সব পাড়ার মতো আমার পাড়াও জেগে ওঠে ভোর হতেই । ভোরে আমি উঠতে পারি না সচরাচর। কিন্তু অনুভব করতে পারি। ওপারের পুকুর ঘাটে হয়তো বা কেউ কাপড় কাচছে, সেই ধপাধপ শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ভোরের আকাশে বাতাসে। আমার স্মৃতি ভরে যাচ্ছে মনোরম সুবাসে ।

বুড়োপুকুরের ঘাটে ক্ষার কাচতে যাচ্ছে মিনতি দি ভারতী দি । বিশাল বড় বড় দুটো বালতি ভর্তি চাদর প্যান্ট জামা শাড়ি…
আমি মিনতিদির হাতটা ধরে বলছি কী অদ্ভুত শিল্পীর মত আঙুল তোমার !এতক্ষণ ধরে এই জামাকাপড় গুলো কাচবে ? তোমার নখগুলো তো সব ভেঙে যাবে গো।
একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে মিনতি দিদি বলে, যার জীবনই ভেঙে গেছে কিছুতেই গড়া হচ্ছে না নতুন করে তার নখ ভাংলে কি আসে যায় বল ?দালান থেকে জেঠিমা মুখ বেঁকিয়ে বলে আদিখ্যেতা করিস নি তো, মেয়েমানুষেরে এত আতুপুতু করতে নেই।
আমি মনে মনে ভাবতে থাকি, শুনতে ভালো যৌথ পরিবারের কায়িক পরিশ্রমের ভার কিন্তু তার কাঁধেই পড়ে বেশি যার বাবা বা স্বামী আর্থিকভাবে ততটা সবল নয়।
ততক্ষণে পুকুরের পাশে মোরগ ডেকে উঠেছে। আমার ক্রিসমাস ট্রিতে এসে বসেছে ঘুঘু। সকাল থেকেই তার কিসের যে বিষন্নতা কেন বিষণ্ণতা!
পাশের ঝোঁপঝাড় থেকে ডানা ঝাপটে একটা দুটো বক বেরিয়ে ভাসমান কচুরিপানার ওপর ব’সে নরম রোদ্দুরে সখ্য ঝালিয়ে নেয়। এদের পাখাতেই তো আলো লুকিয়ে পুবের মাঠ ছেড়েছে গতকালও। পোষা রাজহাঁস চারটে কেউ জলে ঝাঁপিয়ে আনন্দে উচ্ছসিত কেউ প্রতিবেশীর দুয়ারে দাঁড়িয়ে সশব্দে আদায় করে নিচ্ছে রুটি ,বিস্কুটের টুকরো।
বিছানা ছেড়ে উঠে আসি আমি। রান্নাঘরে এসে দেখি বাতাস ভরে গেছে ডিম ভাজার গন্ধে, ধোসার গন্ধে। বুঝতে পারি সুধার ছেলেটা স্কুলে যাবে বর ফ্যাক্টরিতে যাবে। সুধার ভোর হয়েছে অনেকক্ষণ। আমার মন কেমন করে ওঠে।


এক দৌড়ে পিছনের রাস্তায় ছুটে সেই তুমুল ব্যস্ত দিনগুলোকে চু-কিতকিত করে ছুঁতে ইচ্ছে করে।
আমার ডানদিকের বাড়ি থেকে ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে ঝগড়া, দুটি মাত্র বোন থাকে তবু কী নিয়ে যে তাদের ঝগড়া হয় রোজ ! তীব্র অসূয়া যেন আছড়ে পড়ে তাদের প্রতি বাক্যবাণে । অথচ তারা পরস্পরকে নিবিড় আঁকড়ে ধরেই বেঁচে আছে। কি জানি এটাই হয়তো তাদের ভালবাসার ধরন।

ততক্ষণে রোদ পৌঁছে গেছে প্রত্যেক বাড়ির ছাদের কার্নিশে। পুলকার এসে তুলে নিয়েছে বেশি ওজনের ব্যাগ বওয়া শিশু কিশোরদের । তাদের কলহাস্যে মুখরিত হয়ে উঠছে, হেমন্তের হিমহিম সকাল। আমার বাড়ির সামনের রাস্তায় রকমারি কোলাহল। মিলিটারি রঙের ইউনিফর্ম পরে একগুচ্ছ এন সি সির ছেলে মেয়ে কথা বলতে বলতে যাচ্ছে । বর্ধমান, মেমারি লোকালে দূরের গ্রাম থেকে নেমেছে অনেক মহিলা পুরুষ। আরেকটু দূরের খেতে তারা কাজ করতে যাবে। ধান কাটবে, আলু রুইবে, পিঁয়াজ রুইবে।
গাছকোমর করে পরা তাদের শাড়ি গায়ে চাদর,কোমরে গামছা। কালো মসৃণ ত্বক থেকে এক আশ্চর্য গরিমাময় জৌলুশ চুইয়ে পড়ছে ।এরা আমার অনেক কালের চেনা। একসময় এদের ধান রোপন, ধান বপন এবং ধান কাটার ছন্দ দেখতে দেখতে প্রহর কেটে যেত আমাদের।
খেলা থামিয়ে দিয়ে আমরা দেখতাম নালা বেয়ে গড়িয়া আসা জল কিভাবে এরা সানকি করে ছেঁচে ছেঁচে নিজের নিজের জমিতে দিত । দেখতাম কিভাবে ডোঙ্গা করে পুকুর থেকে জল তুলে জমিতে দিত। তখন ডিপটিউবাল বেরোয়নি ট্রাক্টর ছিল সম্পন্নদের সম্বল।
আমার পাড়ার ঘুম ভাঙ্গিয়ে এই জনমজুরেরা দলকে দল চলে যায়। শহুরে বাতাসে মাটির, শ্রমের সোঁদা গন্ধ মিলেমিশে তৈরি হয় এক আশ্চর্য মৌতাত!
একটা দুটো ঘর থেকে কুকারের সিটি পড়ে। রোদ সাবালক হয়। ফেরিওয়ালার ডাক, বাইকের হর্ন, টোটোর তড়িৎ গতি , প্রত্যেক বাড়ির সদর বেয়ে গড়িয়ে আসা জলের মঙ্গলকামনা,কাজের মেয়ের কলিংবেলের শব্দ কমবেশি একই চিত্র রোজ। তবু প্রত্যেকটা ভোর কী অসম্ভব নতুন কী ভীষণ ভালোলাগা!

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জানুয়ারি ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]