
নুড়ি পাথরের সঙ্গে চলতে চলতে (১৫)
সে ছিল আমাদের যৌবনের বেনারস ৷ গলির গলি তস্য গলি আর অসি থেকে বরুণা ঘাটে ঘাটে ঘুরে ঘুরে খাওয়া আর মস্তি করি ৷ সে আজকের কর্পোরেট বেনারস নয় ৷ পৃথিবীর দুটি সবচেয়ে প্রাচীন শহরের একটি বেনারস ৷ বাবা কাশি যাবো বললেই আমাদের মন নেচে উঠতো ৷ গরাণঘাট থেকে আমাদের নিজেদের বজরায় ঘোরা , মাঝি ভোলার সেই মিশকালো দশাসই চেহারায় বৈঠা টানা ৷ সে সব দিন আর এই বেনারসে খুঁজে পাওয়া যায় না ৷ বেনারস মানেই অলিগলি …রাস্তা জুড়ে মহাদেবের বাহনদের উপস্থিতি …পেতলের থালায় সুস্বাদু মালাই রাবড়ি , মঘাই পান , নানা রকমের পানমশালা , সুগন্ধী জর্দা ৷ আর বিশাল বিশাল রামনগরের সাদা বেগুন ৷ কমপক্ষে এক দেড় কেজি তো হবেই ৷ অপূর্ব স্বাদ তাদের ৷ কাঠকয়লার আগুনে সে বেগুন পুড়িয়ে সরষের তেল , নুন আর সুগন্ধি লঙ্কা দিয়ে বেঁটে মায়ের হাতের ফুলকো ফুলকো গরম রুটি দিয়ে খাবার আনন্দটাই আলাদা ছিল ৷ সে অমৃতের স্বাদ আজ সারা ভূবন খুঁজেও পাওয়া যাবে না ৷

বেনারসের গরু মোষের দুধ এত ঘন ছিল যে রক্ত পড়লে মোছার পর যেমন একটা কালচে দাগ থাকে , সেরকম সাদা দাগ থাকত দুধেরও ৷
সেই কাশীর প্রাচীন ঐতিহ্য এখন অনেক ম্লান ৷
সম্প্রতি সুভাষের ছেলের বিয়ে হল জনাইতে ৷ আমি যেতে পারিনি বলে তার খুব অভিমান হয়েছে ৷
আমার কলেজের বন্ধুরা আমায় শৈববৈষ্ণব বলে খোঁচা দিত ৷ এর কারণ জন্ম মাতৃভূমি নবদ্বীপে পিতৃভূমি আমার বেনারস ৷

একটা মজা ঘটত সে সময় বেনারস থেকে ঘুরে এসেই মা আর দুই বোন নবদ্বীপ চলে যেত ৷ তাতে তাদের পড়াশোনার ক্ষতি হলেও বাবার সেদিকে লক্ষ্য ছিল না ৷ বাবার মতে মেয়ে তো অন্য ঘরে চলে যাবে ৷ সেখানে রান্নাবান্না করবে সংসার করবে ৷ তুমি ছেলে পড়াশোনা না করলে আমার ঘাড়ে বসে দমসাবে ৷
আমার বাবা আমায় দুটি মন্দ কথা প্রায়ই বলতেন ৷ একটি বাক্য এরকম ছিল – তুমি একটা গট্টাকশাল আমারই খাবে আমারই পড়বে আমার ঘাড়ে বসে দমসাবে ৷
” গট্টাকশাল” শব্দটির মানে আমি কোনও অভিধানে পাই নি ৷
শ্রীরামপুরে একজন মাস্টার মশাই ছিলেন , সম্ভবত ইউনিয়ন স্কুলের , নাম খুঁজছিলাম স্মৃতির পাতায় দেখলাম মুছে গিয়েছে ৷ তিনি প্রায়ই বলতেন – তুমি হে ছোঁড়া খুবই খাঁটি হৃদয়ের লোক ৷ নবদ্বীপে জন্ম কাশীতে বাস / তোমার থেকে আমার অনেক আশ ৷
সে আশটা কী , জিজ্ঞাসা করলাম ৷ বললেন – সামনের পথে অনেক দূর থেকেও যেন তোমার উড়ন্ত ধ্বজাটি দেখতে পাই ৷
কলেজে পড়লেও তখন কথাটা অত গভীর ভাবে ভাবিনি কখনও ৷ আজ জীবনের এই অন্তিমে এসে বুঝতে পারি তাঁর সেই কথাগুলো ৷
হয় তো তখন আমার জীবনের পথ অন্য ভাবেও লেখা হতেই পারত ৷ প্রেসিডেন্সি কলেজে বাংলায় অনার্স নিয়ে পড়ার জন্যে নির্বাচিত হয়েছিলাম ৷ সেই উত্তাল সাতের দশক ৷ ৭৪-৭৫ এ ৷
বাবা বললেন – না সেটি হবে না ৷ তুমি আমার একটিই ছেলে ৷ আমি তোমাকে হারাতে চাই না ৷
কী বিপদ ! হারিয়ে যাবো কেন !! অত বড় কলেজ বিখ্যাত লোকেরা পড়েছেন সেখানে ৷ আমি ওখানেই ভর্তি হব ৷
বাবা বললেন – আমার শহরে ইতিহাস প্রসিদ্ধ শ্রীরামপুর কলেজে তুমি ভর্তি হবে ৷ আর বাংলা নিয়ে নয় ৷ ওর কোনও ভবিষ্যৎ নেই মাস্টারি ছাড়া ৷ বায়ো সায়েন্স নিয়ে ভর্তি করলেন শ্রীরামপুর কলেজে ৷ বোটানি অনার্স ৷ ব্যাস জীবনের পথ ঘুরে গেল ভুল দিকে ৷ সব স্বপ্ন এলোমেলো হয়ে গেল ৷ সেখানে তখন অচিন্ত্য রায় চৌধুরি বিভাগ প্রধান ৷ এ.আর.সি মানেই কিছু না কিছু ঘটবেই ৷ তাই যা হবার হতে শুরু হল ….
ক্রমশঃ

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জানুয়ারি ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]
