(ভারত প্রেমকথা)

ক্লাস ফাইভ, এবার হাই ইস্কুলে ভর্তি হতে হবে।বাড়ির কাছেই হাই ইস্কুল। সব্বাই চেনে। এখানে প্রাইমারীতে পড়াশোনা করলেও হাই সেকশনে বাবা ভর্তি করবে না। তিন কিলোমিটার দূরে অন্য একটি নামকরা ইস্কুল আছে, সেখানেই পড়তে হবে। ম্যাক উইলিয়ম সাহেবের নামে ম্যাক উইলিয়ম হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল। নামটার মধ্যেই একটা জাঁদরেল ব্যাপার আছে, না?

ট্রান্সফার নিয়ে বাবা এখানে চলে এসেছে। এখন থেকে মা-ভাই-বাবার সাথে ঠাকুর দাদার বাড়িতে সব্বাই একত্রে থাকব। মজাও হচ্ছে আবার ভয়ও হচ্ছে। ইয়া বেতটা বড় ঘরের আলমারির উপরে থাকে, ওটা সরানো যাবে না। সপ্তাহে বা পনের দিন পরে পরে কদিনের দুষ্টুমির গুরুত্ব বুঝে বেতটা পেড়ে বাবা দু ঘা দেবেন। বেশি অন্যায় করলে একবেলা খাওয়া বন্ধ। আমার না বেতটা লুকিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। বাবা তো ট্রেন নিয়ে ছুটে বেড়ায়। এই অসম তো এই বিহার— কোথায় কোথায় না যায়! বাংলাদেশেও ট্রেন নিয়ে যায়। তখন পাড়ার কাকু জেঠুরা বাড়িতে এসে বাবাকে টাকা দিয়ে যায়, বাবা বাংলাদেশ থেকে পদ্মার ইলিশ নিয়ে আসে। বাড়ির পেছনেই পিটকিলা গাছটার পরে একটা বড় খাল, খালের পরে উঁচু জমি কিছুটা, জমিটা যেখানে শেষ হয়েছে সেখানে অনেকগুলো রেল গুদাম, তার পরেই তিন সারি রেললাইন। এটা আলিপুরদুয়ার রেল স্টেশন। যেদিন বাবা বাংলাদেশ থেকে ফেরে, পাড়ার অনেকেই ইঞ্জিনের দিকের প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দাঁড়ায়। বাবা ইঞ্জিনের জানালা থেকে হাত বার করে সবার জন্য একটা করে ইলিশ নামিয়ে দেয়। আমি আর কাকাই যাই। আমাদের জন্য দুটো ইলিশ নামিয়ে দেয় ইঞ্জিন থেকে। পাড়ায় তখন বন্ধুদের কাছে কী ঘ্যাম বাড়ে আমার! যারা ব্যাডমিন্টন খেলায় আমাকে নিত না, তারাও আমাকে কোর্টে ডেকে হাতে র‍্যাকেট দেয়। সন্ধ্যাবেলা নেটের দুইধারে টিমটিমে আলো জ্বালিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলা হয়— ইলিশ এলেই আমাকে কয়েকটা গেম খেলতে দেয়। আমার দুটো কাঠের র‍্যাকেট আছে , বাড়ির উঠোনে ভাইয়ের সাথে খেলি। ভাই একটুও খেলতে পারে না। বারবার ছুটে গিয়ে আমাকেই শাটল কর্ক কুড়োতে হয়— রাগ উঠে যায় তখন!

ম্যাক ইউলিয়ম স্কুলে বাবার অনেক বন্ধু। সবাই টীচার। এবারে আমার কী হবে? দুষ্টুমি করলে খবর চলে আসবে আর ঐ বেত— ওটা আলমারির উপরে! পাড়ার এক কাকুর সাথে শেয়ারের রিক্সা করে স্কুলে যাই। ফেরার সময় কাকুর ছেলে আর আমি রেললাইন বরাবর হেঁটে বাড়ি ফিরি। দু-একজন দাদাও সঙ্গে থাকে। রোজ অতটা হাঁটতে ইচ্ছে করে? রেললাইনের কাঠের স্ল্যাব গুনে গুনে ফিরলে অবশ্য অতটা সময়কে টের পাওয়া যায় না। অ্যালুমিনিয়াম সুটকেসের ঘসায় কালচে দাগ পড়ে যায় পা’য়। মাঝেমধ্যে রিক্সা করেও ফিরি— তাও তো সপ্তাহে তিন বা দুই দিন। ১ টাকা রিক্সা ভাড়া, দুই বন্ধু একত্রে এলে পঞ্চাশ পয়সা দিলেই হয়ে যায়। টিফিনের দশ পয়সা থেকে কয়েকদিন পাঁচ পয়সা বাঁচাতে পারলেই রিক্সা খরচ উঠে যায়। প্রতিদিন এমনটা হলে কী ভালোই না হতো। তখন বাবার উপর রাগ হয়, এত দূরের স্কুলে ভর্তি করল কেন! পাড়ার বন্ধুরা তো হাই স্কুলে পড়ে। বাড়ির কাছেই হাই স্কুল, কী সুন্দর সবাই একসাথে যাতায়াত করতে পারতাম!

এখন না আমার বন্ধু পালটে যাচ্ছে। নতুন স্কুলে অনেক বন্ধু হয়েছে। পাড়ার বন্ধুদের সাথে ছুটির দিন ছাড়া আজকাল দেখা কমই হয়। দেখা হলেও রোজ খেলা হয় না। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গড়ায়। তারপর এট্টু কিছু খেতে না খেতেই অন্ধকার নামে। দাদু বলেছে অন্ধকারে বাইরে যাওয়া যাবে না। পড়তে বসতেই হবে। অন্য একটা ঘরে মাদুরের উপর পড়তে বসি। হ্যারিকেন সামনে জ্বলে, দুইদিকে ভাই আর আমি। ভাই খুব দুষ্টু, পড়তেই চায় না, খাতায় শুধু ছবি আঁকে। এদিকে আবার জোরে শব্দ না করে পড়লে পাশের ঘর থেকে মা নয়ত দাদু চিৎকার করবে। আমি অরণ্যদেবের বই, দিস্তা খাতার নিচে লুকিয়ে জোরে চিৎকার করে অরণ্যদেব পড়ি— কেউ তো আর দেখছে না, শব্দ পাচ্ছে, ভাবছে আমি পড়ছি, কী মজা! ভাই আমার উপর রেগে গেলেই নালিশ করে দেয় আমি নাকি গল্পের বই পড়ছি, অমনি মায়ের দুদ্দার পিট্টি! কাঁহাতক শুধু পড়ার বই পড়তে ভালোলাগে? এই ঘরেই বইয়ের আলমারি। ভাই অন্য ঘরে গেলেই আলমারিটা খুলি। কী মজা! একটি বইয়ের নাম “ভারত প্রেম কথা”..বইয়ের মলাটে কী সুন্দর রাজা আর রাণীর ছবি! বন্ধুরা বলেছে ছেলে আর মেয়ের মধ্যে নাকি প্রেম হয়। যখন একজন অন্যজনকে খুব ভালোবাসে তখন নাকি খুব প্রেম হয়। আমিও প্রেম করব। ‘প্রেম’ শব্দটা জোরে বলা যাবে না— বন্ধুরাই বলেছে। স্কুলে আমরা ফিসফাস করে প্রেম শব্দটা বলি। যদি স্যারের কানে যায় বা বাবার বন্ধু স্যারদের কানে যায় তাহলে বাড়িতে খবর চলে আসবে। কী ভয় আমাদের। আচ্ছা বাবার বন্ধুরা তো সবাই কাকু, বাড়িতে এলে কাকু বলি, স্কুলে গেলেই স্যার বলতে হয়। কী বিরক্তিই না লাগে, অস্বস্তিও!

ভারত প্রেমকথা বইটা আমি চুপচুপ করে পড়ি। দুষ্মন্ত-শকুন্তলা, কচ-দেবযানী, নল-দময়ন্তীর গল্প কী দারুণ লাগে। আমারও খুব প্রেম করতে ইচ্ছে করে। উল্টো দিকের বাড়িতেই এক কাকু ভাড়া থাকে। তার বড় মেয়েটা কী সুন্দর! আমার তো ওকে শকুন্তলার মত লাগে। অমনই টানা চোখ, কী সুন্দর! আমি ওর সাথেই প্রেম করব। দুষ্মন্তের মত মোটেও ভুলে যাব না। করবই করব। আচ্ছা, মা যদি জানতে পারে তাহলে কী হবে? ভাই জানলে আরও বিপদ, ও সব বলে দেবে। দাদু কাকাই বাবা সব্বাইকে বলবে। আমি তাহলে এখন কী করব? বাবা আমাকে আর ভাইকে পাশে শুইয়ে রাতে ঘুমানোর আগে আন্টনি ও ক্লিওপেত্রার গল্প বলে। ট্রয়ের হেলেনের গল্প বলেছে, মার্চেন্ট অফ ভেনিস বলে— আন্তনিও, ব্যাসানিও, পোর্শিয়া আর শাইলকের গল্প। আঙ্কল টমস্ কেবিনের গল্প, গ্যালিভার আর লিলিপুটের গল্প, ওথেলো আর ডেসডিমোনার গল্পও বাবা বলেছে। একটা রুমাল হারিয়ে ফেলার জন্য ওথেলো নাকি ডেসডিমোনাকে গলা টিপে মেরে ফেলেছিল! এজন্যই মা পিসিরা বলে রুমাল যত্ন করে রাখতে হয়, কারুকে রুমাল উপহার দিতে নাকি হয় না। বাবা সবটা খুলে না বললেও আমি জানি এরা সব্বাই প্রেম করে। স্কুলে এক বন্ধু এই বইগুলো আনে, আমি কয়েকটা পড়ে জেনেছি। ঠিক করেই ফেলেছি, উলটোদিকের বাড়ির ভাড়াটিয়াদের মেয়েটার সাথেই প্রেম করব, যেভাবে ‘ভারত প্রেমকথা’-য় সবাই করে— সেভাবেই করব। পাক্কা। (চলবে)

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[ পরম্পরা ওয়েবজিন, জুলাই ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য