অনাহত

[দুঃস্বপ্নের রোজনামচা, যা আমরা কিছুদিন আগে পার হয়ে এসেছি। কোভিড সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর ভয়াল বিভীষিকা আমাদের তাড়া করে ফিরেছে, সেই প্রতিদ্বন্দ্বী কালখন্ডের এক টুকরো দলিল।

ঢাকা থেকে প্রকাশের পর এবার কলকাতা সহ সমগ্র আন্তর্জালের পাঠকের জন্য, শুরু হচ্ছে সৌরভ হাওলাদারের উপন্যাস, অনাহত।]

যং লব্ধা চাপরং লাভং মন্যতে নাধিকং ততঃ।
যস্মিন্ স্থিতো ন দুঃখেন গুরুণাপি বিচাল্যতে।।

গগন বাবুর সঙ্কট। দুহাজার কুড়ি সালের মার্চ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ। খেয়ে না খেয়ে, বসতে না বসতে তলব হয় তল্পি বাঁধার। কাজ যেখানে সাজিয়ে থাকে, গন্তব্য সেখানেই। সত্যি বলতে, একটা তল্পি বাঁধাই থাকে। তাই ডাক পড়লেই, ছুট। এবার দৌড় পুণেতে।

পুণের কথা উঠলেই বুকের ভেতর টগবগ করে ওঠে ইতিহাস। ছত্রপতি শিবাজী মহারাজের বীরগাথা। শিবনেরি দুর্গে তাঁর জন্ম, তারপর পাহাড়ে জঙ্গলে কী অসীম দুঃসাহসিক কর্মকাণ্ড! পরতে পরতে ভারত চেনার আহ্বান।

যাত্রা শুরু দমদম বিমানবন্দর থেকে। দমদমের খোলনলচে পাল্টে গিয়ে নতুন অবয়ব এখন পুরোনো হয়ে গেছে। চাল জুড়ে অক্ষরমালার চিত্র বিচিত্র। শোনা যায় রবীন্দ্রনাথের পাণ্ডুলিপি থেকে নেওয়া। টুকরো টুকরো অক্ষরের মতো, বোঝা যায় না বর্ণমালা কিনা? তবে সব মিলিয়ে ভালো লাগে। রাতের উড়ান, দরজায় মানুষের লম্বা পঙক্তি। গগনবাবু খেয়াল করে, সামনে সতেরোজন দাঁড়িয়ে, তাদের মধ্যে আটজনের নাকে মুখোশ (নাকোশ?) বাঁধা।

বিশ্ব জোড়া সন্ত্রাসের নতুন নাম কোরোনা ভাইরাস। চীন, ইটালি, আমেরিকায় রোগের থাবা বসেছে। তার আঁচ ধীরে ধীরে ভারতবর্ষেও এসে পৌঁছৈছে। সবাইকে দেখে গগনের একবার ইচ্ছে হয়, মুখোশ কিনবে, গত সপ্তাহে হায়দ্রাবাদ যাওয়ার আগে পাড়ার দোকানে মুখোশের কথা জিজ্ঞেস করে। দোকানির গাঢ় স্বরে ঘোষণা, “পাঁচ টাকার জিনিস পঞ্চাশে বিকোচ্ছে, ও আমার দ্বারা হবেনা।” দোকানির সততায় মুগ্ধ হয়ে গগন সে যাত্রায় বিরত থাকে। এই রাতে মুখোশধারীদের ভীড় দেখে ভয় ভয় করে, সততার সম্ভ্রমের জোর বেশি? না মুখোশের? নিরাপত্তারক্ষীরা পর্যন্ত অধিকাংশ মুখোশ পরে আছে। এমনিতেই উর্দিধারীদের প্রতি আশৈশব ভীতি, তারপর ঢাকা মুখের ফাঁক দিয়ে সন্দিগ্ধ চোখের দৃষ্টি, শিহরণ জাগায়। যাইহোক, ভয়ে ভয়ে দরজা, নিরাপত্তা বলয় পার হয়ে, বোর্ডিং পাস-এ ছাপানো গেট নম্বরের কাছে গিয়ে ল্যাপটপ খুলে বসে। উড়ানের আগে কিছু জরুরি কাজ সেরে নেওয়া।

গতবছর ডেঙ্গির রমরমা ছিল। ভীড় বাসে বা লোকাল ট্রেনের ঠাসাঠাসিতে হঠাৎ মশা দেখে যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়তো। এখন কোরোনা আসায় মশক সন্ত্রাসের, সেই বোলবালা আর নেই। বিমানবন্দরের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘেরাটোপে মশাদের আজ বাড়বাড়ন্ত। কেউ তাদের ভয় পাচ্ছে না? আশেপাশের মুখোশধারী সহযাত্রীরা দুই হাতে মশা তাড়াতে তাড়াতে, আরামে অথবা ক্লান্তিতে চোখ বোজার চেষ্টা করছে, ডেঙ্গি বা ম্যালেরিয়ার ভয়কে নতুন ‘ভয়’ করোনা, জয় করে নিয়েছে।

শেষ মুহূর্তে উড়ানের দরজা পরিবর্তন হয়। যারা খেয়াল করেনা, তাদের তখন হুড়োহুড়ি দৌড়োদৌড়ি পড়ে যায়। গগন অভিজ্ঞ ভ্রামণিক, কাজের ফাঁকে কটাক্ষে নজর বৈদ্যুতিন উড়ান তালিকায়। ঠিক তাই, এক্কেবারে অন্তিম পর্বে দরজা বদলের সঙ্কেত। কাজ গুছিয়ে, সেভ করে, মেল করে, ল্যাপটপ, ল্যাপটপের তার, ফোন, চার্জার, বোর্ডিং পাস, সব কিছু ঝোলাতে ভরতে ভরতে ছুট। আবার ভয় হতে থাকে, কিছু পড়ে থাকলো কি? একবার ঘাড় ঘোরায়, কিন্তু দেখা যায় না, ফেলে আসা আসন দখল হয়েছে। নতুন মানুষের শরীরের আড়ালে, আসনের সাথে কিছুটা সময়ের সখ্যতা ঢাকা থেকে যায়।

বেশ কয়েকজন বিমানসেবিকাও মুখোশধারী। তা হোক, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে, এই অনেক! আশেপাশে অনেক বর্ষীয়ান সহযাত্রী। উড়ান শুরুতে আলো নিভে যায়, বাইরে নিঝুম রাত নামছে। শহুরে আলোর ফুটকিগুলো ক্রমে ছোট হতে হতে মিলিয়ে যায়। আকাশে উঠতে উঠতে অন্ধকারের ভেতর ভীষণ গমকে কাশি। খুব কাছেই কেউ। গগন রুমাল খোঁজে। রুমালটি কি বিমানবন্দরের আসনে ফেলে এল?

রাতখাবারের সময় হলে, বাঁদিকের বর্ষীয়ান দম্পতি ঘরের তৈরী আহারের কৌটো বার করেন। আজকাল বেশিরভাগ বিমানে আলাদা করে খাদ্যদ্রব্য কিনে খেতে হয়। সেখানে প্যাকেট বন্দী চটজলদি রসদ ছাড়া অন্যকিছু মেলে না। যেমন প্যাকেট করা নুডল, খিচুড়ি, ইডলি ইত্যাদি। এগুলো গরম জল দিয়ে কিছুক্ষণ রাখলে, গলধঃকরণ যোগ্য হয়ে ওঠে। তার স্বাদ যাই হোক, উদরপূরণের শর্ত সম্পূর্ণ হয়।

অনেকেরই রান্না করা ঘরের খাবারের প্রতি বেশি আগ্রহ, বিশেষ করে বয়স্ক মানুষদের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত প্রচুর বিধিনিষেধ থাকে। কৌটো থেকে হাতে গড়া রুটি আর তরকারি বেরোলো। তবে কোন কারণে বৃদ্ধের অপছন্দ হয়েছে, তিনি হিসহিস করে ওঠেন তাঁর বৃদ্ধা গৃহিণীর প্রতি। এতদিনের দাম্পত্য অভ্যাসে গৃহিণীও মেজাজ ফেরত দিতে সক্ষম। গগন শালীনতা বজায় রাখতে পাশ ফেরে। তবে উচ্চগ্রামের বাদানুবাদ চোখে না পড়লেও, কানে আসতে বাধা থাকে না। “তোমার পছন্দ না হয়, ফেলে দাও। ওরা এখুনি জঞ্জাল নিতে আসবে।” বৃদ্ধের গলায় ভরপুর তেজ, “হ্যাঁ তাই দেবো।” আরও নানা পুরোনো কথার উল্লেখ, যার প্রেক্ষিত গগনের না জানা থাকলেও সারবস্তু বুঝতে অসুবিধে হয় না। কে কীভাবে কাকে কতদিন ধরে সহ্য করছে, তার ফিরিস্তি। এসবের মধ্যে বিমানের ঠান্ডা পাঁউরুটি দিয়ে নৈশভোজ শেষ করে গগন। অতঃপর ঘুম, সুমহান ঘুম।

বিমান অবতরণের ঘোষণার মধ্যে দিয়ে গগনের চোখ খোলে। বাস্তবে ফেরার চেষ্টা। পাশ ফিরে খেয়াল করে, বয়স্ক মানুষদুটি তখনও ঘুমিয়ে। পারস্পরিক ভরসায় নিজেদের দিকে ঘেঁষে রয়েছে পরম মমতায়। কোথাও কলহের চিহ্ন নেই। আর খাবারের কৌটোগুলোও দেখেও বোঝা যাচ্ছে, পরিস্কার করে খাওয়া হয়েছে। কিছুই ফেলা যায় নি। কিছু কি ফেলা যায়? সবই থেকে যায় সময়ের ভাঁজে ভাঁজে।

পুণে বিমানবন্দরে উড়ান নামে, রাত তখন একটা বেজে গেছে। সবার সাথে সারি দিয়ে নিষ্ক্রমণের পথে চলতে থাকে গগন। চলমান সিঁড়িতে এসে বোঝে, সহযাত্রী সেই বয়স্ক পুরুষ সিংহটি তার সামনেই। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে দেখবার চেষ্টা করছে গৃহিণীকে। তিনি নিশ্চয়ই অনেকটা পিছনে, বাকি লটবহর নিয়ে আসছেন।

আধুনিকতার একটা বড় অপরাধ, সব শহরকে সে একই রঙে রাঙিয়ে দেয়। বিশাল বিশাল একই বিজ্ঞাপনের হোর্ডিংয়ে মুখ ঢাকা। যেমনটি কলকাতায় ঠিক তেমনটি পুণে বা ব্যাঙ্গালুরুতে। প্রতিটা শহরের যে আলাদা চরিত্র আছে, বিপণন বিজ্ঞানের প্রয়োগে বোঝার উপায় নেই। আসলে, বহুজাতিক সংস্থাগুলো তাইই চায়। তাদের ভোক্তা বা উপভোক্তা যেন সমস্ত শাখা দোকানে ধারাবাহিক ভাবে একই অভিজ্ঞতা অর্জন করে। গোটা শহরই তো তাদের দোকানের, পণ্যের; মুখ থেকে শরীর, সবটাই।

বাইরে গাড়ি নিয়ে চালক অপেক্ষা করছিল। গাড়ির আসনে সাজানো হাত পরিষ্কারের তরল। গাড়িতে উঠে একবার হাত ঘষামাজা করে নিয়ে, হোটেলের ঠিকানা জানায়। রাতের শহর, ফাঁকা। আশেপাশের মাইলফলক-দোকানপাট বন্ধ। চেনা পথকেই অন্যরকম লাগে। চালক চিনতে সময় নেয়, একটু ঘুর পথে, হোটেলের সামনে পৌঁছয়। এবার গগনের আবার ভয় ফিরে আসে। হোটেলের আলো নেভানো, মূল ফটকের বিশাল লোহার কপাট বন্ধ, মস্ত তালা ঝুলছে। গেটের ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে, সামনের পোর্টিকো পেরিয়ে প্রধান অট্টালিকার প্রবেশদ্বারেও লম্বা শাটার নামানো।
আশঙ্কা হয়, হোটেলে ঢুকতে পারবে তো? রাতের আশ্রয়! কিম্বা হোটেলটি আদৌ চালু আছে তো? গাড়ির চালক ফোন করার পরামর্শ দেয়। বুকিং স্লিপ থেকে ফোন নম্বর বার করে, ডায়াল করে। প্রায় এক মিনিট ধরে কাশি সহ করোনা ভাইরাসের সতর্কবাণী সম্বলিত রিঙটোন শোনানোর পর, আরও খানিক সময় রিঙ বাজে, কিন্তু কেউ ফোন তোলে না। এমন করে পরপর দুবার। সঙ্কট গাঢ় হয়। গগন বলে, “এবার কী করব? ফোন তো ধরছে না!”
চালক বলে, “নেমে দরজায় শব্দ করুন।”
গগন এবার তাই করে। প্রধান অট্টালিকার শাটারের সামনে সিঁড়ির ওপর যেন কিছু একটা নড়ে ওঠে। নিচে কম্বল ওপরে কম্বল জড়িয়ে কেউ একজন শুয়ে আছে। গগনের অবাক লাগে, এমন খোলা আকাশের নিচে কেউ এমনভাবে কী করে ঘুমোতে পারে?

লোকটি নিঃসেন্দহে দ্বাররক্ষী। চাবির গোছা এনে ঘুমচোখে তিন চারবারের চেষ্টায় তালা খোলে। ঘড়ঘড়ে গলায় জিজ্ঞাসা করে, “বুকিং আছে?” গগন ঘাড় নাড়ে। পিছন থেকে কে যেন হর্ন বাজায়। ফিরে দেখে, ওর গাড়ির চালক এখনও অপেক্ষায় আছে। গগন হাত নেড়ে বিদায় জানায়। দ্বারপালের দরজা খোলা দেখে, আশ্বস্ত হয়ে গাড়ি ছাড়ে।

এতক্ষণে গগন বোঝে, বড় শহরের সাথে পার্থক্য কোথায়? যতই আন্তর্জাতিক হোর্ডিংয়ে মুখ ঢাকুক, ছোট শহরের চরিত্র এখনও কিছুটা হলেও অপরিবর্তিত। এখানে রাত বাড়লে, দরজা বন্ধ হয়ে যায়।

হোটেলের ঘুমন্ত কর্মীদের জাগিয়ে নিজের স্থান নিশ্চিত করতে হয়। কোন রকমে ধোপদুরস্ত হয়ে শিবাজী মহারাজের শহরে নিদ্রাকে ডাকে গগন।

ঘুম ভাঙল সকাল ফোটার আগেই। জানালার বাইরেই আধুনিক ময় দানবের কর্মকাণ্ড চলছে। প্রবল শব্দ করে নতুন শহর নির্মাণ চলছে। গভীর রাতের ক্লান্তি কাটেনি, আরেকটু ঘুমের চেষ্টা করে। ভয়ানক শব্দের দাপটে গগনকে শেষ পর্যন্ত উঠে পড়তেই হয়। স্নান সেরে প্রাতরাশ করতে গিয়ে বোঝে, হোটেলে সম্ভবতঃ একাই আছে। কোরোনা ত্রাসে অতিথি সংখ্যাতেও টান পড়েছে। সামান্য কিছু মুখে দিয়ে হোটেল থেকে বিদায় নিয়ে আপিসের উদ্দেশ্য রওনা দেয়।

এরপর দিন কাটে কাজের নিয়মে। ক্লায়েন্ট আপিসের বিশাল চৌহদ্দিতে বিভিন্ন তলায়, নানা ঘরের থেকে ঘরে, ঘুরে বেড়ায়। সেখানে না রইল শিবাজী মহারাজের শৌর্য্য, না আফজল খাঁএর ষড়যন্ত্র। দুপুরে, কাজের মধ্যেই পিৎজা চিবিয়ে উদরপূরণ। তার ভেতর লক্ষ্য করে প্রতিটি ঘরে হাত ধোয়ার তরল। মানুষের সাথে হাত মেলাতেও যেন ভয় হচ্ছে। অনেকে বেশ আতঙ্কিত হয়ে হাল্কা করে আঙুল ছুঁয়ে সৌজন্য রক্ষা করছে। এক মিটিংয়ের ভেতর, পেশাদারী কথোপকথনের মধ্যে, একজন জিজ্ঞেস করে, “কলকাতায় তো চায়না টাউন আছে।”
গগন একটু গদগদ হয়ে কলকাতার গুণকীর্তন করতে উদ্যত হয়, বিশেষ করে চায়না টাউনের রেঁস্তোরা আর সেখানকার খাদ্যসুখ। এসব বলার আগেই লোকটি আবার বলে, “ওরা তো চাইনিজ। নিশ্চয়ই নিষিদ্ধ মাংস খায়!”
গগন থমকে বলে, “মানে বিফ টিফ?”
কথা শেষ করতে পারে না, লোকটি আবার বলে, “আরে সে সব নয়, বাদুড় বাঁদর ওইসব।” মুহূর্তে ঘর কেমন থমথমে হয়ে যায়। চায়না টাউনের কাছ থেকে এসছে বলে গগনকে সন্দেহের চোখে দেখছে? অন্য একজন হস্তক্ষেপ করে, আবার কাজের কথায় ফেরে। গগন গোপনে সঙ্কুচিত হয়। আলোচনার শেষে সেই অস্বস্তি বুকে নিয়ে বিদায় নেয়।

বিকেলের আলোতে একটু বেরবার সুযোগ আসে। কাছেই আরেক সম্ভাব্য খদ্দেরের আপিস। এই সুযোগে সেখানেও মুখ দেখানো। ওইটুকুতে ছুঁয়ে যায় শহর। এখনও কংক্রিটের জঙ্গল না হওয়া রাজপথ। সেনা ছাউনির মধ্যে দিয়ে বড় বড় গাছে ঢাকা প্রশস্ত রাস্তা, মুগ্ধ করে। কোথাও পথের মাঝে সাঁজোয়া বাহিনীর অধিকৃত পুরোনো ট্যাঙ্ক, যুদ্ধের স্মারক হিসেবে সাজানো। ইউরোপীয় শৈলীতে তৈরী সেনাবাহিনীর বিভিন্ন বাড়িগুলো, ছায়াঘন পরিবেশে যেন এক চিলতে ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ।

কোথাও নেমে দুদন্ড দেখার উপায় নেই। এক মিটিংয়ের থেকে পরের মিটিংয়ে যেতে যেতে গাড়ির কাচের ভেতর দিয়ে নজর করে, মস্ত দরগা উল্টোদিকে মন্দির। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে ভক্তদের সারি দাঁড়িয়ে, দুই জায়গাতেই। পরপর ফল ফুলের দোকানের সাথে কাঁচা মাছের দোকানের সংখ্যা চোখে পড়ার মতো। এমনি করে দিন শেষ হয়ে, রাতের কুঠুরিতে ঢোকার চেষ্টা করে। গগনের কলকাতা ফেরার বিমানের সময় হয়ে যায়। গাড়ি চালক সব আপিসের পালা সাঙ্গ করে গগনকে আবার পুণে বিমানবন্দরে নিয়ে আসে।

ইতিমধ্যে খবর এল, মহারাষ্ট্র সরকার মাসের শেষ পর্যন্ত সব বন্ধ ঘোষণা করেছে। শপিং মল, সিনামা হল, স্কুল কলেজ সব। সংক্রমণের ভয়ে, ঘর বন্দী হয়ে থাকার পরামর্শ।


গগনের উড়ানের সময় পিছোলো। বিমানবন্দরে বসে এক স্থানীয় বন্ধুকে ফোনে, কুশল বিনিময় করে। বন্ধুটি সতর্ক করে, “তাড়াতাড়ি পালা। যেকোন সময় বিমানবন্দরও বন্ধ করে দিতে পারে।”
গগনের আবার ঘাম হয়। মনে মনে ভাবে, আজ বারদুয়েক মুখে হাত দিয়ে ফেলেছে, নাকি চোখ ডলেছে? একটা মিটিং থেকে পরের মিটিংএ যাওয়ার সময়, গাড়ির চালক কয়েকবার হেঁচেছিল কি? তিনবার তো মনেই আছে। এদিকে দুবার করে উড়ানের সময় পিছলো। এবার কি বাতিল ঘোষণা হবে?

গগন সঙ্কটমোচনে মধ্যরাত্তিরে বার্গার সহযোগে কফি খায়। অতঃপর অনেক রাতে রওনা দেবার খবর হয়। বিমানে ওঠার শেষ দরজা খোলে। ক্লান্ত ধ্বস্ত শরীর নিয়ে একরাশ মানুষ, কারো নাকে মুখোশ, কারো চোখে ভয়, ঘাড় নিচু, ঘুমে চোখ ছোট, সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়। আলোকোজ্জ্বল মারাঠা ইতিহাসকে পিছনে পাঠিয়ে সকলের সাথে হাঁটতে হাঁটতে বিমান কন্দরে পৌঁছয় গগন। ইতিহাস প্রত্যক্ষ না করার দুঃখে গগনের সঙ্কট জমে ওঠে। যন্ত্র মানব হয়ে ওঠার দিকে আরেকটু পা বাড়ায় সে।

বাড়ি ফিরতে অনেক রাত। স্ত্রী তিয়াসা ঘুমিয়ে কাদা। গগন ওকে বিরক্ত করে না। হাত পা ধুয়ে, পোশাক পাল্টে শুয়ে পড়ে। ঘুমের ঘোরে তিয়াসা ঠিক বোঝে গগন এসেছে। ওর দিকে পাশ ফিরে শোয়। সকালে ঘুম ভাঙে টেলিভিশনের খবরে। বিশ্ব জোড়া মৃত্যু মিছিল এখন ভারতবর্ষকেও ছুঁয়ে ফেলেছে।

এসব ভাবতে ভাবতেই প্রধান মন্ত্রীর ‘জনতা কার্ফু’ ঘোষণা। বিকেল পাঁচটায় সবাই দল বেঁধে ব্যালকনিতে এসে থালা, গ্লাস, কাঁসর ঘন্টা নিয়ে তুমুল আওয়াজ শুরু করল। গগনের প্রাণ কেঁপে ওঠে। বুঝতে পারে না, এ কীসের ইঙ্গিত? উদযাপন না অশনী সঙ্কেত? আর অনতি বিলম্বে সেই বিশ্বজোড়া স্বাস্থ্য সন্ত্রাসের একমাত্র প্রতিরোধের উপায় ‘লকডাউন’ চালু হয়ে গেল দেশ জুড়ে। গগন এবার ঠিক কী করবে? আপিসে আসা বন্ধ হল ঠিকই, ঘরে বসে আপিস করা, জীবনে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। পুণে থেকে ফেরা ইস্তক মনে মনে একটা ভয় যেন আটকে আছে। চিকিৎসক বন্ধু প্রশান্ত ফোনে বলল, “তোর কিন্তু এখনও চোদ্দ দিন হয়নি।” গগন গুণতে থাকে, তার চোদ্দদিন পূরণ হতে আর কত বাকী? গগন চোখ বুঁজে ভেবেই চলে।

হঠাৎ করে লম্বা ছুটির মেয়াদ। চাকুরে, স্কুলের বাচ্চা থেকে শুরু করে বাড়িতে আসা পরিচারিকারাও ছুটিতে। লোকজন বুঝে উঠতে পারছে না, এই ছুটি উদযাপনের কিনা? গগনবাবু গৃহকর্মনিপুণ নয়। পরিচারিকা ছাড়া গৃহিনীর নাকানিচোবানি অবস্থা দেখে ঘর মোছা, ঝাঁট দেওয়ার কাজটা নিজের কাঁধে তুলে নেয়। ঘরের কাজ সেরে, ল্যাপটপ খুলে আপিসের কাজে বসে। আপিসের মিটিং ল্যাপটপের ভেতর দিয়ে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে হয়।

নিজের আর তিয়াসার বাড়িতে ফোন করে গগন। গগনের বাড়ি বনগ্রামে। আপাততঃ সেখানে তেমন কোন সমস্যা নেই। ওর মা জয়মালা একাই থাকেন আশেপাশে জ্ঞাতিদের কয়েকঘর বাস। জ্যাঠতুতো খুড়তুতো দাদা ভাইএরা আছে। তাই বিপদে আপদে নিশ্চিন্তে থাকে। তবু ফোন করে জানতে চায় কী খবর। গগনের বাবার মৃত্যুর পর জয়মালা তার ঠাকুরসেবা নিয়েই ব্যস্ত। তার মধ্যে ফোন আসলে, যেন বিরক্তই হন। সব শুনে বলেন, “এখানে বাপু তেমন কোন রোগ বালাই নেই। তুমি সাবধানে থাকো। বাড়ি থেকে বেরিও না। আর আমায় নিয়ে ভাবতে হবে না।”

গগনের এক দাদার ছেলে আকাশ কয়েকদিন আগে ব্যাঙ্গালোরে গিয়েছে পড়াশুনার জন্য। গগন মাকে ভাইপোর কথা জিজ্ঞেস করে। জয়মালা বলে, “ওর বাবা-মা খোঁজ নিয়েছে। আমি জানিনা।”
গগন খানিক কথা শেষ করে ফোন রাখে। পাশে তিয়াসা দাঁড়িয়ে ছিল। আকাশের কথা শুনে বুঝতে পারলো না ভালো না খারাপ। গত বছর পরীক্ষার সিট পড়েছিল কলকাতায়। গগনদের ফ্ল্যাটে এসে প্রায় মাস খানেক ছিল। তিয়াসার জমে থাকা বাৎসল্য যেন আকাশের কাছেই প্রাণ পায়।

অন্য দিকে তিয়াসার বাবা মা, মালবাজারে থাকেন। যথেষ্ট সংসারী। নিয়মিত টিভি দেখেন। ওরাই ফোন করে মেয়ে জামাইএর খোঁজ নেন। তিয়াসার ভাই অমলও বেশ করিৎকর্মা ছেলে, তবে উত্তরবঙ্গ থেকে কলকাতায় আসা সম্ভব হয় না।

সঙ্কট ছড়িয়ে পড়েছে। গগনের মতো প্রতিটি মানুষকে তার আঁচে বুঝিয়ে দিচ্ছে, সে আছে, খুব কাছে। ঘাড়ের ওপর অশরীরী নিঃশ্বাস। অনেক রকম ভয়ের আবহ। সেই ভয়ের আকার প্রকার ঠিক কেমন, দূর থেকে ইঙ্গিত আসছে। ভাইরাসের কারণে বড় বড় উন্নত দেশের সংক্রমনের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে আতঙ্কিত করতে থাকে।

[ক্রমশঃ]

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পরম্পরায় প্রকাশিত রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, মার্চ ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

5 1 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য