কমলা

[ভারতীয় মহিলা হিসেবে প্রথম ইংরেজি উপন্যাস রচয়িত্রী]
অনুবাদঃ

৩য় পর্ব
অধ্যায় ৫
এখন রাত। পাহাড় ছাপিয়ে পাহাড় উঠেছে, নীরব মহিমায়, আকাশ ভেদ করে। সর্বত্র চাঁদের রূপোলি আলো পড়েছে। ফলে পরিবেশের সৌন্দর্য এবং একাকিত্ব বর্ধিত হয়েছে। একের পিছনে এক শৃঙ্গের উপর রহস্যময় আলোর ঘোমটা বিছিয়ে আছে। মনে হচ্ছে কতকগুলো তুষারাবৃত শৃঙ্গ। সবকিছুতেই এক বিশেষ মহত্ব বিরাজ করছে। নিকটে, ঘন গাছপালা এক গাম্ভীর্যপূর্ণ গরিমায় ঝিলমিল আলোর আবরণে ছেয়ে আছে। তার সঙ্গে মিলেছে নিচের ভয়ঙ্কর জঙ্গল, পাহাড়ের বনময় দিক। একটু তীক্ষ্ণভাবে তাকালে চোখে পড়বে সবকিছুর মধ্যে লুকিয়ে থাকা গুহা এবং কালো বিকর্ষক নদীগুলি। এখানে সেখানে জ্যোৎস্নার আলো গুল্মের ঝোপ বা খাদের উপর থেকে ঝুঁকে পড়া বড় গাছের গায়ে পড়েছে। কাছেপিঠের পাহাড়-পর্বত থেকে বেরিয়ে আসা জলধারা চাঁদের আলোয় ঝিকমিক করছে—যেন গলিত রূপো নদীর উপর দিয়ে বয়ে গিয়ে নিচের জঙ্গলাকীর্ণ উপত্যকায় হারিয়ে যাবে। এই দৃশ্যের মাঝে দেখা যাচ্ছে এক সমতল জায়গায় কয়েকটি মঠ। এখানে তপস্বীরা বাস করেন, যারা প্রায়ই উপাসনা বা ধ্যানের উদ্দেশ্যে এখানে আসেন। বিশেষ এই রাতে আমাদের চোখে পড়ছে এই সমতল স্থানটির উপর দুইজন মানুষ এক আন্তরিক আলোচনায় মগ্ন। একজন হলেন কমলার বাবা। দীর্ঘ, শীর্ণ দেহ, মাথা এবং হাঁটার ভঙ্গিতে এক অদ্ভূত বঙ্কিম এবং মুখে উদাসীনতার ভাব নির্ভুলভাবে নারায়ণকে চিহ্নিত ক্রছে। তিনি এক সন্ন্যাসী, যিনি নিজের এবং স্বপ্নের জগতে বাস করেন। কীসের কারণে জীবনের অর্ধেক ভাগ তিনি অদ্ভূত পাহাড়ি নির্জনতায় কাটাচ্ছেন? তিনি এমন কী পেয়েছেন যা এক তপস্বীর জীবনের শিক্ষিত মননের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ? তাঁর পূর্বের ইতিহাস কী? কেনই বা তিনি অপর তপস্বীর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন থেকে তাঁর প্রতি প্রদত্ত অর্থ এবং উপহার স্বীকার করেন না? সঙ্গের এই ব্যক্তিটি অপ্রত্যাশিত এক তরুণ ভিন্ন আর কেউ নন যে কমলার বিবাহের আগে নারায়ণের সঙ্গে দেখা করেছিলেন।
নারায়ণ বললেন, “রামচন্দ্র, আমি তোমার এবং নিজের জন্য লজ্জিত। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে গেছে। তুমি প্রতিশ্রুতি দাও যে আর কখনও কমলাকে দেখবে না। আশা করি, গোপনতা তোমার কাছে নিরাপদ। সুখ ধনের উপর নির্ভর করে না। আমি আশা করি কমলা যেমন সুখী আছে তেমন থাকবে। আমার অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি যখন আমি মারা যাব, আমি ততক্ষণ সুখী ছিলাম যতক্ষণ ঈর্ষান্বিত ঈশ্বর এং জীবনের শত্রু যম আমার স্ত্রীকে ছিনিয়ে নেয়নি। হায়! আমি তোমাকে পুত্ররূপে কীরূপ ভালোবাসি। কিন্তু ভাগ্যদেবী বিরূপ। মনে হয় সেই মহান বিপদের সঙ্গে আমি সব হারিয়েছি। কমলা এখন একা, আমি ওকে দেখার সাহস করি না। কারণ তাকে আবার আমার সঙ্গে থাকার ইচ্ছা আমার মধ্যে আছে এবং আমাকে ছাড়া তাকে থাকতে হবে। বিবাহের আগে তোমার সঙ্গে আমার দেখা হওয়াটা অদ্ভূত ছিল। বলো, আমি সর্বরূপে তোমার উপর নির্ভর করতে পারি কি না?”সুস্পষ্ট আবেগের সঙ্গে তরুণ বললেন, “আপনি পারেন। আমি আগামীকাল শিবগঙ্গা ত্যাগ করব। কিন্তু আমি তাদের রেখে যাব যারা আপনার উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখবে এবং পাহাড়ের নির্জনতায় থাকলেও আপনি সংবাদ পেয়ে যাবেন। এতদিন না পাওয়া সুখ আপনি খুঁজে পান। আমি চলি।” তরুণের মুখে বিষণ্ণতা এবং বিশাল হতাশা।
রামপুর শহর, যেখানে কমলার স্বামী গণেশ শিক্ষালাভ করতে গেছে তা শিবগঙ্গা থেকে দূরে নয়। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে। দূর দুরান্ত থেকে ছাত্ররা সেখানে শিক্ষালাভ করতে আসে। শহরের বিভিন্ন অংশে তারা তিন/চার জন করে একসঙ্গে থাকে। সবচেয়ে সস্তা এবং সুবিধাজনক স্থান হলো বাজারের কাছে। রামপুরের মতো এক শহরের এক ঘিঞ্জি এলাকায় যারা বাস করে এমন মানুষদের কাছে পরিচিত দৃশ্য এবং শব্দের কথা আমরা একটু আলোচনা করি। তরকারি এবং ফল বিক্রেতারা বিভিন্ন অংশে মাটিতে পসরা সাজিয়ে বসেছে। রাস্তার একধারে মিষ্টির দোকান। দূরে কামারের দোকানের আওয়াজ এবং পিতলের কলসির ঝনঝন শব্দ শোনা যাচ্ছে। কখনও কাছে থেকে হৈচৈ-এর শব্দও কানে আসছে, কারণ অধিক বোঝাই শকট থেকে হয় একটি বস্তা পড়ে গেছে বা ভিড়ে আটকে পড়ে দুই শকটচালকের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়েছে। মনে হচ্ছে একে অপরকে শিক্ষা দিতে চায়, ‘শক্তিতেই অধিকার।’ লোকজন চিৎকার করছে, “আরে! আরে! একজন আগে আর একজন পরে গেলেই তো হয়।” গাট্টাগোট্টা তৈলাক্ত মুখের দোকানিরা যারা নড়াচড়া করতে পারে না, উদাসীনভাবে সুপারি চিবোতে চিবোতে তাকিয়ে আছে। পাথরে মোড়া রাস্তা অসমতল এবং গাড়ির আওয়াজ কান ঝালাপালা করে দিচ্ছে। এখানে ওখানে ব্রাহ্মণদের দল দাঁড়িয়ে আছে। পায়ে তাদের বৈশিষ্টপূর্ণ লাল জুতো, পরনে ঝুলে পড়া ধুতি, আর তাদের মাথায় পাগড়ি এক ছাতার মতো দেখতে। গায়ে কাপড় অনেকের গলায় জড়ানো। যারা এতটা ধোপদুরস্ত নয় তাদের কোমরে কাপড় জড়ান, কাঁধ থেকে কোমর পর্যন্ত ঝোলা পৈতে।
এই ব্যস্ত এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে কালো দোতলা বাড়ি, যার জানালাগুলি ক্ষুদ্র, এবং মরচেপড়া গরাদে তৈরি। এখানে তিন বাসিন্দা থাকেন—বয়স আঠারো থেকে চব্বিশ। টেবিলের উপর পা তুলে হালকা চেয়ারে বসে আছে দুজন, যাদের মনোযোগ বইয়ের উপর। তৃতীয় জন জানালার কাছে পাতা পুরু ভারি তোসকের উপর মাথার নিচে বালিশ নিয়ে বিশ্রাম করছে। হাতের সংবাদপত্রটি পাশে রেখে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পরে টেবিলের কাছে বসে থাকা দুজনের একজন বই ফেলে উঠে দাঁড়িয়ে বিরক্তির সুরে বলল, “ফালতু বই! আরে গণেশ! তুমি বিশ্রামের আনন্দ উপভোগ করছ। আমারও তোমার মতো করতে ইচ্ছে করছে। পাশ করার সঙ্গে সঙ্গেই তো কালেক্টরের অফিসে চাকরি পেয়ে গেলে এবং কবে ছুটিতে বাড়ি ফিরবে ভাবছ?”
শুনে গণেশ বক্তার দিকে স্মিতমুখে তাকাল। আলস্যের সংঙ্গে আড়মোড়া ভেঙে বলল, “গতকালের নাটকের অভিনয় আমাকে পাগল করেছে। পরীক্ষার পরেও আমি এত ক্লান্ত অনুভব করিনি।”
“হ্যাঁ! আমরা জানি আকর্ষণের লক্ষ্য কী! গণেশ সতর্ক থেকো।”
“কীভাবে ঠিক থাকতে হয় আমি জানি। তোমাদের ভয় পাবার কিছু হয়নি। আমি শুধু দূর থেকে তার বুদ্ধি আর সৌন্দর্যের প্রশংসা করছিলাম। কেমন রসের সাগর এবং আত্মসংযত। সে আলোচনা করছিল আর তিনজনকে প্রভাবিত করেছিল। মনে হয় না আমাকে লক্ষ্য করেছে। আমি অনেকটা দূরে ছিলাম। ঈশ্বরের কৃপায় আমি নিজেকে সরিয়ে নিতে পেরেছি।”
“সে মানুষজন লক্ষ্য করে না? সে চোখের কোণ দিয়ে তাদের দেখে। আর একবার ধরে ফেললে কখনও ছাড়ে না। সে নারী, সে প্রাচীনকালে রাজ্যের উত্থান-পতন নিয়ন্ত্রণ করেছে: সে অন্য নারীর মতো নয়।”
গণেশ বলল, “না, সেখানেই ওর বৈশিষ্ট। সেখানেই আছে পুরুষের উপর তার নিয়ন্ত্রণ। সত্যিই সে বিস্ময়কর। তোমরা জান আমি শুনেছি ওর একদল ভিল আছে যারা ওর দাস হয়ে কাজ করে এবং সে দরাজহস্তে উপহার দেয়? খুবই সন্দেহজনক মনে হয়। কিন্তু এটা প্রতীয়মান হয় যে সে প্রত্যেকটি পুরুষের বিষয় কিছু জানে যা অন্যরা জানে না।”
তৃতীয় তরুণ এবার বই নামিয়ে রেখে আলোচনায় যোগ দিল, “খুবই বিপজ্জনক চরিত্র বটে। সবাই ‘সাই’কে চেনে। আমার ইচ্ছা হয় ওর চরিত্র পরীক্ষা করতে।”
“খুব ভালো কাজ। আগে গণেশের মতো পরীক্ষা পাশ কর। তারপর মানুষের চরিত্র গবেষণা করার কথা ভেব,” অন্যজন বলল, “খুব ভাল কথা, গণেশ তুমি বাড়ি যাচ্ছ?”
“হ্যা! আর সেখানে সেই নারীর দ্বারা প্রভাবিত হবার সম্ভাবনা নেই।”
“দেখা যাবে! দেখা যাবে!” বলে অন্য ছাত্ররা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। খাবারের সময় হয়ে গেছে।
শিক্ষিত পরিবারে গণেশের জন্ম। তার পিতা এবং পিতামহ শাস্ত্রী ছিলেন। পাণ্ডিত্য এবং ধর্মান্ধতার জন্য বিশেষ পরিচিত। কিন্তু এযুগে সংস্কৃত শিক্ষার তেমন কদর নেই। সেই দিন চলে গেছে, যখন বড় বংশের তরুণরা উপবনে এবং মন্দিরে জমায়েত হতো। সেখানে তারা শাস্ত্রী এবং পণ্ডিতদের পদতলে বসে, ভিখারির বেশে, ভিক্ষালব্ধ আহার খেয়ে ঈশ্বরের উপাসনা গীত গাইত। সেই উপবন আর জ্ঞানী এবং ঈশ্বরের আবাস নয়। সংস্কৃত শিক্ষা এখন ঘৃণার চোখে দেখা হয়। ইংরেজি শিক্ষাই এখন সবকিছুকে গ্রাস করেছে। কারণ অর্থোপার্জনের রাস্তা খুলে দিয়েছে এই ভাষা। তাই নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে শিবগঙ্গার বৃদ্ধ শাস্ত্রী একমাত্র পুত্রকে ইংরেজি বিদ্যালয়ে পাঠিয়েছেন। নিজের হৃদয়ে বৃদ্ধ মানুষটি রোজ ইংরেজি শিক্ষাকে ঘৃণা করেন। তিনি মনে করেন এই শিক্ষায় কোন গভীরতা নেই এবং তা হিন্দুধর্মের পরিপন্থী। কিন্তু সময়ের কল বাতাসে নড়ে এবং পুত্রের সাফল্যে তিনি কম সন্তোষ পাননি, যদিও তিনি বিশ্বাস করেন এই শিক্ষা তরুণের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং ব্যবহারের উপর কুপ্রভাব ফেলবে।
শিবগঙ্গায় এখন সন্ধ্যা। রাস্তা অস্বাভাবিকভাবে শান্ত। শুধু মাঝে মাঝে গাড়ির ভারি আওয়াজ এবং বলদ চড়ানো শকটচালকদের গান শোনা যায়। আলো দ্রুত কমে আসছে। সরু রাস্তা এবং ছায়াবৃত স্থান অন্ধকার এবং বিষণ্ণ দেখাচ্ছে। শুধু নদীর উপরের প্রশস্ত জায়গায় আলো আরও কিছুক্ষণ থেকে যায়। বাড়ির পিছনে মেয়েদের দল খেলছে। বেশিরভাগ পুরুষ হয় নদীর ধারে ভ্রমণে, বা বাজারে গেছে। বাজার হলো পরচর্চার উৎস স্থান। কোন না কোন ছুতোয় বাড়ির মেয়েরা যথাসম্ভব সজ্জিত হয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়েছে। কেউ কাপড় ধুতে, কেউ জল আনতে বা কেউ দেবতার মন্দিরে পুজো দিতে। কমলা বাড়িতে একা বসে আছে। পাহারায় আছে মাঠ থেকে ফিরে আসা গোপালক। তার মন বিষণ্ণ। সম্প্রতি তার নিয়মানুবর্তিতা কঠোরতর করা হয়েছে। সে অনুভব করছে তার জন্য কোন ভালোবাসা এই পৃথিবীতে নেই। কেউ তার কথা ভাবে না। বাবাও তার সঙ্গে দেখা করতে আসেননি। সে একাকী বসে অবাক হয়ে ভাবছে এইভাবে কতদিন কাটাতে হবে। রমাবাঈয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার সে অনেক চেষ্টা করেছে। তিনিই বাড়ির সর্বময় কর্ত্রী। কিন্তু, লাভ হয়নি। যে মহিলারা মনোবল, ঔজ্জ্বল্য এবং সুখে ভরপুর ছিল তাদের কাছে কমলার জন্য দয়া বা করুণার ভাব ছিল না। কিন্তু কমলা ননদের মন জয় করার কম চেষ্টা করেনি। রান্না করতে করতে বা পিঠে বানাতে বানাতে রমাবাঈ কিছু চাইলে সে দ্রুত তা নিয়ে আসত। রমাবাঈ এই কাজে খুব কুশলী ছিলেন। কিন্তু,এত সব চেষ্টা তার বিফলে গেছে। যদি সে প্রশ্ন করত—“এটা আমি করব?” “আমি কি গুড়ো করে বা বেলে দেব?” তাহলে অনিচ্ছাকৃত স্বরে সম্মতি এলেও, সে গুড়ো করতে করতে বা বেলতে বেলতে রমাবাঈয়ের মুখে হাসির রেখা দেখার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকত। কিন্তু সব চেষ্টাই বিফলে যেত। আজকের এই বিশেষ সন্ধ্যায় সে বাড়ির পিছন দিকের নদীর দিকে তাকিয়েছিল। নদীর উপর ঝুঁকে পড়া কয়েকটি গাছের কাছে বসে ছিল। চিন্তার প্রবাহে সে রাশ টানার সঙ্গে সঙ্গে বিষণ্ণতা ধীরে ধীরে চলে গেল। তখন কল্পনায় তার চোখে তার পাহাড়ি বাড়ি, ইয়েশি এবং তার বন্ধুরা। কোনভাবে মাঠঘাট, পাথর আর ফলের ভাবনা তার মনে শান্তভাব এবং প্রশান্তি নিয়ে আসে। তার হৃদয় নীরব আনন্দে ভরে ওঠে। সে এমন সুখী বিষয়ের কথা ভাবতে থাকে, যা হয়ত এখনও সম্ভব। “রমাবাঈয়ের মন শীঘ্রই জয় করতে পারব। যখন তিনি বুঝবেন আমি তাঁকে কীভাবে আকাঙ্খা করি তখন তিনি আমাকে ভালোবাসবেন। গুঙ্গিও আমার বন্ধু হবে। আর তখন কত সুখ হবে,” কমলা এই রকম ভাবতে থাকে। কল্পনায় সে ভাবে সেও সুন্দর পোশাক পরে বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে তীর্থযাত্রা বা উৎসবে গেছে। বাবাও সঙ্গে আছেন। সবার ভালোবাসা সে পাচ্ছে। সে স্বামীর কথাও ভাবছে। কিন্তু, তার ধাঁধা লাগছে তাঁকে বন্ধু হিসেবে পাবে কি না। এইভাবে ভাবতে ভাবতে অনেক সময় কেটে গেছে। তখন সে কিছু শব্দ শুনে ভাবল, বাড়ির লোকেরা ফিরেছে। ভিতরে যাবার জন্য প্রস্তুত হতেই এমন কিছু শব্দ তার কানে এল যাতে তার শরীরে বিদ্যুতের মতো চমক বয়ে গেল। সে স্তব্ধ হয়ে গেল, কল্পনার রাজ্য মিলিয়ে গেল। স্বামীর প্রশ্নের উত্তরে তিনি বিরক্তির সঙ্গে বলছেন, “কে জানে ওর মা কে? কপর্দকহীন একটি মেয়ে কীভাবে এই সংসারে এল? বেচারা বাবা কীভাবে প্রভাবিত হলেন? এখন সুবর্ণ সুযোগ এসেছে। কী সুন্দর সম্বন্ধ হবে আর গুঙ্গি কেমন ভালো এক পরিবারে যাবে। ওর থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব বলে মনে হয় না।”
অর্থ পরিষ্কার। কমলাকে নিয়েই আলোচনা চলছে। পিছিয়ে এসে সে ভাবল পালিয়ে যাবে। কিন্তু কোথায় যাবে সে? কেন তার জন্ম হলো? যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে অসচেতনভাবে সে শ্বশুরমশাইয়ের কাছে গেল। তিনিই তো বিবাহের বন্দোবস্ত করেছেন। তাই সে তাঁর সঙ্গে কথা বলবে। চৌকোণা প্রাঙ্গণের ধারের ঘরটিতে সে প্রবেশ করল, যে ঘরে শ্বশুরমশাই সাধারণত থাকেন। উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে সে তাঁর পায়ে পড়ল। “কেন আপনি আপনার পুত্রের সঙ্গে আমার বিয়ে দিয়েছেন? আপনি কী অর্থ চেয়েছিলেন? আপনি কি জানতেন না আমি ভিখিরি? এখন সমস্ত বিপদের মধ্যে আমি পড়েছি। কেউ আমাকে ভালোবাসবে না। আমাকে বাবার কাছে ফিরে যেতে দিন।” এক উৎকণ্ঠার সঙ্গে এই কথাগুলি উচ্চারিত হয়েছিল।
“চুপ করো বাছা। কেন তুমি খুব উত্তেজিত হয়ে আছ?” বিস্ময়ের সঙ্গে বৃদ্ধ মানুষটি বললেন। তিনি নিচু হয়ে কমলাকে উঠিয়ে বললেন, “এভাবে কেঁদো না। কে বলেছে তুমি গরীব এবং কপর্দকহীন ছিলে? আমাদের সেটা দেখতে হবে। তুমি যাও, নিজের কাজ করো।” কমলা এমন শিশুসুলভ ভঙ্গিতে বৃদ্ধ মানুষটির কাছে ছুটে গিয়েছিল এবং কাঁদছিল যে তিনি ভুলে গিয়েছিলেন যে সে এক বয়ঃপ্রাপ্ত মেয়ে। তিনি তার মুখ স্পর্শ করেছিলেন এবং বলেছিলেন এইসব ছাইপাশ চিন্তা তার মনে আনা উচিত নয়। শাস্ত্রীর এক মেয়ের কাছ থেকে তিনি এটা আশা করেন না। তার উচিত শাশুড়ির মনরক্ষা করে কাজ করে যাওয়া।
কমলা ভাবল, “হায়! তিনি জানেন না এবং বুঝতে পারেন না কী অবস্থায় আমি আছি। বাবাও হয়তো একই কথা বলতেন। সে ভিতরে নিজের ঘরে গেল এবং বাঁধভাঙা নদীর মতো হৃদয়ের ব্যথা উজাড় করে দিল। অন্যকে বিরক্ত করতেই তার জন্ম। সে এক দরিদ্র মানুষের কন্যা এবং তারা তার থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিল। সেই কারণেই তাকে ঘৃণিত হতে হচ্ছে। আর এখন তার স্বামীও তাকে ঘৃণা করবে। সে মনে করতে চেষ্টা করল কখনও তার বাবা অর্থের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন কি না। তাঁর কি অর্থ আছে? আর সে যদি চায় তাহলে কি তিনি তা দেবেন? কিন্তু কীভাবে সে বাবার সঙ্গে দেখা করবে? আর তার মায়ের কথাও সে কীভাবে জানবে? কেউ কি তাকে জানে না? সবকিছুই হতাশাজনক বলে মনে হল। সন্ধ্যার আলোর সঙ্গে সঙ্গে তার সুখও মিলিয়ে গেল। তার আত্মা জুড়ে শুধুই অন্ধকার। এইভাবে যখন সে ভাবছে, কেউ একজন তার ঘরে প্রবেশ করল। জানালার আলো সেই তরুণের মুখে এবং শরীরের উপর পড়ল। সে বলল: “মা! মা!” কমলা মুখ ঘুরিয়ে ভালোভাবে তাঁকে দেখল। তিনি কি তার স্বামী, যার আসার কথা ছিল। তিনি কি ফিরেছেন? এখন তিনিও তাকে ঘৃণা করবেন, এই ভাবনা তাকে সচকিত করল। বেদনাপূর্ণ অস্পষ্ট স্বরে সে বলল: “মা এখানে নেই।”
“অন্ধকারে কোণে কে? উঠে এস।”
লজ্জাভরে কমলা উঠে এল এবং বলল: “আমি।” জানালার আলো সম্পূর্ণভাবে তার উপরে পড়ল। তরুণের চোখে এক সৌন্দর্যের দৃশ্য ভেসে এল। দু’বছর হয়ে গেছে গণেশ তাঁর স্ত্রীকে ছেড়ে গেছেন। এবং তিনি এক দীর্ঘাঙ্গী, তন্বী, সুন্দরী মেয়েকে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলেন। দীর্ঘ কালো চোখের পাতা ভিজিয়ে অশ্রুধারা সাদা সুডৌল গালের উপর নেমে আসছে। তাঁর পেলব সুন্দর মখে যেন জ্যোৎস্নার আলো পড়েছে। তিনি বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কমলা?” বিস্ময়ে কমলাও তাকাল এবং তার দৃষ্টি তরুণের দেহ ভেদ করে গেল। এক শিশুসুলভ অসহায় নির্মল এবং বিশ্বস্ত মুখ ফুটে উঠল। তিনি স্বাভাবিকভাবেই ফিরে গেলেন। কিন্তু হৃদয়ে এমক এক আকাঙ্খা বিঁধে রইল যে এই বিস্মিত মেয়েকে সাহারা দিতে হবে।
অধ্যায় ৬
স্বামীর প্রত্যাবর্তনের পরে কমলার ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হলো না। বরং দৈনন্দিন কাজের চাপ আরও বেড়ে গেল এবং সে পরিবারের এক মূক দর্শক হয়ে রইল। খুব সকালেই শুরু হতো তার দিনের কাজ। কমলা শাশুড়ির ঘরে ঘুমোত। ঘিঞ্জি ঘরে আলো প্রবেশের রাস্তা দেয়ালের উপর দিকের একটি মাত্র জানালা। দেয়াল কুলুঙ্গিতে পূর্ণ। একটি কুলুঙ্গিতে রাখা থাকত তার সাধারণ প্রসাধন সামগ্রী—একটি কুমকুম বাক্স, ঝিনুকের চিরুনি এবং একটি হাত আয়না। আর একটিতে থাকত জুঁইয়ের মালা, একটি সুপারির বাক্স এবং একটি ট্রে। ঘরের দেয়ালে আড়াআড়ি করে খাটান একটি রডের উপর থাকত তার কাপড়চোপড়। আর আসবাব বলতে দুইটি কাঠের বাক্স। ঘরের অন্ধকার এক কোণে থাকত কমলার নিজের কাপড়ের পুটুলি এবং পাশে থাকত গোটান তোসক। ভোরের অনেক আগে বাড়িতে হৈচৈ শুরু হয়ে যেত এবং নিকটে ঘুমিয়ে থাকা মেয়েটিকে শাশুড়ি ডেকে তুলতেন। উঠেই সে চৌকোণা প্রাঙ্গণ পেরিয়ে ঘরের পিছনের দিকে চলে যেত। কারণ তার কর্তব্যে ছিল বাড়ির সবার স্নানের জল পাত্রে ভরে রাখা। তারপরের কাজ রান্নাঘরের মেঝে গোবরজলে লেপা এবং সেই মেঝেতে খড়িমাটি দিয়ে ফুলের নানান রকম নক্সা আঁকা—হিন্দুঘরের মেয়েরা এতে দক্ষ ছিল। তারপর পথ বিক্রেতাদের কাছ থেকে সবজি এবং অন্যান্য সামগ্রী কেনা এবং তারপরে রান্নাঘরের কাজ শুরু হতো। রান্নার কাজ তাকেই করতে হতো। স্নানের বন্দোবস্ত করে দেওয়াও ছিল তার কাজ—সেখানে সাবান ও অন্যান্য সামগ্রী প্রস্তুত ঠিক মতো না থাকলে এক প্রস্থ গালমন্দ তাকে শুনতে হতো। খাবার পরিবেশন করতেন রমাবাঈ, আর দরজার পিছন থেকে দেখত কমলা। বিকেলে বাড়ির বড়রা সাধারণত বিশ্রাম নিতেন, যখন মেয়েরা তাদের স্নানাদি সেরে নিত। চুল আঁচড়িয়ে বিনুনির ফুল লাগাত, কপালে পরত কুমকুম। কাজের কঠিন অংশ ছিল কমলার। সবকিছু ঠিকঠাক করার পরেও শাশুড়ি এসে বলতেন কাজ করতে করতে গুঙ্গির পিঠে ব্যথা হয়ে গেছে। তাই নিজের কাজ ফেলে কমলা যেন তাকে সাহায্য করতে যায়। তারপর রমাবাঈয়ের কাছ থেকে অভিযোগ আসত পাতে দেওয়া সব খাবার কমলা খায়নি। “সে সবাইকে দেখাতে চায় যে তাকে ভুখা রাখা হচ্ছে। আর আমরা ওর উপর নির্মম ব্যবহার করছি। এমন এক শহীদের অভিনয় সে করছে, মনে হয় চোখদুটো খুবলে নিই।” আর তার মা কমলাকে মুখ ঝামটা দিয়ে বঙ্কিম দৃষ্টিতে বলবেন, “হ্যাঁ, মুখপুড়ি আরও খারাপ কী করবে কে জানে?” এইভাবে এক দীর্ঘ ভুল বোঝাবুঝির চাপে পড়ত কমলা। বেচারা কমলা জানত না কীকরে এই ঘোটলা থেকে নিজেকে বাঁচাবে বা কী উত্তর দেবে। ননদের মিথ্যাকথনে মূক হয়ে থাকা ছাড়া কিছু করার ছিল না।
যাহোক কমলা নিজের মন্দ ভাগ্যের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়েছিল। আর এই কাজে তাকে সাহায্য করেছিল গভীর ধর্মীয় প্রত্যয়। সে পুরাণ-কথকদের পায়ের কাছে বসে সীতা, রাম এবং পাণ্ডবদের বীরোচিত কাহিনি শুনত। সে অনেক দানবের কাহিনিও শুনেছে যাদের মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করার শক্তি ছিল। সংস্কৃত শ্লোকের স্বপ্নিল সুর শুনে সে ঘুমিয়ে পড়ত। জ্যোৎস্নালোকিত রাতে বৃদ্ধাদের মুখে গল্পকথা শোনার সময় সে অর্ধনিদ্রিত অবস্থায়ও গল্পকারদের আরও গল্প শোনাতে বায়না করত। সেই গল্পগুলোর বেশিরভাগ ছিল নীতিকথা। নদী, পাহাড় এবং গাছ মানুষের মতো চরিত্রে অভিনয় করত। পাখি এবং জন্তুরা কথা বলতে পারত। এইসব নীতিগল্প থেকে কমলা একটাই নির্যাস পেয়েছে—যে কোন মূল্যে অন্যকে ভালোবাসা, অন্যের হিতে কাজ করে যাওয়া। গল্প এবং কিংবদন্তিগুলি যতই লঘুমানের হোক না কেন, গল্পের মধ্য দিয়েই শেখান হতো ভালো কাজের কীভাবে পুরস্কার পাওয়া যায় আর মন্দ কাজ পরজন্মেও শাস্তি ডেকে আনে। সে এও জানতে পারত—নমনীয় স্বভাবের পুরস্কার কী এবং ভালোবাসা, সততা, মর্যাদা এবং বড়দের সম্মান করাকে এক মহৎ জীবনের বৈশিষ্ট্যমূলক গুণ বলে বিবেচনা করা হয়। এই ছিল কমলার নৈতিক বোধের অন্তর্নির্যাস আর এই বোধ তাকে সৎপথে চলার শক্তি জোগাত। এর সঙ্গে আর এক ধরনের শিক্ষাকে তাকে মেনে নিতে হয়—তা ছিল সে ভালো বা মন্দ হোক, তা আনন্দ বা দুঃখের মধ্যে থাক, সে ভেঙ্গে পড়বে না, বরং তাকে নীরবে গ্রহণ করবে, কারণ এটাই তার ভাগ্য। কিন্তু, এইভাবে চিন্তা করে সে সামান্যই সান্ত্বনা পেত। উদ্দেশ্য আর ইচ্ছার সাধনে সে আরও দুর্বল হয়ে পড়ত। জীবনের প্রতি সামান্য আগ্রহ সে হারিয়ে ফেলেছিল। কারণ বাস্তব জীবনে আত্মিক গুরুত্ব খুব কমই ছিল। ভাগ্যে তার যা লেখা ছিল তা এড়ান তার পক্ষে দুঃসাধ্য ছিল। সে সীতা, সাবিত্রী বা অন্যান্য মহীয়সী নারীদের মতো হতে চাইত, যদিও সে জানত এক মহীয়সীরাও ভাগ্যের কাছে হার স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। এই ভাবেই কমলা ননদদের গালমন্দ বা কটু কথা নীরবে মেনে নিত। এর মধ্যেই সে বিস্ময়ে ভাবত কীভাবে নীল আকাশ, স্বর্ণালি সূর্যাস্ত বা ভরা নদী দেখে সুখী হবে। বিস্ময়ে আর কেনই সে মহান বন্যতার মাঝে নিজেকে হারিয়ে দিতে চাইবে, যেখানে সে নীরবে স্বপ্নের জগতে বিচরণ করতে পারে এবং পৃথিবী ও আকাশের গরিমা এবং মহিমা হৃদয়ের সমস্ত কোষ দিয়ে আনন্দে শুষে নিতে পারে।
কমলা শুধু তার নিজের বিষয়েই আবদ্ধ হয়ে থাকত না। মেয়েবন্ধুদের জীবনকাহিনি তার কাছে আগ্রহ এবং সমবেদনার বস্তু ছিল। সমবয়সি মেয়েবন্ধুদের জীবন নির্যাতন এবং অবিচারের কথা সে শুনত। নিজের চোখে দেখা কিছু অভিজ্ঞতা তাকে মর্মাহত করত আর সে আরও গভীরভাবে ভাবতে থাকত। বিপরীত দিকের বাড়ির ভাগীরথী তার স্বামীর হাতে খুবই নির্যাতিত হত। স্বামী ভাবত বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে তার আদেশ অমান্য করত। ভাগীরথী পড়াশুনা করেছিল এবং খুবই তেজস্বী ছিল। ধনী কিন্তু অশিক্ষিত স্বামী তাকে কোন গুরুত্ব দিত না। যত রকম উপায়ে সম্ভব সে ভাগীরথীকে অপমান করত, তার শিক্ষা নিয়ে উপহাস করত এবং তার মনোবল ভেঙে দিতে চেয়ে মজা অনুভব করত। বহুদিন, বহুরাত সে মানসিক যন্ত্রণায় কাটাত। একদিন তাকে সকলের সামনে অপমান করে সে বাড়িতে উপপত্নী নিয়ে এল। তখন ভাগীরথী স্বামীর দেওয়া গয়না খুলে ফেলে দিল, হাতের চুড়ি ভেঙে ফেলল, যা আজীবন হাত থেকে খোলার নিয়ম ছিল না। কিন্তু, বেচারা মেয়েটি! মায়ের বাড়িতে সে একদিনের জন্য স্থান পেল না, পাছে স্বামী তাকে চিরজীবনের মতো পরিত্যাগ করে। অপমানিত মেয়েকে ক্রুদ্ধ মা স্বামীগৃহে ফিরিয়ে আনলেন, যদিও তিনি সমঝোতার চেষ্টা করেছিলেন। ভাগীরথীকে যখন স্বামীগৃহে ফিরিয়ে আনা হল তখন কমলা কুয়ো থেকে ফিরছিল। মায়ের সঙ্গে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় ভাগীরথী রাগে ফুসছিল। কিন্তু কেউ তাদের খেয়ালে আনেনি। এক সময় মা ভীষণ চিৎকার শুরু করলেন এবং ভাগীরথীকে গালমন্দ দিতে থাকলেন। পিঠে ঠেলা দিয়ে তিনি বললেন, “ওখানে! গিয়ে দেখ তুমি কী করেছ। যাও ভিতরে যাও।”
“আমি যাব না মা! তুমি নিজের হাতে আমাকে মেরে ফেলতে পার। কিন্তু আমি এই জীবন্ত কবরে প্রবেশ করব না,” এক শান্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ভাগীরথী বলল। আশেপাশের বাড়ি থেকে কয়েকজন মহিলা জড়ো হলেন, কিন্তু কেউই ভাগীরথীকে সমবেদনা দেখালেন না। একজন ঠাট্টা করে বললেন, “কি! এত মেজাজ দেখিয়ে চলে গিয়ে আবার ফিরে এসেছ?” আর একজনের কথা, “এই মেয়ে, তোমার লজ্জা পাওয়া উচিত। তুমি জানো না একজন পুরুষের সঙ্গে জীবন বন্ধনে আবদ্ধ হলে তা থেকে আর বিযুক্ত হওয়া যায় না, সেই পুরুষ গর্দভ হলেও?” দড়ি তোমার গলা ঘিরে রেখেছে, কাঠের হতে পারে আবার সোনারও হতে পারে, একই কথা! তৃতীয়জন বিজয়ীর মতো বলল, “কী অধঃপতন, কত গয়না সে তোমাকে দিয়েছিল! তুমি কি তাতেও সন্তুষ্ট থাকতে পারলে না? যাও ভিতরে গিয়ে তার পায়ে পড়।”
ভাগীরথী উত্তর দিল না, বরং ভাব দেখাল এসব কোন কথাই তার কানে যায়নি। প্রথমে সে অবজ্ঞাপূর্ণ চোখে তাকাল। কিন্তু পরে সে সিঁড়ির উপর মাথা নিচু করে বসে রইল। কী বেদনা তার শরীরে বয়ে যাচ্ছে কেউ জানতে পারল না। দূর থেকে তার দিকে তাকিয়ে কমলা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। সে লোকের দিক থেকে ভয় পাচ্ছিল। কিন্তু যখন সে নিষ্ঠুর বিদ্রুপ শুনতে পেল তখন সে হাতে জলের কলসি নিয়ে বন্ধুর কাছে ছুটে গেল। ঠিক তখনই দরজা খুলে গেল এবং ভাগীরথীর স্বামী গুরুত্বহীন ভাবে জিজ্ঞেস করল হল্লা কিসের এবং বলল, “কোপনস্বভাবা কি ফিরে এসেছে?” দ্রুত ভাগীরথী উঠে দাঁড়াল। তার শ্বাস দ্রুত ওঠানামা করছিল। কিন্তু সে কান্না চেপে রেখে মাথা ঢেকে ঘরে প্রবেশ করল। মুখ তার সংকল্পময়, চোখে বিধ্বংসী দৃষ্টি। বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে সে মায়ের দিকে ফিরে তাকাল। মার চোখে ক্ষমাপ্রার্থীর দৃষ্টি। তখন ভাগীরথী বলল, “মা কথা বলো না। নিজেকে আর ছোট করো না। তুমি আমাকে ফিরিয়ে এনেছ। জীবিত অবস্থায় আমি আর এই বাড়ি থেকে বেরোব না। বাড়ি যাও।”
ঢোক গিলে স্বামী বলল, “কে ওকে ফিরিয়ে নেবে? সে গলা উচিয়ে কথা বলে! মৃত্যুর পর যে চুড়ি খোলা উচিত তাও সে ভেঙে ফেলেছে। সে তার গলার পবিত্র সূত্রও ছিঁড়ে ফেলুক।”
ভগ্নহৃদয়ে এক কর্কশ এবং হৃদয়হীন পুরুষের বিরুদ্ধে গভীর বিদ্বেষ মনে নিয়ে কমলা চলে গেল। প্রথম বারের মতো অনুভব করল এক স্বামী তার স্ত্রীকে কতটা নির্যাতন করতে পারে, যদি সে মনে করে। তথাপি সে বুঝতে পারে না একজন স্ত্রী স্বামীর কাছে ভালোবাসা চেয়ে শুধু ঘৃণা পেলে কী বেদনা পেতে পারে! সে জানে না মানুষের শুভ বুদ্ধি কীকরে দৃষ্টিতে তিক্ততা এবং বিরক্তিতে ঘৃণায় এবং অপমানে পরিণত হয়।
কাছাকাছি থাকত, সুন্দর চেহারার হারনি। ওরা বেশ ধনী ছিল এবং ওর স্বামী খুব ভালো মানুষ। কিন্তু, কুপ্রকৃতির শাশুড়ি লজ্জাজনকভাবে এই ছোট্ট মেয়েটিকে নির্যাতন করতেন। বিলাসিতার মধ্যে বেড়ে উঠলেও হারনি কঠোর পরিশ্রমের কাজ থেকে পেছিয়ে আসত না। কিন্তু কিছুতেই সে শাশুড়িকে সন্তুষ্ট করতে পারত না। সে যতই নমনীয় হয় ততই শাশুড়ি তাকে ঘৃণা করে। তার স্বামী তাদের মধ্যে শান্তি এবং সুসম্পর্ক বজায় রাখার সকল প্রকার চেষ্টা করতেন। কিন্তু যতই তিনি চেষ্টা করতেন ততই বৃদ্ধা মহিলা উত্তেজিত হয়ে পড়তেন, তিনি বলতে চাইতেন ছেলের এই প্রয়াসের পিছনে কু-অভিসন্ধি আছে।
“সে আমার কথা ভাবে না। সে স্ত্রীকে ভালোবাসে এবং চায় কালকের যুগি আমার উপর লাঠি ঘোরায়। এক বা দুবছরের মধ্যে সে আমাকে পথে বসাবে এবং বাড়ির একচ্ছত্র অধিকার ভোগ করবে। আমার আশ্রয় হবে রাস্তায়, যে আমি সেই ছেলেকে হাতেপিঠে বড় করেছি।”
এইসব মন্তব্য হারনি দৈনিক এবং প্রতি ঘন্টায় শুনতে পেত। সকালে যখন সে ব্যস্ত থাকত তখন শাশুড়ি কর্কশ স্বরে জানতে চাইতেন- “আজ তুমি তলায় তলায় কী কাজ করছ? তোমার শাশুড়ির সম্বন্ধে আর কী মিথ্যে বলছ? স্বামীর সঙ্গে গোপনে কী পরামর্শ করছ? যে ছেলে আমাকে এত ভালোবাসত সে আর আমাকে ভালোবাসে না। তুমি ওর চোখে বালি ঢুকিয়ে দিয়েছ; তুমি ওকে যাদু দিয়ে বশ করে ফেলেছ, যাতে তার হৃদয়ে আমার বিরুদ্ধে বিদ্বেষ জন্মে।” তখন হারনির শান্ত হাবভাবে বিরক্ত হয়ে চিৎকার করে বলে উঠতেন—“আচ্ছা! তোমাকে হেনস্তা হতে একদিন আমি দেখবই এবং খুব শিগগিরই তা হবে।” চূড়ান্ত উত্তেজিত হয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়তেন এবং বলতেন: “ঈশ্বর তার উপর অন্যায় ব্যবহারের জন্য প্রতিশোধ নেবেন।” মায়ের এই চিৎকার শুনে ভীরু পুত্র বাড়ি থেকে চুপচাপ বেরিয়ে নিজের কাজে চলে যেত। বেচারা মেয়েটি চোখের জল মুছত এবং উদাসীনভাবে স্বামীকে কাজে চলে যেতে দেখে খাবার খেত না এবং এইভাবে বৃদ্ধাকে আরও প্ররোচিত করত। গজগজানি যখন সহ্যের বাইরে চলে যেত, জল আনার ছুতো করে সে পিতলের পাত্র নিয়ে কুয়োয় চলে যেত। নিশ্চিতভাবে সেখানে সে বন্ধুদের কাছে কিছু সান্ত্বনা পেত। তারা পরামর্শ দেবার জন্য তাকে ঘিরে ধরত এবং তাকে উৎসাহিত করত।
কিন্তু এই সুখ ছিল সাময়িক। বাড়ি ফিরেই সে মুখোমুখি হত বৃদ্ধা মহিলার সৃষ্ট এক অন্ধকার এবং নিরাপত্তাহীন পরিবেশের।
কিন্তু অন্য দুটি মেয়ে কাশী এবং রুখমা তাদের পরিবারে অত্যন্ত সুখে বাস করত। বন্ধুদের সঙ্গে তারা সর্বদা সর্বত্র খুশিতে সময় কাটাত। কাশীর প্রিয় মায়ের উচ্চ কর্তব্যবোধ ছিল এবং তিনি প্রজ্ঞাবান এবং ভালো মানুষ ছিলেন। তিনি দুমুখো নীতি ঘৃণা করতেন। সহজে বশ করা যায় এমন দুর্বল মানুষদের প্রতি তার সামান্য সমবেদনা ছিল না। কমলার শাশুড়ির নিজের পরিবার পরিচালনা করার জ্ঞান ছিল না বলে তিনি কমলার প্রতি করুণা বোধ করতেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন কমলার পরিণতি কী হবে, কীভাবে সুন্দরী নতুন বধূর প্রতি প্রাথমিক ভালোবাসা এবং প্রশংসা, ঔদাসীন্য এবং শীতলতায় পরিণত হবে। অন্যদের প্ররোচনায় একদিন সৃষ্টি হবে ঘৃণা। শুরু থেকে তিনি কমলাকে ভালোবাসতেন। কমলার বিশ্বস্ত এবং নির্দোষ আত্মা বৃদ্ধা মহিলার মন জয় করে নিয়েছিল। তিনি অনুতাপ করতেন যে নিজের কোন পুত্র না থাকায় তিনি কমলাকে নিজে ঘরের বধূ হিসেবে আনতে পারেননি। কাশীর স্বামী নির্বাচনে তিনি প্রজ্ঞা এবং বিচক্ষণতা দেখিয়েছিলেন। দুই পরিবারের মধ্যে এমন সমঝোতা হয়েছিল যে কোন ভুল বোঝাবুঝি ঘটেনি। স্বামীর ভালোবাসায় কাশী খুব সুখী এবং তার শাশুড়ি নিজের মেয়ের মতো তাকে ভালোবাসতেন। দুই পরিবার কাছাকাছি থাকত এবং দুই শাশুড়ি দুই বোনের মতো মেলামেশা করতেন।
শাস্ত্রীর কন্যা রুখমা স্বামীর পরিবারে খুব সুখী ছিল, যদিও সে কাশীর মতো ধনী এবং সুপরিচিত ছিল না। দুই মেয়ের প্রভাবে তাদের মায়েরা কম ভাগ্যশালী বন্ধুদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থা করতেন এবং ভোজ উৎসব বা অনুষ্ঠানের ছুতোয় তাদের বাড়িতে নিয়ে যেতেন। এইভাবে মেয়েদের অন্ধকার এবং নিরানন্দ জীবনে আলো এবং সুখ আসত।
সাধারণভাবে, হিন্দু পরিবারে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক খুব বাধাগ্রস্ত ছিল। ইউরোপের দেশের মতো দুজনে সমান কথা এবং কাজের স্বাধীনতা ভোগ করত না। এই ব্যতিক্রমী পরিবেশের মূলে ছিল যৌথ পরিবার। নিজের বাড়িতে স্বামীর সঙ্গে একসঙ্গে বাস করতে না পারার কারণে সে পরিবারের সবার সামনে স্বামীর সঙ্গে আলাপ করতে পারত না। দুই অপরিচিতের মতো পারস্পরিক ব্যবহার ছিল। স্বামীর সামনে ঘোমটা দিতে হত বা ঘরে স্বামী প্রবেশ করলে তাকে বেরিয়ে যেতে হতো, নতুবা ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। স্বামী কিছু বললে না শোনার ভান করতে বা মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে ক্ষীণ স্বরে উত্তর দিতে হত। শাশুড়ির ঈর্ষার কারণে দুই তরুণ- তরুণীর কথা বা কাজের স্বাধীনতা লোপ পেয়ে যেত। স্বামীর সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা কমলার ছিল না বা সে কখনও স্বামীর দিক থেকে কোন কথা শোনেনি। বিয়ের অনুষ্ঠান চলাকালীন বর-কনের উপর সকলের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল। কখনও বর ও কনে নিজেদের দিকে তাকালে, তা ছিল উপহাসের বিষয়। তারপরে দীর্ঘ সময় কমলা স্বামীকে দেখেনি। আর এখন সে তার উপস্থিতিতে চোখ তোলার সাহস করে না। এর কারণ নিছক লজ্জা নয় বরং এক অনুভূতি যার ফলস্বরূপ সে ঘৃণা এবং মন্দ ব্যবহারের পাত্র। এর কারণে সে স্বামীকে যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলত। অবশ্য স্বামীকে দেখার সুযোগ তার ঘটত। তিনি মাকে খুব ভালোবাসতেন এবং মায়েরও খুব প্রিয়পাত্র ছিলেন। ঘরে তিনি থাকলে কোন কারণে সেখানে প্রবেশ করলে তিনি তার দিকে অকপটে তাকাতেন। তখন লজ্জায় তার মুখ লাল হয়ে যেত। কোন অনুভূতির প্রকাশ না ঘটিয়ে সে নিজেকে বলত:–“ আমার প্রতি আগ্রহ দেখাবেন না। যখন তিনি জানবেন যে আমি নিচ এবং দরিদ্র এবং গ্রাহ্য করার মতো কোন আত্মা আমার এই পৃথিবীতে নেই তখন তিনি আমাকে ঘৃণা করবেন।” কিন্তু যতই সে নিজেকে গুটিয়ে নিত ততই তার প্রতি স্বামী আগ্রহ গভীর হতো। তিনি বিস্মিত হতেন যখন তার বয়সের মেয়েরা ফুল এবং গয়নার জন্য হাপিত্যেশ করত এবং প্রশংসা পচ্ছন্দ করত তখন কেন সে সম্পূর্ণভাবে উদাসীন থাকে। তিনি মাঝে মাঝে ইঙ্গিত দিতেন যে এক সন্ন্যাসীর মেয়ে হবার ফলে সে সভ্য জীবনের সমস্ত অনুভূতি হারিয়েছে এবং তাই অন্যদের চেয়ে তার আচরণ আলাদা। এসব কী সত্যি? সত্যিই কি তার কোন অনুভূতি নেই? অন্যদের থেকে কমলা ভিন্ন এই চিন্তা তাঁকে হতাশ করত। কিন্তু তাকে মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ করে তিনি দেখেছেন যে চেহারার জড়তা এবং দৃষ্টির ঔদাসীন্য সাধারণের মতো নয়। বরং তাঁর বোনেদের হাতে দীর্ঘদিন মন্দ ব্যবহার পেয়ে সে এইরকম হয়েছে। তিনি জানতেন বোনেদের কথায় মা খুব সহজে প্রভাবিত হতেন। ইতিমধ্যে তিনি কমলার সম্পর্কে তাঁকে মন্তব্যও শুনিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন কমলা অকৃতজ্ঞ এবং একগুঁয়ে। সে ননদদের প্রতি সম্মান দেখায় না, যদিও ননদরা কমলার প্রতি দয়াশীল। তিনি বলেন, “তারা অন্য ননদদের মতো নয়। তারা কমলাকে কাজ শেখায়, যা তাকে পরবর্তী জীবনে সাহায্য করবে। কিন্তু, তার মনে তাদের জন্য ভালোবাসা নেই এবং অপরিচিতের মতো সে আচরণ করে।”

