বুমলা পাসে, মিলিটারি দের তোলা ছবি নিলাম। চট জলদি বাঁধিয়ে দিয়েছে। তবে ছবি ভালো তুলতে পারে নি! এবার মোমো খেয়ে গাড়িতে উঠে ফিরছি।
খানিক আসার পর এক সুন্দর লেকের কাছে মিলিটারি রা গাড়ি থামিয়ে নামতে বলল! প্রথমে ভাবলাম সব চেক হবে! ওমা তারপর তারা করজোড়ে
আমন্ত্রণ জানালো, কিছু তাদের সেবা যেন গ্রহণ করি!
“ভাই সাব আভি আভি তো খা চুকে হ্যায় উপর মে”
বললাম। “সাব কফি, চায়, কুছ ভি লিজিয়ে “
সৌমদর্শন গৌরবর্ণ, আর্মি অফিসার আবার অনুরোধ করল!
ভাবলাম এইরে এদের বোধ হয় এগুলো দোকান! একটু নিচে বড় ছাউনী, অনেক মিলিটারি খাবার দিচ্ছে। সামনে অনেক চেয়ার টেবিল। বেশ কিছু পুরুষ, মহিলা
বসে খাচ্ছে! আমায় সিদ্ধার্থ বলল,”চলুন ওরা ফ্রী খাওয়াচ্ছে! বিশেষ এক ভাণ্ডারা!”
ব্যাস, বাঙালি ফ্রী তে পেলে কি না খায়! শুনেই নিচে নেমে এলাম। পাশেই অপূর্ব সুন্দর লেক! কনকনে বাতাসে শীতল করে দিচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানলাম, পাশেই লেকে র নাম স্বয়ম্ভু লেক! দূরে এক মন্দির দেখাও যাচ্ছে!
বাঙালি, থালা নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম! ও বাবা ভালো ঘি এ ভাজা পুরি, ঘন ছোলার ডাল, সবজি ,গরম জিলাবি, গরম ঘিয়ের হালুয়া! আহা লিখতে লিখতে নাকে গন্ধ পাচ্ছি! এর পর ঘন দুধের কফি!
ওপরে এসে একজনকে খানিক ভাগ দিলাম। তিনি নাবেন নি! আর্মি রা সবাইকে অনুরোধ করছে। এবং অনেকেই নামছেন। খোঁজ করে জানলাম, মাঝে মাঝেই এইরকম ভাণ্ডারা করে মানুষজন, কে অতিথি ভেবে সেবা করেন! আমার মনে হলো কত দূরে ঘর সংসার ছেড়ে এই বরফের রাজ্যে এনারা পড়ে আছেন দেশ রক্ষা করার জন্য। তাই আমাদের সান্নিধ্যে ওনারা আত্মীয় স্বজন কে অনুভব করেন! এত ভদ্র ব্যবহারে অভিভূত হলাম। বিনয় সহকারে এক অফিসার কে কিছু ডোনেশন দেবার ইচ্ছা প্রকাশ করলে, ততোধিক বিনয়ে
হাত জোড় করে অক্ষমতা জানালেন! বেশ কয়েকজন কে করমর্দন করে শুভেচ্ছা জানিয়ে গাড়িতে উঠলাম।

খানিক যেতে পড়লো সাঙ্গেস্টার লেক। অতি সুন্দর এই লেকে কোয়েলা সিনেমার শুটিং হয়েছিল, তাই
একে মাধুরী লেক ও বলে!

এবার ফেরার সময় তাওয়াং মনাস্ট্রি এলাম। অনেক সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়। সব মনাস্ট্রি যেরকম সুন্দর, এটাও তাই! এখানে মঠের মিউজিয়াম আছে। কুড়ি টাকা টিকিট। অনেক প্রাচীন পুঁথি, মুদ্রা, পুরোনো বাসন হাঁড়ি, চা এর সরঞ্জাম, বাদ্যযন্ত্র, অনেক বুদ্ধ মূর্তি, মুখোশ, অস্ত্র শস্ত্র, হাতির দাঁত, বেশ কিছু ছবি!
ঘুরে দেখতে ভালো লাগলো। তবে নিচেই কিছু মোমেন্টো বিক্রি হচ্ছিল, কিন্তু দাম বেশি লাগলো! তাই একজনকে বোঝালাম, পরে বাইরে কিনে দোবো!

হোটেল এ ফিরে ভোজন সেরে বিশ্রাম। জয়ন্ত এসে বলে গেল, আজ রাত্রে বনফায়ার হবে, হোটেলের
ছাদে। অবশ্যই রাত আটটায় চলে আসবেন সবাই। দারুন মিউজিক সিস্টেম আছে, খুব ভালো লাগবে!
ছাদের মাঝখানে কাঠ জ্বালিয়ে আগুন এর উত্তাপ ঘিরে সবাই ঠিক সময়ে উপস্থিত! জয়ন্ত বলল “আপনাদের অনেকের নানান প্রতিভা! আসুন আমরা সমবেত ভাবে উপভোগ করবো, গান,কবিতা, গল্প, যে যা জানেন! খোঁজ পেয়েছি মানব দা খুব ভালো গান করেন, আর ওঁর মালাদিও গান করেন! “
ভাই এর পর ঘণ্টা দেড়েক যা জমে উঠলো, শুধু গান, গল্প, কবিতা নয়! তুমুল ড্যান্স ও হোলো।
এই লেখক হেঁড়ে গলায়”তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই ” গাইলো! আনন্দের কথা হাত তালি পড়েছিল! আর ছোট স্বরচিত গল্প, মোবাইল থেকে পড়লাম! কিন্তু বলার কথা , প্রায় সবাই ভালো গান করেন। এক ডাক্তার দাদা দারুন গল্প শোনালেন।
যদি এই লেখা উনি পড়েন, দয়া করে নামটা জানাবেন। বলতে পারলাম না বলে দুঃখিত!
যাঁ ড্যান্স এর ছবি চাইবেন না! অনেক ফিল্ম প্রোডিউসার দেখলে বিপদ হবে! বাকি কিছু ছবি পাঠাবো।

কাল খুব ভোরে উঠে রওনা দোবো, কাজিরাঙ্গার দিকে।

আজ সকাল থেকেই ব্যস্ততা। যাবো কাজীরাঙা
ফরেস্ট। দিরাঙ থেকে তেজপুর ২০০কিলোমিটার। আর তেজপুর থেকে কাজীরাঙা ৫১কিলো মিটার। কাজেই অনেকটাই যেতে হবে! তাড়াতাড়ি আমাদের ব্রেকফাস্ট দিয়ে, গাড়ির মাথায় সব মালপত্র বাঁধা ছাঁদা হতে লাগলো।
আবার ওপরে প্লাস্টিক দিয়ে বাঁধা হল, রাস্তায় বৃষ্টি পড়তে পারে!

নতুন জিনিস দেখার উত্তেজনা সবার মধ্যে! তার প্রতিফলন গাড়ির মধ্যে হাসি ঠাট্টা তামাশা ইয়ার্কি, সমানে চলতে থাকলো। ওরই মধ্যে আমি একটু ধ্যান করে নিলাম। না সামনে বসিনি, মাঝখানের সাইডে বসেছি। ক্রমশ পাহাড়ি এলাকা ছেড়ে নিচে নেমে যাচ্ছি।
কাল রাত্রে জয়ন্ত সব পারমিশন, গাড়ির বন্দোবস্ত করেছে। দু রকম রাইড হয়। এক এলিফ্যান্ট রাইড, আর জিপ সাফারি। এলিফ্যান্ট রাইড অনেকে চাইলো। তার মধ্যে আমি আগে হাত তুলেছি! এই হাতির পিঠে চাপা একটা দারুন থ্রিলিং ব্যাপার! এটা শুরু হয় ভোর ৫টা পনের থেকে ৬টা পনের। আর তার পর ৭টা পনের অব্দি। হোটেল থেকে জিপসি গাড়িতে হাতির পিঠে চাপার পয়েন্ট এ নিয়ে যাবে, আবার রাইড শেষ হলে হোটেল দিয়ে যাবে। এই রাইড হয় বাগোরি থেকে। তবে আমরা নিজেদের গাড়িতে যাব।
খরচা পার হেড, ৬০০টাকা। জিপসি ভাড়া আলাদা। আর জিপ সাফারি তে খরচা ২২০০ টাকা
একটা জিপসি তে ছয় জন যেতে পারে। এই সব বুকিং অনলাইন করা যায়! জয়ন্ত আমাদের সব আই ডি কার্ড নিয়ে কাজ সেরে রেখেছে!

হঠাৎ ধ্যান ভঙ্গ করলো, মিসেস কাবরা “লিজিয়ে ডাক্তারবাবু” ঝুরি ভাজার প্যাকেট হাতে দিল। এই সব আবার আমি না বলতে পারি না! খানিক হাতে ঢেলে আড্ডায় যোগ দিলাম। দুপুর দুটো নাগাদ রাস্তার পাশে এক সুন্দর খাবার জায়গায় লাঞ্চ হোলো প্রায় সন্ধ্যে নাগাদ কাজীরাঙা ঢুকে গেলাম। তার আগে মনে আছে ভোমরা সেতু দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদ অতিক্রম করা। বিরাট চওড়া! শীতকাল বলে অনেক জায়গায় চড়া পড়েছে। কাজীরাঙা এলাকা ঢোকবার সময়ই দু পাশে বনের জঙ্গল, কৃষির এলাকা, বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি।
এসে পৌছালাম লোকচা রিসর্ট এ। পরপর অনেক রিসর্ট, হোমস্টে, হোটেল আছে। আমাদের রিসর্ট এ ঢুকতেই মন ভালো হয়ে গেলো, এতো চারদিকে বাহারি গাছ, প্রবেশ পথে সাজানো! খানিক পরে নিজেদের ঘর পেলাম। গাছ গাছালির মধ্যে দিয়ে বারান্দা পেরিয়ে ঘরে। অনেক টা রাস্তা পেরিয়ে আসতে হয়েছে, খানিক পরে ডাইনিং টেবিলের পাশে এক জায়গায় কাঠের লগ জ্বালানো হয়েছে, সেখানেই সব জড়ো হয়ে গল্প শুরু হলো। তবে জয়ন্ত বলল ভোর সওয়া চারটে তে রেডি হয়ে চলে আসবেন। আমরা প্রথম স্লটের রাইড নিয়েছি।


রীতিমত শীত এখানে! অত ভোরে কি করে উঠে যাব চিন্তা হচ্ছিল! যাইহোক ব্রেনের ঘড়ি ঠিক সময়ে তুলে দিয়েছে। ভাল করে জ্যাকেট, মাফলার বেঁধে সবাই গাড়িতে উঠলাম। বাগোরি রেঞ্জ এ প্রাইভেট গাড়িতে যাওয়া যায়।
গিয়ে পৌঁছলাম তখন চারিদিক অন্ধকার। আমাদের ট্যুর গাইড ততক্ষণে কাগজ পত্র যা দেখাবার দেখিয়ে লাইন এ দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। শুনে নিয়েছি, এক হাতির পিঠে চারজন বসবে। দুজন পূব মুখো, তো দুজন পশ্চিম মুখো!
লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে দেখলাম দু হাত দুর দিয়ে পাহাড়ের মত হাতি, গোদা গোদা পা ফেলে যাচ্ছে!
প্রায় এক ডজন হাতি, গা ঘেঁষে গেল! মর্নিং শিফট এর ডিউটি করতে! হাবভাব দেখে মনে হলো ভাবছে “এতো আমাদের রোজের কাজ, ডিউটি না করলে খাব কি!”

পরের পর্বে

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, আগস্ট ২৫, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]