
অরুণাচল ভ্রমণ (চতুর্থ পর্ব)

তাওয়াং এর যে হোটেল এ ছিলাম, বেশ আরামে
ছিলাম। কারণ রুম হিটার প্রায় সর্বক্ষণ চালু। বাইরে চার পাঁচ ডিগ্রি দিনে, আর রাত্রে এক কি দুই!
আর সর্বক্ষণ গরম জল এর ব্যাবস্থা ছিল!
তাই গতকাল সক্কাল বেলা বেরিয়ে তাওয়াং মনাস্ট্রি ঘুরে ঘুরে দেখতে পেয়েছিলাম! এই মনাস্ট্রি, পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম! এই তিব্বতী বৌদ্ধ মঠ, ষষ্ঠ দলাই লামার জীবনের সঙ্গে জড়িত! এর আর এক নাম গোল্ডেন নামগিয়াল লাতসে। চীন যখন তিব্বত অধিকার করে, দলাই লামা তিব্বত থেকে অনেক অনুরাগী সহ এই খানে কিছুদিন ছিলেন।
এর চারপাশ এর সৌন্দর্য অসাধারণ!
কিছুটা দূরে এর পর প্রায় ১২কিলোমিটার দূরে
রয়েছে আনি গুমফা। তিনশো বছরের আগে তৈরি এই গুমফা বৌদ্ধ সন্নাসিনীদের জন্য।
এর প্রবেশ পথ বড় সংকীর্ণ আর অপরিষ্কার। আশ পাশের বাড়ি যেন যাবার রাস্তা দখল করেছে। মহিলাদের
মঠ বলে যেন উন্নতি নেই! এখানে সব মহিলা সন্ন্যাসিনী!

আবার যাত্রা শুরু। আমাদের ইনোভার একদম পেছনে
বসছে কাবরা জুটি! আর তাদের সঙ্গী একটা ব্যাগ!
সেই ব্যাগে কি ধনরত্ন ভাবতে পারবেন না! অবশ্য ওনারা একা উপভোগ করছেন না, সবাই কে বিতরণ করছেন!
কি কি সাপ্লাই দিচ্ছেন শুনুন, ঝুরি ভাজা, কাটি ভাজা, মুগডাল ভাজা, চানাচুর, কাজু, ক্যাডবেরী, পটেটো চিপস্ ইত্যাদি ইত্যাদি!
আর এই সবে আমি খুব ভক্ত! একজনের চোখ রাঙানি অগ্রাহ্য করে হাত বাড়িয়েই
চলেছি! না নিলে দীনেশ কাবরা দুক্কু পাবে!
একটু পরেই দেখলাম ষষ্ঠ দলাই লামার জন্ম স্থান!
বৌদ্ধ ধর্মের মানুষজনের পবিত্র স্থান!
সন্ধ্যে বেলা হোটেল এর চারপাশে বেশ কিছু দোকান বাজার আছে! সঙ্গের মহিলা সদস্যদের একযোগে
কিছু মার্কেটিং এ মনোযোগ দেবার জন্যে ছটপট করছেন!
আমি গরম পিয়াঁজি সহকারে চা এ মনোযোগ দিলাম।
ম্যানেজার স্থানীয় আর্মি সেন্টার এ লাইট অ্যান্ড সাউন্ড এ চীন ভারত যুদ্ধ থেকে, অমর ভারতীয় শহীদের
জীবনী ইত্যাদি দেখাবার জন্য অনেক কে নিয়ে গেলেন।
কিন্তু এই ঠাণ্ডায় হিটার এর সামনে বসে, আমার আর বেরোতে ইচ্ছে হল না!
রবিবার, ছুটির দিন। লিখতে বসলাম
দেখুন বেড়াতে বেরোলে, থাকা এবং খাওয়া টাও
খুব গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোই ফীল গুড ফ্যাক্টর। অনেকে ভাবেন দুর যেখানে হোক থাকলেই হবে, বা যা হোক খেলেই হবে, এতে কিন্তু আমি নেই এবং আমার মতই
অনেকে রাজি হবেন না। তাই যে সংস্থার সঙ্গে যাবেন, আগে তাদের সঙ্গে পরিচিত কেউ গিয়েছেন, তাদের থেকে জেনে যাবেন।
খাওয়ার ব্যাপার বলি, আমি পর পর দুদিনের দুপুরের খাবার লিখে রেখেছি…
১ দেরাদুন রাইস এর ভাত, লেবু, লঙ্কা, পিয়াঁজ।
ঘন মুগের ডাল তাতে গাজর, বিনস, করাইশুঁটি। ছোলা
দিয়ে মোচার ঘণ্ট, ক্যাপসিকাম পনির, পাবদা মাছের ঝাল সরষে দিয়ে। দই, চাটনি, পাঁপড়।
২ ভাত লেবু লঙ্কা পিয়াঁজ। পিয়াঁজ দিয়ে ঘন মুসুর ডাল, বড় সাইজের গরম বেগুনি। ফুলকপির ডালনা, কাতলা মাছের কালিয়া, চাটনি পাঁপড়। শেষে গোটা আপেল।
সব গরম, আর যে যত পারো খাও, অতি সুস্বাদু রান্না।
রাত্রে দুদিন খাবার মেনু পরে লিখব।
আজ খুব সকালে বেরোতে হোলো। যাবো বুমলা
পাস। তাওয়াং থেকে ৩৮কিলোমিটার দূর। উচ্চতা ১৫২০০ ফুট গরম জামাকাপড় বেশি নিতে বললো ম্যানেজার
জয়ন্ত। আর আইডেন্টিটি কার্ড সঙ্গে রাখতে হবে। এখানে যেতে গেলে অনুমতি লাগে, সে সব ব্যাবস্থা, ছবি, আর আইডেন্টিটি দিয়ে ব্যবস্থা করে রেখেছে।
এবার এঁকে বেঁকে পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি উঠতে
লাগলো!গাছ পালা কমতে থাকলো। খানিক দুর যাবার পর মনে হোল, বাবা মেরু প্রদেশে চলে এলাম নাকি!!
চারিদিকে বরফ আর বরফ! আশে পাশে বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বরফের আস্তরণ! পাহাড় গুলো বরফে ভর্তি।
মিলিটারি ব্যারাক গুলোর ছাদে, ঢোকবার জায়গায় বরফে মোড়া!
এইবার আর একটু যেতেই টায়ার হড়কে যেতে
লাগলো!গাড়ি থেমে গেল। পিছু পিছু সব দাঁড়িয়ে গেল!
তারপরও অন্য ড্রাইভার এসে চেষ্টা করেও হলো না।
তখন পেছন থেকে কাঁটা দেওয়া লোহার চেন পরাতে
লাগলো, পেছনের টায়ারে। আমিও নিচে নেমে
টায়ারের হার পরানো দেখলাম। কনকনে ঠান্ডা! এদিক ওদিক ছবি তুললাম। প্রায় মিনিট পনের পর আবার বরফে মোড়া রাস্তায় যেতে যেতে, দু চোখ ভরে এই বরফ সাম্রাজ্য পেরিয়ে, বুমলা এসে পৌঁছলাম।

এখানেই ইন্ডো চায়না বর্ডার। কোনো ছবি তুলতে পারবে না। শুধু বাইরে একটা পাথরে লেখা বুমলা পাস, ঐ জায়গা তে ছবি তুলতে পারবে! ওখানেই মিলিটারি ছাউনী তে ঢুকে ঠাণ্ডার হাত থেকে বাঁচলাম! মিলিটারি রাই বিক্রি করছেন, গরম চাউমিন, মোমো, টোস্ট, কেক, চা, কফি। গরম কফি এনে দিল সিদ্ধার্থ। খেয়ে উত্তাপ এলো শরীরে!
এবার সবাই জড়ো হলাম ছাউনির বাইরে, সেখানে এক অফিসার, এই অঞ্চলের গুরুত্ব, ইন্ডো চায়না ঝারপিট, আবার ইদানিং কিছুটা বন্ধু বন্ধু , এইসব নিয়ে বলার পর, আমাদের নিয়ে হেঁটে বর্ডার এর দিকে নিয়ে গেলেন! প্রায় পাঁচশ মিটার হেঁটে যেতে
হলো। হু হু করে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে, হাড়ে কাঁপন ধরাচ্ছে!
যাবার পথে নানান রঙিন দেশাত্মবোধক বোর্ড, নানান দর্শনীয় স্থানের ছবি দেওয়া বোর্ড রয়েছে।
হাঁটতে হাঁটতে এলাম বর্ডার এ। আমার খুব ইচ্ছে ছিল চায়না সোলজার এর ছবি নেবার! কিন্তু দশ হাজার টাকা ফাইন এর জেল যাবার ভয়ে হোলো না!
তবে পঞ্চাশ মিটার দূরে ওদের দেখে মনে হলো, খাবার দাবার ভালো পায় না! রোগা রোগা, ছোট
খাটো!আর আমাদের মিলিটারি সলিড, দশাসই!
যদি কেউ বর্ডার এ ছবি নিতে চান, তাহলে পার হেড দুশো টাকা! স্বামী স্ত্রী চারশো টাকা গুণে দিলাম।
মিলিটারি রাই ছবি তুলে আধঘন্টা বাদে, বাঁধিয়ে ছবি দেবে! আমার দেখা দেখি, অনেকে জোড়ায় জোড়ায় ছবি তুলতে লাগলো!
আমার চোখ ওপারে! দেখি ওরাও বাইনোকুলার দিয়ে আমাদের দেখছে, মনে হলো আমার ছবি নিল! যদি পেটো ফেটো ছুঁড়ে দিই!
তবে আমাদের দিকে কিরকম মিলিটারি রা ছবি তুলে টাকা নিচ্ছে, ওদের ওখানে কেউ নেই! খালি সোলজার!
হয়ত বলাবলি করছে “দেখছ কি রকম ওরা কামাচ্ছে,
আমরা লবডঙ্কা চুষছি”
ওখান থেকে ফিরে সেই ছবি নিলাম। দীনেশ কাবরা গরম মোমো নিয়ে এলো, আবার খানিক শরীর গরম হোলো!
পরের পর্বে

