অল্প বয়সের কাঁচা কৌতূহল আর হিরোগিরির মেজাজ নিয়ে শ্রীকান্ত উপন্যাসে যে পরিমাণ সম্পৃক্ত হতে পেরেছিলাম হয়ত পাঠ্য পুস্তকের পথের দাবীতে সে পরিমাণ হতে পারিনি। হয়েছিলাম আরও অনেক পরে গোটা বয়সে। এই ডাগর বয়সেই সব মফস্বলী যুবকের হিরোয়িক সত্তার মধ্যেই আর এক বিপ্লবীর জন্ম দেয়। ‘সব্যসাচী’ ছিল পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে থেকে মানে বই বা নোট বই ডিঙিয়ে হৃদয়ে ঢুকে পড়া সেই বিপ্লবী সত্তা যে মাঝেমাঝেই আমাদের মনের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা রাসবিহারী বসুকে জীবন্ত করে এক সামাজিক বিপ্লবের রাজনৈতিক মন্ত্রে দীক্ষা দিত। মনে মনে পথের দাবী নামটাই যেন সেই চেতনাকে উসকে দিয়ে যায় যেখানে একসাথে হাঁটে অন্য কোন পাঁচালির খোঁজে ঘোরা অন্য নায়ক।

অনেক অনেক পরে প্রায় হাফ বুড়ো বয়সে যখন এক রমতা পথিকের দেখা পেলাম প্রকৃত মধুপুর যাত্রীর খোঁজ করতে করতে। তিনি হাত ধরে চেনালেন পথের দাবীর উপন্যাসের বাইরে হাঁটা রিয়েল সব্যসাচীকে। শরৎবাবুর সেই উপন্যাসের প্রকাশক সব্যসাচীকে চিনতে গিয়েই জানা হয়ে গেল হারিয়ে যাওয়া নানা গল্প।

পথের দাবী প্রকাশের মূল কাণ্ডারী পরম শ্রদ্ধেয় এই মানুষটি হলেন – পরিব্রাজক লেখক উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। হ্যাঁ, বাংলার বাঘ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের সেজ পুত্র উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বা শরৎচন্দ্রের অত্যন্ত পছন্দের বিজু। (কারণ ওঁনার বিজয়ের দিন জন্ম এবং মৃত্যু।) যিনি আবার আমাদের পছন্দের রমতা পথিক লেখক অনাথবন্ধু চট্টোপাধ্যায়ের প্রাণের সেজদা আর ভারতের সাধক গ্রন্থের লেখক শঙ্করনাথ রায় যাকে উল্লেখ করেছেন গুপ্তসাধক উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বলে। পথের দাবী উপন্যাস প্রকাশকে কেন্দ্র করে শুধু নয়, এই মুখোপাধ্যায় পরিবারের উদ্যোগে প্রকাশিত ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকার দৌলতে শরৎবাবুর সাথে এক অন্য সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যেমন এই মুখোপাধ্যায় পরিবারের। ঠিক তেমনি বাঙালি পাঠকের।

শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় জন্মগ্রহণ করেন ১৮৭৬ সালে। রেঙ্গুন যান ১৯০৩ সালে। কলকাতা ফিরে আসেন ১৯১৬ সালে। থাকতেন হাওড়ায়। বাজে শিবপুর অঞ্চলে প্রায় নয় বছর। তারমধ্যেই তার স্বপ্নের বাড়িটি গড়ে তোলেন পানিত্রাসে বা সামতাবেড়ে – সেই বিখ্যাত দোতলা মাটির বাড়িটি। কলকাতায় ফিরেই তিনি গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় অ্যান্ড সন্সের কর্ণধার হরিদাস চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে মাসিক ১০০ টাকা চুক্তিতে সব বই প্রকাশের চুক্তিপত্র সাক্ষর করেন। আজকের দিনের সেলফ পাবলিশিং খ্যাত লেখক এবং প্রকাশকদের কাছে এই বিষয়টির ওপর মতামত জানতে ইচ্ছে হয়।

অন্যদিকে ১৯২১ সালে বঙ্গবাণী পত্রিকা ভবানীপুরের বাড়ি থেকে প্রকাশ হতে শুরু করে। স্যার আশুতোষ তখন জীবিত। সম্পাদকমণ্ডলীতে আশুতোষের বড়-মেজ ,সেজ এবং ছোট পুত্ররা সবাই ছিলেন। অর্থাৎ রমাপ্রসাদ, শ্যামাপ্রসাদ, উমাপ্রসাদ এবং বামাপ্রসাদ। শরৎচন্দ্র তখন জনপ্রিয়তার শিখরে উঠেছেন।

ফলে রমাপ্রসাদ বঙ্গবাণী পত্রিকার তরফ থেকে হাওড়ায় শরৎবাবুর সাথে যোগাযোগ করলে বেশ কিছু গল্প পেয়েছিলেন তারা – মহেশ, অভাগীর স্বর্গ ইত্যাদি। কিন্তু সবারই শখ শরৎবাবুর উপন্যাস ছাপার। গেলেই উনি বলতেন – দেখি। মাথায় তো কিছু আসছে না। একদিন রমাপ্রসাদ বাবু ডেস্কের ওপর রাখা কয়েকটা লেখা পৃষ্ঠা দেখিয়ে বলেন – এই তো লেখা রয়েছে। এটা কি? শরৎবাবু বলেন – ওটা একটা পলিটিক্যাল লেখা। অল্প কিছুটা লিখেছিলাম। ভেবেছিলাম প্রবাসীর রামানন্দকে(রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়)দেব। ওরা পরে বলেছিল – চলবে না। রমাপ্রসাদ মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলেছিলেন – আমাদের জন্য শেষ করুন। শরৎবাবু বলেছিলেন – ‘এই পরাধীন দেশে জেল হবে।’ জজের বাড়ির কাগজে এ লেখা ছাপবে কি করে? আসলে স্যার আশুতোষের বাড়িকে তখন জজের বাড়ি বলত। মধুপুরের গঙ্গাপ্রসাদ হাউসের এর ঠিকানায় চিঠি দিতে হত – জজের বাড়ি, মধুপুর। তাহলেই চিঠি পৌঁছত।

যাই হোক অবশেষে মুখোপাধ্যায় ব্রাদার্স অ্যাণ্ড কোম্পানির দৌলতে পথের দাবী উপন্যাস ১৯২২ সালের ফাল্গুন সংখ্যা থেকে ধারাবাহিক ভাবে বঙ্গবাণীতে প্রকাশ পেল। যদিও বলা হয় ধারাবাহিকভাবে বেরিয়েছিল কিন্তু বঙ্গবাণী পত্রিকার অন্যতম লেখা সংগ্রহকারী পরিব্রাজক উমাপ্রসাদ তাঁর শরৎ প্রসঙ্গে বইটিতে জানিয়েছেন – বঙ্গবাণীর পনেরোটি সংখ্যায় পথের দাবীর কিস্তি মিস হয়েছিল। আসলে শরৎবাবু একটু খেয়ালী মানুষ, আবার তখন রাজনৈতিক মানুষও বটে। অহিংস ও সহিংস আন্দোলনে কংগ্রেসের সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত হয়েও পড়েছেন। রাজনীতির বাইরেও অন্য মানুষ শরৎবাবু। ভীষণ শৌখিন ছিলেন। অ্যান্টিক কাগজ জোগাড় করে তাতে লেখার প্যাড ছাপিয়ে দিত বঙ্গবাণী। মোটা ফুলস্কেপ কাগজ। লাইন টানা প্রতি পাতার ওপরে এক কোণে নীল কালিতে এমবস্‌ করে ছাপা একটি ডাবের রেখাঙ্কন। তার মধ্যে লেখা শরৎ। এছাড়া বিলেত থেকে পরে একটা ওয়াটার ম্যান পেন কলম বিলেত থেকে আনানো হয়েছিল। খুব সরু নিবের পেন ছিল সেটি। অবশেষে পথের দাবী উপন্যাস শেষ হয় বঙ্গবাণীতে ১৯২৬ সালের বৈশাখ সংখ্যায়। শেষ হওয়ার পরেই শরৎবাবুর কাছে উপস্থিত হন উমাপ্রসাদ। বই আকারে প্রকাশ করার অভিপ্রায়ে। শরৎবাবু শুনে বলেন – বই? ছাপবে কে? নির্ভিক উত্তর পান – আমি ছাপব। বিস্মিত শরৎবাবু বলেন – জজের বাড়ির পত্রিকা না ধরলেও বই ধরবে। এবং তোমার জেল হতে পারে। নির্ভিক উমাপ্রসাদ জানান – লেখককেও নিশ্চয় ধরবে। তবে তো ভালই। লেখকের সাথে একসাথে জেলে থাকা যাবে। এটা কি কম সৌভাগের, এই বলে বঙ্গবাণী পত্রিকার থেকে ধারাবাহিক কিস্তি কেটে বাঁধানো পাণ্ডুলিপিটি দেখালে বিস্মিত শরৎবাবু রাজি হন। অবশেষে তৎকালীন হ্যারিসন রোডের বি জি প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম সংস্করণ পথের দাবী। ১৯২৬ সালের ভাদ্রমাসে। উল্লেখ্য এই ভাদ্র মাস শরৎবাবু জন্ম মাস। আর এই বছর পথের দাবী প্রকাশের শতবর্ষ পূর্ণ করল এবং শরৎবাবুর জন্মের সার্ধশতবর্ষও বটে। মোটা পিচবোর্ডের হার্ডবোর্ড বাঁধাইয়ের সেই পথের দাবী বইতে লাল কালিতে পথের দাবী নাম লেখা ছিল। নিচে শরৎবাবুর নাম সাক্ষর। দাম তিন টাকা। তিন হাজার কপি প্রথম ছাপা হয়। মাস কয়েকের মধ্যেই সব বই বিক্রি হয়ে যায়।

এ প্রসঙ্গে একটা মজার গল্প আছে। ‘পথের দাবী’ শেষ কিস্তির শেষেও সমাপ্ত কথাটি লেখা হয়নি। লেখা ছিল ক্রমশ। ফলে প্রশাসন বুঝতে পারেনি – উপন্যাস শেষ এবং বইয়ের প্রস্তুতি শুরুর মুখে। প্রকাশের আগের দিন শরৎবাবু সারা রাত ছিলেন বাংলার বাঘ স্যার আশুতোষের ভবানীপুরের বাড়িতে। সেই রাতে ছিল চূড়ান্ত উত্তেজনা। উমাপ্রসাদ তাঁর ডায়েরিতে সব কথাই লিখেছেন। বই প্রকাশের পর তা বিক্রি এবং জনপ্রিয়তা দুইই তুঙ্গে ওঠে। কিন্তু গ্রেপ্তার হননি কেউ। নিষিদ্ধও হয়নি ওই বছর। উত্তেজিত শরৎচন্দ্র তাঁর স্নেহের পাত্র বিজু তথা উমাপ্রসাদকে চিঠি লেখেন মধুপুরে – দ্বিতীয় সংস্করণ এর জন্য হরিদাসকে বলব ভাবছি। টাকাও পাওয়া যাবে কিছু। উমাপ্রসাদ উত্তরে জানান – এবার তাহলে হাজতবাস নিশ্চিত। শরৎবাবু চিঠি পেয়েই পরিকল্পনা পরিত্যাগ করেন। আশ্চর্যজনকভাবে ১৯২৭ সালে পথের দাবী নিষিদ্ধ হয়। সেই নিষেধাজ্ঞা ওঠে ১৯৩৯ সালে ফজলুল হক নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়। তার আগের বছরে অর্থাৎ ১৯৩৮ সালে শরৎবাবু পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন যকৃৎ -এর ক্যান্সারে। উমাপ্রসাদের উদ্যোগে দ্বিতীয় সংস্করণ বেরোলেও উমাপ্রসাদ তাঁর বইতে আক্ষেপ করেছেন – বেঁচে থাকতে দ্বিতীয় সংস্করণ বেরোলে বেশি খুশি বোধহয় উনিই হতেন। সেটা তো হল না। সে বই মানে দ্বিতীয় সংস্করণ ছাপা হয়েছিল শ্রী গৌরাঙ্গ প্রেসে। দ্বিতীয় সংস্করণও বিক্রি হয়েছিল মন্দ নয়। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাজারে সেই বই বিক্রিতে কিছু ভাঁটাও পড়েছিল।

নিষিদ্ধ হওয়ার পর মানে ১৯২৭ সালে ভবানীপুরের বাড়িতে মানে বাংলার বাঘের বাড়িতে পুলিশের খানা তল্লাশির সময়ে একটা মজার ঘটনাও ঘটেছিল। আসলে সব বই বিক্রি হয়ে যাওয়ায় বাজেয়াপ্ত করার মতন বই ছিল না বাড়িতে। পুলিশরা কিছু না পেয়ে উমাপ্রসাদকে অনুরোধ করেছিলেন – কেস সাজাতে তো হবে? অন্ততঃ একটা বই জোগাড় করে দিন। অবশেষে তাঁদের এক দিদির বাড়ি থেকে তাঁদের বাড়ির কপিটি এনে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয় যাতে পুলিশের মুখরক্ষা হয় আইনের খাতায়।

নিষিদ্ধ পথের দাবী উপন্যাস সাধারণ পাঠক সমাজের কাছে কেমন আলোড়ন তুলেছিল— সে গল্প শুনিয়েছিলেন আমাদের শ্রীরামপুর এর মানুষ কাননদেব ভট্টাচার্য। কাননদার বাবা সেসময় শ্রীরামপুর এর অন্যতম প্রাচীন গ্রন্থাগার সাধনা পাঠাগারের সদস্য। প্রথম সংস্করণ পথের দাবীর একটি কপি সাধনা পাঠাগারে এসেছিল। কিন্ত ডিমান্ড অনন্ত। তাই কাউকে ইস্যু না করে রিডিং রুমের টেবিলে খুলে গ্রুপ করে পড়া হোত। একজন মাঝখানে বই এর পাতা খুলে মেলে ধরতেন আর দুপাশ থেকে অন্য পাচঁ- ছজন মিলে একসাথে পড়ত। খোলা দুপাতা পড়া হলে সবার সম্মতি নিয়ে পাতা ওল্টানো হত। অনেকে আবার বই দেখে কপিও করে নিয়ে যেত। সাধারণ পাঠক সমাজে একটা আবেগের জন্ম দিয়েছিল পথের দাবী।

এ প্রসঙ্গে বিশেষ উল্লেখযোগ্য – পথের দাবীকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্র পারস্পরিক সম্পর্কে বেশ কিছুটা চাপান উতোর হয়েছিল। পথের দাবীকে রবীন্দ্রনাথ একেবারেই মেনে নিতে পারেন নি। বেশ কয়েকটি চিঠিচাপাটি চালাচালি হয়। সেই সমস্ত চিঠি ন্যাশনাল লাইব্রেরির আর্কাইভে আছে। আমি নিজে দেখেছিলাম। একটা লাইন আছে – ‘তোমাকে কিছু না বলে তোমার বইকে চাপা দেওয়া প্রায় ক্ষমা।’ এর প্রত্যুত্তরে শরৎচন্দ্রও চিঠি লিখেছিলেন, কিন্তু পোস্ট করেন নি বিশ্বকবিকে ছোট করা হবে মনে করে – সে চিঠিও পড়বার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। অনাথদার উদ্যোগে এবং উমাপ্রসাদের কলমে। সেখানে একটি লাইন আজও ধাক্কা দেয়। শরৎচন্দ্র এক জায়গায় লিখেছিলেন – আপনি নিজে বহুদিন যাবৎ দেশের কাজে লিপ্ত আছেন। দেশের বাহিরের অভিজ্ঞতাও আপনার অত্যন্ত বেশি। আপনি যদি শুধু আমাকে এইটুকু আদেশ দিতেন যে এ বই প্রচারে দেশের সত্যিকারের মঙ্গল নেই, সেই আমার সান্তনা হত। মানুষের ভুল হয়, আমারও ভুল হয়েছে মনে করতাম। আর এক জায়গায় আছে – “আপনি লিখেছেন আমাদের দেশের রাজারা এবং প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের অন্যান্য রাজশক্তির কারও ইংরেজ গভর্নমেন্টের, মতন সহিষ্ণুতা নেই। একথা অস্বীকার করবার অভিজ্ঞতা আমার নেই। আমার প্রশ্ন – ইংরাজ রাজশক্তির এ বই বাজেয়াপ্ত করবার justification যদি থাকে পরাধীন ভারতবাসীর পক্ষে protest করার justification ও তেমনি আছে”। ক্ষোভ থাকলেও বিক্ষুব্ধ আচরণ করেননি শরৎচন্দ্র।

এবার একটু প্রসঙ্গ বদলানো যাক।

পথের দাবীর নাট্যরূপও তৈরি করার পরিকল্পনা হয়েছিল সে যুগে। ফজলুল হক মন্ত্রীসভার অন্যতম সদস্য নির্মলচন্দ্র চন্দ্র জানান পথের দাবীর ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা যেতে পারে যদি তৎকালীন বিখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্ব প্রবোধচন্দ্র গুহ মহাশয়কে এটি নাটক রূপে অভিনয় করার সত্বাধিকার দেওয়া হয়। নাটকে রূপান্তরিত করবেন – শচীন সেনগুপ্ত। ব্যবস্থাও সেই মত হয়েছিল।

এরপর তৃতীয় শোভন সংস্করণ বেরোয় ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্টের পর। ওটিই উমাপ্রসাদের প্রকাশ করা শেষ সংস্করণ। এর একটি কপি দেবানন্দপুরে রাখা আছে। উমাপ্রসাদের অনুরোধে প্রচ্ছদ করেছিলেন নন্দলাল বসু। আর বর্ণ প্রতিস্থাপন করে পথের দাবী করেছিলেন শিল্পী গোপাল ঘোষ। ১৯৪৭ এর আশ্বিন মাসে প্রকাশ পেয়েছিল। বই ছাপানো হয়েছিল শ্রী গৌরাঙ্গ প্রেস থেকে। এটিকে শোভন সংস্করণ নাম দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে নানা প্রকাশক সংস্থা তাদের পছন্দ অনুযায়ী পথের দাবী প্রকাশ করেছিলেন। আজ শতবর্ষের প্রাকমুহূর্তে দাঁড়িয়ে এটুকু বলাই যায় – উমাপ্রসাদের দুঃখের ভাগীদার আমরাও। শরৎবাবু তাঁর নিজের জীবদ্দশায় এ বইয়ের শোভন সংস্করণটি দেখে যেতে পারেন নি। কালের এই দায়ভার বহন করতে হবে পরবর্তী যুগের সমস্ত পাঠককে। তবে আগ্রহী পাঠক ও সংগ্রাহকদের সাহায্যার্থে জানিয়ে রাখি – এই শোভন সংস্করণটি উমাপ্রসাদের মানস পুত্র অনাথবন্ধু চট্টোপাধ্যায়ের ভূমিকা সহ ফ্যাক্সিমিলি সংস্করণ হিসাবে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে। আগামীর পাঠকদের কাছে ইতিহাসের সাক্ষীকে পুনর্জন্ম করানোর লক্ষ্যে।

শরৎচন্দ্র চলে গেছেন ১৯৩৮ সালে। সুভাষচন্দ্রের উদ্যোগে একটি শোকসভার পাশাপাশি উমাপ্রসাদদের রসা রোডের বাড়ীতে শরৎ স্মৃতি রক্ষা সমিতি তৈরি হয়েছিল। সমিতির সভাপতি ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সহসভাপতি বাসন্তী দেবী, সুভাষচন্দ্র বসু, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। সম্পাদক ও কোষাধ্যক্ষ ছিলেন – উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। নিজ উদ্যোগে শরৎ ভক্তদের কাছ থেকে সংগৃহীত হয়েছিল ত্রিশ হাজার টাকা। সে যুগে জনপ্রিয় সাহিত্যিকের স্মৃতিরক্ষায় কম টাকা নয়।

শরৎবাবুর প্রিয় বিজু তথা উমাপ্রসাদ এর এই ভূমিকা পথের দাবীর সব্যসাচীর মতনই আমাদের পাঠককে চিরকাল ভাবিয়ে যায় যেভাবে উমাপ্রসাদের মানসপুত্র অনাথবন্ধু আজও হঠাৎ কোন বিকেলে মধুপুরে একলা বেরোলে সেই বিকেলটার স্মৃতির সাথেই হাঁটতে হাঁটতে নিজের সাথেই নিজে কথা বলেন -– সেজদার সাথে প্রথম দিনের আলাপটা আজও আমায় ভাবায়, এমনকি কথাগুলোও – সেই চোখ, সেই মুখ – আবার কেন এলে? কেন যে তার নিজের প্রিয় বাপির মধ্যেই শরৎবাবুকে খুঁজে পেতেন শরৎ বাবুর প্রিয় বিজু। আর তাই শরৎ প্রসঙ্গের যাবতীয় দায়িত্ব নির্দ্বিধায় সঁপেছিলেন এই রমতা পথিক অনাথবন্ধুর ওপর। প্রকৃত সব্যসাচীর উত্তরাধিকার খুঁজতে দেরি হবে কেন? শরৎবাবুর বাস্তবের সব্যসাচী যে।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, নভেম্বর ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

2 1 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য