অনাহত

[দুঃস্বপ্নের রোজনামচা, যা আমরা কিছুদিন আগে পার হয়ে এসেছি। কোভিড সময়ে, যখন বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর ভয়াল বিভীষিকা আমাদের তাড়া করে ফিরেছে, সেই প্রতিদ্বন্দ্বী কালখন্ডের এক টুকরো দলিল।

পূর্বানুবৃত্তিঃ শুরু হয়ে গেল লক-ডাউন। রেশন দোকানে লম্বা লাইন। গগন তিয়াসা-র মধ্যেকার রসায়ন নতুন করে ধরা দেয়। গগনের বেতন কমে গেল। সনতের পুত্র আদিত্য আর পুত্রবধূ ধৃতি আলাদা হয়ে রয়েছে। বিল্টুবাবুর কাছে কথা বলতে আসে গগন। পথে একবৃদ্ধকে অকারণ মার খেতে দেখে। রাতে ন’মিনিটের ব্ল্যাক আউটের পর অকাল দীপাবলি। বন্ধু বিকাশ আত্মশক্তির ওপর নির্ভর করতে বলে। বুঝতে পারেনা কোথায় সেই শক্তি পাবে? ]

গগনের মন ভারাক্রান্ত। মাসের ভিতর পনেরো ষোলো দিন যে দৌড়ে বেড়ায়, আজ কতদিন ঘরবন্দী! আরও কতদিন যে এভাবে থাকতে হবে জানা নেই। তিয়াসা এসে বলে যায়, “এত ভেবো না। পৃথিবীশুদ্ধ লোকেদের এক অবস্থা। তোমার বা আমার আলাদা করে খারাপ কিছু হয়নি।”
গগন উত্তর করে না। ইদানিং নিজের ভেতর গুটিয়ে গেছে। বন্ধুদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সকাল থেকে, ক্লাসে শিক্ষক না থাকলে যেমন হতো, সেখানে তেমনই ছেলেবেলার মতো হট্টগোল চলেছে। গগন খুব একটা যোগ দিতে সময় পায় না। তবু ছোট বয়সের বন্ধুত্ব। চাইলেও ছাড়া যায় না। একেকজন একেকটা চরিত্র। কেউ ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ গগনের মতো সওদাগরী আপিসের একজন সওদাগর, কেউ কেউ সরকারী কাজ করে, কেউ ওকালতি। বিকাশ এদের মধ্যে একদম অন্য রকম। এত ভালো রেজাল্ট, বড় সরকারি ইঞ্জিনিয়ার! ভালো চাকরি, বাতি লাগানো গাড়ি! কিন্তু বিয়ে-থা করল না। জীবনভোর সমাজের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করছে। শুনেছে, কোন এক প্রত্যন্ত গ্রামে একটা অনাথ আশ্রম করেছে। বেশ কয়েকটি বাপ-মা ছাড়া বাচ্চাকে মানুষ করছে। শুক্রবার বিকেল হলেই, আপিস থেকে সরাসরি সেই গ্রামে চলে যায়, আবার সোমবার সকালে, ওখান থেকেই আপিসে আসে।

ছেলেবেলার বন্ধুদের গ্রুপে কথাবার্তার আগল থাকে না। বিকাশ নিঃশব্দে থাকে। কয়েকবার দেখা হতে, বন্ধুদের আশ্রমে নিমন্ত্রণ করেছে। কিন্তু এই অবধি। নানান কাজে ব্যস্ত থাকায় গগনের আর যাওয়া হয়নি।

সকাল থেকে ঠাট্ট ইয়ার্কি চলতেই থাকে। একে অন্যের পিছনে লাগে, কখনও রাজনৈতিক মত নিয়ে চাপান উতোর হয়। কখনও ইষ্টবেঙ্গল মোহনবাগান বা হিন্দু মুসলমান। সুমন লিখেছে, “ওয়ার্ক ফ্রম হোম করতে বলেছে বলে, কোন এক সন্ত্রাসবাদী নাকি নিজের বাড়িতেই বোমা ফাটিয়েছে।” শুনে শুনে অনেকেই হাসির ইমোজি দেয়। ইদানিং গগনের এসব যেন ভালোই লাগছিল না। কতদিন হয়ে গেল, আপিস যাচ্ছে না। প্রচুর ট্যুর থাকতো, সে সবও হচ্ছে না। ঘরে বসে বসে জং ধরে যাচ্ছে যেন!

গগন কী মনে করে, বিকাশ কে ফোন করে। একথা সেকথার পর গগন বলে ফেলে, “আর ভালো লাগছে না।”
বিকাশ, ওর স্বভাবসিদ্ধ শান্ত ভঙ্গীতে বলে, “ভালো লাগার তো কথাও নয়। সারা পৃথিবী খারাপ আছে, সেখানে তোর বা আমার একার ভালো থাকার তো কথা নয়।”
গগন বলে, “তোর তো সংসার নেই। তাই মহানন্দে আছিস। আমাকে সবসময় ভাবতে হচ্ছে, ই-এম-আই কোথা থেকে দেবো? খাওয়া খরচ-ইবা কোথা থেকে আসবে! মনে হয় কোভিড হলেই যেন মুক্তি পেয়ে যাবো।”
বিকাশ হাসে, “মুক্তি অতো সোজা? তুই কি ভাবছিস, আমি সংসার করিনি বলে, আমার দুশ্চিন্তা নেই? কুড়িটা ছেলে, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। ওদের ভবিষ্যত, ওদের প্রতিদিনের খাবারটা। সে সব তো আমাকেই ভাবতে হয়।”
এরপর একটু থামে, আবার বলে, “তবে এর মধ্যে একটা অন্য রসায়ন আছে। সেটা হল, সমস্ত দুশ্চিন্তার কেন্দ্রে, ওই বিপদগ্রস্থ শিশুগুলো। আর তোর দুশ্চিন্তা তোর নিজেকে নিয়েই। তোর ফ্ল্যাট, তোর গাড়ি, তোর স্ত্রী ইত্যাদি।”
গগন বলে, “তা ভাই আমার মতো সাংসারিক মানুষের এছাড়া আর কী উপায়?”
“উপায় আছে। তার জন্য তোকে একবার আমার আশ্রমে আসতে হবে।”
“বেশ, লকডাউন কাটুক, নিশ্চই যাবো। অন্ততঃ তোর জন্যেই যাবো। দেখব তুই কী কান্ড করেছিস!”

বিকাশ হাল্কা হেসে বলে, “আমার জন্য নয়, নিজের জন্য আসবি। তোর প্রতিদিনের এই চাপ থেকে মুক্ত হওয়ার খোঁজ পেতে আসবি। আর আমার কান্ড করার কোন ক্ষমতাই নেই। যা কিছু সব তিনিই করিয়ে নেন। আমরা তো সামান্য মানুষ।”
“আমাদের মতো সাধারণ তো তুই নোস। যাই হোক, ভালো থাকিস। তোর অনাথ ছেলেরা ভালো থাকুক।”
ফোন রেখে গগনের যেন একটা অন্যরকমের ভালো লাগা বোধ হয়। এতদিন ঠিক এইভাবে দেখেনি। মনে মনে ঠিক করে, লকডাউনের শেষে একবার যেতেই হবে। প্রতিদিনের এই টানাপোড়েনের শেষে কিছু একটা পাওয়ার হদিস পেতেই হবে। বিকাশের কথা মধ্যে কিছু একটা ইঙ্গিত রয়েছে।

জানালার পাশে বসে ফোন করছিল আর এসব ভাবছিল। তখন দরজায় চাবি ঘোরানোর শব্দ পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, তিয়াসা ঢুকছে, হাতে ব্যাগে কিছু বাজার রয়েছে। গগন জিজ্ঞাসা করে, “তুমি বেড়িয়েছিলে? কখন? টের পাইনি তো?”
“তোমার মতো ভয়ে, ঘরে ঢুকে বসে থাকলে চলবে?”
“এখন ঝুঁকি নিয়ে বেরনো কি ঠিক?”
“দেখো, ঠিক ভুল জানিনা। যদি কপালে থাকে, লোহার বাসরেও সাপ ঢোকে।”


গগন, তিয়াসার কথা শুনে কী জবাব দেবে বুঝতে পারে না। একে তার কাজ কর্ম নিয়ে অনিশ্চয়তা। তার ওপর চতুর্দিকে শুধু খারাপ খবর। সেখানে হঠাৎ করে তিয়াসার এমন বেপরোয়া মনোভাব চাপ বাড়িয়ে তোলে। পৃথিবীটা হয়তো এমনই! গগন ভাবে, ঠিক যখন ভাবছে, তিয়াসা তার সমস্যাকে বুঝতে পারবে। এই বিপদের দিনে পাশে থাকবে। তখন সে এক্কেবারে উল্টো মেরুতে দাঁড়িয়ে অবস্থাকে চ্যলেঞ্জ করছে। গগন মনে মনে যতই ভাবুক, মুখে কিছু প্রকাশ করে না। এখন ঘরবন্দী অবস্থায়, দুজনকে দুজনের চব্বিশ ঘন্টা সহ্য করে যেতে হবে। কোন কারণে মনোমালিন্য হয়ে গেলে তার জেরে সব জেরবার হয়ে যাবে। শুধু বলে, “যাও, বাইরের পোশাক ছেড়ে ফেলে, ভালো করে স্নান করে নাও।”

বাজারের থলি দুটো নামিয়ে রেখে, তিয়াসা চানঘরে ঢুকে যায়। কোথায় যে এখন এতসব বাজার পেয়েছে, গগন বুঝতে পারে না। আবার জিজ্ঞাসা করতেও সাহস পায় না। নিজের ল্যাপটপ খুলে অপিসের কাজে মন দেওয়ার চেষ্টা করে। হোয়াটসঅ্যাপে বন্ধুদের গ্রুপে বেশকিছু হাহাহিহি-র ছবি আসতে থাকে। সুমন আজ বলছে, “লকডাউনের পর বাচ্চা জন্মানোর হার বেড়ে যাবে।” মনের কোণে একফালি খুশি গজিয়ে ওঠে, সত্যিই যদি গগন আর তিয়াসার তাই হয়! মাঝে মাঝে ফোনে, ফেসবুক ইনস্টা দেখতে থাকে। সব মিলিয়ে বিক্ষিপ্ত মন যদি ঠান্ডা হয়। ডাক্তার বন্ধু প্রশান্ত, নানা রকমের সতর্কতামূলক পোস্ট পাঠাচ্ছে। সে সব দেখে, ভয় আরও বেড়ে যায়। কখনও প্রশান্তকে ফোন করে মানসিক চাপের কথা বলে। প্রশান্ত ওর মতো করে সমাধানের রাস্তা দেখায়, কিন্তু বলা বাহুল্য গগন পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে পারে না।

অন্যদিকে বিকাশের কথা মনে পড়ে। কেমন নিরুপদ্রব গলায় কথা বলে। শান্ত, হাসিতে উজ্জ্বল। ফোনের মধ্যেও ওর হাসিটা যেন ছুঁয়ে গিয়েছে। বলল বটে এতগুলো বাচ্চাদের ভবিষ্যত ওর হাতে, কিন্তু কেমন যেন নিশ্চিন্ত। বোধহয় ঈশ্বরের প্রতি আনুগত্য ওকে নির্ভার হতে সাহায্য করে। সমস্ত সমস্যা তাঁকে সঁপে দিয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে রয়েছে। গগন যদি এমন ভক্ত মানুষ হতে পারতো, বেশ হতো। কিন্তু সকলের মনে তো ওই রকম সমর্পন থাকে না। তারা প্রশ্ন করে। যুক্তি খোঁজে। পরম শক্তিমানের শক্তিকে হয়তো সন্দেহও করে। গগন তো সেই দলেরই একজন। ও কী করে তাঁকে আঁকড়ে ধরে বলবে, “আমার সবটা তোমায় দিলাম।” যৌবনের প্রথমে যাকে সত্যিই বলেছিল, সেই তিয়াসাকে এখন কেমন অচেনা মনে হয়। এই যে এতো উথালপাথাল নিয়ে বসে আছে, তার একটু আভাষও কি পৌঁছচ্ছে? পৌঁছলে, এমন বিপদের মুহূর্তে অনায়াসে বাজার ঘুরে আসতে পারে? একটা ম্লান দিশাহীন দৃষ্টি নিয়ে গগন জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকে। দুপুরের রোদে আকাশটাকে ঘোলাটে মনে হয়। সরাসরি দিকচক্রবাল দেখা যায়না। বড়বড় ইমারতের সারি এখন স্কাইলাইন। শহুরে জীবনের এটাই সীমাবদ্ধতা। অসীমকে সে ছুঁতে দেয় না।

(দুটি স্থিরচিত্রের জন্য কৃতজ্ঞতা শ্রী প্রদীপ রায় চৌধুরীকে)

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পরম্পরায় প্রকাশিত রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জুলাই ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

4 1 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য