাব কমাতে এবং বাজারের ওপর কৃষকের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি।
ক্ষুদ্র কৃষকদের একজোট করে কৃষক উৎপাদনকারী সংস্থা (এফপিও) ও সমবায় গঠনে উৎসাহিত করতে হবে। এর মাধ্যমে তারা সম্মিলিতভাবে উপকরণ সংগ্রহ ও উৎপাদিত পণ্য বিপণন করে শক্তিশালী দর কষাকষির ক্ষমতা অর্জন করতে পারবে।
এফপিও -এর সাফল্যের জন্য কেবল অর্থ সাহায্যই যথেষ্ট নয়। তাদের মধ্যে পেশাদার ব্যবস্থাপনা, সুশাসন এবং পর্যাপ্ত পুঁজি সংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের জন্য গ্রামীণ পরিকাঠামো নির্মাণে জোর দিতে হবে, যাতে এফপিও – গুলি সরাসরি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প ও বড় ক্রেতাদের সাথে যুক্ত হয়ে নিজেদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে পারে।
এই বাস্তুসংস্থান-ভিত্তিক, কৃষক-নিয়ন্ত্রিত মডেলই কেবল কর্পোরেট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী রক্ষাকবচ তৈরি করতে পারে এবং ভারতীয় কৃষিকে সামাজিক ও পরিবেশগত দায়বদ্ধতার পথে ফিরিয়ে আনতে পারে।

নীতিগত রূপান্তর: চূড়ান্ত পদক্ষেপ ও অগ্রাধিকার
সরকারের উচিত হবে বর্তমান নীতিগত দ্বিধাবিভক্তি দ্রুত দূর করে একটি সুসংহত এবং কৃষক-কেন্দ্রিক নীতি গ্রহণ করা। বর্তমানে রাসায়নিক উপাদানের ভর্তুকি (যেমন সার ও বিদ্যুতের ওপর ভর্তুকি) প্রধানত কর্পোরেট কোম্পানিগুলির মুনাফাকেই বাড়ায়। এই ভর্তুকি থেকে অর্থ সরিয়ে তা টেকসই কৃষি পরিকাঠামো (যেমন ফসল সংরক্ষণের জন্য কোল্ড স্টোরেজ, প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র) এবং প্রাকৃতিক চাষের জন্য সরাসরি বরাদ্দ করা জরুরি। এই ধরনের বাস্তুসংস্থান-ভিত্তিক রূপান্তর একদিকে যেমন জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা নিশ্চিত করবে, তেমনই অন্যদিকে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত কৃষি উপকরণের উপর কৃষকের নির্ভরতা কমিয়ে তাকে আর্থিক সুরক্ষা দেবে।
সবশেষে, এটা বলা অপরিহার্য যে ভারতের কৃষিকে কৃষক-কেন্দ্রিক পথে পরিচালিত করাই এই মুহূর্তে একমাত্র কাজ। এই কাজে প্রয়োজন:
• কর্পোরেট দখলদারির বিরুদ্ধে শক্তিশালী জনমুখী নীতি প্রতিষ্ঠা।
• বীজ ও বাজারের একচেটিয়া আধিপত্য রুখতে কঠোর আইনি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা।
• কৃষক উৎপাদনকারী সংস্থা ও সমবায়ের মতো কৃষক সংগঠনগুলির প্রাতিষ্ঠানিক সংহতকরণ নিশ্চিত করা।

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জানুয়ারি ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]
