
শেষে দিল রা- চোদ্দো

বয়স্ক এক দম্পতি এলেন কয়েক দিন আগে। দুজনেই সত্তরোর্ধ্ব। ভদ্রমহিলাকে দেখতে হবে। উঠতে,বসতে, এমনকি বিছানায় শুয়ে পাশ ফিরতে গেলেও মাথা ঘোরে ওনার। নিউরোলজিস্ট থেকে ই এন টি স্পেশালিস্ট সকলেই দেখেছেন, এবার আমার পালা।
দেখলাম। প্রথাগত ডাক্তারী মতে এ ধরণের মাথা ঘোরার ক্ষেত্রে যেমনটা হওয়ার কথা, তেমন কিছুই না পেয়ে আর সব কথা জিগ্যেস করতে করতে চোখ আটকে গেল গলায় ঝোলানো লকেটে। ছোট্ট একটা লকেট,তাতে একটি কিশোরের মুখচ্ছবি।
পাশ থেকে স্বামী ভদ্রলোক বললেন, আমাদের ছেলে, বত্রিশ বছর আগে চলে গেছে।
ভদ্রমহিলা চোখ মুছলেন।
— বন্ধুর বাসায় ঘুড়ি ওড়াতে গেছিল,নেড়া ছাদ… ক্লাস টেনে পড়ছিল, খুব ভালো রেজাল্ট করত স্যার!
আর বলতে পারেন না তিনি।
–সেই থেকেই চলছে। অনেক কিছু নিয়েই ভুলে থাকতে চেয়েছি আমরা , তবুও মনের মধ্যে কোথাও না কোথাও ঘুরে ফিরে আসে, যদি বাবু থাকতো আজ! কত বড় হতো, সংসার হতো!
আমার তো ঘোরাঘুরির চাকরি ছিল,তাই কোনো রকমে কেটে গেছে। ওর তো উপায় ছিল না, নিঃসঙ্গ… এক মূহুর্ত আমায় ছাড়তে চায় না!
আমার মনে হয়, এই মাথাঘোরাটাও ওর একটা মনের ব্যারাম, এত জায়গায় তো দেখালাম, কমে না!
দীর্ঘ শ্বাস ফেলেন স্বামী।
জানলাম,এই দীর্ঘ সময় ধরে ভদ্রমহিলা প্রায় প্রতিটা রাতেই জেগে থাকেন, ঘুমের ওষুধ খেলেও ঘুম হয়না। সারাটা দিন ঝিমোন কেবল।
কিছুক্ষণ কথা হয় আরও।
এই শূন্যতা পূরণের সাধ্য কি ওষুধের থাকে? কে জানে!

এত বছর ধরে এ কাজটা করতে করতে বুঝেছি, প্রত্যেক মানুষেরই এক একটা গল্প থাকে। হাসির আড়ালে, সৌজন্যের মলাটে অনেক গল্প ঢাকা থাকায় সেসব আর পড়া হয়ে ওঠেনা।
অনেক বছর আগে নিমন্ত্রণ রাখতে গিয়ে আরো অদ্ভুত একটা গল্পের মধ্যে অজান্তেই ঢুকে পড়েছিলাম।
কোনো অনুষ্ঠান বাড়ি নয়, নেহাৎই একটা পারিবারিক আমন্ত্রণ।
দুপুরের খাবার। সযত্নে
টেবিলে সাজিয়ে দেওয়া হচ্ছে থরে থরে। বাড়িতে কেবল গৃহকর্ত্রীই থাকেন। আমরা ছাড়া আর অন্য অতিথি নেই কেউ। গৃহকর্ত্রী যদি আমাদের সঙ্গেই খেতে বসেন তাহলেও তিনটে থালাই যথেষ্ট। চতুর্থ একটা পাত পাতা দেখে মনে ভাবলাম নিশ্চয়ই কেউ একজন আসবেন। জিগ্যেস করতে যাচ্ছিলাম, আমার স্ত্রী চোখের ইশারায় থামিয়ে দিলেন।
তিনজনেই বসেছি, অথচ চতুর্থ থালাটা নিয়ে মনের উসখুশ ভাবটা যাচ্ছে না। জলের গেলাস থেকে শুরু করে সবটুকুই পরিপাটি সেখানে। একটু ঢেকে রাখলে হতো না?
আমার অস্বস্তির মধ্যে বলেই ফেললাম কথাটা।
ভদ্রমহিলা ততোধিক অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে,– তোমার মেসোমশাই খাবেন তো?
ওনার ফেভারিট খাবার তো সব… পোস্তর বড়া হয়েছে না!
যদ্দুর জানতাম, ওনার স্বামী গত হয়েছেন বহুদিন। দেখলাম আমার স্ত্রী কটমট করে আমার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে।
খাওয়া দাওয়ার পর আর বসা গেল না। বাইরে বেরোতেই গাল খেলাম,
আচ্ছা আহাম্মক তো! এসব কথা বলে নাকি কেউ?
— কিন্তু… মেসোমশাই তো…
আমতা আমতা করি আমি।
— হ্যাঁ,দশ বারো বছর আগে থেকেই মেসোমশাই নেই, তাতে কী? উনি এই এতগুলো বছর ধরে দুবেলাই ওনার জন্য খাবার সাজিয়ে দেন, ওরকম করেই দেন — মান্তু মাসিমার কাছে উনি জীবিত!
শুরুতে কেউ কেউ বোঝানোর চেষ্টা করলেও এখন আর করেনা। একা থাকেন…একটা কাজের লোকই যা সম্বল! তুমি জানতে না সেজন্যই অবাক হয়েছ!
আর কথা বাড়াই না, কোনো মানে হয় না এরপর।
আরও একজন আসতেন আমার কাছে। বয়স ষাটের কাছাকাছি।ভদ্রলোকের সমস্যা যে ঠিক কী, সেটা প্রথম দিকে বুঝিনি। মুখে বলতেন,ঘুম হয়না ডাক্তারবাবু! কখনও কখনও গা হাত পা জ্বলে, অস্থির লাগে এসবও বলতেন।
একাই আসতেন বরাবর, কাউকে কখনও সঙ্গে আসতে দেখিনি।
স্ত্রী মারা গেছেন বহুদিন। একমাত্র ছেলে কখন ঢোকে,কখন বেরিয়ে যায়, তার ঠিক নেই। ইন ফ্যাক্ট, সে যে কোথায় চাকরি করে,কি কাজ করে, তাও ঠিকমতো জানেন না উনি।
যখনই আসতেন, কোমরে একটা বড়সর চাবি ঝুলছে দেখতাম। ফ্ল্যাটের চাবি, বেশ লম্বা। পৈতৃক বাড়ির বদলে কিছু টাকা আর দু কামরার এই ফ্ল্যাটটা পেয়েছেন উনি।
রোজগার কিছু নেই, লোকজনের হাত দেখে যা দুচার টাকা হয়!
নিজের ছেলেকেও আংটি পরিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করেছেন — ছেলে ইদানিং একেবারেই কথা বলে না কিনা!
কদিন পরেই আবার এলেন, ডাক্তারবাবু, ছেলে আমায় খুব মেরেছে– আংটি টা স্যুট করেনি মনে হয়!
আত্মীয় স্বজনের ওপর খুব রাগ,ওরাই ছেলেকে নানারকম বোঝাচ্ছে নাকি।
হোম ডেলিভারি থেকে খাবার আসে,তাই খান।
মাঝে মাঝেই আমায় খুশি করার চেষ্টা করেন, এমনকি হাত দেখার চেষ্টাও করেছেন কয়েকবার।
প্রত্যেক বারই এসে ঘুমের ওষুধ বাড়ানোর এন্তাম করেন।
একদিন দেখলাম খুব খুশি,
ছেলে একটা ফ্ল্যাট কিনেছে স্যার! বিয়ে করবে বোধহয়!
বিয়ে হলো।
কদিন পরে এলেন তিনি যথাবিহিত।
রেজিষ্ট্রেশন করে বিয়ে হয়েছে। ও পক্ষে কে ছিলেন জানা নেই, তবে এ পক্ষে বন্ধুবান্ধব ছিল।
বিয়ের দিনও কেউই ডাকেনি ওনাকে।
কদিন পরে নিজেই গিয়েছিলেন ছেলের বৌয়ের মুখ দেখতে। পকেটে করে সযত্নে নিয়ে গিয়েছিলেন নিজের স্ত্রীর সোনা বাঁধানো লোহার বালা। কদিন নাকি ছিলেনও সেখানে।
ফিরে এসে বললেন,
আর নাহ্! আপনি ঠিকই বলতেন স্যার, ছেলে ছেলে করেই একদিন মরব আমি!
বছর খানেক চুপচাপ। গেল সপ্তাহে এলেন হঠাৎ।
— মনটা ভালো নাই ডাক্তার সাহেব!
ছেলের বন্ধুর মুখে শুনেছেন, দাদু হয়েছেন তিনি। যদিও ছেলেকে ফোন করে কথাটা জানতে চাইলে, “কোত্থেকে শোনো এসব?”বলে কেটেই দিয়েছে ফোনটা।
মহাসঙ্কটে পড়েছেন তিনি, নিজে থেকেই কি চলে যাবেন একবার? যদি হাঁকিয়ে দেয়,এই ভয়টাও কাজ করছে মনে, আবার উত্তরাধিকারী কে একবারটি চোখের দেখার সাধটাও বিসর্জন দিতে পারেন না যে!

এইটুকু তো জীবন!
কতরকম গল্পই যে লুকিয়ে আছে বুক পকেটের নিচে!
কেই হারিয়ে খুঁজছেন, কেউ না থাকার মধ্যেও একটা খোঁজ পেয়ে গেছেন।
কেউ আবার জনাকীর্ণ এই গ্রহের অলিগলিতেই খুঁজে বেড়ান সন্তানের মুখখানা, যে থেকেও নেই।


ভাই গৌতম, বড় মন খারাপ হয়ে যায়, তোমার রোগীদের
এই সব কথা ও কষ্টের কথা শুনে!
কল্পনায় বুঝে নিই, কি ভাবে ভোকাল ট্রিটমেন্ট দাও!
শুভেচ্ছা জানাই।
জীবন কত বৈচিত্র্যময়
ভালো লাগলো ডাক্তারবাবু।