
নুড়ি পাথরের সঙ্গে চলতে চলতে (১৯)
আমি তখন নাইন কি টেন ৷ যতদূর মনে পড়ছে ১৯৭১ চারু মজুমদার ধরা পড়েছেন ৷ তার অল্প কিছুদিন আগেই আমি আর পেট্রিক ঘুরে এসেছি ৷ চারু মজুমদারের মাঝে মাঝেই অক্সিজেন নিতে হতো ৷ তাঁর টিনের চালের ঘরেও আধো অন্ধকারে দেখেছিলাম সেই সিলিন্ডার ৷ পরে শুনেছিলাম সেই অক্সিজেন বন্ধ করেই মেরে ফেলা হয়েছিল তাঁকে ৷ আমার শোনা কথা ৷
সেই সময় কানু সান্যালকে জেলে নিয়ে গেলে আমার শহরের দেওয়ালে এবং কলকাতার বহু কলেজের দেওয়ালে লেখা হয়েছিল
” এক কানু গেছে জেলে / তৈরি আছে হাজার ছেলে ” লিখেছিল মৃদুল দাশগুপ্ত ৷
১৯৬৭ থেকে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা নক্সাল আন্দোলন ছিল ছাত্রবিদ্রোহ এবং সশস্ত্র কৃষকদের বিদ্রোহ ৷ ফলে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দমন পীড়ন ছিল ভয়ঙ্কর ৷ ইতি মধ্যে মারা গেলেন চারু মজুমদার ৷ নেতৃত্বের মধ্যে প্রবল মতবিরোধ শুরু হল ৷ নরমপন্থী এবং চরমপন্থী নেতাদের এই বিভেদকে কাজে লাগিয়ে সরকার চাইলেন আন্দোলনকে দুর্বল করতে ৷ পুলিশের কম্বিং অপারেশনে সে সময় বহু মেধাবী ছাত্রছাত্রী মারা গেলেন ৷ যা বাংলা তথা ভারতের অনেক ক্ষতি করেছিল ৷ অনেকে ভুল পথেও গেলেন ৷

কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে সুযোগ পেয়েও পড়া হল না আমার ৷ বাবার ভয় ছিল আমিও পুলিশের গুলিতে মারা যাবো ৷ ভর্তি হলাম শ্রীরামপুর কলেজে ৷ শ্রীরামপুর কলেজ ইউনিয়ন তখন CP নিয়ন্ত্রিত ৷ পরবর্তীকালে এখান থেকেই পাশ করে এখন বেশ অহংকার হয় ৷
কানু সান্যাল , জঙ্গল সাঁওতাল , আজিজুল হক , মার্কসবাদী -লেনিন বাদী এইসব নেতা আজ আর কেউ নেই ৷ আজিজুল মধুসূদন দত্তের সমাধিতে আমার একটা কবিতার বই প্রকাশ করে অনেক কথা বলেছিলেন ৷ যা শুনে মঞ্জুষদাও একটু চমৎকৃত হয়েছিলেন ৷ গতবছর ২০২৫ এ তিনি মারা গিয়েছেন ৷ ইতিপূর্বে জঙ্গল সাঁওতাল ১৯৮৮ তে মারা যান ৷ কানু সান্যাল মারা যান ২০১০ এ ৷ এঁদের সে সময় তরুণ প্রজন্মের অনেকেই অন্ধের মতো বিশ্বাস করতেন ৷ এসময় সহিংস নকসালবাদীদের হাতে অনেকেই মারা গিয়েছিলেন ৷ একটা অত বড় বিপ্লব দূরদৃষ্টি আর পরিকল্পিত দিশার অভাবে শেষ হয়ে গেল ৷
সাতের দশকে আমি নিয়মিত আকাশবাণী কলকাতার “যুববাণী” বিভাগে অনুষ্ঠান করতাম ৷ অডিশন পাশ করা শিল্পী ছিলাম আমি ৷ প্রদীপ মিত্র ছিলেন আমাদের পেক্স মানে প্রোগ্রাম এক্সিকিউটিভ ৷ কলকাতা “ক” অনুরোধের আসর ও বেশ কয়েকবার পরিচালনা করেছি ৷ আমাদের মধ্যে অনেকেই এখন বিখ্যাত শিল্পী ৷ সে সময় যতদূর মনে আছে স্টেশন ডিরেক্টর ছিলেন মলয় পাহাড়ী ৷ তবে আকাশ বাণীতে প্রথম অনুষ্ঠান কবি কবিতা সিংহ পরিচালিত সাহিত্যের অনুষ্ঠান ” শ্রবণী”তে ৷ দু’বার ডাক পেয়েছিলাম ৷ তখন আকাশবাণীতে যাবার আর একটা মুখ্য উদ্দ্যেশ্য ছিল বিখ্যাত শিল্পীদের দেখা ৷ মাত্র একবার ইন্দিরাদিকে দেখেছিলাম ৷ শিশুমহলে খুব ছোট্টখাট্ট মানুষটির কথা আজও মনে আছে ” ছোট্ট সোনা বন্ধুরা ভাই আদর ও ভালোবাসা নাও …কি সব্বাই ভালো আছো তো ?” আর ছোট্টোরা সব্বাই সমস্বরে বলে উঠতো ” হ্যাঁআআআআ” ৷

ইসস আকাশবাণীর সেই শিশুমহল আর গল্পদাদুর আসর আজকাল আর হয় না ৷ হবেও না কোনও দিন ৷
আকাশবাণীর বাড়িটার ভিতরে ঢুকলেই একটা রোমাঞ্চ হত ৷ বিখ্যাত সব সঙ্গীত শিল্পী , অভিনেতা ,খেলোয়ার লেখকরা হেঁটে যাচ্ছেন ৷ যেদিন আকাশবাণী কলকাতার অনুরোধের আসর অনুষ্ঠানটি করার জন্যে প্রথম রেকর্ড আরকাইভে গেলাম রেকর্ড বাছাই করতে আমি দমবন্ধ করে বসেছিলিম ৷ ভাবছিলাম কত সব প্রাতঃস্মরণীয় মানুষের কন্ঠ এখানে ঘুমিয়ে আছে রেকর্ডে আর স্পুলে ৷ প্রণাম করে একটা লিস্ট দিয়ে চলে এসেছিলাম ৷ অনুষ্ঠানের দিন ডিউটিরুম থেকে সেগুলি নিয়ে এক নম্বর স্টুডিও তে বসে প্রথম ” অনুরোধের আসর “করলাম ক্যাসুয়াল শিল্পী হিসেবে ৷ অনুষ্ঠান শেষ হতেই ঘরে ঢুকলেন ঘোষক তরুণ চক্রবর্তী ৷ বললেন ওয়েল ডান ৷ প্রথম করলেন ? আমি বললাম হ্যাঁ ৷ অনুষ্ঠান শেষ হতেই এক নম্বর স্টুডিও থেকে ভেসে এলো সেই অসাধারণ কন্ঠস্বর ৷ আকাশবাণী কলকাতা , এতক্ষণ শুনছিলেন অনুরোধের আসর …৷
আমি তখন ডিউটি রুমে সই করছি ৷ দীর্ঘ দিন ছিলাম আকাশবাণীতে ৷
সেই সময়েই সাতের দশকের মাঝামাঝি আনন্দবাজার অফিসে আমার হঠাৎ যাওয়া শুরু ৷ সে এক স্মরণীয় ঘটনা ৷ তখন চাকরি পাইনি ৷ পড়াশোনাই করছি ৷ ডাকে রবীবাসরীয় পাতায় গদ্য লিখতাম আর সাপ্তাহিক আনন্দমেলা , যেটা সোমবার আনন্দবাজারের পাতায় থাকতো তাতে ছড়া এবং ফিচার লিখতাম ৷ কিন্তু লিখে যে টাকা পাওয়া যাবে সেটাই জানতাম না ৷আর ঠিকানা লিখে দিতে হয় সেটাও জানা ছিলনা ৷ হঠাৎ একদিন বিকেলে ল্যান্ডলাইনে একটা ফোন এলো ৷ মা ধরলেন -ওপাশ থেকে কেউ একজন মাকে বললেন ৷ রামকিশোর ভট্টাচার্য আছেন ? মা বলেছেন – বাড়ি নেই ৷ তিনি বলেছেন এলে বলবেন আনন্দবাজার অফিসে এসে রমানাথ চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে ৷
ক্রমশঃ

