
যাত্রাপথের আনন্দ-গান (চতুর্দশ পর্ব)
(টেপ রেকর্ডার)
এই তো আর ক’দিন, পুজো আসছে। খুব আনন্দ হচ্ছে। সেই কোন সকালে ইয়া ধ্যাবড়া ফিলিপস্-এর রেডিওটা অন করে দিয়েছে দাদু। কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছি। স্টোভে গরম জল বসিয়েয়েছে মা। সবার জন্য চা বানাচ্ছে। ঘুলঘুলির দিকে তাকিয়ে লক্ষ করছি এখনও আলো ফোটেনি বাইরে। উঠোনের দিকের দরজাটা অল্প খোলা, রান্নাঘর থেকে কেরোসিন স্টোভের গন্ধটা নাকে এসে লাগছে। শরৎকালে ভোরবেলায় এই গন্ধটা কী দারুণ লাগে! রেডিওতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলায় স্ত্রোত্রপাঠ শুনলেই গা’য় কাঁটা দেয়। বাড়ির সামনের রাস্তায় লোকজনের চলার শব্দ। আমি জানি এদের মধ্যে কেউ কেউ ফুল চুরি করতে বেরিয়েছে। গাছের ঘাড় মটকে এরা ফুল চুরি করে। আশেপাশের বাড়িগুলো থেকেও রেডিওর শব্দ— পাড়াটা গমগম করছে।

নাহ্ উঠতে হবে। সবাই ভাঙা বিস্কুট আর চা খাবে। কলতলায় কলের ঘ্যাঁচোর ঘ্যাঁচ শব্দ হচ্ছে। দূরে কুলিদের বস্তি থেকে রামা হো রামা হো শব্দও আসছে। চা খেয়ে কালজানি ব্রিজে যাব। আকাশ ক্রমশ ফকফকে হচ্ছে। বড়বাজারের রাস্তাটা, যেটা চৌপথী থেকে সোজা এসে রেলস্টেশন পার করে, আলিপুরদুয়ার দুর্গাবাড়ি ছাড়িয়ে সোজা কালজানি ব্রিজ অবধি গেছে, সেই রাস্তা ধরে কত লোক হাঁটছে। সবাই ব্রিজের দিকে যাচ্ছে। বন্ধুরা এসে গেছে, আমরা এখন রাস্তায়— ব্রিজের পথে। মহালয়ার ভোরে ব্রিজ থইথই করে মানুষের ভীড়ে। পাড়ার মেয়েরাও দল বেঁধে যাচ্ছে, কেউ আমাদের সামনে, কেউ পিছনে। সব্বাইকে কী সুন্দর লাগছে। আড়চোখে দেখছি অনেককেই। মা বলেছে পাড়ার সব মেয়েরাই বোন। বোনেদের দিকে অন্য নজরে তাকাতে নেই।
ভটচাজ্দের মাঠে আমরা ফুটবল খেলব। একদল ইষ্টবেঙ্গল, অন্য দল মোহনবাগান। সাতসকালেই বিজুদের বাড়ির রান্নাঘরে আবার ঝমঝম করে বাসন পড়বে। তপুর দুই পায় গোলার মত শট, ওর শটেই বেশি বাসন পড়ে। ও আমাদের দলে। আমরা ইস্টবেঙ্গল।
ততদিনে ফুটবল খেলাটা ভালই শিখে গেছি। টাউনক্লাব মাঠে শহরের প্রাক্তন ফুটবলার কাকু-জেঠুরা কোচিং ক্যাম্প খুলেছে। তিন বছর সেখানে খেলে ফেলেছি। বিষ্টু কাকু মুখে বাঁশি নিয়ে আমাদের ফুটবল খেলা শেখায়। আর ভুল করলেই চিৎকার করে বলে— “আগে রিসিভ শেখো”…প্রতিদিন কতবার যে এই কথাটা শুনতে হয়! এখন আমি মোটামুটি খেলতে পারি, তাই দাদারা আমাকে পাড়ার ইষ্টবেঙ্গল টিমে নেয়। বিষ্টুকাকু বলেছে সেন্টার ফরোয়ার্ডে খেলবি, পরিশ্রম কম তবে গোলপোস্ট ভালো করে চিনতে হবে। গোল চাই, গোল।
স্টেশন পাড়ায় প্যান্ডেল হচ্ছে। মাইকে গান বাজছে। কিশোরকুমার আর মহম্মদ রফির গান বেশি বাজায়। লতা মুঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলেও। “আমার পূজার ফুল/ভালোবাসা হয়ে গেছে/ তুমি যেন ভুল বুঝো না “… এই গানটা কানে আসলেই মনের মধ্যে খুব কষ্ট হয়। কেমন জানি একটা ভাললাগা অথচ বুকটা মুচড়ে ওঠে। হু হু করতে থাকে মনের ভিতরটা। কাউকে খুব ভালবাসতে ইচ্ছে করে। বাড়ির উল্টোদিকের ভাড়াটিয়াদের মেয়েটাকে কী ভালই না লাগে। এদিকে মা বলে দিয়েছে পাড়ার সবাই নাকি বোন! ধুত্, তাহলে কার সঙ্গে প্রেম করব! সবাই বোন হলে… কই ঐ যে তপু পাড়ারই একজনের সাথে নাকি প্রেম করে। ও কীভাবে করে? সবাই বোন হয় নাকি?

মাইকে গান বাজছে — “এপারে থাকব আমি, তুমি রইবে ওপারে/ শুধু আমার দু-চোখ ভরে, দেখব তোমারে”… বাড়িতে একটা ছোট্ট টেপ রেকর্ডার আছে। এটার মালিক মেজ মামা। অনেকগুলো ক্যাসেটও আছে। মামাবাড়িতে সবাই গান ভালোবাসে। মেজমামা খুব ভালো ফুটবল খেলে। খেলার জন্য রেলওয়েতে চাকরি পেয়েছে। এখন গান শোনার সময় পায় না, তাই টেপ রেকর্ডার আর সব ক্যাসেট আমার কাছে জমা রেখেছে। আমি কিশোর কুমারের এই গানটা বারবার শুনি। যখনই শুনি তখনই মনের মধ্যে কষ্টের বাতাস দৌড় দেয়। আমি বারান্দায় এসে দাঁড়াই, উল্টোদিকের ভাড়াটিয়া বাড়ির জানলার দিকে চোখ বড় করে দেখি আর টেপের ভল্যুমটা খুব বাড়িয়ে দিই। গা গা করে টেপ বাজে, মা এসে ভল্যুম কমিয়ে দেয়। আমি টুক করে এসে আবার ভল্যুম বাড়াই। উল্টোদিকের বাড়ির শকুন্তলার মত দেখতে মেয়েটা জানালায় এসে দাঁড়ায়। আমি বারান্দার আড়াল থেকে ওকে দেখেছি জানালায় দাঁড়াতে। এমনটা চলতে থাকে। একই গান আমি বারবার রি-ওয়াইন্ড করে বাজাই। রান্নাঘর থেকে মা এসে বকা দেয়। ভল্যুম কমিয়ে দেয় বারবার। ধুত্তোর! রাগ উঠতে থাকে। এভাবেই চলছিল ক’দিন। একদিন সাহস করে বারান্দায় এসে উল্টোদিকের বাড়ির জানালার দিকে তাকালাম। দেখি শকুন্তলা জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে আছে। অমনি চিৎকার করে গান ধরলাম— “এপারে থাকব আমি, তুমি রইবে ও পারে”… আহ! মাথা-কান কটকট করে একটা তীব্র ব্যথা ছুটে গেল সারা মুখে। গান থেমে গেল। অসহ্য যন্ত্রনায় মাথাটা ঘুরে গেল, নিচু হয়ে গেল…মায়ের একটা হাত আমার এক কানে আর অন্য হাতে আলমারির উপরে রাখা— বাবার সেই চকচকে বেতটা! (চলবে)

