আমন্ত্রণের চিঠিটা হাতে নিয়েই খুলে ফেলেছিল অশীতিপর শিবু ওরফে শম্ভুনাথ দত্ত। ভেতরের পাতায় চোখ বোলাতে গিয়ে ওর নিজের নাম দেখে মনের ভেতরের চোখটায় যেন ষাট সত্তর বছর আগের কত দৃশ্যকে একটা সাদা কালো পর্দায় ভেসে উঠতে দেখল – অতীন্দ্র সিনেমা হলের সামনে পুলিশে পুলিশ। গুরুর ছবির রিলিজ – ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো। সকাল সাড়ে পাঁচটায় দরজায় কড়া নাড়ছে লাইটম্যান কানাই। ঘুম চোখ কচলাতে কচলাতে বেরিয়ে এল বছর বাইশের শিবু। হাতের চটের ব্যাগটা শিবুর হাতে তুলে দিয়ে নিচু গলায় কানাই বলল – ব্যালকনি পনেরোটা, ডিসি পাঁচটা, ফার্স্ট ক্লাস ত্রিশটা, সেকেণ্ড ক্লাস ত্রিশটা, থার্ড ক্লাস চল্লিশটা আছে। আর বাবুদা বলেছে – গুরুর ছবি। মামারা প্রচুর সিভিল ড্রেসে থাকবে। কবিরাজ মশাইয়ের ঘরের ওপাশ থেকে পনেরো নম্বর রেলগেটের সামনে অবধি কোনো টিকিট বেচা যাবে না। হেভভি চাপ আছে। লাটবাগানে তুলে নিয়ে গেলে দিনের পুরো রোজগার মাটি। চটের ব্যাগটা হাতে নিয়ে বলল – শালা এত কম দিলি কেন? উত্তম- সুচিত্রার সপ্তপদী। ভাবতো কী ডিমান্ড আছে?

কানাইয়ের নামের সার্থকতা আছে ওর চোখে। একটা পাথরের চোখ, অন্যটা কটা। কথা বললে চোখ সমেত পাথরটা নাচে। চোখ নাচিয়ে বলল – পাঁচ দিন যাক, ডবল পাবি। পুলিশই তুলে নিয়েছে দুশো টিকিট। বাবুদা লোক পাঠিয়ে পুলিশ লাইনের জন্য দুশো টিকিট নিয়ে গেল – তিনটি শোয়ের। কি করব বল? বলল – আগে পুলিশ লাইনকে খুশ রাখ। পরে কামাবি।

টিকিটের বাণ্ডিলটা ঘুমচোখে হাতে নিয়ে ফাটাচ্ছে শিবু। এটা কি শুধু ম্যাটিনি? নাতো ইভিনিংও আছে মনে হচ্ছে। দুরকম কালার দেখছি।

কানাই বিড়ি ধরিয়েছে। টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বলল – হ্যাঁ, হ্যাঁ। দুপুর আর সন্ধ্যের। রাতেরটা বেরোয় নি। দেখছি দাঁড়া। আসলে সপ্তপদীর তো হেব্বি ডিম্যান্ড। চারটে নাগাদ জলুয়ার দোকানে যাস স্টেশনের দিকে। ওখানে কটা রাখতে পারি দেখছি। তবে সাবধানে কিন্তু বাবুদা বলে দিয়েছে। সাদা পোশাকে প্রচুর পুলিশ থাকবে হলের ভেতরে, বাইরে। ধরে ফেললে তিনদিনের আগে ছাড়বে না। ব্যবসা কিস্যু হবে না।

-ধুর্‌ ছাড় না। এই কটা টিকিট বিক্রি করতে রাস্তাতেই নামতে হবে না। ঘর থেকেই সেল হয়ে যাবে। একটু পরেই টাঙ্কু, মনা, ন্যাপা, গোবিন্দরা এসে গেলে হাতে হাতে বেরিয়ে যাবে। আসলে খড়দার প্রফুল্ল ছাড়া এ চত্বরে কোথাও তো সপ্তপদী লাগে নি, ভাবলাম গুরুর এই বইটায় একটু পয়সার মুখ দেখব।

বাবুদা বলেছে কটা দিন সামলে চল। তারপর পুষিয়ে দেবে। লোকটা ভালো রে, পুলিশ হয়েও আমাদের কথা ভাবে।

মুখ বুজে অনেক কথা নিজের সাথেই বলে কার্ডটা মুড়ে খামে ভরছে শিবু। বাবুদার কথা মনে পড়ল খুব। ভাল নাম শিবনাথ সান্যাল। এত সুন্দর পুলিশ অফিসার জীবনে দেখেনি শিবু। ব্ল্যাকারদের দেবতা ছিল। টাকার ঘুষ সব জায়গায় চললেও ব্যারাকপুরে চলে নি। লাটবাগানে বাবুদা যতদিন ছিল, ব্ল্যাকাররা দুটো পয়সার মুখ দেখেছিল। রেডের খবর আগে দিত। ধরা পড়লে ও টাকা না নিয়েই ছেড়ে দিত। শুধু ওনার লোক এলে টিকিট দিয়ে দিতে বলত। শিবুর বাবার অসুস্থতার সময় টাকা হাতে গুঁজে দিয়েছে। একশ, পঞ্চাশের নোট। ওর বিয়ের সময় বাড়ি এসেছিল।ওর বিয়ের মিস্টির সমস্ত খরচ বাবুদা দিয়েছিল। বলত – শোন, অন্য লাইন ধর। এ লাইন বেশিদিন চলবে না। ব্ল্যাকারদের ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা, বিয়ে, চাকরির সমস্যা হয়। তুই ভদ্র পরিবারের ছেলে। ভাবতে ভাবতেই চোখটা এই আশিতেও ভিজে উঠছে বুঝল – ওর জীবনে দুই গুরু – এক উত্তম কুমার, দুই বাবুদা। প্রথম গুরুকে সম্মান দিয়েছে ছেলের নাম উত্তম রেখে। আর দ্বিতীয় গুরুকে সম্মান দিয়েছে প্রফেশন চেঞ্জ করে কনট্রাকটর হয়ে গিয়ে। তবে আশির দশকের পর।

সেদিনের কথাটাও মনে পড়ে খুব। আশি সালের, চব্বিশে জুলাই। খবরটা ভোরবেলা রেডিওতে শুনেছিল শুয়ে শুয়ে। মায়ের ফোঁপানো কান্নার শব্দে ঘুমের ঘোর ছুটে গিয়েছিল। শুধু ঘরের দেওয়ালে সাঁটানো পোস্টারটার সামনে দাঁড়িয়ে ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলেছিল – গুরু,তুমি চলে গেলে!! আমরা কী করে খাব বলোতো? প্রতিদিনের বাজারটা হত তোমার একটা ছবি হিট করলে। এই পয়সা অন্য কোনো নায়ক দেয়নি গুরু,দেবেওনা। আর দিতেও পারবে না। ওর মা-বাবাও গুরুর অন্ধ ফ্যান। সবাই কাঁদছে। এমন আঘাত ওই বয়সে ওর ছিলনা। কোনো মতে সাইকেল নিয়ে অতীন্দ্রর পাশের গলিতে ঢুকেছিল বাবুদার বাড়িতে। বাবুদাও হতাশ। বৌদি হাতের কাজ ফেলে রেডিও শুনছে। ইশারায় ডাকল বাবুদা – আয়। খুব ক্ষতি হইয়া গেল রে। বাঙাল ভাষাই বেশি বলত বাবুদা। একসময়ে টালিগঞ্জে অভিনয়ও করেছিল তিনটে ছবিতে। পরে পুলিশে জয়েন আসে। কিন্তু বাবুদার পুলিশে আসা উচিৎ হয়নি। অভিনেতার মতন দেখতে ছিল বাবুদা। ধুতি পাঞ্জাবি পরা বাবুদা, কোট প্যান্ট পরা বাবুদা, পুলিশের পোশাকে বাবুদা রাজপুত্র। মানুষে মানুষে বিভাজন করে কখনও কথা বলত না – পাশে বসিয়ে বলল— দ্যাখ, তোর নাম শম্ভুনাথ আর আমার নাম শিবনাথ। যা হওয়ার তো হইসে। বাংলা সিনেমাটা শেষ হইয়া গেল রে। কাছ থেইক্যা দেখসি। আর উত্তমের মত ছবি দাঁড় করাইতে কেউ পারবা না।

——-বাবুদা! মাঝপথে কথা থামাল শিবু।

——-ক, কি কবি।

——আজ এই চব্বিশে জুলাই গুরু চইল্যা গেল। এই শিবুও ব্ল্যাকারি ছাড়ল। অন্য যা করার করুম, কিন্তু কখনও রাস্তায় দাঁড়াইয়া কমু না সপ্তপদী –ফার্স্ট ক্লাস পঞ্চাশ, সেকেন্ড ক্লাস ত্রিশ – এই পয়সা কেউ দিতে পারবো না দেখো। এই কইর‍্যা তো দশ বছরে আনন্দপুরীর মাঠের প্লটিং এর জমিটা কিনতে পারসি। তোমার দয়াও অবশ্যই ছিল। তারপর হাত দুটো ধরে বলেছিল – আমার এক নম্বর গুরু চইল্যা গেল, তুমি রইলা দুই নম্বর গুরু – এতদিন শুনি নাই, আজ কইতাছি – ছাইড়া দিলাম এই ব্ল্যাকারি।

বয় – বইল্যা ভেতরে গেল বাবুদা। তারপর এক বাণ্ডিল টাকা হাতে গুইজ্যা দিয়া কইল – রাখ। দুই হাজার আছে, গুরুদক্ষিণা। কাল বেলায় আয় রতনের লগে আলাপ করাইয়া দিমু। আনন্দপুরীতে প্লটিং করতাছে। ওর লগে থাক, মিস্ত্রি জোগাড় কর, কনট্রাকটরি শুরু কর। খাইয়া পইরা বাঁচবি।

সেই শুরু। আর বাবুদা দু হাজার দশে চইলা যাওনের দুই বছর আগে বাবুদার বাড়ি তৈরি কইরা শেষ।

দ্বিতীয় গুরু বাবুদা চলে যাওয়ার পর বয়সের কারণেও ওই পেশাও ছেড়ে দেয় শিবু। কিন্তু এরই মধ্যে ও গড়ে তুলেছিল – উত্তম ফ্যান ক্লাব। উত্তম ভক্তদের সংগঠন। নব্বই দশক থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত ওই ক্লাবের প্রেসিডেন্ট ছিলেন বাবুদা ওরফে শিবনাথ সান্যাল। প্রতি বছর বিরাট বিরাট অনুষ্ঠান হত তেসরা সেপ্টেম্বর। চব্বিশে জুলাই দিনটা ওরা পছন্দ করত না। বাবুদা বলত— মানুষের চইলা যাওনের দিনটার কথা মনে রাখতে নাই। তাতে কষ্ট বাড়ে।তাই তেসরা সেপ্টেম্বর।

বাবুদা চলে যাওয়ার একবছরের মধ্যেই ওই সংগঠনও ওর ছেলে আর বাবুদার ছেলে তুতুল এর হাতে তুলে দিয়ে সরে গেছে শিবু। বলেছে – তোমরা নতুন জেনারেশন, গুরুর দায়িত্ব গুরু শিষ্য পরম্পয়ায় দিয়া যাইতে হয়। বাবুদা নাই, আমিও নাই। তোমরা করবা, আমরা দেখুম। পরে ওরা নাম বদলে করে দিল– উত্তম কালচারাল সোসাইটি, ব্যারাকপুর। কত কী করেছে এবং করছেও ওরা। গরীব শিল্পীদের চিকিৎসা থেকে তাদের বাড়ির বাচ্চাদের বইপত্তর কেনা, ফিস্‌ সব দেয় ওরা। সেই উত্তম কালচারাল সোসাইটির শতবর্ষে উত্তমকুমার বিশেষ অনুষ্ঠানে ওকে আর লাইটম্যান কানাইকে বিশেষ সম্মাননা দিচ্ছে গুরুর জন্মদিনে। তারই আমন্ত্রণ পত্র। বাবুদা নাই, ভাবে শিবু – থাকলে ঠিক কইত – গুরু দিতাছে। গুরুর দান ফিরাইতে নাই।

২

‘উত্তম কুমার শতবর্ষে পৌঁছনো এমন এক মহানায়ক, যাঁকে আজও অতিক্রম করা যায় নি। আমার ধারণা অতিক্রম করা যাবেও না কোনোদিন’ – জন্মদিনের অনুষ্ঠান মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন বিশিষ্ট অভিনেতা প্রসেনজিৎ। সামনের আসনে বসে বসে শুনছিলেন শিবু। এতদিন সংগঠন করার ফলে আর বাবুদার পুলিশি কানেকশন কাজে লাগিয়ে তরুণ কুমার থেকে সুপ্রিয়া দেবী কাকে না ব্যারাকপুরে নিয়ে এসেছে শিবু। সবাই জানে শিবুর গুরুভক্তির কথা। প্রাচীন থেকে প্রাচীনতর মানুষরা জ্যান্তকালে আড়ালে আলোচনা করত – ব্ল্যাকার শিবুর কনট্রাকটর হয়ে ওঠার ম্যাজিক ফিউশন। এখন অতীত , এমনভাবে বর্তমানে মিশে গেছে যে, উত্তম ফ্যান ক্লাবই শিবুর পরিচয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিবু জানে, বাবুদাই প্রচারের কাজটা আড়ালে করিয়ে দিয়েছে।

যেদিন ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে গিয়েছিল বাবুদার সাথে সকালবেলা আর গুরু পাতলা আদ্দির পাঞ্জাবিটা গায়ে ফেলে কাঁধে হাত রেখে বলেছিল – কি কর শিবু? বাবুদা আর বাবুদার মাসতুতো দাদা নিতাইদা পর্যন্ত থতমত খেয়ে বলেছিল – না মানে,এই টুকটাক কাজ করে। ওইরকম রূপবান পুরুষকে নিজের পাশে পেয়ে শিবুর মনে পড়েছিল – ওর মায়ের কথা। গুরুদেব পবিত্র মানুষ। তিনি অবশ্য তাঁর মন্ত্রদীক্ষিত গুরুমশাইয়ের কথা বলেছিলেন। কিন্তু শিবুর তখন মনে হল – আমার আর গুরু কই? যার বইতে করে খেতে পারি সেই গুরু। ওদের থামিয়ে বলেছিল – ওনারা বলতে লজ্জা পাচ্ছেন, আমি একজন ব্ল্যাকার। ব্যারাকপুরে অতীন্দ্র থেকে অমলা আর ওদিকে চম্পা থেকে জয়ন্তী সব আমি আর আমার ছেলেরা ব্ল্যাকার ওয়ার্ল্ডকে ডিল করি। এতেই আমাদের এতগুলো পরিবারের সংসার চলে। কিন্তু আপনাকে আমরা সবাই গুরু মানি। আপনার বইতে আমাদের সংসার দুটো বেশি পয়সার মুখ দেখে। বাবুদা, নিতাইদার মুখ ফ্যাকাশে হতে হতেই দরাজ দিলে হেসে জড়িয়ে ধরেছিল গুরু। সেই স্পর্শটা আজও ভাবলেই যেন শরীরে টের পায় শিবু। জড়িয়ে ধরে বলেছিল – এভাবে এতগুলো সংসারের মুখে ভাত তুলে দিতে পারে আমার বই কখনও ভাবিনি। সব বুঝলাম, কিন্তু এটা তো ভাল নয়, শিবু। তুমি পরে আমার সাথে ইন্দ্রপুরীতে দেখা কর। ওখানে লোক লাগে। কথা বলব। আহ্লাদে আটখানা হয়ে গেছিল শিবু। বাবুদাকে বলেও দিয়েছিলেন – আমি ট্রলিম্যান লালুকে বলে রাখব। ওকে নিয়ে চলে যাবেন। স্টুডিওর কাজে লাগিয়ে দেবে।

গুরুর নির্দেশে গিয়েছিল কিন্তু কয়েক মাস করে বুঝেছিল – এক একটা দুনিয়া এক একটা মানুষের জন্যই নির্মিত, সবার সব জায়গায় স্থান নেই। তবে প্রচুর অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেছিল দশ মাস কাজের পরে। সেকেন্ড গুরু বাবুদাকে সব বলেছিল। নিতাইদা আর বাবুদার বোনেরা গীতাদি, সবিতাদি, অঞ্জলি দি, মঞ্জুদি, কবিতাদি, মাসিমা, মিনু বৌদি গোল হয়ে বসে শুনত টালিগঞ্জ পাড়ার ইন্দ্রপুরী স্টুডিওর সেসব গল্প। গুরু ঢুকলে কীরকম সব বদলে যেত, আবহাওয়া। সুচিত্রা সেন মেক আপ নিয়ে কেমনভাবে সেটে আসতেন সব শিবু দেখত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। আর সব শোনাত সবাইকে। বিনিময়ে শিবুকে ওরা দারুণ দারুণ খাবার খাওয়াতো, পুজোয় জামাকাপড় দিত কত। বাবুদার সব পুরনো জামাই শিবুর প্রাপ্য ছিল।

কত কথা যে মনে পড়ছিল শিবুর। প্রসেনজিতের উত্তম ভজনা কানেই ঢুকছিল না। অনুষ্ঠানের আগে সুকান্ত সদনের বাইরে দাঁড়িয়েছিল ও একাই একটু আলাদা। নতুন নতুন প্রচুর লোক আসছিল। পুরনো ব্যারাকপুরের সেই সিনেমাখোর লোকগুলো কোথায় গেল? হঠাৎ চোখে পড়ল লাঠি ধরে রিক্সা থেকে নামছেন চিনুদি। ব্যাঙ্কে কাজ করতেন। বিয়ে করেন নি। কী সিনেমা দেখতেন তখন!! তিন বোন, একসাথে আসতেন, সপ্তপদী ছ’বার দেখেছিলেন। অগ্নিশ্বর বোধহয় পাঁচবার, পথে হল দেরী চারবার। বাঁধা কাস্টমার ছিল শিবুর। কাজের লোককে বাড়ি পাঠিয়ে টিকিট নিতেন। শিবু যা দাম চাইত, তাই দিতেন। এমনকি বেশি টাকা ফেরত দিতে গেলেও বলতেন – রেখে দাও, চা মিস্টি খেও। আর এখন নাতি শুভ্র-র মোবাইলে ওয়েব সিরিজ দেখেন। ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শো – গুরু আসছে ভাবলেই সাইটিকা ধরা এই শরীরটা আজও যেন চনমনিয়ে ওঠে। একবার তো একসাথে দুটো ছবি এসেছে পুরনো বসু পরিবার– অমলায় আর এদিকে দেয়া-নেয়া—অতীন্দ্রতে। সামনে পুজো। টিকিট দিয়ে শেষ করতে পারছে না। ভাল গান হলেই হল যেন নিশ্চুপ। অগ্নিশ্বর শিবুর নিজের খুব ভাল লেগেছিল ও অবশ্য ফার্স্ট ডে নাইট শোতে দেখত সবসময়ে, গুরুর ছবি হলে। বাড়ির লোককে, মা দিদিকে পাঠাতো ইভিনিং এ।

শহরে দু একজন পুরনো উত্তম ভক্তকে মঞ্চে সংবর্ধনা জ্ঞাপনের পরের ঘোষণাতে সম্বিত ফিরল শিবুর। মঞ্চে উপস্থিত হবেন উত্তমরূপী অভিনেতা রাজু বন্দ্যোপাধ্যায়। বাঙালির কাছে প্রায় হার্ট থ্রব হয়ে গেছেন এই রাজু। গুরুর জীবন নিয়ে এক কাহিনী করছেন বিখ্যাত পরিচালক শ্রীধর মুখোপাধ্যায়। তাঁর ছবিতে রাজু ফিট করে গেছে। ফোনের সোস্যাল মিডিয়ায় ছেয়ে গেছে উত্তমরূপী রাজুর ছবি। সমস্যা হল – রাজুর গলাটা চেরা বাঁশের মতন। তাই ডিমান্ড বেড়েছে শিবুর ছেলের। যে দেখতে শিবুর বউয়ের মতন হাঁটলে মনে হয় ঠিক যেন পিচের ড্রাম। নামটা অবশ্য উত্তম কুমার দত্ত। গলাটা আশ্চর্যজনকভাবে – গুরুর গলার টোন। অবিকল উত্তম-হেমন্তর গলা। গান গাইতে পারে, বিশেষ বিশেষ অংশ বলতে পারে ।ফলে রাজু-উত্তম যুগলবন্দী করে দুপয়সা কামায়। রাজু নানা পোশাকে উত্তম সেজে স্টেজে ঘুরছে আর শিবুর ছেলে উত্তম ওর গুরুর গলা দিচ্ছে স্টেজের আড়াল থেকে। ঐ বায়োপিকেও তাই হবে শুনেছে শিবু।

শুরু হল সেই ডামি গুরুর চলাফেরা সঙ্গে ছেলে উত্তমের গলা। অগ্নিশ্বরের ডায়ালগ, মরুতীর্থ হিংলাজ, অগ্নিপরীক্ষা, নায়কের মতন ব্লকবাস্টার ছবিগুলোর ছোট ছোট ডায়ালগ আর মঞ্চে রাজুর সেই সেই অংশের অভিনয়। মনে মনে হাসছিল – গুরুর সাথী কই? সুচিত্রা কই? বাচ্চাদের ভাবনা যেমন হয় আর কি। তাতেই হাততালি পড়ছে । লোককে যা খাওয়াচ্ছে তাই খাচ্ছে। এটাই আধুনিক সভ্যতা। খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না।

বাবুদার এক বোনের ছেলের কথা মনে পড়ল, ফিল্ম সোসাইটি করত। এইসব বই নয়, সব বিদেশি ছবি টবি দেখত। বুঝতও খুব। একটু বোদ্ধা বোদ্ধা টাইপ। বলেছিল— নায়কের উত্তম কুমার সত্যজিতের কপি। রুমাল খাওয়া, তাকানো সব নাকি সত্যজিতকে ফলো করে। ভাল লাগেনি কথাটা শিবুর। কপি করে এত লোকের মন জয় করা যায়? তাহলে তো গুরুর কপি করেও আরও গুরু বানানো যেত। এই রাজু যতই গুরু গুরু সাজুক বা দেখতে হোক নতুন কোনো ছবি হলে গুরুর মতন ফাটাফাটি করতে পারবে না।এমন কি শেষের ছবি কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী বা ও গো বধু সুন্দরীর মোটা গুরুকে দেখেও না। আনন্দ আশ্রম বা অমানুষে সবাই গুরুকে নিয়ে সমালোচনা করেছিল। কিন্তু শিবুর মনে হত – হয়ত ঠিক কিন্তু বয়সও তো হয়েছিল। এখন মনে হয় জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা অবস্থায় চলে যাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। উত্তম আর সত্যজিৎ তা পেরেছিলেন। শুধু গুরুর ফ্যামিলি লাইফের ব্যাপারটা ভাবলেই সব গুবলেট হয়ে যায়। উত্তম, সুপ্রিয়া আর গৌরী দেবীর কথা ভাবলেই ওর মায়ের একটা কথা মনে পড়ে। মা বলতেন – গৌরীর ভাগ্যেই ওর উন্নতি আর সুপ্রিয়ার সঙ্গে গিয়েই ডুবল উত্তম। ঘরোয়া মানুষ সবসময় তার পছন্দের নায়ককে পছন্দের যুক্তিতেই নির্মাণ করে। অভিনেতার অভিনয় সেখানে কোনো দাঁত বসাতে পারেনা।

হঠাৎ ছেলে উত্তমের ঠ্যালায় সম্বিত ফিরে খেয়াল করল মঞ্চে ডাকছে ঘোষিকা মেখলা। বিশেষ সম্বর্ধনা জ্ঞাপনে উঠতে হবে ওকে, লাইটম্যান কানাইকে আর চম্পা হলের কাউন্টার সেলসম্যান পুকাইকে। এটা বাবুদা চালু করেছিলেন। সিনেমার সঙ্গে যুক্ত ছোট ছোট কাজের লোককে সম্বর্ধনা। গুরুও বলেছিলেন বাবুদাকে আর ওকে বহুবার। মঞ্চে উঠে পুরস্কারের মেমেন্টো উত্তরীয় নিতে গিয়ে বাবুদার ছবিটা বারবার ভাসছে ওর। হাততালির আওয়াজ ছাপিয়ে উঠছিল সেই ষাটের বা সত্তরের দশকের হল ফাটানো হাততালি যখন পছন্দের গান বাজত। আর ও বাড়ি ফিরত পকেট ভর্তি টাকা নিয়ে। খাবার আর সংসার বাঁচানো আজও ব্ল্যাকার শিবুকে ভদ্র অর্গানাইজার শিবু করে দিয়ে গেল। এখনও মনে আছে বাবুদার কথাটা – ওই লোকটা ছাড়া কেউই বাংলা সিনেমার গুরু কোনদিনই হইব না। সবাই অধম, ওই উত্তম।

৩

চা পর্বের পর উত্তম কুইজে বললেন অভিনেতা অম্বরীশ আর পরিচালক নন্দিতা রায় আর শিবপ্রসাদ। তাৎক্ষণিক পুরষ্কার – ছোট ছোট প্রাইজ।উত্তমকুমারের ছবিতে সই এমব্লেম করা, প্রচুর করিয়েছে। সামনের সারিতে বসে উপভোগ করছিল শিবু। কত সোজা সোজা প্রশ্ন। আবার জটিল প্রশ্নও আসছে। উত্তর দিতে যেন হিমসিম খাচ্ছে নতুন যুগের ছেলেমেয়েরা। সুচিত্রার সাথে প্রথম ছবি সাড়ে চুয়াত্তর এই উত্তরটা পেতে অন্তত সত্তর বছরের এক ভদ্রলোকের কাছে পৌঁছতে হলই, হাতে ট্যাটু আঁকা কালো পোশাক পরা একগাদা ছেলেমেয়ে একটু পরে পরেই বলছে – ও নো! ও মাই গড, সবগুলোই বাঙালি। বাঙালির শিকড়টাই জানে না, এরা নিশ্চয়ই সেই খুন, ধর্ষণ এর মোবাইলি ওয়েব সিরিজগুলো দেখে। আর ওই এ আইতে ছবি বানায়। ওর নাতির ওই এক নেশা, সব পুরোনো নায়ক-নায়িকা সাথে ছবি বানিয়ে মোবাইলে ছাড়ে। কী অবাক লাগে শিবুর। হিরো একটাই হয়।, ছবি তার সাথেই থাকবে। যেমন ওর ঘরে আছে।এরা কোনোদিন বুঝলই না ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শোতে প্রিয় নায়কের ছবি অন্যের আগে দেখে গল্প শোনানোর মজা। ব্ল্যাকারকে ফিট করে আগে দেখে পাড়ার রক গরমের মজা, গুরুর মতন চেতক বাইকে মনের মানুষটাকে নিয়ে হারিয়ে যাওয়ার মজা।

কয়েকটা প্রশ্ন বেশ কাবু করার মতন করেছিল সঞ্চালক। নেগেটিভ চরিত্রে কোন সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন উত্তম।? কেউ বলতে পারছেনা দেখে বাধ্য হয়ে হাত তুলল শিবু। কুহক নামটা বলতেই হাততালি কুড়িয়ে ছবি পেল গুরুর। বিধান রায় উত্তমকে কী নামে ডাকতেন? – শ্যামল বলে আবার ছবি পেল শিবু। কিংবা স্মৃতিভ্রষ্ট যুবকের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ১৯৫৫ সালে কোন ছবিতে— হ্রদ ছবিতে বলেও হইহই ফেলে দিল শিবু।

এতগুলো ছবি কী করবে, ওর বাড়িতে তো গুরু আর বাবুদার একসাথে একটা ছবি আছে। বড় করে শোবার ঘরে। নাতিও নেবে না, পছন্দ করে না। তার ঘরে হনুমানজীর ছবি। কী করে লাগায় আজকের ছেলেরা কে জানে! অম্বরীশ কুইজ শেষ করে দুঃখের সাথে বললেন – মহানায়ক নিয়ে যত আবেগ শুধুই মুখেমুখে,আসল ছবির গল্প ছবির খবর কমছে কিন্তু আধুনিক প্রজন্মের কাছে। এটা চিন্তার। স্টারডর্ম কনসেপ্টকে ফেরাতেই হবে।

শিবু শুনল বছর চল্লিশের হাতে ট্যাটু, বালা আর কালো গেঞ্জি পরা মদ্দা মত একটা মেয়ে ওর পাশের বান্ধবীকে বলছে – দ্যাখ, দেখেছি সবই ছোটবেলায়। মায়ের পাল্লায় পড়ে। কিন্তু এত গল্প এত তথ্য মনে রাখা যায়? আমি না সিনেমা দেখার পর সব ভুলে যাই। ঐ যতক্ষণ হলে ততক্ষণই। তারপরই আর মনে থাকে না। আর ভাব তো দুশোর ওপর ছবি, সম্ভব নাকি? এত গল্প মনে রাখা যায়। শিবুর মনে পড়ল, খড়দহে ওর মাসির বাড়ির পাশে থাকত সিন্টু আর বোন ফচো। কী মেমোরি মাইরি, ছবির নাম বললেই গল্প বলে দিত। তারপর শিবুর মা। হয়ত কথা উঠল চাওয়াপাওয়া কিংবা মরুতীর্থ হিংলাজ!!! মুহূর্তে কী কী ঘটেছিল সব বলে দেবে। এরা কি অন্য গ্রহের জীব! নাকি এদের মাথায় গুরুর আশির্বাদ আছে? বাবুদা অবশ্য বলত – শোন, এই নতুন প্রজন্মটার কোনো স্বপ্ন নেই ফলে ওদের গুরুও লাগে না।

৪

কুইজ শেষ হতেই শুরু সেই ভয়ঙ্কর বিতর্কসভা – নায়ক যুগের কি অবসান নাকি উত্তম নায়কের অভাবে? পক্ষের বক্তাদের তালিকায় ওর নাম লিখিয়ে দিয়েছিল বাবুদার ছেলে তুতুল। বলল – শিবু কাকু তুমি বলবে, সেই যুগ আর এই যুগ দুটোই দেখেছো, বাবা থাকলে বাবাকে দিতাম, তুমিই বলো। বাবুদার ছেলের কথা ফেলে কী করে? উঠতেই হল – এককালের ব্ল্যাকার কাম উত্তম লাভার শম্ভুনাথ দত্ত ওরফে শিবুকে। সঙ্গে লাইটম্যান কানাই। যদিও ঘোষিকা মেখলা রায় পরিচয় করালেন সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য বলে। উল্টোদিকে অভিনেতা অম্বরীশ, শিবপ্রসাদ, প্রসেনজিৎ। আরও অনেকে। টান টান উত্তেজনা। প্রসেনজিৎ প্রথমেই মোবাইল, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, ওয়েব সিরিজ ইত্যাদির আর অধিক সংখ্যায় সিনেমা হওয়ার অজুহাত দাঁড় করালেও শিবপ্রসাদ, অম্বরীশ বললেন, কণ্ডিশন বা সিচ্যুয়েশন উত্তমের মতন নায়ক বা স্টারডর্ম কনসেপ্ট তৈরি করতে দিচ্ছে না, তার সঙ্গে রয়েছে সিরিয়ালের একঘেয়েমি কনসেপ্ট। ফলে উত্তম কুমার হচ্ছে না। কানাই অবশ্য বলল – উত্তম কুমার কালের নিয়মে জন্মেছে। ক্ষণজীবী বারবার জন্মায় না, যুগের আশির্বাদ। সবকিছুর বিপরীতে সব শেষে বলতে উঠল ব্ল্যাকার শিবু – গুরু আর বাবুদার কথা ভেবে নিয়ে প্রথমেই বলল – আমার পরিচয় কম দেওয়া হয়েছে। আমি আসলে ছিলাম সে যুগের ব্ল্যাকার। উত্তমকুমারের সাথে দেখা হয়েছে বহুবার। আমি অভিনয় জানিনা তাই সত্যি বললাম – কারণ গুরুর নামে মিথ্যা বলা অপরাধ। দীর্ঘ কুড়ি বছর দর্শকদের চাহিদাটা আমি দেখেছি আর আজও দেখছি—বদলু সমাজের নয়া ডিমান্ড মেটাতে নতুন প্রোডিউসারদের সাপ্লাই। একেনবাবু এ যুগেরই সিনেমা,এবং মানুষ নিয়েছে। অভিনেতা নায়ক হওয়ার আগেই ফুটেজ খাওয়া শিখছে। মহানায়ক তো দূর অস্ত, অভিনয় শেখার আগেই লাইক পেতে চাইছে। হল তো সব মলের পেটে ঢুকে গেছে,হলের সিনেমার চরিত্র নষ্ট হয়েছে ছোটছোট স্ক্রিনে বেরিয়ে।ভাবুন তো, উত্তম-সুচিত্রা, বা অমিতাভ- রেখার একটা ছবির ফার্স্ট ডে রিঅ্যাকশন— চেয়ার পেটানো আনন্দে, পয়সা ছুঁড়ত। একটা জয়েন্ট ব্যাপার। দল বেঁধে ছবি দেখতে আসত, ফ্লপ করলে গালির নাম ধনঞ্জয়। ব্ল্যাকারদের গুষ্টির তুষ্টি করতে ছাড়ত না। মুড অফ হয়ে যেত আমাদের, আর হিট হলে পোয়াবারো।এখন শুধুই একা একা। একলা মানুষ এর নায়ক তো সে নিজেই আর নায়ক, মহানায়ক কোথায় পাবে?একলা মানুষরা চুপিচুপি হলে যাচ্ছে, চুপিচুপি মরে যাচ্ছে–

একটু থেমে আবার বলল–আর তাই সারা বিশ্বজুড়ে চলছে সব সস্তা চুটকি আর চটজলদি বিক্রি হচ্ছে সেক্স, খুন আর ভয়। সেটার সাপ্লাই বেড়েছে। ভাল বাংলা গল্প কমেছে। সাহিত্যিক নেই। আর ব্যবহার করার মতন পরিচালক নেই। খুন আর মৃত্যুকে ভালবাসে না বাঙালি। আমার গুরুও বাসত না, ফলে অভিনয় করে মধ্যবিত্ত জীবনটাকে হাসিঠাট্টা মজায় ভরিয়ে দিত পরিচালক আর প্রোডিউসাররা। এই যেমন কদিন আগে একেনবাবুতে দিয়েছে। মানুষ নিয়েছে। খুন, মারপিট, যৌনতা, নৃশংসতার বাইরে পরিচালককেও স্রেফ মজার কথা ভাবতে হবে সাড়ে চুয়াত্তরের মতন। শুধুই গুরুকে খুঁজলে হবে না, গুরুগিরির কায়দাটাও জানতে হবে। ইন্দ্রপুরীর ট্রলিম্যান লালুদাকে মনে পড়ে। ওনার বাবাও শুটিং এর ট্রলি ঠেলতেন। ক্যানসার হয়েছিল। গুরু জানতে পেরে শেষদিন পর্যন্ত চিকিৎসার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। কত নায়ক এল গেল। মহানায়ক একজনই হল। হাততালিতে হল ফেটে পড়ছে।

প্রসেনজিৎ, অম্বরীশ উঠে এসে জড়িয়ে ধরলেন শিবুকে। মাউথপিসটা হাতে নিয়ে বললেন – উত্তম ব্ল্যাকারকে উত্তম অভ্যর্থনা জানাতে চাইছি, আমরা এযুগের পরিচালক অভিনেতারা। এই পেশাটা অনৈতিক হলেও ছিল। আজ হারিয়ে গেছে মাল্টিপ্লেক্স আর ওটিটি প্লাটফর্মে। আগামী মাসের দিকে আমরা ওনাকে নিয়ে শুরু করছি নতুন ছবি— ব্ল্যাকার। শিবপ্রসাদ প্রস্তাব রেখেছেন। আমিই প্রযোজনা করব। গল্পের সূত্র সবই শিবুবাবু জোগাবেন আমাদের। ছবিটির প্রিমিয়ার শো এই সুকান্ত সদনেই করব। আগামী বছর উত্তম জন্মদিবসে। এটা উত্তম কুমারের প্রতি আমাদের শিল্পী সংসদের শ্রদ্ধাঞ্জলি ধরতে পারেন। এই বিষয়ে আমাদের সহযোগিতা করবেন শিবু বাবুর ছেলে উত্তম তার উত্তম কন্ঠে।

মহানায়ক উত্তম কুমারের থেকে সে যুগের সব ছবির ডিমান্ড সাপ্লাই কার্ভটার বাস্তব চেহারাটা ব্ল্যাকারের চেয়ে ভাল কেই বা বলতে পারবে বলুন তো?

তুমুল হাততালি পড়ছে হলে।

উঠে এসে মাইকটা হাতে নিয়ে শিবু বলল – এই সংস্থার প্রয়াত সম্পাদক শিবনাথদা মানে বাবুদা বলতেন – একশ বছর পরেও দেখিস ঠিক এইরকম পপুলার থাকব তোর এই অ-মানুষ গুরু। আজ বুঝলাম – অমানুষ কেন জনপ্রিয়? খালি একটা ব্যাপারই মাথায় ঢুকছে না, বই তো হবে আমাদের মতন অমানুষদের নিয়ে,কিন্তু শুটিং হবে কোথায়? কারণ আমাদের যুগে হলগুলোই হয়ে যেত নায়ক বল্গবাষ্টার ছবিগুলো প্রথম রিলিজ করিয়ে আর সেই নায়কদের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসত গুরুর মতন মহানায়করা।

বাইরে তুমুল বৃষ্টি হয়েছে অনুষ্ঠান চলাকালীন। সুকান্ত সদনের সামনে থেকে ব্যারাকপুর রেল স্টেশন পুরো জলে জলাক্কার। ওরা বেরোতে গিয়েও আটকে গেল, টোটো বন্ধ। অটো বন্ধ। এই অবস্থায় বাড়িতে ফিরবে কি করে? বাবুদার ছেলে তুতুল বলল – আমিও তো বাইক রেখে এলাম। দাঁড়াও সেরকম হলে প্যান্ট ছেড়ে বারমুডা পরে গিয়ে বাইকটা নিয়ে আসছি।

কোনো চিন্তা নেই আমরা পৌঁছে দিচ্ছি – ব্ল্যাকার শিবুর পিঠে হাত রাখল শিবপ্রসাদ। পেছনে হাসছে প্রসেনজিৎ আর অম্বরীশ। বলল – আমাদের দুটো গাড়ি আছে একটাতে উঠে পড়ুন। পাশের পাড়াই তো, নামিয়ে দিয়ে চলে যাব। সোজা হয়ে দাঁড়াল শিবু, যেমন আগে টিকিটের দাম বাড়াবার সময়ে দাঁড়াতো, বলল – আসলে অনেকক্ষণ বসে উঠলে আজকাল কোমর থেকে পা অবধি খুব যন্ত্রণা হয়।তারপর একটু থেমে উদাস চোখে বাইরের দিকে তাকিয়ে বলল, আসলে দোষ আমারই—- অগ্নিশ্বর চলছে তখন। খুব ভিড় হচ্ছে। বাবুদা ছিল না ব্যারাকপুরে। আচমকা রেড করল পুলিশ।দৌড়ে পালাতে গিয়ে হাইড্রেনে পড়লাম। পাইপে লাগল। বড় চোট ছিল। এখনও বোঝায় অমানুষের যন্ত্রণাটা কি আর ঠিক কতটা ভেতরে!!

প্রসেনজিৎ এসে পিঠে হাত রেখেছে – এবার শুটিং শুরু হলেই দেখবেন ব্যথা কমছে আস্তে আস্তে। আসুন আমার গাড়িতে। ওরা আসছে পেছনের গাড়িতে।

বিশাল সাদা গাড়িটা ওদের ঘুষিপাড়ায় ঢুকে বাড়ির সামনে যখন দাঁড়াল তখন ওর পঙ্গু স্ত্রীর ঘর থেকে রেডিওতে ভেসে আসছে একটা গান– পৃথিবীর গান আকাশ কি মনে রাখে?

দরজা খুলে নেমে প্রসেনজিৎ চারদিক দেখছে। মফস্বলী বর্ষাভেজা রাত্রিকে উপভোগ করছে বোধহয়।

-চলুন – ভেতরে চলুন। মহানায়ক না হয় এলেন না, নায়ক তো এসেছেন।—আন্তরিকতার ডাক শিবুর গলায়।

প্রসেনজিৎ এগিয়ে জড়িয়ে ধরলেন। আজ না তবে এরমধ্যে এমনিই আসতে হবে ফুল টিম নিয়ে। তখন একদিন দুপুরে এসেখাওয়াদাওয়া করব।প্রমিস।বৌদির সাথে আলাপও করব।

-তবে হ্যাঁ, আপনি প্রসঙ্গটা ঠিকই তুলেছেন। শুটিং করব কোথায়? হলই বা কোথায়? আপনিই দেখুন। আশেপাশে কোনো পুরনো হল পাওয়া যায় নাকি? মালিকরা কেউ বেঁচে আছেন?

শিবু চুপ। শুধু বলল – দেখছি। আসলে আমার দ্বিতীয় গুরুও তো নেই। তাই চ্যালা এখন খুব একা।

৫

দিন দুয়েক বাদে দুপুরে খাওয়ার পরে পুরনো অ্যালবাম ঘাঁটতে বসেছে সেই সময়কার কিছু ছবির জন্য। শুটিং এ লাগবে। ফোনটা বাজছে – ওপাশ থেকে প্রসেনজিতের গলা – শুনুন শিবুদা প্রোডাকশন খোঁজ নিয়েছে – অমলা বলে একটা পুরনো সিনেমা হল এখনও আছে ব্যারাকপুরে, তবে বন্ধ।

কথা থামাল শিবু – হ্যাঁ হ্যাঁ অমলা জানি। মালিক জনিদা। বাবুদার বন্ধু।

-কথা বল তো – ওপারে প্রসেনজিতের গলা।

পুরনো মেজাজ যেন ফিরেছে শিবুর – চিন্তা নেই। হয়ে যাবে।

বিকেলে যোগাযোগের পর রাতে ফোনে দুবারের চেষ্টায় পেয়ে গেল। প্রসেনজিৎকে বলল – কথা হয়েছে। প্রোমোটারের সাথে হাফ কথা হয়েছে। সাত দিন হল দিতে পারবে। আর বলছে আপনারা শুটিং করলে ও সাত দিনে একুশটা উত্তম কুমারের ছবি চালাবে। প্রজেক্টর বেচে নি। হলটা একটু পরিষ্কার করে নিতে হবে।

-ভেরি গুড। নো প্রবলেম। ডান শিবু ডান। রেট্রোস্পেকটিভ করবে তাই তো। খুব ভাল হবে। তোমার পুরনো ছবিগুলো চাই।

শিবু থামাল। শুনুন জনিদা খুব গুরু ভক্ত। ওর বাড়িটার নাম দিয়েছিল সূর্যতপা। বুঝলেন তো?

ও বলল – আর কদিন শিবু। হলের শেষ শো গুরুকেই দিয়েই হোক। শুটিংও হবে, গুরুও বাঁচবে। গুরুকে সম্মান দিয়েই মরতে পারব।

-ফোন নাম্বার পাঠাও। কথা বলে নেবে প্রোডাকশন।

ফোন ছাড়তেই দেখল পাশে দাঁড়িয়ে আই টি অপরাধের নাতি – তৃষাণ।

-শেষে অমলায় শুটিং। ওয়ার্থলেস। এইজন্য বাংলা সিনেমা দেখতে ইচ্ছে করেনা। তা তুমি কী সাজবে? ব্ল্যাকার? কী ট্রাস ব্যাপার

-ইয়েস – এগিয়ে এসেছে ছেলে উত্তম – হ্যাঁ বই এ লাগলে ব্ল্যাকার সাজবে বৈকি।

-আমাকে বাদ রেখো ও কদিন ওসব কাজে – নাতি যেন ফুটছে।

-ঠিকাছে। তুই কোথাও ঘুইরা আয় – টাকা আমি দিমু – শিবুর গলায় তাপ।

তারপর নাতি আর ছেলের দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে বলল – বাবুদা থাকলে কইত গুরুর লিগা রেডি হইয়া যা শিবু – চান্স ছাড়িস না – তারপর বাবুদা উত্তম আর শিবুর বড় ছবিটার দিকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে স্বগতোক্তি করল –

-হ্যাঁ হ্যাঁ ছাড়ুম ক্যান –

-গুরু উত্তমের লইগা রেডি এই অধম – একটা আসলি অমানুষ- আর ওগো ভাষায় উত্তম ব্ল্যাকার।

-কি বলিস?

কথা শুনে তার গুরুর গলায় হো হো করে হেসে উঠল উত্তম।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, অক্টোবর ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য