

অঙ্গারেওয়ালি রসিদ জাহান
অনুবাদঃ

শকুন্তলা,
তোমাদের মেয়েদের রঙ্গের কোন মা বাপ নেই! আমার ঘড়ির কাঁটা পিছিয়ে দিয়েছো! আমি ট্রেন মিস করলে কী হতো বল তো?
কলেজ থেকে বেরোতে এত দেরি হয়েছিল যে যখন আমি স্টশনে পৌঁছলাম, ট্রেন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকলেও, গার্ডের বাঁশি তখন মুহুর্মুহু বেজে চলেছে। আমিই জানি কী ভাবে ট্রেন ধরলাম শেষ পর্যন্ত! শাড়িটা নির্লজ্জের মতো তুলে ধরলাম আর আর খাড়া রেলব্রিজ থেকে পুরোটা দৌড় লাগালাম। ডাইনে বা বাঁয়ে কোনদিকে তখন তাকাবার ফুরসৎ নেই আর আমি উন্মত্তের মত ছুটে গেছি। ব্রিজ থেকে নামার তখনও কিছুটা পথ বাকি, এমন সময় ট্রেন প্ল্যাটফর্মের ওপর দিয়ে চলতে শুরু করলো। আমি গতি বাড়িয়ে দিলাম আর এক এক বারে দুই বা তিন পদক্ষেপ পড়ছিল। গার্ডটি খুব ভালো মানুষ ছিলেন, তিনি আমাকে দেখতে পেলেন, স্মতি হাসলেন কিন্তু তথাপি বাঁশি আর একবার বাজালেন।
আমি নিশ্চিত যে আমি তখন এমন এক অদ্ভূতদর্শন জীবে পরিণত হয়েছি যে কেউ আমাকে দেখে না হেসে পারবে না। আমার চুলের বাঁধন খুলে গেছে। তোমরা হয়তো বলবেঃ তাতে আর নতুন কী? তোমার চুল তো সবদিকেই ছেয়ে থাকে! না, সিরিয়াস হও, গতকাল আমি প্রকৃতপক্ষেই সবদিক থেকে ঝড়োকাকের মত হয়ে গিয়েছিলাম। চুলের সব পিনগুলি পড়ে গেছে আর চুলে আমার মুখ ঢেকে গেছে। ব্রিজের ঢাল বরাবর উড়তে উড়তে সিঁড়িগুলি আমি প্রায় দেখতে পাচ্ছিলাম না। শাড়ি পিছন দিকে হাওয়ায় উড়ছে। এক অতিকায় জন্তুর হাপরের মতো আমার শ্বাস সশব্দে নির্গত হচ্ছে। আর আমি—আর আমি খালি ভাবছি এক পা আর এক পায়ের ওপর ফেলে দেব। তখন আর দুটো ধাপ বাকি আছে। তাড়াহুড়োতে, আমি লাফিয়ে ওদের পেরোতে গেলাম। ফল যা হবার হল। আমার পা শাড়িতে জড়িয়ে গেল। আমি পড়ে গেলাম, সাষ্টাঙ্গে মুখের ওপর।
লোকজন আমাকে সাহায্য করতে এল। কিন্তু এক মুহূর্তে, আমি নিজেকে সামলে নিলাম। আমার হাঁপানো মুখ তখন লাল হয়ে গেছে। মুখের ওপর থেকে চুল সরিয়ে দিলাম। এক সুগভীর শ্বাস নিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম? ‘ট্রেন!’
গার্ডসাহেব হাসছেন। আর হাসছে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই যারা আমার লজ্জাজনক পতন দেখেছে। আমি যেন আমাকে ঘিরে এক হাসির হট্টরোল শুনতে পাচ্ছি। কিন্তু আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি কীভাবে গার্ড পর্যন্ত আমাকে দেখে হাসছেন। তা সত্ত্বেও তিনিই কোনোরকমে হাসি নিয়ন্ত্রণ করে আমাকে বললেনঃ ‘আমি ট্রেন থামিয়ে দিয়েছি। (আরো হাসি) জলদি করুন, ট্রেন এরই মধ্যে পাঁচ মিনিট পিছিয়ে আছে।’
আমি আবার দৌড়তে আরম্ভ করলাম। এই বার, আমি আমার সামনের প্রথম কামরায় উঠতে পারলাম। সেটি ছিল পুরুষ কামরা। আমি সিটে বসে পড়লাম, জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার চারিদিকে হালকা হাসি আর খিলধরা হাসি। আমার শ্বাস স্বাভাবিক হয়ে এলে, আমি টয়লেটে গেলাম, আমার চুল ঠিক করে বাঁধলাম। তারপরে আবার আমার সিটে এসে বসলাম আর রইলাম পরের স্টেশনের অপেক্ষায়। ট্রেন থামতেই আমি নেমে পড়লাম, ছুটে গিয়ে টিকিট কাটলাম আর উঠে পড়লাম মেয়েদের কামরায়।
কামরাতে ভিড়ে গাদাগাদি। মেয়েদের জন্য নির্দিষ্ট তৃতীয় শ্রেণীর কামরা ছিল বলে এটি শিশু আর লটবহরে ভর্তি ছিল। দাঁড়াবার এক চিলতে জায়গা পর্যন্ত ছিল না। টয়লেটের সামনের জানালা দিয়ে আমি বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তোমাদের মত যারা প্রথম আর দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভ্রমণ করেছো তারা কল্পনাও করতে পারবে না আমি টয়লেট থেকে নির্গত বদবু’র মধ্যে কী করে চুপ করে দাঁড়িয়েছিলাম। আমার মুখে রুমাল বেঁধে দুর্গন্ধ থেকে বাঁচবার চেষ্টা করছি। এমন সময় এক হিন্দু মহিলা একটু সরে গিয়ে তাঁর পাশে বসবার মতো একটু জায়গা করে আমাকে বললেন, ‘বেহেনজি, এখানে বসুন।’ আমি সেইমত তাঁর পাশে বসলাম। কামরাতে চারটি বেঞ্চ ছিল। হিন্দু মহিলারা তাঁদের শিশুদের নিয়ে দুটো বেঞ্চে বসেছিলেন। আর মুসলিম মহিলারা তাঁদের বাচ্চাকাচ্চাদের নিয়ে বসেছিলেন অপর দুটিতে। সন্দেহ নেই আমার কপালে লাল বিন্দি ছিল বলেই হিন্দু মহিলা আমাকে হিন্দু ভেবে ডেকে বসিয়েছেন। আমার বিন্দিকে ধন্যবাদ আমাকে দুঃসময়ে সাহায্য করার জন্য। তোমাদের জানাই আমার এই লাল টিপ আমার দিদিমা পছন্দ করেন না, তিনি রেগে যান। তবে রাগের সবটাই যায় আমার দিকে নয়, আমার বাবা মায়ের দিকে!

‘বেহেনজি, আমরা তিনজন ঘণ্টাখানেক পরেই নেমে যাবো। তখন আপনি আরাম করে বসতে পারবেন।’
আমি তাকে ধন্যবাদা জানিয়ে বললাম, ‘আমিও এক ঘন্টার মধ্যে নামবো।’
পরের প্রশ্ন, ‘আপনি কি পড়াশুনা করেন?’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’
‘আপনি কি বিবাহিত?”
‘না’। আমার ‘না’ উত্তরে মহিলার মুখ আর ভ্রু কুঁচকে গেল। মুখও ঘুরে গেল বিপরীত দিকে।
আর এক মহিলা এক ধাপ এগিয়ে বললেন, ‘আপনার জাতি কী?’
‘চামার,’ উত্তর দিয়েই আমি জোরে হেসে উঠলাম।
বুঝতেই পারছো আমি ট্রেনটা ধরতে পেরে নিজেই খুব খুশি হয়েছিলাম আর সঙ্গে মনে হচ্ছিল আমি নিছক আনন্দে হাসতে হাসতে লাফাবো, চিৎকার করবো। মহিলাদের প্রশ্নবাণের কারণে আমি আর সংযত থাকতে পারলাম না, হাসির ফোয়ারা ছুটিয়ে দিলাম। কিন্তু প্রশ্নকর্ত্রী এতে অসন্তুষ্ট হলেন।
‘তুমি চামার? লেখা পড়া শিখেছো বলেই কি ভাবছো অন্যরা সবাই বোকা?’
নিজেদের বেঞ্চে বসে থাকা মুসলিম মহিলারা পানের পর পান চিবিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁদের দেখে মনে হলো, অশিক্ষিত। এছাড়া এটাও বোঝা গেল, ওঁরা সবাই এক ঘরানাভুক্ত। হিন্দু মহিলাদের অশিক্ষিত দেখালেও মনে হচ্ছিল ওঁরা বিভিন্ন জাতভুক্ত, যেমন বানিয়া, ঠাকুর এবং ব্রাহ্মণ। কিন্তু, আমি দেখেছি যখন এরা একসঙ্গে ভ্রমণ করেন তখন প্রত্যেকেই ব্রাহ্মণ হয়ে যান। আমি যত সফর করেছি, আমি কখনও দেখিনি ভ্রমণকারীরা কেউ ঠাকুরের নীচে কেউ নন।
আঁটসাঁট কালো পাজামা, গোলাপি দোপাট্টা আর রূপোর গয়না পরিহিত এক মুসলিম রমণী তাঁর সিট থেকে উঠে দাঁড়ালেন। নাকের নোলক তাঁর নাসারন্ধ্রে লাগানো ছিল না, ছিল নাসামধ্য-পর্দায়। এত বড় সেই রিং যে তা ঠোঁটের পানমাখা লাল দাগ আর দাঁতের কালো দাগ ঢেকে দিয়েছিল। আমি নিঃসন্দেহ যে অতীতে কোন এক পুরুষ এক মহিলার বকবকানিতে বিরক্ত হয়ে নাকের নোলক আবিষ্কার করেছিল যাতে সেই মহিলা স্বর মুখের মধ্যেই আটকে যায়। আর তুমি তো জানো মহিলারা এমন আজীব জীব যে এই আবিষ্কারকে তারা প্রথায় পরিণত করে নিয়েছে। নিশ্চয়ই অবাক হবে না যে প্রত্যেক ধর্মই এই শিক্ষা দেয় যে নারীরা দুর্বলচিত্ত।
যাহোক, শুনতে থাকো! সেই মুসলিম মহিলা তার লোটা হাতে নিলেন আর টয়লেটের দিকে অগ্রসর হলেন। চকিতে হিন্দু মহিলারা একদিকে সরে এলেন। এক দরিদ্র মহিলা তাঁর মালের ওপর বসেছিলেন আর তাড়াহুড়োর মধ্যে সরতে গিয়ে তিনি জুতো পায়ে তাঁর স্যুটকেসের ওপর উঠে দাঁড়ালেন। আর মুসলিম মহিলা সানন্দে এগিয়ে গেলেন—তাঁর দোপাট্টা পিছন দিকে আশীর্বাদী কম্বলের মত স্যুটকেসের ওপর দাঁড়ানো হিন্দু মহিলা এবং তাঁর পাশের অন্য মহিলার গায়ের উপর দিয়ে ঘেঁষটে চলে গেল।
এই দুই হিন্দু রমণী রাগে চিৎকার করে উঠলেন আর অন্যদের দিকে ফিরে বললেনঃ ‘আপনারা দেখলেন? দেখলেন কেমন বিদঘুটে এই মহিলা? আমাদের গায়ে ওর কাপড় ছুঁইয়ে বেমালুম কেমন চলে গেল?’
‘আর কী ভাবে সে টয়লেটে যেতে পারতো? কেন আপনি পথের ওপর বসে রয়েছেন?” এক মাঝবয়সী মহিলা ফস করে বলে উঠলেন।
‘কেউ তো কাউকে যেতে বাধা দেয়নি। কিন্তু, সে তো তার দোপাট্টা শক্ত করে নিজের গায়ের সঙ্গে লাগিয়ে যেতে পারতো। কেন তার কাপড় দিয়ে আমাদের স্পর্শ করা?’ আমার পাশের মহিলা তাঁকে প্রশ্ন করলেন। সেই মহিলার হাতে একটি হিন্দি খবরের কাগজ।
ইচ্ছাকৃত অগ্রাহ্যের ভঙ্গিতে আর এক মুসলিম মহিলা বললেন, ‘এই ভাবে বসে থাকলে এটা তো ঘটবেই ভাই!’
‘পথে না বসলে’ আর কোথায় বসতে পারতাম? আমাদের মাথায়? নিজের দিকে তাকাও, বেঞ্চের ওপর তুমি পা ছড়িয়ে বসে আছো আর আমরা কেমন কুঁকড়ে বসে আছি। আর এতেও তোমরা বিরক্ত হচ্ছো! ট্রেন কি তোমার বাপের সম্পত্তি আর তুমিই কি একা টিকিট কেটে যাচ্ছো?’ মুখ ঘুরিয়ে হাতের ভঙ্গি করে এক হিন্দু মহিলা মুসলিম মহিলাকে বললেন।
‘হ্যা! ট্রেন আমার বাপের সম্পত্তি। আর আমরা পা ছড়িয়ে বসবো। তোমার যা করার করতে পারো। আর একটা কথা বলি, এর পরেও যদি উলটোপালটা কথা বলতে থাকো, ভালো হবে না কিন্তু।’ মাঝবয়সী মুসলিম মহিলা কামরার মধ্যেই স্রোতের মত পানের পিক ফেলে দিলেন আর হিন্দু মহিলাকে বকলেন।
‘আমাদের ভালো হবে না? তাহলে, কী হবে? তুমি কি কালেক্টর সাহেব যে আমাদের কামানের সাথে বেঁধে রাখবে?’ হিন্দু মহিলা পালটা বললেন। আর নিজের ‘দলের’ দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘বেহেনজী, তোমরা কি শুনছো? এই মুসলমান মহিলারা এই কামরাতে আসার পর থেকেই লঙ্কাকাণ্ড বাঁধিয়ে দিয়েছে।’
এতক্ষণে আমার হৃদয়ঙ্গম হয়েছে কেন এই দুই ‘শিবির’ পৃথকভাবে বসেছে। তখন কামরার মধ্যে হিন্দু আর মুসলিম মহিলাদের মধ্যে খণ্ডযুদ্ধ চলছে। দরিদ্র পরিবারভুক্ত এই মহিলা ক্বচিৎ রাস্তায় লড়াই করার সুযোগ পান। এখন, তাঁদের সৌভাগ্য যে তাঁরা নিজেদের এক আবদ্ধ তৃতীয় শ্রেণীর রেল-কামরায় একত্রে জমায়েত হতে পেরেছেন। কাজেই বিদ্বেষের বিষ পরস্পরের দিকে ছুঁড়ে দেবার এই সুবর্ণ সুযোগ তাঁরা হেলায় হারাতে চায় না।
আমি উঠে পড়লাম। আমার চারপাশে কী ঘটে চলেছে তা সযত্নে অনুধাবনের করবার চেষ্টা করলাম। এক মুসলিম তরুণী চিৎকার করে নিশ্চিত ভাবে হিন্দু শ্রোতাদের সুবিধার্থে বলল, ‘আই চাচি, কেন তুমি ছোট জাতের সঙ্গে এত কথা বলছো? এরা কী কথা শোনাবার যোগ্য?’
‘তুমি কী বললে? নীচ-জাতের? মুখ সামলাও। না হলে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেবো।‘
আমার পাশে বসে থাকা মহিলা গর্বের সঙ্গে বললেন, ‘তুমি জানো আমি কে? তুমি যদি আর একটা কথা বলো, তাহলে আমি তোমাদের ডাইনিদের ট্রেন থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেবো।’
মুসলিম মেয়েরা এক কৌতুকপূর্ণ হাসিতে ফেটে পড়লো।‘তোমরা শুনতে পেলে? এক লাটসাহেবের বউ এখানে বসে আছে!’
আমার পাশের মহিলা উত্তেজনায় আমাকে সরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ঠিক সেই সময় টয়লেটের দরজা খুলে গেল আর সেই বিশাল নোলক পরা মহিলা বেরিয়ে এলেন। তিনি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই স্যুটকেসের ওপর বসে থাকা মহিলা বলে উঠলেন, ‘এদিকে তাকাও, ভালো করে দেখো হাঁটার সময় তোমার কাপড়ে কীভাবে যায়।’

‘আমি আমার খুশিমতো হাটবো’, অবলীলায় ফিরে আসতে আসতে তিনি বললেন, দোপাট্টা তখনও পিছনে লুটোচ্ছে। সুতরাং, আবার তাঁর দোপাট্টা স্যুটকেসের ওপর বসে থাকা মহিলার গায়ে লাগলো। মহিলা আর রাগ সামলাতে পারলেন না। নোলক পরা মুসলিম মহিলার দোপাট্টা ধরে এমন হ্যাঁচকা টান দিলেন যে সেই মহিলা পিছনে পড়ে গেলেন। তাঁর লোটা ছড়িয়ে পড়লো। লোটার বেশিরভাগ জল দুই হিন্দু মহিলার গাছে ছিটকে লাগলো আর বিন্দু বিন্দু জল অনেকের গায়েই পড়লো। সমস্ত হিন্দু মহিলা একসুরে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘রাম! রাম!’ ততক্ষণে দোপাট্টায় টান মারা মহিলা দোপাট্টা ছেড়ে দিয়েছেন। আর পরখ করতে লাগলেন তাঁর ধুতি কতটা দূষিত হয়েছে। ইতিমধ্যে, পড়ে যাওয়া মহিলা উঠে দাঁড়িয়েছেন। সমস্ত ঘটনা এমন চকিতের মধ্যে ঘটে গেল যে তাঁর সাথীরা তখনও উঠে দাঁড়াচ্ছেন আর পড়ে যাওয়া মহিলা তাঁর দোপাট্টা ছুঁড়ে দিয়ে রুখে দাঁড়ালেন। তখন, এদিক ওদিক কোনদিকেই না তাকিয়ে সেই মহিলা শত্রুর নত মাথায় এক সজোর আঘাত দিলেন। ‘হারামজাদি! তুমি নিজেকে কী মনে করো?’
কামরার যেন এক অদ্ভূত তর্কাতর্কি আর ক্ষিপ্ততার এক আজব স্রোত বয়ে গেল। প্রত্যেক মহিলা তাঁর বিরুদ্ধ দলের মহিলাদের দিকে তাকিয়ে আছেন, চোখ রোষের আগুন। আমি জানালার বাইরে মুখ বের করে দেখছিলাম, কোনো স্টেশন আসছে কি না, তাহলে কামরার পরিবেশে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে। কিন্তু সেটা একটা এক্সপ্রেস ট্রেন ছিল। অনেক ছোট ছোট স্টেশন পিছনে ফেলে সে ছুটে চলেছে দীর্ঘ পথ পরবর্তী স্টেশনে থামার আগে।
ঘর্মাক্ত কলেবরে লাঞ্ছিত এই মহিলাদের পক্ষে কি আর নীরব থাকা সম্ভব? যাদের জামাকাপড় ভিজে গেছে তাঁরা আমৃত্যু লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। এখন তাঁরা নোলক পরা মহিলার উপর একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। অন্য দিকও কি আর পিছিয়ে থাকে? চার- পাঁচ জন মহিলা সেই ঘিঞ্জি জায়গায় একে অপরকে জড়িয়ে ধস্তাধস্তি করছেন। একজন অন্যজনের চুলের গোছা ধরেছেন আর অন্য দিকে তাঁর কানের দুলে টান পড়েছে।
তাঁরা মালের ওপর পড়ে গেলেন, দ্রুত উঠে দাঁড়ালেন আর আবার পড়ে গেলেন। একদিকে হিন্দু রমণীরা নাক আর কানের রিং খামচে ধরছেন আর অন্যদিকে মুসলিমরা চুলের বিনুনি ধরে টানছেন। এমনকি শত্রুপক্ষের দেহের যেখানে পেরেছেন মাংস দাঁত দিয়ে কামড়ে দিয়েছেন। যদি তাঁরা একটি মুষ্ট্যাঘাত দিচ্ছেন তবে তার পরেই আসছে এক ঝাঁক ঘুষি আর লাথি। অন্য ভাষায়, লাথি-খামচানি- কামড়ানো-ঘুষির ঝড় অবশেষে পরিসমাপ্তি পাচ্ছে মাল আর কামরার মেঝের ওপর পতনে।
আমার পাশে বসা মহিলা তাঁর মাল একদিকে সরিয়ে দিলেন যাতে তিনি চলমান লড়াইয়ে অংশ করতে পারেন। কিন্তু, তিনি দাঁড়াবারই এক ইঞ্চি জায়গা পেলেন না। উন্মত্ততা সামলাতে না পেরে তিনি পায়ের পাতার উপর দাঁড়িয়ে তিনি এক আট—দশ বছরের মুসলিম মেয়ের উপর এক জোড়া ঘুষি চালিয়ে দিলেন। এর ফল কী দাঁড়াল—যে সব মুসলিম মহিলা এতক্ষণ মৌখিক গালিগালাজে সীমাবদ্ধ ছিলেন তাঁরাও শত্রু শিবিরের বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে নেমে পড়লেন। ছোঁয়াচে রোগের মত অন্য শিবিরের হিন্দু মহিলারা, যারা এতক্ষণ লড়াইয়ের প্রান্তে ছিলেন তাঁরাও সক্রিয় ভাবে জড়িত হয়ে পড়লেন। যে কুস্তি কামরার একদিকে সীমাবদ্ধ ছিল তা এবার পুরো কামরাতে ছড়িয়ে পড়ল। আমার ইতস্তত ভাব দেখে আমার পাশের মহিলা আমাকে এই বলে লড়াইতে আহ্বান জানালেনঃ ‘বেহেনজী, আপনি কেন চুপ করে বসে মজা দেখছেন? আপনি কি এই সব ম্লেচ্ছ মহিলাদের হাতে নিগৃহীত হতে চান?’
এক মাঝবয়সী মুসলিম মহিলা জ্বলন্ত চোখে আমার দিকে তাকালেন। দ্রুত আমি মুখ ঘুরিয়ে নিলাম আর জানালার বাইরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম। আমি তাকে বোঝাতে চাইলাম যে এই ঝগড়া আর লড়াইতে আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। আমি লক্ষ্য করলাম কয়েকজন শিশু কামরার এক কোনে ভয়ে জড়সড় হয়ে আছে আর অন্য কয়েকজন ফুসফুস বিদীর্ণ করে উচ্চস্বরে কাঁদছে। আর মায়েরা…এই সাম্প্রদায়িক উন্মত্ততায় এমন নিমগ্ন যে নিজেদের সন্তানদের কথা ভুলে গেছেন। এই উন্মত্ততার শুধু শুনতে পাওয়া যাচ্ছে না ‘আল্লাহ-ও-আকবর’ বা ‘শ্রী কৃষ্ণমহারাজ কি জয়’ ধ্বনি। পরিবর্তে বাতাসে ভেসে আসছে ‘বেশ্যা!’, ‘কুত্তি’ এবং এইরকম আরো শব্দ। কিছু শব্দ আমি লিখতে পারবো না, তুমি বুঝে নাও।
এক বৃদ্ধা মুসলিম মহিলা এতক্ষণ এক কোনায় বসে নিজের মাথা নাড়ছিলেন। এবার তিনি নবোদ্যমে উঠে দাঁড়ালেন। হয়তো তাঁর উদ্দেশ্য ভাল ছিল, কিন্তু ফল হল ভয়ংকর। তিনি তাঁর খাবারের প্যাকেট খুলে তা থেকে মাংসের টুকরো এবং কিমার ঝুরো অন্য দলের উপর ছড়িয়ে দিলেন। হিন্দু মহিলারা কিছুক্ষণ হতচকিত হয়ে রইলেন এবং তারপর লড়াইয়ের পদ্ধতি বদলে ফেললেন। একজন যে লোটাটা মেঝেতে পড়েছিল সেটা ছুঁড়ে জানালার বাইরে ফেলে দিলেন। মুসলিম মহিলারা এবার হিন্দু মহিলাদের মালপত্র টানাটানি শুরু করলেন। মুহূর্তের মধ্যে উভয় দিক নিজেদের মালপত্র আঠার মত আঁকড়ে ধরে রইলেন। যখন একদল অন্য দলের মালপত্র ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা করছে তখন অন্য দল তাদের মালপত্র চেপে ধরে রাখছে। এই মালপত্রের টানাটানি এক বীভৎস পর্যায়ে পৌঁছল। ইতিমধ্যেই কিছু মালপত্র ছোঁড়া হয়ে গেছে এবং সেগুলো কামরার মধ্যে ইতস্তত ছড়িয়ে পড়ে আছে। এই সময় আমার ভয় হল মালপত্র ছোঁড়া থেকে দুই বিবদমান দলের লক্ষ্য না শিশুদের উপর পড়ে।
উন্মত্ততার সীমা ছাড়িয়ে ছাড়িয়ে গেলে এক মহিলার অবস্থা রুষ্ট ষাঁড়ের মত দেখায়। আর আমাদের এই কামরার মধ্যে মহিলাদলের সব সদস্যই উন্মত্ততার সীমা ছাড়িয়ে কীসে আনন্দ আর দুঃখ তাও বোধগম্য করতে পারছে না। এবার আমার চুপ করে ভাবছি এই ধস্তাধস্তি, চুল ছেঁড়াছেঁড়ি আমি কীভাবে বন্ধ করতে পারি। ইতিমদ্যে আমার পাশের মহিলা লড়াইয়ে পরাজিত হয়ে আমার গায়ের ওপর ঢলে পড়েছেন। আর আমার সদ্য আঁচড়ানো চুলের উপর এক মুসলিম মহিলার ঘুষি সজোরে এসে পড়েছে। আমি তখন চোখে কার্যত সর্ষের ফুল দেখছি। এক হ্যাঁচকায় আমি কোলের উপর থেকে আমার পাশের মহিলাকে তুললাম। এবার আমাকে উঠে দাঁড়াতে হল। উভয় মহিলাক আমি এমন বেমক্কা ধাক্কা লাগালাম যে দুজনের মাথা পরস্পরের মধ্যে ঠোকাঠুকি হল। মুহূর্তের মধ্যে আমি লাফিয়ে ট্রেনের চেনের দিকে হাত বাড়ালাম।
শকুন্তলা, এমন পরিবেশে আমি তোমাকে কখনো দেখতে চাই না! আমি মহিলাদের সঙ্গে পথে যেতে অনেক লড়াই দেখেছি—জায়গা নিয়ে বা ধর্ম নিয়ে বা শিশু বা জঞ্জাল নিয়ে.. বস্তুতপক্ষে সমস্ত প্রকার লড়াইয়ে সাক্ষী থেকেছি আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে। কিন্তু এমন উন্মত্ত লড়াই আমি আগে দেখিনি। কয়েকজনের নাক দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে, কারুর কানের লতি থেকে, কারু পরিচ্ছদ ছিন্ন ভিন্ন বা কারুর মুঠোয় প্রতিপক্ষের এক গোছা চুল। এক দরিদ্র মহিলার শাড়ি প্রায় খুলেই গেছিল, কিন্তু ভিড়ের আবহে সে তা ঠাহর করতে পারেনি।
আমাকে দেখ, আমি তো ভাষণেই ব্যস্ত রয়েছি! কীকরে আমি এই পরিবেশ তোমার কল্পনায় আনতে পারি, বল! তুমি তো জানো জুবেদা কীভাবে কথা বলতে পারে!
হাত দিয়ে চেন ধরে আমি চরম উচ্চস্বরে চিৎকার করে বললামঃ’ তোমরা থামবে কি না? আমি কি চেন টেনে পুলিশ ডাকবো?’
বিবদলাম মহিলারা থামলেন, আমার দিকে তাকালেন, চেন ধরা আমার হাতও দেখলেন এবং অবশেষে নিজেদের সম্বিত ফিরে পেলেন। অপরকে ধরে থাকা হাতগুলি শিথিল হয়ে এল। সুযোগের সদ্ব্যবহার করে আমি গর্জন করে উঠলামঃ ‘একবার নিজেদের দিকে তাকাও! তোমরা কার্যত বিবস্ত্র হয়ে পড়েছো!’ তৎক্ষণাৎ যে মহিলার শাড়ি খুলে গিয়েছিল তিনি সামলে নিয়ে শাড়ি নতুন করে গায়ে জড়ালেন। এতক্ষণে তাঁর মালুম হল যে তিনি প্রায় নগ্ন হয়ে পড়েছিলেন। ‘তোমার কান দিয়ে রক্ত পড়ছে!’ সঙ্গে সঙ্গে, অনেকগুলো হাত নিজেদের কান ছুঁল। ‘তোমার কুর্তা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। বল…মহিলারা তোমরা কি পশু হয়ে গেছ?’
আমার হাত চেন থেকে সরেনি। কিন্তু আমি অনুভব করেছিলাম আমি যদি এক মুহূর্তের জন্যে বলা বন্ধ করি তাহলে মহিলারা আবার পরস্পরের গলা চেপে ধরবে। তাই আমি বক বক করে যেতে থাকলাম। আমি কতকিছু বলেছি তা আর মনে নেই। আর এখন, আমি খুব কমই কথা বলি। আমি আমার পাশের মহিলার দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘আপনি কি মনে করেন কামরা কুস্তির রিং আর আপনারা নিজেদের ঘুষি আর কলাকৌশল দেখাবেন? আপনি স্টেশন মাস্টারের স্ত্রী হতে পারেন আর সম্ভবত আপনি কোন বালিকা বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন, কিন্তু আজ কি নিজের ব্যবহারে লজ্জিত নন? আপনি একটি নির্দোষ বালিকাকে আঘাত করেছেন।’
মহিলা উত্তর দেবার সুযোগ পাওয়ার আগেই আমি আবার পরের দফার বকবক শুরু করলাম, ‘থামুন! আপনার যদি বিন্দুমাত্র লজ্জা থাকত তাহলে আপনি মুখ লু্কোতেন!’
তারপর আমি বৃদ্ধা মহিলার দিকে তাকালাম, আর দাঁতে দাঁত চেপে কঠিন স্বরে বললাম, ‘বড়ি বাঈ, আপনি যদি আমার মায়ের মত বয়সী না হতেনঃ, তাহলে আমি নিজের হাতে আপনার গলা টিপে ধরতাম। আপনাদের মত মানুষকে জীবন্ত কবর দেওয়া উচিত। ঐ ভাবে মাংস ছুঁড়ে আপনি কী বোঝাতে চেয়েছেন? এটা কি হোলির উচ্ছব যে আপনি চারদিকে রঙ ছড়াবেন?’
বৃদ্ধা মহিলা তাঁর কোঁচকানো ত্বকের মুখ ঘুরিয়ে অপর এক মহিলার দিকে ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘ও কী বলতে চায়?’
ক্রুদ্ধ হয়ে আমি চিৎকার করলাম, ‘দজ্জাল কালা বৃদ্ধা ডাইনি! বৃদ্ধ বয়সে কি আপনার জিহাদের শখ হয়েছে?’
এমন দৃশ্য কমই দেখা যায়। প্রত্যেক মহিলা স্থাণুবৎ বসে আছেন আর সর্বত্র ছড়িয়ে আছে তাঁর মাথার চুল। পরিস্থিতি তখন আমার হাতের মুঠোয়। প্রত্যেকের চোখ আমার দিকে নিবদ্ধ। আর আমি, এক ক্রুদ্ধ হাতির মত বৃংহন করে যাচ্ছি। ‘এই যে তুমি… তুমি কেন ঐ মহিলা যখন তোমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল তখন তার দোপাট্টা ধরে টানলে? তুমি কি অস্পৃশ্যা? গায়ে খদ্দরের শাড়ি পরে তুমি কি নিজেকে গান্ধীর শিষ্যা বলে ভাবো?’
অকস্মাৎ, আমি অনুভব করলাম আমিও তো এই মহিলাদের মত কথা বলছি। এদের সমস্ত রকমের শব্দ এবং অভিব্যক্তি আমার জিভ দিয়ে বেরোচ্ছে। আমার পারদর্শিতায় আমি নিজেই অবাক হয়ে গেলাম।
‘আপনি কেন এইভাবে হেঁটে গিয়েছিলেন? এই ট্রেন কি আপনার বাপের সম্পত্তি? আপনি কি জানেন না এই কামরায় এমন যাত্রী থাকতে পারে যারা আপনার ছোঁয়া পছন্দ নাও করতে পারেন। তাহলে আপনি কেন তাদের স্পর্শ করতে গেলেন? অন্যের এলাকাতে অন্যায়ভাবে বলপূর্বক প্রবেশ করার কী অর্থ হয়?’
ধীরে ধীরে, আমার ক্রোধ থিমিয়ে এল। আর মহিলারাও নিজেদের সম্বিত ফিরে পেতে শুরু করলেন। এই বার আমি এক নতুন কৌশল অবলম্বন করলাম।
‘পরের স্টেশন আসতে দাও… আমি গিয়ে পুলিশে রিপোর্ট করি। তোমাদের হাতে কড়া পরিয়ে আমি তোমাদের উচিত শিক্ষা দেবার ব্যবস্থা করছি।’
একজন মহিলা যথেষ্ট সাহস সঞ্চয় করে বলে উঠলেন, ‘তাই হোক, কুমারি বেহেনজী। এটা তো ঠিকই যে লড়াই হয়েছিল। তবু আপনি পুলিশে জানাবেন না। তাহলে ঝামেলার শেষ থাকবে না।’
‘আমি পুলিশকে বলব। আপনারা লড়াই চালিয়ে যান। কিন্তু আপনি কেন আমার মাথার উপর আঘাত করেছিলেন? আর কেনই বা আমার চুল ধরে টেনেছিলেন? আমি সহজে ছেড়ে দেবার বান্দা নই।’
‘কুমারি-সাহেবা, আমাদের মেয়ে আর বৌমাদের ইজ্জত আপনার হাতে। ওরা ভুল করেছে। তাদের এবারের মত ছেড়ে দিন’, মাঝবয়সী মুসলিম মহিলা তোষামোদের ভাষায় বলতে শুরু করলেন।
‘আমি কেন এদের ছেড়ে দেবো? সবই আপনার কীর্তি। আপনিও তো সমস্ত সময় এই মেয়েদের প্ররোচনা দিয়ে আসছিলেন। আপনি যদি একবারের জন্যেই ওদের তিরস্কার করতেন, তাহলে ঘটনা এই পর্যায়ে যেত না। আপনি নির্বোধ, দুষ্টমনা, কলহপ্রিয় মহিলা! আপনি আমার চুল টেনেছিলেন। আমি সহজে আপনাকে ছেড়ে দেবো না।’
আমার পাশের হিন্দু মহিলা আমার কথা শুনে উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন আর তাঁর অদূরে বসা আর এক মহিলাকে কিছু বলতে চাইছিলেন। ঠিক তখনই আমি ফেটে পড়লাম, ‘আপনি কি নিজেকে ভাল বলে মনে করেন? আপনিই তো আমাকে লড়াইয়ের মধ্যে জড়াতে চাইছিলেন। আমি যখন উঠতে আর আপনার পক্ষ নিতে অস্বীকার করলাম, আপনি ইচ্ছাকৃত ভাবে আমার উপর পড়লেন, যাতে আমি আপনার সঙ্গে লড়াই করতে বাধ্য হই। আপনিও সব সময় হিন্দু মহিলাদের প্ররোচিত করছিলেন। আপনার যদি নেতা হবার এতই সখ জেগে থাকে, আপনি বাজারে চলে যেতে পারতেন আর সেখানে আপনার নেতৃত্ব দেখাতে পারতেন। আমি ললাটে তেমন লেখা পড়তে পারছি। একজন মুসলমান দেখলেই আপনি কি তার সঙ্গে কোন্দলে জড়াবেন? আপনি স্টেশন মাস্টার বা অন্য যারই স্ত্রী হন না কেন, এটা নিশ্চিত যে পুলিশের কাছে আমার অভিযোগে আপনার নাম থাকবেই।’
আমি এইভাবে যতক্ষণ দাঁড়িয়ে নক্সা করে যাচ্ছিলাম, আমি পলে পলে আমি দুহাত দিয়ে আমার মাথা চেপে ধরছিলাম আর অস্ফূটে বেদনার স্বর আমার মুখ-নিসৃত হচ্ছিল। এবার আমি বসে পড়লাম। হিন্দু আর মুসলিম শিবির ইতিমধ্যে ভেঙে গেছে। সব মহিলারই দৃষ্টি আমার দিকে। তাঁদের কয়েকজন নীরবে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। আবার কয়েকজন অনুগত মধুর স্বরে আমার সঙ্গে আমড়াগাছি করতে চাইছিলেন। ওঁরা আমাকে পুলিশের কাছে অভিযোগ না করার জন্য বোঝাতে চাইছিলেন আর আমাকে শান্ত হতে অনুরোধ করছিলেন। অবশেষে, আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে মাঝবয়সী মুসলিম মহিলা, আমার পাশের মহিলা, নাকে নোলক পরা মহিলা আর যে হিন্দু মেয়েটির গায়ে লোটার জল লেগেছিল—এরা সবাই পরস্পরের কাছে ক্ষমা চাইবে্ন আর ভবিষতে এমন কাজ না করার শপথ নেবেন। আর হ্যাঁ, বৃদ্ধা মুসলিম মহিলাকে উঠে দাঁড়িয়ে করজোড়ে হিন্দু মহিলাদের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। মাঝবয়সী মহিলা এক গ্রামে থাকেন এবং সারাজীবনে সম্ভবত কোনদিন কারুর কাছে কোনো বিষয়ে ক্ষমা চাননি। তিনি জানেনই না কী করতে হবে। তিনি যতক্ষণ কিছু না বলেই চুপ করে বসে রইলেন, আমি তাকে ভয় দেখাতে লাগলাম। ‘ঠিক আছে। তোমার যা ইচ্ছে। ক্ষমা চেও না। তুমি ভাল করেই জানো আমি কী করতে চলেছি। তোমাকে এক কথা বার বার বলে আর কী লাভ?’
নিজের হারিয়ে যাওয়া সাহস ফিরে পেতে মহিলা তাঁর মুসলিম বোনদের দিকে তাকাতে থাকলেন। কিন্তু দৃশ্য তখন বদলে গেছে। সবাই শরীরের আঘাত এবং ক্ষত ভুলে গেছে্ন। তাঁরা সাগ্রহে নতুন পরিস্থিতি বুঝতে চাইছেন। আর আমি, যমদূতের মত হাস্যহীন এবং দৃঢ় অবস্থানে অনড় রয়েছি। কয়েকটি মেয়ে উৎসাহে সঙ্গে মাথা নাড়াল। মাঝবয়সী মহিলাটি উঠে দাঁড়ালেন। পড়া ভুলে যাওয়া শিশুর মত তিনি ভেড়ার মত দাঁড়ালেন আর তারপর ক্লাসরুমের মত নিজের আসনে ভয়ে বসে পড়লেন। তিনিও অসহায় ভাবে চারদিকে তাকালেন আর তারপর বসে পড়লেন। মুখ ঘুরিয়ে আমি তাঁকে দেখলাম। অতি তৎপরতার তিনি তাঁর আসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন এবং বললেন, ‘আমাকে ক্ষমা কর, আমাকে ক্ষমা কর, ক্ষমা কর।’
আমি বললাম, ‘দাঁড়াও! তোমরা সবাই কি ওকে ক্ষমা করেছো?’
সবদিকে থেকে কোরাসের মত স্বর উঠল, “হ্যাঁ! হ্যাঁ!’
আমি আমার পাশের মহিলাকে বললাম, ‘শ্রীমতীজী, এবার আপনার পালা।’
‘কেন? তুমি কি গর-না-মেন্ট?’ প্রতিবাদী বিদ্রোহের স্বর আবার প্রকাশ করতে তিনি চেষ্টা করলেন।
‘এটা খুব কৃপার বিষয় যে আমি গভর্নমেন্ট নই। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে আপনি নিজের ব্যবহারে একটুও লজ্জিত নন। যাই হোক, আমি যখন আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করব, আমি এও বলব যে আপনার স্বামী রেলে কাজ করেন। আমি নিশ্চিত যে আমার রিপোর্টের পর পুলিশ তাঁর সঙ্গে সমুচিত ব্যবহার করবে।’
তাঁর স্বামীর নাম উল্লেখ করতেই ভদ্রমহিলা দোনমনা করতে শুরু করলেন। যখন এক হিন্দু মহিলা ফোড়ন কাটলেন, ‘বেহেনজী, এবার দাঁড়ান, দয়া করে দাঁড়ান।’ মহিলা এবার দাড়ালেন। আধমরার মত করুণ স্বরে তিনি বললেন, ‘বোনেরা, আমার ভুলের জন্য আমাকে ক্ষমা করে দিন।’ বলেই চটজলদি তিনি নিজের সিটে বসে পড়লেন।
এবারে আমার দৃষ্টি পড়ল নাকে রিং লাগানো মহিলার দিকে। তার নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে আর ইনি ইতিমধ্যেই দাঁড়িয়ে পড়েছেন। তিনি হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘বেহেন, এটা তো দুই মিনিটের যাত্রা। এই সব লড়াই দাঙার কী প্রয়োজন। আমার দোপাট্টা যদি অস্পৃশ্য হতো, তাহলে আপনি আমার হাত ধরতেন না। ভুলে যান, আমাকে ক্ষমা করে দিন, আমারই দোষ ছিল।’
আর তারপর একটি অদ্ভূত ঘটনা ঘটল, এমন কিছু যা আমি কল্পনাও করতে পারিনি! মোটা খদ্দর পরিহিত হিন্দু মহিলাটি নাকে রিং-পরা মুসলিম মহিলাকে জড়িয়ে ধরলেন আর কাঁদতে লাগলেন।
নারী সত্যিই অদ্ভূত জীব! এক মুহূর্তে তারা একরকম, আর পরমুহূর্তে তারা অন্য কিছু! কিছুক্ষণ আগে একজনের দোপাট্টা আর এক জনের গায়ে স্পর্শ করার কারণে তাঁরা লড়াই করছিলেন আর এখন তাঁরা নিজেদের জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন।
স্টেশন আসছিল। লড়াইয়ের সময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাওয়া নিজেদের মালপত্র সবাই তুলে নিতে লাগলেন। কিন্তু এই দুই মহিলা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে আর কাঁদতে থাকলেন। আর এই দৃশ্যে আমি এতই মুহ্যমান হয়ে পড়েছি যে আমি বৃদ্ধ ডাইনির কথা ভুলে গেলাম।
আমার দিকে দেখ! আমি তোমাকে একটা চিঠি লিখতে বসেছি, আর কীভাবে আমি তোমাকে ট্রেনের একটি ঘটনা পুরো জানিয়ে ফেললাম। সাক্ষাতে তোমাকে বিশদে বলব। আমার অনেক লেখার ছিল, কিন্তু, এখন আমাকে থামতে হবে। একই সঙ্গে আমি কলেজের কথা এবং বিশেষ করে বাস্কেটবল ম্যাচের কথা ভাবছি। সত্বর উত্তর দিও আর আমাকে জানিও তোমাদের জন্য এখান থেকে আমি কী নিয়ে যেতে পারি।
তোমার প্রিয়,
জুবেদা।

