
বিশ্বায়নের কাছে হার মেনেছে বাংলার লৌকিক ব্রত
বাংলায় বারো মাসে তেরো পার্বন। এখানে এমন কোন মাস নেই যে মাসে ব্রত বা পার্বন নেই। ব্রত হল ধর্মের গারস্থ রুপ। ‘বৃ‘ ধাতু থেকে ব্রত শব্দের উৎপত্তি। এই শব্দের সাধারন অর্থ নিয়ম বা সংযম। বাঙালির ব্রতকর্ম বাঙালির সংস্কৃতির আদিতম অথচ আবহমান ধারার এক অনবদ্য প্রকাশ। কামনা-বাসনা পূরণের জন্য কৃত্য সম্পাদনই ব্রত। অর্থাৎ ব্রতের মধ্যে সর্বদা একটা কামনা প্রকাশিত হয়। কামনা বাসনার বাস্তব রূপায়ণের জন্যই ব্রতের আয়োজন। মানুষ আজীবন তার নানা কামনা চরিতার্থতের জন্য নানা কাজ করে চলেছে। অবনীন্দ্রনাথ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের এই কামনা-বাসনা চরিতার্থতা সাধনের মধ্যে খুঁজে পেতে চেয়েছেন ব্রতের উদ্ভবের ইতিহাস। সমাজতাত্ত্বিক এক ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অবরোহী পদ্ধতিতে ব্রতের উদ্ভবের কাছে পৌঁছাতে চেয়েছেন। তিনি বলেছেন, “ ব্রত হল মনস্কামনার স্বরূপ। আলপনায় তার প্রতিচ্ছবি, ছড়ায় তার প্রতিধ্বনি এবং নাট্যে নৃত্যে তার প্রতিক্রিয়া।” সহজ কথায়, ব্রত হলো মানুষের গীতময়, চিত্রিত ও সচল জীবন্ত কামনার বহিঃপ্রকাশ।
এই পৃথিবীর যা কিছু মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তার সঙ্গেই তিনি জুড়ে দিয়েছেন তার কল্পনা ও বিশ্বাসকে। এই বিশ্বাস থেকেই গড়ে ওঠে এক অপার্থিব শক্তি। সেই শক্তিই মানুষ কে সব দিক থেকে রক্ষা করবে – মানুষের বিশ্বাস তেমন টাই। এই শক্তিকেই মানুষ নিজের মতো করে মূর্ত রূপ দিয়েছেন , তাকে তুষ্ট রাখার জন্য যা যা করণীয় তাই করেছেন । ব্রত তারই একটি রূপ। আমাদের সমাজে সাধারণত দুই ধরনের ব্রত পালিত হয়। কিছু শাস্ত্রীয় ব্রত – যা বৈদিক পূজা পদ্ধতির মত। অন্যটি- মেয়েলি ব্রত। এই মেয়েলি ব্রত আবার দুধরনের। কিছু, নারীব্রত-যেগুলি বিবাহিতা নারীরা পালন করেন। আর কিছু কুমারীব্রত – যেগুলি অবিবাহিত নারীরা করে। এদের গঠন–আহরন, আচরণ এবং ব্রতকথা থাকলে তা শোনা। কুমারীব্রত পালনে কোন মন্ত্র বা পুরোহিতের প্রয়োজন হয়না। মেয়েরা নিজেরাই ছড়া বা শ্লোক তৈরি করে পুজো করে।
বাংলায় কুমারীদের জন্য বিভিন্ন মাসে বিভিন্ন ব্রতের নিয়ম তৈরি করা হয়েছিল এবং সেই অনুযায়ী তা পালন করা হয়। বাংলার উল্লেখযোগ্য কুমারী ব্রতগুলি হল : বৈশাখ মাসে – পুণ্যিপুকুর ব্রত, হরিরচরণ ব্রত, গোকুল ব্রত, পৃথিবী ব্ৰত , শিব ব্রত ও অশ্বত্থপাতা ব্রত, কার্তিক মাসে – যমপুকুর ব্ৰত, অগ্রহায়ণ মাসে –সেঁজুতি ব্ৰত, পৌষ মাসে তুষ-তুষলী ব্ৰত। এইসব ব্রতে নানারকম শ্লোক বলতে দেখা যায়। প্রতিটি শ্লোকেরই মূল কথা- সতী হওয়া, স্বামী পাওয়া, পুত্র সন্তান জন্ম দেওয়া, ভাল রাঁধুনি হওয়া, সতীনবিহীন সংসার, সধবা অবস্থায় মৃত্যু হওয়া এবং সাত ভাইয়ের এক বোন হওয়া। এছাড়াও খরায় যাতে পুকুর জলশূন্য না হয়, গ্রীষ্মকালে গাছ না মরে এবং ফসল যেন ভাল হয় তার কামনা।
বাংলার এই ব্রতগুলি একেবারেই বাঙালির নিজস্ব। এর উৎপত্তি মনের আশা আকাঙ্ক্ষা, কামনা – বাসনা থেকে। কতকগুলি আচারের মাধ্যমে এই ব্রত পালিত হয়। প্রত্যেকটি ব্রতর আলাদা আলাদা কাহিনী। অঞ্চল ভেদে এদের জনপ্রিয়তার তারতম্য চোখে পড়ে । এই ব্রত গুলি পালিত হয় মূলত গ্রামীন পরিবারের মধ্যে। কিন্তু দ্রুত নগরায়ন প্রতিদিন গ্রাস করছে আমাদের গ্রামীণ বাংলাকে, আঞ্চলিকতাকে। আজ ‘পরিবার কেন্দ্রিকতা এবং গ্রাম্য জীবনের সংস্কার’ বিলুপ্তির পথে। কিন্তু বাঙালির বাঙালিত্বকে জানতে হলে, গ্রাম্য জীবনের সংস্কার ভুলে গেলে চলবে না। তাহলে বাঙালি জাতি একদিন তার জাতীয় পরিচয় হারিয়ে ফেলবে। এই ব্রত- অনুষ্ঠানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাংলার হৃদয়। বাংলার ব্রত আমাদের অহংকার। এই কুমারী ব্রত গুলি আজ আর সেই ভাবে পালন করতে দেখা যায় না। তা আজ হারিয়ে যাওয়ার মুখে।
পুণ্যিপুকুর ব্রত

‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে দেখা যায়, দুর্গা মায়ের ধমক খেয়ে উঠোনে পুণ্যিপুকুর ব্রত করছে। ব্রতের ছড়া শুনে অপু যখন হিহি করে হেসে উঠছে, সেই চেনা ছবিটি আমাদের সবার খুব পরিচিত। বৈশাখ মাসের প্রথম দিন থেকে শুরু করে পুরো মাস ধরে এই ব্রত পালন করা হয়। ব্রতের মূল উদ্দেশ্য হলো — বৈশাখ মাসের খরায় পুকুর যেন জলশূন্য না হয়, গাছপালা যেন না মরে যায় এবং ফসলের ফলন যেন ভালো হয়।
এই ব্রতের প্রস্তুতির জন্য প্রথমে সাদা ফুল, চন্দন, দূর্বাঘাস, তুলসী গাছ, পাতাসহ বেল গাছের ডাল, কয়েকটি কড়ি ও এক ঘটি জল জোগাড় করতে হয়। এরপর তুলসী তলায় একটি ছোট পুকুর খনন করে তার চারদিকে চারটি ঘাট তৈরি করা হয়। প্রতিটি ঘাটের দুপাশ কড়ি দিয়ে সাজিয়ে পুকুরের মাঝখানে ফুলের মালা দিয়ে সাজানো তুলসী গাছ বা বেল গাছের ডাল বসানো হয়। সূর্য ওঠার আগে ফুল ও প্রসাদ দিয়ে পূজা শেষ করতে হয়। সবশেষে চার-ছয় পংক্তির ছড়া বলতে বলতে ঘটি দিয়ে গাছে জল ঢালা হয়। এই সময় ব্রতীরা বলেন — “পুণ্যি পুকুর পুষ্প-মালা / কে পূজেরে দুপুর বেলা? / আমি সতী লীলাবতী / সাত ভা’য়ের বোন ভাগ্যবতী / এ পূজলে কি হয়? / নির্ধনীর ধন হয় / সাবিত্রী-সমান হয় / স্বামী আদরিণী হয় / পুত্র দিয়ে স্বামীর কোলে / মরণ যেন হয় গঙ্গা জলে।” ছড়া বলা শেষে তিনবার চন্দনসহ সাদা ফুল ও দূর্বাঘাস তুলসী তলার ওই পুকুরে অঞ্জলি দেওয়া হয়। তারপর গলায় কাপড় দিয়ে ভক্তিভরে প্রণাম করা হয়। টানা চার বছর এই ব্রত পালনের পর আশিটি কড়ি দিয়ে এটি উদযাপন করা হয়। উদযাপন শেষে ব্রতিনীর ইচ্ছানুযায়ী এক বা চারজন ব্রাহ্মণকে সোনার বেল ও ষোড়শদান দক্ষিণাসহ ভোজন করানোর রীতি আছে।
হরিরচরণ ব্রত

এটিও বৈশাখ মাসের শুরু থেকে শেষ দিন পর্যন্ত কুমারী মেয়েদের করতে দেখা যেত। মনের মতো পতি লাভ করে চিরসুখী হওয়ার উদ্দেশ্যেই মূলত এই ব্রত পালন করা হয়। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বাংলার ব্রত’ গ্রন্থে এই ব্রতের এক চমৎকার বিবরণ দিয়েছেন। সেখানে দেখা যায়, বাংলার মায়েরা কীভাবে শিশু বয়স থেকেই মেয়েদের অন্তরে ভক্তি ও আদর্শ পরিবারের স্বপ্ন বুনে দিতেন। পূজার প্রধান উপকরণ হলো একটি তামার টাট বা পাত্র, সাদা চন্দন, ধান, দূর্বা আর ফুল। পিতলের থালায় চন্দন দিয়ে এক জোড়া পা আঁকা হয়—এই পদযুগলই হলো শ্রীহরির পাদপদ্ম। বালিকারা সেই থালার ওপর একটি করে ফুল ফেলে মন্ত্র উচ্চারণ করে: “হরির চরণ, হরির পা / হরি বলেন ‘মা গো মা’ / কোন্ ভাগ্যবতী পূজে মা? / সে ভাগ্যবতী কী চায়? / আপনাকে সুন্দর চায় / রাজ-রাজেশ্বর স্বামী চায় / গিরিরাজ বাপ চায় / দশরথের মতো শ্বশুর চায় / মেনকার মতো মা চায় / দুর্গার মতো আদর চায় / বসুমতীর মতো ক্ষমা চায় / দরবার আলো বেটা চায়।” বাঙালি সব সময়ই তাদের মেয়েদের কল্যাণময়ী মাতৃরূপে দেখতে চেয়েছে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ধাত্রীদেবতা’-র মতো উপন্যাসেও গ্রাম-বাংলার অন্দরমহলে প্রচলিত এই ধরণের লৌকিক আচার ও মাতৃত্বের কামনার ছোঁয়া পাওয়া যায়। তাই শিশু বয়স থেকেই মেয়েদের প্রার্থনা করতে শেখানো হয়— “হবে পুত্র মরবে না / পৃথিবীতে এক ফোঁটা চোখের জল পড়বে না / পুত্র দিয়ে স্বামীর কোলে / মরণ যেন হয় গঙ্গার জলে।” এইভাবে তিনবার মন্ত্র উচ্চারণের পর পূজায় ব্যবহৃত ফুল ও দূর্বা জলে ভাসিয়ে দিতে হয়। ব্রত উদযাপনের সময় সোনা, রূপা ও তামার তিন জোড়া চরণ গড়িয়ে পূজা করার চল আছে। সেই সময় তিনজন ব্রাহ্মণকে ভোজন করানো ও নতুন বস্ত্র দেওয়ার রীতি রয়েছে।
গোকুল ব্রত

চৈত্র সংক্রান্তি থেকে বৈশাখ মাস জুড়ে গ্রাম-বাংলার ঘরে ঘরে ‘গোকুল ব্রত’ পালিত হয়। সংসার ও গবাদি পশুর মঙ্গল কামনায় পালিত এই ব্রতটিকে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বাংলার ব্রত’ গ্রন্থে বাঙালির আদিম পশুপালন সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ব্রতটি পালনের জন্য থালায় তেল, সিঁদুর, চন্দন, হলুদ, তিন গাছি দূর্বাঘাস, তিনটি পাকাকলা, এক ঘটি জল আর একটি পাখা সাজিয়ে নিতে হয়। প্রথমে গরুটির শিঙে তেল মাখিয়ে কপালে হলুদ, সিঁদুর ও চন্দনের তিলক পরিয়ে দিতে হয়; তারপর গরুর চার পায়ের খুর ধুইয়ে দেওয়ার সময় তিনবার বলতে হয়— “গোকুল গোকুলের ধনী / ব্রত করে রাজরানী”। এরপর গাভীটিকে দূর্বাঘাস ও পাকাকলা খাওয়ানোর সময় বলতে হয়— “গোকুল গোকুলে বাস / গরুর মুখে দিয়ে ঘাস / আবার যেন হয় স্বর্গে বাস।” খাওয়া শেষ হলে ভক্তিভরে পাখা দিয়ে বাতাস করতে করতে বলতে হয়— “তোমারে পূজিয়া গাভী বাতাস করি পাখা / আমার হাতে থাকে যেন সুবর্ণের শাঁখা।” সবশেষে প্রণাম জানিয়ে সেদিনের মতো আচার শেষ হয় এবং টানা চার বছর এই নিয়ম পালনের পর ব্রতটির উদযাপন বা সাঙ্গ করার রীতি রয়েছে।
পৃথিবী ব্রত

পৃথিবী ব্রত মূলত চৈত্র সংক্রান্তি থেকে শুরু করে পুরো বৈশাখ মাস জুড়ে পালন করার নিয়ম। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই ব্রত ভক্তিভরে পালন করলে সংসারের যাবতীয় অমঙ্গল দূর হয় এবং পরিবারে সুখ-শান্তি বজায় থাকে। পূজার প্রস্তুতির জন্য প্রথমে মাটির ওপর পরিষ্কার করে আতপ চালের পিটুলি দিয়ে একটি পদ্মপাতা এবং তার ওপর পৃথিবী ও ধরিত্রী দেবীর অবয়ব আঁকতে হয়। পূজার উপকরণের মধ্যে প্রয়োজন হয় ছোট শাঁখ, মধু, দুধ ও গাওয়া ঘি। পূজার সময় শাঁখের মধ্যে ঘি, দুধ ও মধুর মিশ্রণ ঢেলে সেই আলপনার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে তিনবার প্রার্থনা করতে হয়— “এসো মা ধরিত্রী, বসো পদ্ম-পাতে / শঙ্খ চক্র ধরি হাতে / খাওয়াব ক্ষীর আর মাখাব ননী / আমি যেন হই রাজার রানী।” মন্ত্র পাঠ শেষে শাঁখের ভেতরের মিশ্রণটি আঁকা আলপনার ওপর ঢেলে দিয়ে প্রণাম করতে হয়। একটানা চার বছর এই ব্রত পালনের পর তা উদযাপনের বিধান রয়েছে, যেখানে নিয়ম অনুযায়ী একটি সোনার পদ্মপাতা গড়িয়ে দান করতে হয়।
শিব ব্রত

এই ব্রততে চৈত্র সংক্রান্তির দিন থেকে শুরু করে পুরো বৈশাখ মাস ধরে প্রতিদিন নিজের হাতে শিব গড়ে পূজা করা হয়। মূলত শিবের মতো বর পাওয়ার জন্যই এই ব্রত পালনের নিয়ম। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসে গ্রাম-বাংলার এই শিব গড়ার আচারের মাধ্যমে গ্রামীণ সমাজের এক সহজ ও শুদ্ধ ছবি ফুটে উঠেছে। চৈত্র সংক্রান্তির দিন খুব ভোরে উঠে মেয়েরা গঙ্গা মাটি বা এঁটেল মাটি দিয়ে ছোট ছোট শিবমূর্তি তৈরি করে। তারপর সবাই মিলে বা একা হলে নিজের শিবমূর্তিটি তামার টাটের ওপর বসিয়ে সামনে আতপ চাল আর ফল দিয়ে নৈবেদ্য সাজায়। ধূপ জ্বালিয়ে শুরু হয় মূল পূজা।
শিবকে স্নান করানোর সময় একটি বিশেষ নিয়ম মানা হয়— মেয়েরা ডান হাতে জলের পাত্র ধরে আর বাঁ হাত দিয়ে ডান হাতের কনুই ছুঁয়ে থাকে। স্নান করাতে করাতে তারা বলতে থাকে— “শিল শিলাটন, শিলেবাটন, শিল অঝঝরে / স্বর্গ হতে বলেন মহাদেব, গৌরী কী বর্ত করে? / নড়ে আশ, নড়ে পাশ, নড়ে সিংহাসন / হরগৌরী কোলে করে গৌরী আরাধন।” স্নান শেষ হলে আকন্দ, দূর্বা, বেলপাতা, আতপ চাল আর চন্দন নিয়ে তিনবার অঞ্জলি দেওয়া হয়। অঞ্জলির সময় বলতে হয়— “কালা পুষ্প তুলতে গেলাম সেখানে অনেক লতাপাতা / শিব চরণে দেখা হলো শিবের মাথায় অনেক জটা / আকন্দ, বিল্বপত্র, তোলা গঙ্গাজল / এই পেয়ে তুষ্ট হলেন ভোলা মহেশ্বর।” তিনবার অঞ্জলি দিয়ে ‘নমঃ শিবায়’ বলে প্রণাম করে সেদিনের মতো ব্রত শেষ হয়। এইভাবে পুরো বৈশাখ মাস পূজা করে সংক্রান্তির দিন ব্রতটি উদযাপন করা হয়।
অশ্বত্থপাতা ব্রত

সারা বৈশাখ মাস ধরে এই ব্রত পালন করার নিয়ম। এটি মূলত এক ধরনের গাছ পূজা বা বৃক্ষ বন্দনা। সাধারণের ধারণা, এই ব্রত করলে মানুষের নাম, যশ আর প্রতিপত্তি যেন অশ্বত্থ গাছের মতোই চিরস্থায়ী আর অক্ষয় হয়। এ ছাড়াও সন্তান লাভ, ধনসম্পদ বৃদ্ধি এবং সংসারে সুখ-শান্তি পাওয়ার আশায় মেয়েরা এই ব্রত করে। পাশাপাশি ব্রতীদের মনে এই প্রার্থনাও থাকে— যেন আকাশ থেকে বৃষ্টির ধারা নেমে আসে, পৃথিবী চাষের উপযুক্ত হয় আর চারপাশ ফসলে ভরে ওঠে।
এই ব্রতের মূল উপকরণ হলো পাঁচটি অশ্বত্থ পাতা— একটি পাকা পাতা, একটি কাঁচা পাতা, একটি কচি পাতা, একটি শুকনো পাতা আর একটি ঝুরঝুরে ছেঁড়া পাতা। এই পাঁচ রকমের পাতা মাথায় নিয়ে ব্রতী প্রতিদিন সকালে পুকুরে গিয়ে পাঁচবার ডুব দেয়। এরপর ভেজা গায়ে উঠে অশ্বত্থ গাছের গোড়ায় এক ঘটি জল ঢেলে প্রণাম করে আর বলতে থাকে— “পাকা পাতাটি মাথায় দিলে / পাকা চুলে সিন্দুর পরে / কাঁচা পাতাটি মাথায় দিলে / কাঞ্চন মূর্তি হয় / কচি পাতাটি মাথায় দিলে / নব কুমার কোলে হয় / শুকনো পাতাটি মাথায় দিলে / সুখ-ঐশ্বর্য বৃদ্ধি হয় / ঝুরঝুরে পাতাটি মাথায় দিলে / হীরে মুক্তোর ঝুরি পায় / উজাইতে পারিলে ইন্দ্রের শচী হয় / না পারিলে ভগবানের দাসী হয় / সুখ হয়, সম্পদ হয়, স্বস্তি হয় / সাত ভাইএর বোন হয়।” পরপর চার বছর ধরে এই নিয়ম পালন করলে মনের ইচ্ছা পূরণ হয় বলে মনে করা হয়।
যমপুকুর ব্রত

আশ্বিন মাসের সংক্রান্তি থেকে কার্তিক মাসের শেষ দিন পর্যন্ত, প্রতিদিন সকালে মাসব্যাপী এই ব্রত পালন করা হয়। ব্রতের মূল উদ্দেশ্য হলো—মৃত্যুর পর আত্মীয়-পরিজন বা প্রতিবেশীদের যেন পরলোকে কোনো কষ্ট ভোগ করতে না হয়। সাহিত্যিক লীলা মজুমদার তাঁর স্মৃতিচারণে এই যমপুকুর ব্রত পালনের এক জীবন্ত বর্ণনা দিয়েছেন।
এই ব্রতের জন্য বাড়ির উঠোনে একটি ছোট পুকুর কাটা হয়। সেই পুকুরের মাঝখানে কচু, হলুদ, কলমী, শুষনী ও হিঞ্চে গাছ পোঁতা হয়। পুকুরের দক্ষিণ পাড়ে মাটির তৈরি যমরাজা, যমরাণী ও যমের পিসিকে বসানো হয়। উত্তর পাড়ে মেছো ও মেছুনী, পূর্ব পাড়ে ধোপা ও ধোপানী আর পশ্চিম পাড়ে বসানো হয়—কাক, বক, চিল, কুমির ও কচ্ছপের মূর্তি। পুকুরের প্রতিটি পাড়ে একটি করে হলুদ, সুপুরি আর কড়ি পোঁতার চল আছে। এরপর পূর্ব দিকে মুখ করে বসে মন্ত্র পড়ে পূজা করা হয়। ব্রতের মন্ত্রটি হলো— “এক ঘটি জল আমি দিই বাপ-মার / এক ঘটি জল দিই শ্বশুর-শাশুড়ীর / এক ঘটি জল দিই পাড়া-পড়শীর / শেষ ঘটি জল দিই আমার স্বামীর / সাত ভায়ের বোন আমি ভাগ্যবতী / যম পুকুর পূজি আমি সাক্ষী জগৎপতি।” এইভাবে টানা চার বছর ব্রত পালনের পর এটি উদযাপন বা সাঙ্গ করা হয়। উদযাপনের সময় আশিটি কড়ি ও দক্ষিণা দান এবং চারজন ব্রাহ্মণকে ভোজন করানোর রীতি আছে।
সেঁজুতি ব্রত

গ্রামীণ বাংলার হিন্দুঘরের পাঁচ থেকে নয় বছর বয়সী কুমারী মেয়েরা কার্তিক মাসের সংক্রান্তি থেকে অগ্রহায়ণ মাসের শেষ দিন পর্যন্ত এক মাস ধরে প্রতি সন্ধ্যায় বাড়ির আঙিনায় আলপনা দিয়ে ও প্রদীপ জ্বালিয়ে এই ব্রত পালন করে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাসে দেখা যায়, দুর্গা যখন বাড়ির উঠোনে পিটুলি দিয়ে ঘর-সংসার, সিঁদুর-কৌটো আর সতীনের ছবি আঁকত, ছোট ভাই অপু অবাক হয়ে দিদির সেই ব্রত করা দেখত। এই ব্রত কেবল একা করার অনুষ্ঠান নয়; একজনের মনে যা কামনা তা যেন সবার কল্যাণে ছড়িয়ে পড়ে—এটাই এই ব্রতের আসল উদ্দেশ্য। মূলত ভালো স্বামী ও পরিবার পাওয়া, সন্তান লাভ, ঘর-সংসারের উন্নতি এবং সব রকম বিপদ থেকে মুক্তি পেতেই মেয়েরা এই ব্রত করে। ব্রতের আলপনা আর ছড়ার মধ্যে কুমারী মনের ইচ্ছা আর বাস্তব জীবনের নানা সমস্যার ছবিই ফুটে ওঠে।
এই ব্রতের তিনটি পর্যায় আছে। প্রথম পর্যায়ে ব্রত পালনের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম হিসেবে একটি কলসি, আতপ চালের গুঁড়োয় তৈরি পিটুলি, প্রচুর পরিমাণে দূর্বাঘাস, ধূপ, প্রদীপ ও একটি জলঘট জোগাড় করতে হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে পিটুলি দিয়ে মাটিতে নানা ধরনের রেখাচিত্র বা আলপনা আঁকা হয়। এর মধ্যে থাকে শিবমূর্তি, শিবমন্দির, গঙ্গা-যমুনা, গাছপালা, ঘরবাড়ি, রান্নাঘর, গয়নাগাটি, দশপুতুল এবং ‘হাতে পো কাঁখে পো’ (সন্তান লাভের প্রতীক)-সহ মোট ৫২টি বিষয়। তৃতীয় পর্যায়ে প্রতিটি আলপনার ওপর একটি করে দূর্বাঘাস দিয়ে মনোস্কামনা পূরণের জন্য ৫২টি ছড়া বলা হয়। তেমনই একটি ছড়া হলো— “সাঁঝ-পূজন সেঁজুতি / বারো মাসে বারো সতী / তার এক মাসে এক সতী / সতী হয়ে মাগলাম বর / ধনে-পুত্রে ভরুক বাপ-মার ঘর।” ব্রতের শেষে দূর্বাঘাসগুলো আঙিনা থেকে তুলে কলসিতে রাখা হয় এবং ভক্তিভরে প্রণাম করে সেদিনের মতো পূজা শেষ হয়। চার বছর ব্রত পালনের পর এটি উদযাপন করা হয়। সেই সময় নিয়ম অনুযায়ী তিনজন ব্রাহ্মণকে ভোজন করানো হয় এবং কাপড়, চাদর, পঞ্চামৃত, মধুপর্কের বাটি ও দক্ষিণা দান করা হয়।
তুষ-তুষলী ব্রত

অগ্রহায়ণ সংক্রান্তির দিনেই শুরু হয় ‘তুষ-তুষলী’ ব্রত। সারা পৌষ মাস ধরে পালন করার পর পৌষ সংক্রান্তিতে এই ব্রত শেষ হয়। কুমারী মেয়েরা তুষ-তুষলীকে নারায়ণ ও লক্ষ্মী জ্ঞান করে পূজা করে। রাঢ় বাংলার টুসু গানে এই ব্রতের প্রচুর উল্লেখ পাওয়া যায়, যেখানে কুমারীরা টুসুকে সখীর মতো আদরে গান গাইতে গাইতে জলে ভাসাতে নিয়ে যায়। সাধারণের বিশ্বাস, এই ব্রত করলে পিতৃ ও শ্বশুরকুল—উভয় পক্ষেরই সুখ-সমৃদ্ধি বাড়ে। বিশেষ করে বাণিজ্যে বা প্রবাসে থাকা বাবা, ভাই কিংবা স্বামীর নিরাপদ জীবন ও ঘরে ফেরার কামনায় মেয়েরা এই ব্রত করে। তবে ডক্টর নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, “তুষ-তুষলী মূলত কৃষি সংক্রান্ত প্রজনন শক্তির পূজা।”
এই ব্রতে গোবরের সঙ্গে তুষ মিশিয়ে ছোট ছোট নাড়ু তৈরি করা হয়। এরপর সেই নাড়ুগুলো দূর্বা দিয়ে পূজা করে একটি মাটির মালসায় তুলে রাখা হয়। মকর সংক্রান্তির দিন মেয়েরা সেই মালসা মাথায় করে নিয়ে কোনো পুকুর বা নদীর জলে ভাসিয়ে দেয়। ভাসানে যাওয়ার পথে তারা গাইতে থাকে— “কুলকুলতি এয়োরানী / মাঘ মাসে শীতল পানি / শীত ধাইলো / বড় গঙ্গা নাইলো।” জলে মালসা ভাসিয়ে স্নান সেরে তারা বাড়ি ফেরে। অনেকের মতে, প্রাচীন বাংলার এই তুষ-তুষলী ব্রতই হয়তো কালক্রমে ‘টুসু’ উৎসবে পরিণত হয়েছে। যদিও গবেষক নিত্যানন্দ রায় তাঁর প্রবন্ধে ভিন্ন মত পোষণ করে উল্লেখ করেছেন যে, “তুষ-তুষলী থেকে টুসু নামের উদ্ভব হয়নি।”
লৌকিক ব্রতের স্বাতন্ত্র্য ও বিশুদ্ধতার সংকট
আমাদের আলোচিত কুমারী ব্রতগুলি অন্য অনেক ব্রতের তুলনায় বেশ খাঁটি। এর একটি বড় কারণ হলো—কুমারী ব্রতে মনের কামনা যেমন বিচিত্র, তা পূরণের উপায় বা আচারগুলোও তেমনই বৈচিত্র্যময়। শাস্ত্রীয় ব্রতের ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয়; সেখানে যে কামনাই করা হোক না কেন, পূজার প্রক্রিয়া বা নিয়ম সব ক্ষেত্রেই প্রায় একই রকম। অর্থাৎ সব রোগের যেন এক ওষুধ। কুমারী ব্রতের বৈশিষ্ট্য এখানেই যে, প্রতিটি কামনার জন্য আলাদা আলাদা লোকজ আচার ও ছড়া প্রচলিত।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এবং হিন্দুধর্মের প্রভাবে লৌকিক ব্রতের ধরনে অনেক বদল এসেছে। বর্তমানে সম্পূর্ণ খাঁটি অবস্থায় এই ব্রতগুলি খুব কমই পাওয়া যায়। জীবনযাত্রার পরিবর্তনের ফলে এই আচারগুলো মনে রাখার আগ্রহও মানুষের কমেছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে খাঁটি ও মেকি ছড়া বা আলপনা একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক ব্রতের ছড়ার সঙ্গে অন্য ব্রতের অংশ মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। এই অবস্থায় খাঁটি ব্রতের একটি আদর্শ রূপ খুঁজে পেতে হলে শুধু আমাদের দেশের ব্রত নিয়ে নাড়াচাড়া করলেই হবে না, বরং পৃথিবীর বিভিন্ন আদিম জাতির মধ্যে প্রচলিত ব্রত-অনুষ্ঠানের ইতিহাস ও বিবর্তনকেও গভীরভাবে বোঝা জরুরি।
বিশ্বায়ন ও ভোগবাদী সংস্কৃতির প্রভাব
বাংলার মানুষের দীর্ঘদিনের জীবনবোধ থেকেই গড়ে উঠেছে এই ব্রতগুলো। কৃষিকাজ, সাংসারিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য আর সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক চাওয়া-পাওয়াকে ঘিরেই এর বিবর্তন। ব্রতকে কেন্দ্র করেই বাংলার লোকসাহিত্য, লোকসংগীত এবং ঋতুভিত্তিক উৎসবগুলো আমাদের সংস্কৃতিকে বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে। তবে বিশ্বায়নের ফলে আজ পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের মেলবন্ধন ঘটলেও, প্রতিযোগিতার মুখে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য। ভেঙে যাচ্ছে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও মূল্যবোধ। মানুষ যৌথ পরিবার ছেড়ে একক সংসার বেছে নেওয়ায় পারিবারিক বন্ধনের সেই চিরাচরিত রূপটি আজ অনেকটা ফিকে হয়ে গেছে। পশ্চিমী ভোগবাদী সংস্কৃতির প্রসারে আমাদের পুরনো দিনের ধর্মনিষ্ঠা ও নৈতিকতা আজ ম্লান। ফলে বাংলার লোকসংস্কৃতির এই সমৃদ্ধ ধারা আজ প্রায় অবলুপ্তির পথে।
বর্তমানে নদিয়া, বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ বা বীরভূমের কিছু গ্রামে এখনও ‘পুণ্যিপুকুর’ ব্রত পালন করতে দেখা যায়। হুগলি, বাঁকুড়া বা পুরুলিয়ায় পালিত হয় ‘তুষ-তুষলী’। উত্তরবঙ্গের কিছু গ্রামে বিক্ষিপ্তভাবে দু-একটি ব্রত দেখা গেলেও বেশিরভাগই আজ আর নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হয় না। মেদিনীপুর বা হাওড়া জেলায় ‘গোকুল ব্রত’ এখন কেবল একদিনের অনুষ্ঠান মাত্র। আজকের প্রজন্মের কুমারী মেয়েদের সঙ্গে কথা বললে জানা যায়, এসব ব্রতের নামও তারা অনেকে শোনেনি। তাদের মায়েরা শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী হয়ে এখন আর নিজের মেয়েদের ব্রত পালনে তেমন উৎসাহ দেন না। কারণ আধুনিক সচেতনতায় তাঁরা বুঝেছেন, এই ব্রতগুলোর অনেকগুলোই তৈরি করা হয়েছিল নারীকে কেবল স্বামী-পুত্র আর সংসারের মায়ায় আটকে রাখার জন্য। আজ নারীরা নিজের সত্তা ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন। তারা জানে যে সংসারের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষক, কবি বা রাষ্ট্রপতির মতো প্রতিটি ক্ষেত্রে সফল হওয়ার ক্ষমতা তাদের আছে। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত কুমারীদের কাছে তাই এই ব্রতগুলো আজ আর আগের মতো আকর্ষণীয় নয়।
উপসংহার
বাংলার ব্রত-অনুষ্ঠানের মধ্যেই লুকিয়ে আছে বাঙালির আসল হৃদয়। এই ব্রতগুলো আমাদের অহংকার। যদিও আধুনিক শিক্ষার আলোয় ব্রতের কিছু আদিম আকাঙ্ক্ষা (যেমন সপত্নী-বিদায় বা কেবল পুত্র লাভ) আজ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে, তবুও এর আলপনা, ছন্দময় ছড়া আর প্রকৃতির প্রতি মমত্ববোধ আমাদের সংস্কৃতির এক অমূল্য দলিল। বিশ্বায়নের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে আমরা যেন আমাদের এই ‘জাতীয় পরিচয়’ হারিয়ে না ফেলি। ব্রতের আচার হয়তো একদিন পুরোপুরি বিলুপ্ত হবে, কিন্তু তার শিল্প আর লোকসাহিত্যের রসটুকু আমাদের আগলে রাখা প্রয়োজন।

