
ধর্মরাজ ও তাঁর গাজন: হারিয়ে যাচ্ছে রাঢ় বাংলার লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি
রাঢ় বাংলার লালমাটির পথে পথে চৈত্রের শেষ সূর্যের তাপ যখন ছড়িয়ে পড়ে, গ্রামের বাতাসে ভেসে আসে ঢাকের বোল আর শাঁখের আওয়াজ-তখন বুঝতে হবে, ধর্মরাজ বা ধর্মঠাকুরের গাজন উৎসব এসে গেছে। এটি কেবল কিছু নির্দিষ্ট ব্রত পালনকারী মানুষের ব্যক্তিগত পূজা-অর্চনা নয়, বরং একটি বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদযাপন। এক বিশাল জনপদের বিশ্বাস, ভক্তি আর অদম্য প্রাণের উদযাপন।

গাজনের মাঠে জীবনের প্রতিচ্ছবি: বিশ্বাস ও ভক্তির উপাখ্যান
গাজন বললেই মনে পড়ে বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ের কথা। চৈত্রের শেষ বিকেলে ধর্মরাজতলার চারপাশে তখন উপচে পড়া ভিড়। হাজার হাজার মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে এসেছেন, শুধু একটুকরো বিশ্বাস আর ভক্তির টানে। বৃদ্ধ হারাধন, যার রোগক্লিষ্ট শরীর বহু বছর ধরে কোনো উপশম পায়নি, আজ সে কাঁটা লোটার ব্রত নিয়েছে। ধারালো কাঁটার ওপর দিয়ে যখন সে গড়িয়ে চলেছে, তার মুখে যন্ত্রণার কোনো ছাপ নেই, কেবল এক দৃঢ় সংকল্প আর ঠাকুরের প্রতি অগাধ আস্থা। আর বছর পঁচিশের রমেশ, যার ঘরে গত দু’বছর নতুন ফসল আসেনি, সে তার নবজাতক সন্তানকে কোলে নিয়ে মানত করেছে, একজোড়া মাটির সাদা ঘোড়া তুলে দিয়েছে ধর্মরাজের থানে-যেন তার শিশুর সুস্থ ভবিষ্যৎ আর পরিবারের সমৃদ্ধি নিশ্চিত হয়। শুধু এই হারাধন বা রমেশ নয়, এমন হাজারো জীবনের গল্প লুকিয়ে আছে এই গাজনে, যেখানে দুঃখ, কষ্ট, আর বঞ্চনার ঊর্ধ্বে উঠে মানুষ মিলিত হয় এক অলৌকিক শক্তির ছায়ায়, নতুন আশার স্বপ্ন নিয়ে।

ধর্মরাজ: রাঢ় বাংলার লোকায়ত দেবতা
এই কাহিনীর মূল চরিত্র ধর্মরাজ, যিনি কোনো বিগ্রহে বাঁধা নন, এক সাধারণ শিলাখণ্ডেই যাঁর বাস। পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় অঞ্চলের গ্রামীণ জনসাধারণ দ্বারা পূজিত এক বিশেষ লৌকিক দেবতা। হিন্দুধর্মের মূলধারার দেব-দেবী থেকে তাঁর অবস্থান কিছুটা আলাদা, কারণ তাঁর উৎপত্তি এবং বিবর্তন বহু বিচিত্র লোকবিশ্বাস, আর্য-অনার্য সংস্কৃতি এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ধারণার সংমিশ্রণে ঘটেছে। ধর্মরাজ বা ধর্মঠাকুর মূলত একজন গ্রামদেবতা। তিনি গ্রামের রক্ষাকর্তা এবং মঙ্গলকারী দেবতা হিসেবে পূজিত হন। রাঢ় অঞ্চলের (যেমন – বাঁকুড়া, বীরভূম, বর্ধমান, পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, হুগলি) বিভিন্ন গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, বিশেষত বাউড়ি, বাগদি, হাঁড়ি, ডোম ইত্যাদি নিম্নবর্ণের মানুষেরা ঐতিহ্যগতভাবে তাঁর প্রধান উপাসক। তবে বর্তমানে তাঁর পূজা বিভিন্ন বর্ণ নির্বিশেষে জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। তিনি একাধারে গ্রামের শান্তি, শস্যের উর্বরতা এবং গ্রামবাসীদের আরোগ্য নিশ্চিত করেন বলে বিশ্বাস করা হয়। তিনি শুধু একজন গ্রামদেবতা নন, বরং বাংলার লোকসংস্কৃতি ও ধর্মীয় ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। তাঁর সবচেয়ে বড় উৎসব হলো গাজন, যা রাঢ় বাংলার জনজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

গোয়ালপাড়ার ধর্মঠাকুর
“গোয়ালপাড়ার ধর্ম ঠাকুর এবং ‘গাজন’ শব্দের উৎস বিষয়ে দু-চারকথা” – এই প্রবন্ধে সুব্রত ঘোষ রাঢ় অঞ্চলের প্রাচীন লোকদেবতা ধর্মঠাকুর এবং ‘গাজন’ উৎসবের গভীরতা ও উৎস নিয়ে আলোচনা করেছেন। ধর্মঠাকুরের বিবর্তন, তাঁর পূজা পদ্ধতি, এবং ‘গাজন’ শব্দের ব্যুৎপত্তি নিয়ে এক ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। শ্রী ঘোষের প্রবন্ধটি ধর্মঠাকুরকে রাঢ় অঞ্চলের এক প্রাচীন ও জটিল দেবতা হিসেবে উপস্থাপন করে, যাকে কেন্দ্র করে ‘শূন্যপুরাণ’, ‘অনিলপুরাণ’, ‘সৃষ্টিপুরাণ’ রচিত হয়েছে। শ্রীসুকুমার সেন ধর্মঠাকুরকে সূর্যদেবতা, যম, বরুণ, কূর্ম এবং অশ্বারোহী যোদ্ধা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বিনয় ঘোষের মতে, ধর্মঠাকুর কালক্রমে বাবাঠাকুর ও পঞ্চানন হয়ে অবশেষে শিব-মহাদেবে রূপান্তরিত হয়েছেন। প্রবন্ধটি বর্ধমানের জামালপুরের বুড়োরাজ ধর্মঠাকুরের পূজার উদাহরণ দিয়ে এই জটিলতা তুলে ধরেছে, যেখানে নৈবেদ্য অর্ধেক ধর্মঠাকুরকে এবং অর্ধেক শিবকে উৎসর্গ করা হয়।
ওই প্রবন্ধে পাওয়া যাচ্ছে, বীরভূমের বোলপুর শান্তিনিকেতন থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে গোয়ালপাড়া গ্রাম। সেই গ্রামের ধর্মপূজা বসন্ত পূর্ণিমার পরের পূর্ণিমায় অনুষ্ঠিত হয়। এই পূজায় ‘শ্রীশ্রী বঁহড়াডিহি ধর্ম্মঠাকুর জিউ’ মূল দেবতা, এবং চাঁদ রায়, ফটিক রায়, মেঘ রায়, ও বুড়ো রায় সহ অন্যান্য দেবতারাও পূজিত হন। মূল পূজারী কালীশঙ্কর চট্টোপাধ্যায়ের পরিবার পুরুষানুক্রমে এই পূজা পরিচালনা করে আসছেন। এই পূজার অন্যতম আকর্ষণ হলো ‘মেঘগর্জন’। পূর্ণিমার পরদিন সকালে মেঘ রায়ের থানে শত শত ঢাকি সমবেত হয়ে ঢাক বাজান, যা দূর থেকে মেঘের গর্জনের মতো শোনায়। এটি একটি অনুকরণের মাধ্যমে যাদু -বিশ্বাস, যেখানে মানুষ মেঘের দেবতাকে বৃষ্টির জন্য বার্তা পাঠায়। এটি বীরভূম জেলার ঢাকিদের এক অলিখিত মিলন উৎসবও বটে, যেখানে পাঁচ শতাধিক ঢাকি যোগ দেন এবং তাদের থাকা-খাওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়। বরিষ্ট ঢাকি সুশীল দাস – এর মতে, এই ‘মেঘগর্জন’ প্রথা আর কোথাও দেখা যায় না, এটি তাদের পূর্বপুরুষদের স্বপ্ননির্দেশিত একটি ঐতিহ্য।
সুব্রত ঘোষের প্রবন্ধে আরও উল্লেখ রয়েছে, ধর্মঠাকুরের পূজায় বলিদানের প্রথা প্রচলিত আছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেটা বলা আছে তা হলো ধর্মঠাকুরের পূজার ‘রাজ ভাঁড়ালে’ বা দেশীয় পদ্ধতিতে শস্য গাঁজিয়ে (Fermentation) তৈরি মদের কথা। এই মদ ভক্তরা ‘মহাপ্রসাদ’ হিসেবে গ্রহণ করেন। শিবের গাজনে মদ ও গাঁজার ব্যবহার থাকলেও পূজার অঙ্গ হিসেবে এই গাঁজন পদ্ধতি দেখা যায় না। ড. অমলেন্দু মিত্রের গবেষণার উদাহরণ দিয়ে প্রবন্ধটি বিভিন্ন গ্রামে ভাঁড়াল খেলার প্রচলন এবং পূজার সময় মদের ব্যবহার নিশ্চিত করেছেন।

ধর্মরাজ: বহু সংস্কৃতির সমন্বয়ে এক লৌকিক দেবতা
ধর্মঠাকুরের উৎস অত্যন্ত জটিল এবং বহুমুখী। ধর্মঠাকুরের সঙ্গে বিভিন্ন দেবদেবীর সম্পর্ক প্রচলিত। মহাভারতে যমকে ‘ধর্মরাজ’ বলা হয়েছে, তাই ধর্মঠাকুরের সঙ্গে যমরাজের একটি সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়, বিশেষত ন্যায়বিচারের দিক থেকে। যদিও তাদের পৌরাণিক কাহিনীতে পার্থক্য রয়েছে, উভয়কেই ‘ধর্ম’ অর্থাৎ ন্যায় ও বিধির প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। একইসাথে, ধর্মঠাকুরকে সূর্যের প্রতীক এবং ‘শুভ্র নিরঞ্জন’ রূপে কল্পনা করা হয়। আদিম বিশ্বাসে সূর্যের রং সাদা এবং তাঁর বাহন ঘোড়ায় টানা রথ। এ থেকেই ধর্মঠাকুরকে শুভ্র এবং তাঁর পূজায় কাঠের বা মাটির ঘোড়া ব্যবহারের প্রথা প্রচলিত। আধুনিককালে বা বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মঠাকুরকে শিব বা বিষ্ণুর সঙ্গে একীভূত হতেও দেখা হয়। কিছু মন্দিরে ধর্মরাজের মূর্তির পাশে শিবলিঙ্গও স্থাপিত থাকে, আবার কোথাও তাঁকে গদাপদ্মধারী বিষ্ণু বা নারায়ণ রূপেও পূজা করা হয়।
পণ্ডিতদের মতে, বহু বিচিত্র বিশ্বাস ও ধারণার সমন্বয়ে ধর্মরাজের উদ্ভব ঘটেছে:
• অনার্য উৎস: ধর্মঠাকুরের আদি রূপটি ছিল আদিবাসী কৌম সমাজের দেবতা। শস্য উৎপাদন, প্রজনন এবং বৃষ্টিপাতের মতো কৃষি-সংক্রান্ত ঐন্দ্রজালিক বিশ্বাস ও ক্রিয়াকর্মের মধ্য দিয়েই তাঁর উদ্ভব।
• আর্য-অনার্য সংমিশ্রণ: সময়ের সাথে সাথে আর্য সংস্কৃতির প্রভাবে ধর্মঠাকুরের সঙ্গে হিন্দুধর্মের বিভিন্ন দেবদেবীর ধারণা যুক্ত হয়। তিনি একাধারে সূর্য, বরুণ, বিষ্ণু, যম এবং শিবের সঙ্গে একীভূত হয়েছেন, যা বাংলার ধর্মীয় সমন্বয়বাদের এক অনন্য উদাহরণ।
• বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব: হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতো অনেক পণ্ডিত ধর্মঠাকুরকে প্রচ্ছন্ন বৌদ্ধ দেবতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাঁদের মতে, ধর্মঠাকুর বৌদ্ধ ধর্মের ‘শূন্যতা’ ও ‘করুণা’ সংক্রান্ত ধারণার প্রতীক। এমনকি কেউ কেউ বৈশাখী পূর্ণিমায় ধর্মপূজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণ হিসেবে বুদ্ধপূর্ণিমার প্রভাবকে উল্লেখ করেন।
• অন্যান্য ধর্মের প্রভাব: সুকুমার সেনের মতে, ধর্মঠাকুর একটি মিশ্র দেবতা। বৈদিক ধর্মাচার, প্রাচীন আর্যেতর সংস্কার, ব্রাত্য শৈব ধর্ম, নাথ ধর্ম এবং ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির বিষ্ণু উপাসনার সঙ্গে ধর্ম উপাসনার যোগ আছে। এমনকি মুসলমান ফকির বেশধারী দেবতার প্রভাবও তাঁর মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায়, যা বাংলার ধর্মীয় উদারতার এক বিশেষ দিক।

জেলাভিত্তিক ধর্মরাজ পূজার বিস্তার
ধর্মরাজ বা ধর্মঠাকুরের পূজা পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় অঞ্চলের গ্রামগুলিতে, বিশেষত বাঁকুড়া, বীরভূম, বর্ধমান, পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর (গড়বেতা অঞ্চল) এবং হুগলি জেলায় অত্যন্ত বিস্তৃত ও জনপ্রিয়। বাঁকুড়া জেলা ধর্মঠাকুরের পূজোর জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; এই জেলায় ধর্মঠাকুরের পূজা অত্যন্ত প্রবল। বহু গ্রামে তাঁর থান ও মন্দির দেখা যায় এবং বৈশাখী পূর্ণিমাতে আয়োজিত ধর্মরাজের গাজন উৎসব, যেখানে ভক্তরা ‘দেল’ বা ‘দেউল পূজা’ ও ‘বাণফোঁড়া’র মতো কঠোর আচার পালন করেন, তা দূর-দূরান্ত থেকে মানুষকে আকর্ষণ করে। বীরভূম জেলার বিভিন্ন স্থানেও ধর্মঠাকুরের পূজা ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এখানকার গ্রামগুলোতে স্থানীয় দেব-দেবী হিসেবে ধর্মঠাকুরের উপস্থিতি খুবই সাধারণ এবং অনেক ক্ষেত্রে শিবের পাশাপাশি তাঁর পূজা আর্য-অনার্য সংস্কৃতির মিশ্রণকে তুলে ধরে। বর্ধমান (পূর্ব ও পশ্চিম) জেলার গ্রামীণ এলাকাতেও ধর্মঠাকুরের পূজা একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে কৃষিভিত্তিক সমাজের প্রাধান্য থাকায় কৃষকদের ভক্তি বিশেষভাবে দেখা যায় এবং কিছু গ্রামে প্রাচীন ধর্মরাজ মন্দিরও রয়েছে। পুরুলিয়া জেলার আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ধর্মঠাকুরের পূজা আদিম লোকবিশ্বাসের ধারাকে বহন করে, যেখানে তাঁর পূজা অনেক বেশি কৌম ও লোক-সংস্কৃতির আদলে পালিত হয়। সেখানে ব্রাহ্মণ্য প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গড়বেতা ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ধর্মঠাকুরের বেশ কিছু প্রাচীন থান রয়েছে, যেখানে স্থানীয় সম্প্রদায়ের মানুষেরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তাঁর পূজা করেন। সবশেষে, হুগলি জেলার গ্রামীণ প্রান্তেও ধর্মঠাকুরের পূজা দেখা যায়; যদিও এটি বাঁকুড়া বা বীরভূমের মতো ততটা ব্যাপক না হলেও, বিভিন্ন গ্রামে ধর্মরাজের নির্দিষ্ট থান বা বেদি রয়েছে। এছাড়াও, দক্ষিণ চব্বিশ পরগণার কিছু অংশে, যেমন জয়নগর থানার বহড়ু গ্রামে ধর্মরাজের মন্দির ও পূজা প্রচলিত আছে। এমনকি কলকাতার প্রাণকেন্দ্র ধর্মতলার নামের সঙ্গেও এই ধর্মঠাকুরের যোগসূত্র রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন, যা প্রমাণ করে যে একসময় কলকাতাতেও তাঁর পূজা প্রচলিত ছিল এবং সাম্প্রতিককালে আবার তার আয়োজন করা হচ্ছে।

ধর্মরাজ পূজার বিস্তারের নেপথ্যে সামাজিক কারণ
এই জেলাগুলোতে ধর্মরাজের পূজা ব্যাপক হওয়ার পেছনে রয়েছে নানা সামাজিক কারণ:
• আদিবাসী ও নিম্নবর্ণের প্রভাব: ধর্মঠাকুর মূলত আদিবাসী এবং তথাকথিত নিম্নবর্ণের হিন্দুদের (যেমন—বাউড়ি, বাগদি, হাঁড়ি, ডোম) মধ্যে উদ্ভূত ও বিকশিত দেবতা। এই জনগোষ্ঠীর মানুষেরাই ছিলেন কৃষিভিত্তিক সমাজের মূল চালিকাশক্তি। এই জেলাগুলোতে উল্লিখিত জনগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস বেশি, তাই ধর্মঠাকুরের পূজাও এখানে বেশি প্রচলিত।
• কৃষিভিত্তিক সমাজ: রাঢ় অঞ্চলের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর। কৃষকদের কাছে শস্যের ভালো ফলন, বৃষ্টিপাত এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়া অত্যন্ত জরুরি। ধর্মঠাকুরকে শস্য ও উর্বরতার দেবতা হিসেবে পূজা করা হয়, যিনি বৃষ্টি দান করেন এবং শস্যক্ষেত্রকে রক্ষা করেন। তাই এই অঞ্চলের কৃষিজীবী মানুষের কাছে তাঁর গুরুত্ব অপরিসীম।
• গ্রামীণ জীবনযাত্রা: এই জেলাগুলোর অধিকাংশ মানুষই গ্রামে বসবাস করেন এবং তাদের জীবনযাত্রা প্রকৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ধর্মঠাকুরকে ব্যাধি নিরাময়কারী এবং গ্রাম রক্ষাকারী দেবতা হিসেবে বিশ্বাস করা হয়। তাঁর থানে মানত করে রোগমুক্তির প্রার্থনা করা হয়, যা তাঁর জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ।

ধর্মঠাকুরের প্রতীক ও পূজার পদ্ধতি: লোকায়ত আচার
ধর্মঠাকুরের কোনো নির্দিষ্ট মূর্তি নেই। সাধারণত, একটি সিঁদুর-মাখানো নির্দিষ্ট আকারবিহীন প্রস্তরখণ্ডে তাঁর পূজা করা হয়, যা ‘ধর্মঠাকুরের থান’ বা ‘ধর্মরাজতলা’ নামে পরিচিত। কোথাও এটি গাছের তলায় থাকে, কোথাও মন্দিরে। ধর্মঠাকুরের প্রিয় প্রতীক হলো পাদুকা বা কাঠের খড়ম, যা পুরোহিতরা গলায় পরেন। তাঁর বাহন সাদা ঘোড়া, তাই পূজার সময় মাটির বা কাঠের সাদা ঘোড়া মানত করে উৎসর্গ করা হয়।
ধর্মরাজ শুধু থানেই সীমাবদ্ধ নন। গ্রামের মঙ্গল কামনায় তাঁর প্রতীকী শিলা বা বিগ্রহ পালকিতে করে গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রামবাসীরা পরম শ্রদ্ধায় তাঁকে পূজা নিবেদন করেন, বিশ্বাস করেন তাঁদের ঘরে দেবতার আগমন ঘটল। বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ে মহাদানা ঠাকুর, স্বরূপ নারায়ণ আর ধর্মরাজ – এই তিন কাঠের ঘোড়া নিয়ে যে শোভাযাত্রা বের হয়, তা দেখতে বহু দূর থেকে মানুষ ছুটে আসে।
ধর্মঠাকুরের বিশেষ পূজা সাধারণত বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথিতে অথবা ভাদ্র মাসের সংক্রান্তির দিন অনুষ্ঠিত হয়। বার্ষিক পূজা সাধারণত বৈশাখী পূর্ণিমায় হয়, যা ‘দেল’ বা ‘দেউল পূজা’ নামেও পরিচিত। ধর্মপূজা সাধারণত তিন প্রকারে অনুষ্ঠিত হয়: নিত্য পূজা: এটি অনাড়ম্বরভাবে দৈনন্দিন অনুষ্ঠিত হয়। বারমতি পূজা: এটি যেকোনো রবিবার (অঞ্চলভেদে শনি বা মঙ্গলবার) অনুষ্ঠিত হয়। এতে সাদা রঙের পাঁঠা বা কবুতর বলি দেওয়ার রীতি আছে। এটি অনেকটা সার্বজনীন পূজা, যেখানে ১২টি স্থানে পূজিত ধর্মশিলা একত্রিত করে ১২ দিনব্যাপী পূজা করা হয়।বাৎসরিক পূজা: এটি সমারোহের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয় এবং এতে বহু কৃত্য ও বিধিবিধান পালিত হয়।
ধর্মপূজার প্রধান পুরোহিত সাধারণত ডোম সম্প্রদায়ের মানুষ হন। তবে কৈবর্ত, শুঁড়ি, বাগদি এবং ধোপাদের ভেতর থেকেও আজকাল ধর্মপণ্ডিত বা পুরোহিত হতে দেখা যায়। ধর্মরাজের সেবাইতদের ‘দেয়াসি’ বলা হয়। ভক্তরা ‘ভক্তা’ নামে পরিচিত এবং তারা ব্রত পালন, লোটন, কাঁটা লোটন, দণ্ডি দেওয়া, এবং বাণফোঁড়ার মতো কঠোর আচার পালন করেন। ধর্মঠাকুরের মাহাত্ম্য প্রচারের উদ্দেশ্যে তাঁর গাজন উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এই উৎসবে ভক্তরা বিভিন্ন কঠোর ব্রত ও আচার পালন করেন, যা বাংলার লোকসংস্কৃতির এক বিশেষ দিক।

গাজন: ধর্মরাজকে ঘিরে এক অগ্নিপরীক্ষা ও আনন্দের মেলা
গাজন উৎসব মূলত ধর্মঠাকুর ও দেবী কামিনী-কামাখ্যা (বাঁকুড়া জেলায়) অথবা দেবী মুক্তির (অন্যান্য অঞ্চলে) বিবাহ উৎসব হিসেবে পালিত হয়। এটি বাংলা বছরের শেষ এবং নতুন বছরের শুরুর দিকের এক গুরুত্বপূর্ণ লোকায়ত উৎসব। গাজন উৎসবের কয়েকদিন আগে থেকেই ভক্তরা ‘সন্ন্যাসী’ বা ‘ভক্তা’ হিসেবে ব্রত গ্রহণ করেন। এঁরা বিভিন্ন কঠোর নিয়ম-কানুন পালন করেন, যেমন-নিরামিষ আহার, সংযম এবং নির্দিষ্ট কিছু আচার পালন। ধর্মঠাকুরের পুরোহিত সাধারণত ডোম সম্প্রদায়ের মানুষ হন, যদিও অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষও এখন পুরোহিতের ভূমিকা পালন করেন। ধর্মরাজের সেবাইতদের ‘দেয়াসি’ বলা হয়, আর তাঁদের হাতেই পূজার ভার।
গাজনের দিন ধর্মরাজতলায় ঢল নামে মানুষের। ধর্মরাজের প্রতীক সেই সিঁদুর-মাখানো শিলাখণ্ডকে ঘিরে শুরু হয় মূল পূজা। তাঁর প্রিয় কাঠের পাদুকা পুরোহিতের গলায় শোভা পায়। আর দেখা যায় সারি সারি মানত করা মাটির সাদা ঘোড়া , যা ধর্মরাজের বাহন। এই ঘোড়াগুলো যেন ভক্তদের মনের কামনা-বাসনা নিয়ে ছুটে চলে দেবতার কাছে।
গাজনের মূল আকর্ষণ কিছু ভয়ঙ্কর অথচ ভক্তিপূর্ণ আচার। চৈত্রের কাঠফাটা রোদে ভক্তরা যখন বাণ ফোঁড়া আর চড়কের প্রস্তুতি নেন, তখন দর্শকের বুক কেঁপে ওঠে। লোহার শিক নিজ নিজ শরীরে বিদ্ধ করে যখন ভক্তরা সারা গ্রাম পরিক্রমা করেন, তা শুধু এক আত্মত্যাগ নয়, অশুভ শক্তিকে তাড়িয়ে দেওয়ার এক সংকল্প। বিশাল চড়কগাছে চড়ে যখন ভক্তরা শূন্যে ঘোরেন, তা যেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেবতার প্রতি চরম আনুগত্য প্রকাশ।
এরই সাথে চলে লোটন, কাঁটা লোটন আর দণ্ডি দেওয়ার মতো কঠিন ব্রত। ভক্তরা মাটিতে গড়িয়ে, বা কাঁটার ওপর দিয়ে হেঁটে ধর্মরাজের থানে পৌঁছান। এই দৃশ্যগুলো ভক্তি আর কষ্ট সহিষ্ণুতার এক আশ্চর্য মিশেল। কোনো কোনো গ্রামে ভাঁড়াল নাচানো হয়, যেখানে ভাঁড়ে রাখা পচাই মদ গ্রামের পথে পথে ঘুরিয়ে দেখানো হয়-এ যেন উৎসবের এক অন্য মেজাজ।
এই পূজাকে কেন্দ্র করে বসে বিশাল মেলা। হস্তশিল্প, খেলনা, মিষ্টির দোকান আর বিভিন্ন লোকনৃত্য ও গানে মেলা ভরে ওঠে।
সুব্রত ঘোষের প্রবন্ধটি ‘গাজন’ শব্দের উৎস নিয়ে একটি নতুন ধারণা দিয়েছে। অনেকে মনে করেন ‘গাজন’ শব্দটির উৎপত্তি, সংস্কৃত ‘গর্জ্জন’ থেকে, আবার কেউ কেউ বলেন ‘গ্রাম-জন’ থেকে। শিব ও ধর্মের পুজো পদ্ধতির নির্দিষ্ট পার্থক্য দেখে লেখকের মনে হয়েছে এই দুটির কোনটি-ই নয়। এই প্রবন্ধে বলা হয়েছে ‘গাজন’ বাংলা শব্দ ‘গাঁজ’ (মাতিয়া ওঠা) থেকে এসেছে। এখানে ‘অন’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘গাঁজন’ এবং পরে তা ‘গাজন’ হয়েছে, যার অর্থ পচন বা ফেনিয়ে ওঠা। এই মত অনুযায়ী, দেবতার অলৌকিক ক্ষমতায় গাঁজন প্রক্রিয়ায় মদ তৈরি হয়। তাই সেই দেবতাকে স্মরণ করতেই কৃষক সমাজ গাজনে মেতে ওঠে।

ধর্মঠাকুর ও লোকসাহিত্য: এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্য
ধর্মঠাকুরের মাহাত্ম্য প্রচারের উদ্দেশ্যে মধ্যযুগে বাংলায় বিভিন্ন মঙ্গলকাব্য রচিত হয়েছে। এই কাব্যের একটি প্রধান শাখাই হলো ধর্মমঙ্গল কাব্য, যা রাঢ়বাসীদের জীবনযাত্রা, বিশেষত ডোম নরনারীর বীরত্বের কাহিনী সুপরিস্ফুট করেছে। চণ্ডী ও মনসার মতো ধর্মঠাকুরকে কেন্দ্র করেও বাংলা ভাষায় এক বিরাট সাহিত্য গড়ে উঠেছে। এই পালাগানগুলি প্রান্তিক মানুষের রোগ-শোক থেকে মুক্তি পেতে এবং বিভিন্ন পারিবারিক সমস্যা থেকে রেহাই পেতে ধর্মঠাকুরের থানে এসে পুজো দেওয়ার বিশ্বাসকে তুলে ধরে।

ধর্মঠাকুর বাংলার লৌকিক সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি প্রাচীন অনার্য বিশ্বাস থেকে শুরু করে আধুনিক হিন্দু ও বৌদ্ধ ধারণার সংমিশ্রণে এক বহুস্তরীয় দেবতায় পরিণত হয়েছেন। ধর্মঠাকুরের এই বহুমুখী পরিচয় তাঁকে বাংলার লোকধর্মের বিবর্তনের এক জীবন্ত ইতিহাসে পরিণত করেছে। তাঁর পূজা প্রমাণ করে যে, বাংলার লোকধর্ম কতটা বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং কীভাবে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ধারা একীভূত হয়ে নতুন রূপ ধারণ করতে পারে। ধর্মরাজের গাজন আসলে রাঢ় বাংলার আত্মপরিচয়েরই এক জ্বলন্ত ছবি, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বয়ে চলেছে।


[পরম্পরা ওয়েবজিন, জানুয়ারি ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]
