
যাত্রাপথের আনন্দ-গান (পঞ্চম পর্ব)
(নদী)
ফিরতে হবে। ফেরা মানেই গুচ্ছের মনখারাপ। নদীতে স্নান, অফুরান চা আর সমস্তদিন এদিক-সেদিক ছুট— এসব ছেড়েছুড়ে ফিরতে ভালো লাগে? ধান ভরা উঠোন। সন্ধ্যাবেলা অল্প অল্প হিম পড়ছে। ধান ভিজছে। গা-য় উঠেছে চক্করবক্কর ফ্লানেলের শার্ট। গ্রামে আবার ঝুপ করে রাত নামে। লম্বাটে বারান্দার দু’ধারে ঝুলছে দুটো হ্যারিকেন। বাতাসে অল্প নড়ছে। দুই হ্যারিকেনের মাঝখানে ভক্ত ; মাঝেমধ্যেই ক্রো-ক্রো করে বিড়বিড় করছে— খাঁচাবদ্ধ টিয়াপাখি। এখন অবশ্য ওর ঝিমুনির সময়। যা আলো তাতে উঠোনের ওধারে মাটির রান্নাঘরের সিঁড়িগুলোয় হালকা আলো হালকা অন্ধকার। চারদিকে পাট আর ধানের গন্ধ, সাথে কবুতরের বিষ্ঠার গন্ধ। নারীকন্ঠের হাঁক-ডাক শুনে বাড়ির পুরুষেরা একে-একে রাতের খাবার খেতে হাজির হয়েছে। রান্নাঘরের দেয়ালে হেলান দেওয়া কাঠের পিঁড়িগুলো মাটিতে পেতে খেতে বসতে হবে। উঁচুনিচু মাটির মেঝেয় পিঁড়িগুলো খটখট শব্দ করে। নারকেল তেলের কৌটা ফুটো করে বানানো কয়েকটা কুপি ফতফত করে জ্বলছে। রাতের খাবার খেতে বিশ্রী লাগে! ভাতডালতরকারির গন্ধ আর কেরোসিনের গন্ধ মিলেমিশে ওয়াক্ আসে। এট্টু খেয়ে, আধো-অন্ধকার কলতলায় হাত-মুখ ধুয়ে, ধানের ঢিবিগুলো এড়িয়ে— লাফাতে লাফাতে বড়ঘরে। বড়ঘরের একপাশে যাত্রাপালার মঞ্চের মত বড় চৌকি। পাঁচিল ডিঙানোর মত করে চৌকির সামনের ধার আঁকড়ে এক পা তুলে চৌকির উপর উঠতে হবে। ভক্তও ততক্ষণে খাঁচাসুদ্ধু ঘরের ভিতর। মেঝেতে রাখা হ্যারিকেনের আলোয় ক্যালেন্ডারগুলো চকচক করছে— উঁচুতে টাঙানো বাইসনের শিং দুটোও। ক্যালেন্ডারে কত রকমের ঠাকুর। ঠাকুরের মুকুট আর পোশাকের হলদে অভ্রগুলো কী উজ্জ্বল! রাম তীর ছুড়ছে সোনার হরিণের দিকে, গাছের আড়াল থেকে তা আবার দেখছে সীতা। সীতার হাতের আঙুলগুলো ফরসা আর টিকালো! নাচের মুদ্রার মত করে চারটে আঙুল লেপ্টে আছে। বুড়ো আঙুলটা মাছের লেজের মত বাঁকা। রামের গায়ের রঙ নীল। ওপাশের ক্যালেন্ডারে রথের উপর কৃষ্ণঠাকুর। মাটিতে হাঁটু মুড়ে হাতজোড় করে কৃষ্ণের দিকে তাকিয়ে আছে অর্জুন। কৃষ্ণের গায়ের রঙও নীল। চোখটা কী বড়! তরোয়ালের মত বাঁকা চোখের পাতা! মশারি টানানোর হূকের পাশে, দেয়ালে রঙিন সুতো দিয়ে সেলাই করা ফুল পাতার ছবি— ফ্রেমে বাঁধানো। ওতে আবার এক বা দুই লাইনের কবিতাও আছে। কবিতার তলায় যে লিখেছে তার নাম, নামের নিচে আবারও একটা ফুল।

এই বাড়ির ছেলেরা ফুটবল খেলে। “খেলার আসর” পত্রিকার ভারে কাঠের তাক বেঁকে গেছে। পত্রিকাগুলোয় পুরনো কাগজের গন্ধ। মলাটে হরজিন্দার সিং, ইন্দার সিং, সুরজিৎ সেনগুপ্ত, মইদুল ইসলাম, উলগানাথন, বিদেশ বসু, জেভিয়ার পায়াস, সুভাষ ভৌমিক, ভাস্কর গাঙ্গুলী। একটা পত্রিকায় বলের উপর বসে আছে মজিদ বাসকার। কী সুন্দর দেখতে! অনেকটা টারজানের মত, না? অমনি দৌড়ে মামার ঘর থেকে ফুটবল বুট এনে পরতেই হ’ল। উঠোনে ছড়ানো ধানের উপর চামড়ার কালো বলটাকে সে কী লাথ! ফস করে বুট উড়ে খটাম করে পড়ল কবুতরের বাক্সের গায়। কবুতরও ভয় পেয়ে উড়ে গেল বাক্স থেকে! ধ্যুসস্.. মামার বুট কি আর পা-য় হয়?
মামা, আমিও খেলতে যাব। তোমাদের সঙ্গে বুট পরে হাই-ইস্কুলের মাঠে খেলব।
মামা বলল, আচ্ছা যাস। চল এখন নদীতে যাবি।
…চলোওওও নদীতে। কী মজা হবে এখন। বারান্দায় অনেকগুলো গামছা ঝুলছে, ভক্তর খাঁচার দুইধারে। একটা টেনে নিয়ে দে ছুট নদীর রাস্তায়। নদী যত কাছে আসছে ছুট তত বাড়ছে। ঐ যে নদী। দৌড়ে এসে কিছুটা ঢাল পেরিয়ে, বালু পেরিয়ে, জলের কাছে এসেই এক লাফ। এখানে না অল্প জল। আমার ভয় লাগছে না কিন্তু! জলে কত কত মামা সাঁতার কাটছে। দূরে আর একটা ঘাট, ওখানে মাসিরা স্নান করে। আমরা ঐ ঘাটে যাবই না। মামা বলেছে, মাসিদের ঘাটে জল অনেক কম। অল্প জলে কি সাঁতার শেখা যায়! কোমর জলে ঝুপঝুপ করে সাঁতরাচ্ছি। ডুবে যাব না, ভয় নেই, অনেকগুলো মামা আছে তো। মামা, আমি না ডুবসাঁতার দেব। ডুব দিতেই জলের নিচটা ঘোলা ঘোলা লাগল। মুখে ভক করে জল ঢুকে গেল।
মা কোত্থেকে খবর পেয়েছে আমি নাকি নদী থেকে উঠছিই না! ঘাটের ধারে এসে হাতে লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার চোখ জবাফুলের মত লাল। ক্ষিদেও পেয়েছে খুব। উঠি, নইলে লাঠি খেতে হবে। মামা দাঁত বের করে হাসছে, আমার গা পিত্তি জ্বলে যাচ্ছে। যাও, আমি যাব না খেলতে বুট পরে। মাথা মুছতে মুছতে মামাবাড়ির পেছনের রাস্তা ধরে গজগজ করতে করতে ঢুকলাম। দিদা যা দিয়েছে সব চেটেপুটে খেলাম। কী ঘুম পাচ্ছে এখন! কাল ফিরতে হবে ঠাকুর্দার বাড়িতে। খুব কষ্ট হচ্ছে। কেউ যদি মা-কে একটু বোঝায়, আর একটা দিন যদি…!
বাস এসে থামল তোর্সা নদীর এইধারে। বিশাল নদী। এখনও কত জল! এবার নৌকায় উঠতে হবে। কত বড় নৌকা! কত লোক। জিপ গাড়িও উঠছে, পাশাপাশি দুটো নৌকায় বাঁধা কাঠের পাটাতনের উপর। আমাদের নৌকাটায় শুধু মানুষ। চারজন মাঝি। বাঁশের লগির মাথায় আবার রাজমিস্ত্রির ওলনের মত চোখা লোহা লাগানো। মাঝিরা লগি ঠেলছে, আমার ভয় করছে, যদি নৌকা উলটে যায়! এবারে তো সাঁতার শেখা-ই হ’ল না। পরেরবার এলে মামা ভালো করে শিখিয়ে দেবে বলেছে। ডুবে গেলে পরেরবার আসব কী করে! অবশ্য মা ভালো সাঁতার জানে— ভাবতেই ভয়টা কেটে গেল। আসার সময় দাদু অনেকগুলো লজেন্স আর দু’টাকা দিয়েছে। বাড়ি ফিরে বন্ধুদের সাথে ফুটবল খেলব। আর একটু বড় হলে বাবা বুট কিনে দেবে। আমি এই দু টাকা দিয়ে ইন্দ্রজাল কমিকস্ আর চাঁদমামা কিনব। ফ্ল্যাশ গর্ডন আর ডক্টর জারকভের কমিকস্ কিনতে হবে এবার। মামাবাড়ি যাবার সময় কাশফুলগুলো কী সুন্দর ছিল, এখন কেমন যেন নেতিয়ে পড়েছে। এই তো এপার এসে গেছে। নৌকা থেকে নামব। ভাই মায়ের হাত ধরে নামবে। ঐ যে ড্রাইভার কাকুর গাড়ি দেখা যাচ্ছে। জোরসে দৌড়োতে হবে। কাচের সামনে ধারের সীট-টা চাই। ড্রাইভার কাকু পান খেতে খেতে গাড়ি চালাবে। এট্টু পরেই বাড়ি পৌঁছে যাব। বিকেলে পিট্টু খেলব। বন্ধুদের সাথে কতদিন দেখা হয়নি!

