জটিল মনের আবছায়াতে আত্মআবিষ্কারের এক সেরেব্রাল সার্চলাইট
সুখচর গ্রুপের নতুন নাটক ‘পাখি ও ঘাতক’, দেখে লিখলেন

সে অনেককাল আগের কথা। আমার তখন কলেজের শেষপাত। শ্রদ্ধেয় ভাষাবিদ জ্যোতিভূষণ চাকী’র সান্নিধ্যে কাটানো বেশ কিছু দামী অভিজ্ঞতা হয়েছিল সে সময়। চারদিকের নানা বিচিত্র বিষয়ে প্রশ্ন করে জ্বালাতন করতুম বরেণ্য সেই মানুষটিকে। আজও আশ্চর্য হই এই ভেবে যে, কোনওদিন বিরক্ত হতে দেখিনি তাঁর অমায়িক আপাতগম্ভীর সরস সত্ত্বাকে। উল্টে মজার ছলে বহু গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিতেন অক্লান্ত প্রশ্রয়ে। একবার কথা উঠেছে “পেশাদার বনাম শৌখিন” শিল্পকৃতি প্রসঙ্গে। নানা রাস্তা পেরিয়ে কথা এসে দাঁড়িয়েছে লাইভ পারফর্মিং আর্টস (মূলত মঞ্চাভিনয়) প্রাঙ্গণে। হঠাৎ তিনি কয়েক পংক্তির একটি ছড়ার ফুলকারি আসন পেতে কথাটাকে যেন বসতে দিলেন। এতদিন পরে স্মৃতিসঙ্কটে একটু এদিক-সেদিক নড়ে যেতেই পারে সেই উপবেশন। তবে পেশাদার ও শৌখিন অভিনয় নিয়ে দর্শকের আশা বা প্রাপ্তির নিরিখে তাঁর সেই ছড়ার নির্যাস যেটুকু আজও মনে আছে তা হল –
অ্যামেচার, ঘামে তার আলাদা কি গন্ধ?
একই বাগিচায় ফোটা ধুতুরা আকন্দ
‘পেশাদারি পেশোয়া না, নেই তলোয়ারে ধার’
এই ভেবে অবহেলা করলেই বারবার
ঠকে যাবে নির্ভুল, পরচুল আঁচড়ে
টিকি নেড়ে পণ্ডিতি, কে হীরে কে কাচ রে!
অ্যামেচার, পেশাদার – হও দ্বিধামুক্ত
পেট দুরকমই হয় – ভরা বা অভুক্ত
বোঝা গেল তিনি এসব কেতাবী ভাগাভাগিতে বিশ্বাসী নন। কিন্তু মানা গেল কি? পেট ভরা আর মন ভরা কি এক?

জাম্প কাট টু –
এর বেশ কিছুদিন পরে আন্তর্জাতিক নাট্যকর্মী, নাট্যতাত্ত্বিক ও প্রশিক্ষক রবার্ট ব্রুস্টেইনকে তাঁর প্রশিক্ষণ শিবিরের এক প্রশ্নোত্তর পর্বে বড় আনাড়ির মত জিজ্ঞাসা করেছিলাম – “অ্যামেচার অভিনয় কি পেশাদারী অভিনয়ের থেকে লঘুমাত্রার চর্চাক্ষেত্র?” অভিভাবকের যত্ন নিয়েই পাল্টা প্রশ্ন সাজিয়ে দিয়েছিলেন স্মিতহাস প্রাজ্ঞ মানুষটি – “ঘরোয়া রান্নাতেও স্বাদ বা পদের চেহারা ঠিকমতো ফুটিয়ে তুলতে হলে, রাঁধুনির খাটনি বা মনোযোগ কি কোনও বিখ্যাত রেস্তোরাঁর শেফের চেয়ে কম প্রয়োজনীয় মনে হয়?” … আমতা আমতা করে বলেছিলুম “তা নয়, তবে….”, আমার কথার খেই ধরেই শিক্ষক বললেন – “বরং বেশি মনযোগ, বেশি সতর্কতা, বেশি অভ্যাস দাবী করে ঘরোয়া রান্না। কারণ মূলত তিনটি
১. সে রান্না খাবে তার প্রিয় বা পরিচিতজন, যাদের পেট ভরানোর চেয়েও মন ভরানোর দায় বেশি রাঁধুনির
২. সীমিত সম্পদের জোগান – খাবারটা একবার খারাপ হলে, বিকল্প খাবারের ব্যবস্থা মজুত নাও থাকতে পারে। কাঁচামাল থাকলেও সময় জুটতে সমস্যা হতে পারে
৩. শেফের মত প্রতিদিন হাজারগন্ডা রান্নার চর্চা, অভিজ্ঞতা ও প্রতিষ্ঠা ঘরোয়া রাঁধুনির নেই। মাল্টিপল ‘কুকিং শো’ করে নিজেকে নানা পদে প্রমাণ করার সুযোগও তার নেই। তার হাতে সুযোগ সীমিত, তাই প্রতিটি সুযোগই তার জন্য ‘এসপার নয়তো ওসপার’ যুদ্ধ।”
এর পর একটু থেমে বললেন, “আর জানোই তো, ব্যাটল ইজ অলওয়েজ আ সিরিয়াস বিজনেস টু বি সাকসেসফুল, নো ম্যাটার ইউ বি ইন ইট ফর আ পার্টটাইম অর পার্মানেন্ট রোল….”
সেদিন আবারও আন্দাজ পেয়েছিলাম “অ্যামেচার অভিনয়” বলে কিছু হয় না। প্রতিটি আন্তরিক মঞ্চায়ন, প্রতিটি আবেশী কুশীলববৃত্তি, প্রত্যেক মুহূর্তের আবেগবাঁধা জীবন্ত চলাচল – তা একদিনের জন্য হোক বা বছরে ৩৬৫ দিন, দুটোই মাত্র ভাগে বিভক্ত – ‘মনে নাড়া দেওয়ার মত ভালো’ বা ‘ভুলে যাওয়ার মত ভুষি’….সেখানে নাট্যদলটি বড় না ছোট, নাটকটি একাঙ্ক না পূর্ণাঙ্গ, মঞ্চটি কী মাপের, অংশগ্রহণকারীরা নিয়মিত নাট্য-সংসর্গে আসেন কিনা এগুলো ম্যাটার করে না।

এরপর ধীর লয়ে এই আন্দাজটা বিশ্বাসে পরিণত হতে শুরু করেছে তথাকথিত “অ্যামেচার” বা অপেক্ষাকৃত “ছোট দল” বলে বিবেচিত বিভিন্ন নাট্যসংস্থার কাজ দেখতে দেখতে। সেই বিশ্বাসেই আরেকটু ভরসা জোগাল সুখচর গ্রুপের একটি নাটক “পাখি ও ঘাতক”। সংক্ষিপ্ত সময়ে বিস্তারিত যে নাটকটি ধারণ করে আছে একটি পূর্ণাঙ্গ ২ঘন্টা ব্যাপী নাটকের সুপ্ত বীজ তথা সম্ভাবনার বার্তা।
নাটকের চলন বা গড়ন যে অভিনয় জগতে অত্যন্ত অভিনব তা বলব না। এই ধাঁচের উপস্থাপনা আমরা পিরানদেল্লোর “Six Characters in search of an Author” নাটকে দেখেছি (বঙ্গমঞ্চে যাকে অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় রূপ দিয়েছেন নান্দীকার প্রযোজিত “নাট্যকারের সন্ধানে ছটি চরিত্র” নির্মাণ করে, এবং সংসৃতি প্রযোজিত “কোথাকার চরিত্র কোথায় রেখেছ” নাটকে তা এসেছে পরিচালক দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের নিজস্ব পরীক্ষামূলক রীতি অবলম্বন করে)। আরেকটি বাংলা নাটক “অদ্য শেষ রজনী”তেও এই পদ্ধতির আঁচ উপভোগ করেছেন দর্শক। একদা রেডিওতে শুনেছিলাম “নাটকটাই জীবন আর জীবনটাই নাটক” হয়ে ওঠার এক অনবদ্য অন্তর্বুনন (নাট্যকার সম্ভবত মন্মথ রায়)। এমনকি ঋতুপর্ণ ঘোষের “আবহমান” বা কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের “অপুর পাঁচালি” চলচ্চিত্রও এই পথে খানিক হেঁটেছে।

পথটি কী? সোজা ভাষায় – কোনও খেলার ধারাভাষ্যকার যখন নিজেই হয়ে পড়ছেন মাঠে ঘটে চলা খেলার অংশ। কিংবা খেলাটা খোলা মাঠ ছাড়িয়ে উত্তেজনা বাড়িয়ে হঠাৎ এসে ঢুকে পড়ছে কমেন্টারি বক্সের চার দেয়ালের মধ্যে। খেলোয়াড়দল ও ধারাভাষ্যকারমন্ডলী নিজেদের দ্বৈতসত্তার দিকবদল করে করে খেলাটাকে নানান দিক থেকে খেলছেন। রোল রোটেশন হয়ে একজন অন্যজনের ভূমিকায় এসে দাঁড়াচ্ছেন অনবরত আর অনায়াসে। আর এই পক্ষ-পরিবর্তনেই জন্ম নিচ্ছে নাটকীয়তা। দুটি চরিত্র এক সুতোয় বাঁধা পড়ছেন দুই আলাদা সময়ের ব্যবধান নিয়ে। একইসঙ্গে তাঁরা এক প্রেক্ষিতে পরিপূরক, আরেকটি প্রেক্ষিতে পরস্পরবিরোধী। বাঁধাধরা চেনা মুখের ওপর অনেক কোণ থেকে এসে জমছে কাহিনীর আলো, সংলাপের ভিন্নতা, দৃষ্টিভঙ্গীর দূরত্ব – যে প্রক্ষেপণের পার্থক্যে চেনা মুখটাই কখনও বড় অচেনা হয়ে যাচ্ছে, আবার কখনও তাতে মিল খুঁজে পাচ্ছে দুটি আলাদা চরিত্রের চাহিদা তথা পরিস্থিতির পারাপার।
‘পাখি’ এখানে অবশ্যই রূপক। সে এক নারীর নরম মনের তীব্র ও উষ্ণ আকাঙ্ক্ষা। যে নীল আকাশে ডানা মেলার স্বপ্নে বিভোর কিন্তু নিরাপদ নিভৃত খাঁচাটি হারানোর আশঙ্কায় দ্বিধাগ্রস্ত। সে অধিকার জিতে নেওয়ার স্পর্ধাসচেতন অথচ বশ্যতার আবেশে আত্মসমর্পণকারিনী। আর সেই দ্বিধার ড্রামাটিক ডিলেমা নিয়েই সে ঘুরে বেরিয়েছে এক আশ্রমপালিতা নারীর রূপ থেকে কোনও হালফিল নাট্যদলের হট নায়িকা হয়ে ওঠার সিঁড়ি ভাঙায়। সেই নাট্যদলের পরিচালক কখনও তার সিঁড়ির ধাপ, কখনও বা লাইটম্যান তার সিঁড়ির রেলিং। অথচ তার স্বামী সফল নাট্যকার হয়েও এই জীবননাট্যের গতি ও প্রকৃতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ ও বিড়ম্বিত এবং বিরুদ্ধতা বা বিবরণে অক্ষম। ঠিক যেমন নাট্যকার-স্বামীর সৃষ্টি করা সেই আশ্রমকন্যা মেয়েটি তার শিক্ষাগুরু আচার্যকে একপ্রকার বিবাহে বাধ্য করেও একসময় খাঁচার বাঁধনে অতিষ্ঠ হয়ে আশ্রমের কার্যপরিচালকের কাছে ছুটে গিয়ে চেয়েছে সহজ মুক্তির তরুশীর্ষ আর তপোবনের নিভৃত অন্তরাল – সেই ঘটনার অভিঘাত নিজের জীবন ছুঁয়ে অনুভব করেও, আধুনিক নাট্যকার শুধুই যেন অসহায় দার্শনিক।

ভাবনা ও যাপনের যে অন্তরাল থেকে এ নাটক প্রশ্ন তোলে – প্রেমিক কি আসলে ঘাতকই? প্রেমও কি এক নান্দনিক হত্যারই নাম? আ ডিজায়ারড গ্লোরিফায়েড মার্ডার অন দ্য ব্যাটলফিল্ড অব ডিলেমা? প্রথমে অন্যের দাবীকে নস্যাৎ করে হত্যা, তারপর নিজের ইচ্ছাকে অন্যের চাহিদার হাতে হত্যা, তারপর স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সম্পর্কের হত্যা, সন্দেহের চোখে বিশ্বস্ততার হত্যা, ঈর্ষার ইন্ধনে সখ্যের হত্যা, সুখের সন্ধানে শান্তির হত্যা, পরিস্থিতির টালমাটাল বুঝেও মুখ বুঁজে সইতে চেয়ে নিয়ন্ত্রণের হত্যা, পথ হারানোর নেশায় নিরাপত্তা খুঁজে না পেয়ে সম্মানের হত্যা, শেষমেশ আত্মহত্যা!!
পাখির বুকে তিরতিরে উত্তাপ বিছিয়ে যে হত্যামঞ্চে নিয়তির সাদা পাথর নীল বিষে নান্দনিক করে তোলে প্রেম নামক আঘাতের চিরকালীন দ্বন্দ্ব, এই নাটক উড়ন্ত ডানায় সেই ঘাতকের পায়ের আওয়াজ বয়ে চলা জীবনেরই গল্প।

নাটকের মূখ্য ভূমিকায় এই নাটকের নাট্যকার (আক্ষরিকে এবং নাটকের চরিত্রেও) এবং পরিচালক শিবাশিস মুখোপাধ্যায় (প্রখ্যাত কবি শিবাশিস মুখোপাধ্যায়) অসাধারণ অভিনয়ে বাজিমাৎ করেছেন। সঙ্গে তাল মিলিয়ে সঙ্গত করেছেন মাম্পি, সুখেন, কস্তুর, এবং বৃদ্ধাবেশী নিয়তির ভূমিকাচারিনী অভিনেত্রী (ওঁর নাম জানা হয় নি)।

বাড়তি প্রাপ্তি হিসেবে, এ নাটকে, ইতিহাসের আশ্রমপর্ব ও ইদানীংকালের নাট্যনির্মাণ অনুষঙ্গ – দুটি ভিন্নকালীন সমধর্মী পরিস্থিতির মাঝে ঢুকে পড়েছে শিবাদিস’দার নিজের লেখা একটি বিখ্যাত কবিতা (রঙ্গমঞ্চ)। আধুনিক নাট্যকার চরিত্রের সংলাপে সেই আধুনিক কবিতার এহেন মাপসই প্রয়োগ নাটককে অসম্ভব ভালো ও বিস্ময়কর বুস্ট দিয়েছে।
“পাখি ও ঘাতক” শুধু দর্শককে আবেশে বুঁদ করে রাখার নাটক নয়। বিনোদনের বেড়া টপকে এ নাটক জটিল মনের আবছায়াতে আত্মআবিষ্কারের এক সেরেব্রাল সার্চলাইট । এই প্রযোজনা বড় মঞ্চে দেখার অপেক্ষায় রইলুম।

[পরম্পরা ওয়েবজিন, জানুয়ারি ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]
