
ঈশ্বরই ধ্রুবক(পর্ব ৬)
এথেন্স নগরের প্রাণকেন্দ্র – উচুঁ মঞ্চের উপর বাদী-বিবাদী পক্ষের বাদানুবাদ চলছে। নীচে জনতা, মাগনায় এমন তোফা মজা দেখার সৌভাগ্য আর ক’বার হয়! জনতার মাঝে দাঁড়ানো যুবকটির কপালে তখন বিনবিন করে ঘাম হচ্ছে… যত দু’পক্ষের চাপানউতোর বাড়ছে, তত বাড়ছে জনতার উৎসাহ, আর ততই যেন যুবকের জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হচ্ছে! এক সময় যুবকের আশংকাই সত্যি হল…গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বদান্যতায় ফরিয়াদী বিজয়ী হলেন, সোপর্দ হলেন বিবাদী, দীর্ঘশ্বাস ফেললেন যুবক – প্লেটো! রাষ্ট্র তথা শাসনযন্ত্রের সুবিধাবাদী, ক্ষমতালোভী চরিত্র এবং তাতে অধিকাংশ স্থূলবুদ্ধি জনগনের আখের গোছানো, বেকুব নির্লিপ্তি দিনের আলোর মত ফুটে উঠল তার কাছে – এই নাকি মহান গণতন্ত্রের নমুনা!
আসুন, আগের পর্বগুলির চেনা কক্ষপথের একটু বাইরে যাওয়া যাক – যদি ভেবে দেখেন, শাসনযন্ত্রের এই সুবিধেবাদী চরিত্র আসলে আমাদের সকলের, যাকে বলে, রক্তে লেখা আছে… যদি কয়েক লক্ষ বছর পিছিয়ে যান, তাহলে দেখা যাবে – আমরা সুবিধেবাদী তখন থেকে, যখন থেকে আমাদের পূর্বপুরুষ চার পা থেকে পাকাপাকি দু’পায়ে দাঁড়াতে শিখল, যাতে তারা দূর থেকে দেখতে পায় অন্য কোনো পশু তাকে শিকার করতে আসছে কিনা… ধীরে ধীরে দু’পায়ে দাঁড়ানো যখন তার পদায়ত্ত হল, ক্রমে ক্রমে সে শিখতে শুরু করল দুটি হাতের ব্যবহার, করায়ত্ত করতে শিখল নানাবিধ আয়ুধ, যেমন ধরুন – গাছের ডাল, পাথর ইত্যাদি, প্রভৃতি। অন্যান্য প্রাণী যখন তাদের শরীরের বাইরে আর কোনো জিনিষকে নিজেদের সুবিধার্থে ব্যবহার করতে শেখেনি, তখন থেকেই আমাদের পূর্বপুরুষ নিজেদের বুদ্ধি খাটিয়ে শিখে নিল, কীভাবে প্রকৃতির অন্যান্য উপাদানকে নিজের প্রয়োজনে কাজে লাগানো যায় – সুবিধাবাদের সেই সূচনা! কই সে তো বললো না একবারও, ‘আয় বাঘ, তোর সাথে খালি হাতে লড়ি’ কিম্বা ‘আয় হরিণ, তোর সাথে খালি পায়ে দৌড়ে তোকে শিকার করি’! বরং প্রকৃতির সরঞ্জামে সজ্জিত হয়ে সে প্রকৃতির বিপক্ষপাতিতা শুরু করল!
তবে, সুবিধেবাদের একটা প্রধান অসুবিধে হল – সুবিধা সর্বদাই আপেক্ষিক এবং কদাচিত চিরস্থায়ী! অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখবেন এক মূহূর্তের সুবিধা পরমূহূর্তে অসুবিধায় বদলে যেতে সময় নেয় না! আদিম মানুষের ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় হল না – দু’পায়ে দাঁড়ানোর খেসারত অচিরেই দিতে হল আমাদের পূর্বসুরি মহিলাদের! দু’পায়ে দাঁড়ানোর ফলে ক্রমবিবর্তনের পথে নারী শরীরে প্রসবনালি সংকীর্ণ হতে শুরু করল – ফলে এক অদ্ভুত সঙ্কটের সম্মুখীন হতে হল আদিম মানুষদের। একদিকে তারা চাইছে বুদ্ধিমান হতে! বুদ্ধি বাড়লে তার শারীরিক যে প্রতিবন্ধকতাগুলো আছে, যেমন গায়ের বল কম থাকা বা ছোটার বেগ কম হওয়া, সেগুলোকে অনেকাংশেই জয় করা যায়…কিন্তু সে বুদ্ধিতো আর হাঁটুতে থাকবেনা! গড়পড়তা প্রাণীদের তুলনায় তার বুদ্ধি যদি বেশি হতে হয়, স্বাভাবিক কারণেই শরীর সাপেক্ষে তার মস্তিষ্কের আয়তনও বাড়বে। এবার ভাবুন, একইসাথে মস্তিষ্কের প্রসারণ এবং প্রসবনালীর সংকোচন কী মারাত্মক ব্যাপার; সেকালে তো আর আজকালকার মত সিজারিয়ান বেবির এত ছড়াছড়ি ছিল না, শিশুকে মায়ের প্রসবনালী দিয়েই মাথাচাড়া দিতে হত!
সমস্যা কি শুধু একটা! ওদিকে আবার মানুষের ক্রমবর্ধমান মগজাস্ত্রের জন্য প্রয়োজন হল পর্যাপ্ত চালিকাশক্তির, যার যোগান আসবে খাবার থেকে। কিন্তু সে খাবার কদাপি আজকের মত সহজপাচ্য কিম্বা সুপক্ক ছিল না! মাছ, মাংস কিম্বা শাকসব্জি যেটাই হোক, কাঁচা অবস্থায় হজম করা একটু কঠিন, তা আবার যদি স্বাভাবিকের থেকে বেশি পরিমানে প্রয়োজন হয়, তাহলে তো গোদের উপর বিষফোড়া! কিন্তু ততদিনে আমরা হাতের ব্যবহার শিখে নিয়েছি। বাঘকে সামনে পেয়ে হাতের কাছে যা পাই, তাই ছুঁড়ে মারার চেষ্টা করি। হরিণ শিকার করার জন্য যখন দৌড়ে নাগাল পাই না, তখন গাছের ডাল, পাথর ছুঁড়ি। পাথর যে একটি অত্যন্ত উপযোগী বস্তু, তা আমরা পাকেচক্রে বুঝতে শিখেছি! একটু একটু করে বুদ্ধি বাড়ছে, তার সাথে সাথে অভিজ্ঞতাও; ধীরে ধীরে তাই আদিম প্রস্তরযুগের মানুষ বুঝতে শিখল – পাথর কে যদি একটু ঘষে মেজে ধারালো করা যায়, তাহলে অস্ত্র হিসাবে তার উপযোগিতা আরো বাড়ে। সেই পাথর ঘষে শান দিতে দিতে একদিন হঠাৎই সে আবিষ্কার করে বসে – ফুলকি – আগুন! মানবজাতির ইতিহাসের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার – যা তার বিবর্তনের পথ মসৃণ করল বহুলাংশে…
মানুষ সহ অন্যান্য প্রাণীকুল এতদিন আগুন দেখেছে দাবানল হিসাবে। তারা জানত আগুন কতটা সর্বগ্রাসী এবং বিপজ্জনক! আর সেই আগুন যখন আদিম মানুষের নিয়ন্ত্রণে চলে এল, এক লহমায় সে অন্যান্য প্রাণীকুল থেকে এগিয়ে গেল কয়েকশ’ যোজন! আগুন মানে অপার শক্তির উৎস, আগুন মানে অন্ধকারকে জয়, আগুন মানে হিংস্র প্রাণীদের কাছে ভয়, আগুন মানে শীতের দিনে ওম, আগুন মানে রাতের বেলায় শান্তিতে ঘুম – মগজের বিশ্রাম, আগুন মানে কাঁচা খাবার ঝলসানোর সুযোগ! আগে যে কাঁচা মাংস ছিল কঠিনপাচ্য, সেই মাংসই হঠাৎ একদিন আগুনে পড়ে ঝলসে গেল। সেই ঝলসানো মাংস পরম তৃপ্তি ভরে খেতে খেতে মানুষ আবিষ্কার করল অগ্নিপক্ক মাংস পরম সুস্বাদু তো বটেই, একই সঙ্গে সহজপাচ্যও। আরো একটা সুবিধা হল – কাঁচা মাংসে থাকা জীবাণুরাও সেই আগুনে ঝলসে গেল। ফলত বুদ্ধির বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্যশক্তির যে চাহিদা, তার সাথে যোগানের একটা সামঞ্জস্য তৈরির পরিস্থিতি তৈরি হল, একইসাথে অপেক্ষাকৃত দীর্ঘায়ু হল মানুষের জীবন – খাদ্যে থাকা জীবানুকুলের অগ্নিচিতায় পঞ্চত্বপ্রাপ্তির ফলে! বুদ্ধির বহর বাড়ার জন্য এই যে অনুকুল অবস্থা তৈরি হল মানবজাতির ক্ষেত্রে, ফলস্বরূপ অন্যান্য প্রানীদের থেকে শরীরের তুলনায় মস্তিষ্কের পরিধি বাড়তে শুরু করল তাদের। কিন্তু বিধি বাম – আগেই বলেছি যে হাঁটতে শেখার জন্য ততদিনে মহিলাদের প্রসবনালিও সংকুচিত হতে শুরু করেছে! প্রসব যন্ত্রণা এমনিতেই দুঃসহ, তায় যদি সে বাচ্চা মাথামোটা হয়, তাহলে তো চিত্তির! তাই প্রকৃতির অদ্ভুত নিয়মে স্থির হল, মানব সন্তান প্রিম্যাচিওরড অর্থাৎ অপরিণত অবস্থাতেই ভূমিষ্ট হবে!
ছোটবেলায় আমাদের পাশের বাড়িতে গোয়াল ছিল – সেখানে খান চারেক গরু থাকত। সিঁড়ির জানলা দিয়ে ছোটবেলায় একবার দেখেছিলুম, একটা গরুর বাচ্চা হতে। বাচ্চাটা দেখলাম জন্মানোর কিছুক্ষণ বাদেই লাফাতে শুরু করল! ভারি আশ্চর্য হয়েছিলাম – কই, আমারতো মনে পড়েনা, আমি ছোটবেলায় জন্মেই হাঁটতে শিখে গিয়েছিলাম বলে! না হয় আমার কথা বাদ দিন, আমি তখন ‘দুধের শিশু’ ছিলাম, হয়তো সেসময়ের কথা মনে নেই! কিন্তু তারপরেও কখনো কোনো সদ্যজাত মানবশিশুকে হেঁটে বেড়াতে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি, আশা করি আপনাদেরও হয়নি! আপনি যুক্তি দিতেই পারেন, দু’পায়ে হেঁটে বেড়ানো অত সহজ নয়, তার জন্য ব্যালেন্স আয়ত্ত করতে হয়…আচ্ছা নিদেনপক্ষে কোনো মানবশিশুকে কি দেখেছেন, জন্মেই সে হামাগুড়ি, অর্থাৎ চার-পেয়ে চলাচল শুরু করেছে!
আজকের যুগে এই বৈচিত্রময় মানবজাতি, আসলে যদি ভেবে দেখেন, মানবশিশুর সেই অপরিণত জন্মের অবশ্যম্ভাবী পরিণাম! শিশুটি অপরিণত অবস্থায় জন্মানোর পর স্বাভাবিক ভাবেই বেশ কিছুকাল পর্যন্ত তার মায়ের স্বাভাবিক বিচরণ সীমিত হয়ে পড়ল, অন্তত যতদিন না শিশুটি খানিকটা সাব্যস্ত হয়। ফলত, গোষ্ঠীবদ্ধ যাযাবর জীবনেও একটা থিতু হবার প্রবণতা দেখা দিল। এক তাল নরম মাটি যেমন কুমোরের আঙুলস্পর্শে নিটোল রূপ পায়, তেমনই নবজাত শিশুটির ক্রমপরিণতির ক্ষেত্রে কুম্ভকারের ভূমিকা পালন করে তার চারিপাশে থাকা মানুষজন-পরিবেশ-পরিস্থিতি। জন্মানোর পর থেকে প্রথম কিছুমাস অবধি দেখবেন প্রায় প্রতিটা শিশুর হাব-ভাব উনিশ-বিশ, সে তালতলাতেই থাকুক, কিম্বা তানজানিয়ায়। কেউ রাতে ঘুমোয়, কেউ দিনে, কেউ খিদে পেলে কাঁদে, কেউ ঘুম পেলে… কেউ কেউ আবার এমনিই কাঁদে! আমার ছেলে রোদ্দুর যেদিন প্রথম নার্সিং হোম থেকে বাড়ি এসেছিল, সেদিন সারারাত কেঁদেছিল আর সবুজ পটি করেছিল। ভোরবেলায় দেখলাম সে আর তার মা একসাথে কাঁদছে – এমন অভিজ্ঞতা আমার মত নিশ্চয়ই অনেকেরই হয়েছে! পরদিন সকালে স্থানীয় এক শিশুবিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে গেলাম মা আর তার ছানাকে! তিনি আবার খেঁচো ডাক্তার! এমন বকাবকি আরম্ভ করলেন, যেন তার আগে আমাদের দশটি সন্তান হয়ে গেছে, ক্রিকেট টিম বানাবো বলে এটি আমাদের এগারোতম সন্তান! আমরাও যে একদম আনকোরা মা-বাবা, সেটা বোঝার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করলেন না, দাগিয়ে দিলেন, আমরাই বাচ্চা ভোলাতে পারিনা! ডাক্তারখানা থেকে বেরিয়ে আমরা পণ করেছিলাম, আর ওনার চৌকাঠ মাড়াবো না! তা সে যাকগে, সে অন্য কথা…
প্রাথমিক অবস্থা কাটার পর আস্তে আস্তে মানবশিশু যখন পরিণত হতে শুরু করে, তখনও দেখবেন পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই শিশুরা ‘মা’, ‘বা’, ‘দা’ এইধরণের ছোট ছোট শব্দোচ্চারণ করে। তখনো সে আর পাঁচটা প্রাণীর শিশুদের মত। কিন্তু এরপরেই ঘুরতে থাকে চাকা! আর পাঁচটা প্রাণীর শিশুদের মধ্যে শারীরিক বিকাশ বাদে নতুন করে কিছু বিকাশ ঘটেনা, বাঘের ছানা থেকে বাঘ হয়ে ওঠার পথে তাদের স্বাভাবিক বৃত্তিগুলোর খুব একটা পরিবর্তন দেখা যায় না। সুন্দরবনের বাঘ আর সাইবেরিয়ার বাঘের মধ্যে যা পার্থক্য, তার বেশিটাই অভিযোজনজনিত। কিন্তু সেখানে বাঘের যে স্বকীয়তা, তার খুব বেশি হেরফের হয়না! আমেরিকার ছাগল আর আসানসোলের ছাগলের মধ্যে বৃত্তি কিম্বা যাপনের খুব বেশি পার্থক্য চোখে পড়েনা। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে একবার ভাবুন, কী আকাশ-পাতাল পার্থক্য হয় সামান্য অঞ্চল ভেদে! প্রতিটা জায়গা, তার নিজস্বতা, সেখানকার মানুষের ভাষা-বুলি, চিন্তা ভাবনা, লোকাচার, সেইসঙ্গে শিশুর পরিবার-পরিজন সবাই মিলে শিশুটির ক্রমবিকাশের পথ নির্ধারন করে দেয়। এখানেই আসে প্রশ্ন, কোন কারণ সেই মানবশিশুকে অন্যান্য প্রাণীর শিশুদের থেকে আলাদা করে দিল? উত্তর আমাদের জানা, আমাদের বুদ্ধি এবং চিন্তাশক্তি। মানুষের শারীরবৃত্তীয় বিবর্তন প্রাকৃতিক নিয়মেই শুরু হয়েছিল। কিন্তু একটা সময় সেই বিবর্তন মন্দীভূত হল। নৃতত্ত্ববিদরা বলেন, আজকের মানুষ আর লক্ষ বছর আগের মানুষের মধ্যে শারীরিক পার্থক্য সামান্যই, ব্যবধান শুধু তাদের চিন্তাশক্তিতে!
প্রতিটি প্রানীরই নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের ভাষা আছে। আধুনিক বিজ্ঞান বলে, আমরা একে অপরের সাথে যে যোগাযোগের মাধ্যম স্থাপন করি, তার মাত্র সাত শতাংশ শব্দের উপর নির্ভরশীল। বাকি তিরানব্বই শতাংশ আমাদের কন্ঠস্বর এবং বাচন ভঙ্গীর উপর নির্ভর করে! অন্যান্য প্রাণীদের তাই আমাদের মত শব্দভান্ডার নেই মানে এই নয় যে তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে না! প্রতিটি জীবের নিজস্ব ভাষা আছে। যেমন ধরুন, একটা আস্ত নলেনগুড়ের তালশাঁস সন্দেশ খাবেন বলে একটা বাটিতে রেখে গেলেন, ফিরে এসে দেখলেন, পিঁপড়েদের মহাভোজ। পিঁপড়েদের টহলদার কমিটির কেউ নিশ্চয়ই পরম লোভনীয় বস্তুটি আবিষ্কার করেছিল…তা বাবা তুই সন্ধান পেয়েছিলিস, তুই খা, তোর এত রাষ্ট্র করে বেড়ানোর কী দরকার ছিল! তার মানে, ওদের মধ্যেও ‘পেটে কথা চেপে রাখতে না পারা’-র অভ্যাসটা আছে; দল বেঁধে তাই সব্বাই পিলপিল করে চলে এসেছে আপনার সাধের সন্দেশে ভাগ বসাতে!
প্রথম দিকে যোগাযোগের ক্ষেত্রে মানুষও খুব বেশি সুবিধে করে ওঠতে পারেনি। আর পাঁচটা প্রানীদের মত কিছু আওয়াজই ছিল তার সম্বল। কিন্তু আগুন আবিষ্কারের পর থেকেই, তার মস্তিষ্ক প্রক্ষালনের মাত্রা গেল বেড়ে। ফলে ব্রেনের বিভিন্ন অঞ্চল জুড়তে লাগল এবং কন্ঠের ওপর কন্ট্রোল বাড়তে থাকল। আদিম মানুষদের চেহারা লক্ষ্য করলে দেখবেন, ক্রমশ তার গলার গঠন সুস্পষ্ট হতে থাকল। ফলে প্রথম প্রথম যে শব্দ শুধুমাত্র মুখগহ্বর থেকে প্রস্তুত হত, তার সাথে যোগ হল কন্ঠনালী। ফলে শব্দের বৈচিত্র বাড়তে থাকল। অনুঘটকের কাজ করল জেনেটিক মিউটেশন, ‘স্পিচ জিন’। শব্দের ঝুলি বাড়ার সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গেল মানুষের গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন, কারণ কথাই পারে কথার কথা বাড়াতে, কথার জাল বুনতে!
আমার তখন বছর দশেক বয়স, কোনো এক পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করায় পিতৃদেব হেমেন রায়ের লেখা ‘আবার যখের ধন’ বইটি উপহার দিয়েছিলেন। ট্যাঙ্গানিকা হ্রদ, বিমল-কুমার, কাফ্রী, মাংসের শিঙারা, উফ, বই তো নয়, সে এক রোমহর্ষক রোমাঞ্চকর ব্যাপারস্যাপার! সেখানে, গাঁটুলা সর্দ্দার আমার ভীষণ প্রিয় চরিত্র ছিল। গাঁটুলা সর্দ্দার কথায় কথায় বিমলকে একবার বলেছিল, “…যারা বেশী কথা কয়, তারা বাজে কথা কয়। যারা বাজে কথা কয়, তারা সিঙ্গী মারতে পারে না। যারা সিঙ্গী মারতে পারে না, তারা বীরপুরুষ নয়…” । একথা শুনে মনে-মনে হেসেছিল বিমল। হাসারই কথা। কিন্তু, মনে রাখবেন, যতই হোক, সে সর্দ্দার, তার কথা হেলাফেলার নয়! কেন, বলছি…
আধুনিক সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, আমাদের এই গোষ্ঠিভিত্তিক সামাজিক জীবনের পিছনে, এই ‘বেশী কথা’-র এক সাংঘাতিক ভূমিকা আছে! যেকোনো স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে দেখা গিয়েছে, গোষ্টীর সদস্য সংখ্যা সাধারণত ৫০ অধিক যায় না। আবার বলছি, হিসেবটা স্তন্যপায়ীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, কীটপতঙ্গদের সে হিসেবের আওতায় আনবেন না। আমাদের সবচেয়ে নিকটাত্মীয় – শিম্পাঞ্জীদের মধ্যে দেখা যায়, গোষ্ঠীর সদস্য সংখ্যা যদি ৫০ এর কম থাকে, তাহলে সেই গোষ্ঠীর স্থায়িত্ব বাড়ে। কিন্তু ৫০ অধিক সদস্য সংখ্যা মানেই নানা মুনির নানা মত, গোষ্ঠীকোন্দল বেড়ে যায়, ফলশ্রুতি – গোষ্ঠীবিভাজন! কিন্তু, সেই সংখ্যাটাই ১৫০ পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে, যদি গোষ্টী সদস্যরা নিজেদের মধ্যে বেশি কথা বলে। কারণ বেশি কথা মানেই যে সর্দ্দারের ভাষায় ‘বাজে কথা’ – কেজো কিম্বা নৈর্ব্যক্তিক কথা ছাড়াও কত কথা – আমার কথা, তোমার কথা, ওর কথা, তার কথা, পরের কথা, পরের চর্চা! এই পরচর্চা শুধু আজকের যুগে রোজকার টিভি সিরিয়ালগুলো আর তাদের দর্শককুলকেই ধরে রাখেনি, এর একটা ঐতিহাসিক অবদান আছে মানবসভ্যতার বিচারে! পরচর্চাই পেরেছে আদিমকালে মানুষকে বেঁধে বেঁধে রাখতে, গোষ্ঠীবদ্ধ হতে! এবং এই পরচর্চাই মানুষকে তার আশ্চর্য অথচ অবশ্যম্ভাবী পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে… যে চর্চা শুরু হয়েছিল একজনের অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে আলোচনায়, তাই কালে কালে এসে ঠেকল, আদৌ যা নেই, সেই সম্পর্কে আলোচনায়… ভাবনার উঠোনে, কল্পনার খোলা ময়দানে মানুষের থিতু হওয়ার সেই নান্দীমুখ!
মানুষ কোনোকালেই গাঁটুলা সর্দ্দারের মত ‘বীরপুরুষ’ ছিল কি না, তাতে ঘোর সন্দেহ আছে। ‘সিঙ্গী মারা’ তো আর হাতের মোয়া নয়, আর আজকালকার দিনের মত তখনকার লোকজনের হাতে অমন স্বয়ংক্রিয় বন্দুক ছেড়ে দিন, দোনলা বন্দুকও ছিল না! তাই সিঙ্গী, অর্থাৎ সিংহ কে সেকালে মানুষ সমীহ করেই চলত! প্রথম প্রথম তাই গোষ্ঠীর মধ্যে কেউ যখন যাতায়াতের পথে সিংহ কে দেখতে পেত, সে বাকিদের এসে জানাত কোথায় সিংহ দেখা গেছে। ‘ওই হুথা সিঙ্গী আছে, হুথা যাস না বটে…’ কালে কালে লোকমুখে রূপ নিল ‘জানিস, আমার মরদ বলিছে বটে, কাল হরিণ শিকার লগে যাবার সময় সিঙ্গী দেখিছে, সে টো দেখেই তো সিঙ্গীর মত বল পেল, আর হরিণটাকে মাইরতে পারলো বটেক…তুই ও তোর মরদ কে বলিস, সিঙ্গীটাকে মানত কইরতে, তাইলে হরিণ পালাইতে লাইরবে…’। বুঝুন, কীভাবে সামান্য একটা সমাপতন সম্পূর্ণভাবে অন্য একটি মাত্রা লাভ করছে! যে সিংহকে সে প্রথমে এড়িয়ে চলছে, সেই সিংহই তার কাছে কালক্রমে সিংহাবতার রূপে আরাধ্য হয়ে দাঁড়াচ্ছে! আর তার কাছে খুলে যাচ্ছে এক নতুন জগৎ – পরাবাস্তব, অবাস্তব, আধিবাস্তব এক কল্প-জগৎ, যার বিস্তৃতি অসীম!
এই চিন্তা-ভাবনা-কল্পনার বিমূর্ত জগতে পা রাখা ইস্তক গত সত্তর হাজার বছরে মানুষের যে বিবর্তনের গতি, তার তুলনা জীবকুলে বিরল। নৃতত্ত্ববিদরা এর নাম দিয়েছেন Cognitive Revolution। সেই বিবর্তন যতটা না শারীরিক, তার চেয়ে বহুগুণ মানসিক। সেই বিবর্তন মানুষকে ভাবতে শেখায়, বুঝতে শেখায়; তার ভিতরে চেতনার মাদুরকাঠি বোনার কাজ করে এই বিবর্তন। সেই বিবর্তনের জালে জড়িয়েই মানুষ তিলেতিলে গড়ে তোলে সমাজ, শাসন, অনুশাসন, সংস্কার, ধর্ম, রাজনীতি, বিজ্ঞান, ঈশ্বর… আমাদের চেনা কক্ষপথ।

[পরম্পরা ওয়েবজিন, ফেব্রুয়ারী ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

অসাধারণ লিখনভঙ্গি! এত জটিল একটি বিষয়ের এমন সহজ ও সাধারণেরও বোধযোগ্য বিশ্লেষণ সত্যিই দুর্লভ। রচনাটি একটি গ্রন্থবদ্ধ রূপ পেলে ভালো হয়।
অনেক ধন্যবাদ…🙏🙏…চেষ্টা করছি নিজের মত করে, যতটুকু পারা যায়…
চমৎকার লেখা। মানুষের Brocas’ center development for speech সেটাও এক মিউটেশন। Hono habilis, Neandarthal হয়ে Cro- magonga পর্যন্ত সব স্বর বিকাশ তেমন ভাবে সংগঠিত হয়নি, Cro-magnon থেকে Bomo sepian এর আবির্ভাব নিয়ে প্রচুর বিতর্ক…. জানিনা তোমার লেখার অভিমুখ কোন দিকে ঘুরবে, যে দিকেই হোক না কেন, এতো সুন্দর সহজ নির্মাণ অনেক দিন দেখিনি। মুগ্ধতা।