পর পর দুটি পরিবারের একটানা বিড়ম্বনার কথা শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলাম। প্রথমটিতে স্বামীর সমস্যা। নানান উদ্বেগে ভোগে ছেলেটি, বর্তমানে অবশ্য একটু ভালো। ছেলে বললাম বটে, বয়েস তার ও চল্লিশ ছুঁই ছুঁই—অফিস যাচ্ছে, লৌকিকতা করছে । চেয়ার ছেড়ে ওঠার সময় স্বামী স্ত্রী তে চোখাচুখি হল, বলি? বুঝলাম আরও কিছু বলার বাকি আছে।

এদের বিয়ে হয়েছে বছর কয়েক,সন্তান হয়নি এখনও । সরল সাধাসিধে মেয়েটি। ছোটবেলায় মা বাবা হারিয়ে মামারবাড়ীতে বড়ো হয়েছে। বিয়ের পর বেশ ভালো ছিল, তারপর হঠাৎ করেই চুপচাপ হয়ে যায়। বিস্ফোরণের মতো জানা যায়, যে শ্বশুরকে সে বাবার আসনে বসিয়েছিল, সে লোকটাই ছেলের নাইট ডিউটির রাতে এমন একটা কান্ড ঘটায় যে তা আর মুখে আনতে পারেনি বৌমা।
ঘটনাটা তিনবছর আগের। এখানে তাদের দুজনেরই সংসার। বর্তমানে শ্বশুর শাশুড়ি দেশের বাড়িতেই থাকেন, তবুও তাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলা নিয়েই তান্ডব চলে বাড়িতে।
ছেলের বক্তব্য, আলটিমেটলি তো আমার বাবা,কী করব আমি?

মেয়েটির দিক থেকে এটা একটা ট্রমা, মনের এই কষ্টটা থেকে আজও সে বেরোতে পারেনি যে!
কিছুক্ষণ কথাবার্তায় খানিকটা শান্ত হয় সে।

পরের জনও স্বামীর সঙ্গে এসেছেন।
ভদ্রমহিলাকে আগেও কয়েকবার দেখেছি, পরিষ্কারের বাতিক , এখন সামান্য ভাল সেটা নিজেই বললেন ।
প্রেসক্রিপশন লেখার মধ্যেই স্বামী ভদ্রলোক বললেন, ও বলছে বটে ভালো আছে, কিন্তু আমি বলব একেবারেই ভালো নেই সুপর্ণা। মধ্যে একটা ঘটনাও ঘটেছে।

বাড়িতে বাতিকের রোগী বা রোগীনি থাকলে অনেক আত্মীয় পরিজনই বেশ বিরক্তই থাকেন, মনে করেন, ইচ্ছে করেই এমন করছে বুঝি লোকটা। তাঁদের বিড়ম্বনার অন্যান্য কারণ থাকলেও কখনও কখনও বিষয়টা অন্য চেহারাও নেয়।

মেয়েটি বলতে শুরু করল, ভর দুপুরে মদ খেয়ে বাড়ি ঢুকলে আপনি কি ফুল চন্দন দিয়ে পুজো করবেন ডাক্তারবাবু? রীতিমত টলছে, বাথরুমে গিয়ে এদিক ওদিক ভিজিয়ে দিচ্ছে, আর ওই সময়েই ওর মোবাইলে ওর বস -এর ফোন এলো।
আমি রাগের মাথায় যা তা বলে দিয়েছি তখন।

এবার শুরু হলো স্বামীর ভার্সন। আমারও মাথাটা গরম হয়ে গেসল তখন, কিন্তু মারতাম না! এমন চেল্লাচিল্লি করল যে আমি জাস্ট মাথাটা একটু ঠুকে দিয়েছি,মারিনি কিন্তু!

স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বসে আছে ওদের সাত বছরের ছেলেটা। সে অম্লান বদনে বলে ওঠে —
বাবা তো মা-কে রোজ রোজই মারে ! খুব মারে!

— দেখেছেন, কিরকম শিক্ষা পেয়েছে মায়ের!
স্বামী বিরক্তি প্রকাশ করে।

এবার হাল ধরতেই হয় আমায়। ছেলেটাকে বাইরে বসতে পাঠিয়ে একটু কঠিন গলায় বলি — তোমাদের কে কতটা অসুস্থ সে বিচারে না গিয়ে একটা কথা বলি, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি কিন্তু এই বাচ্চাটারই হচ্ছে!


এবার মায়ের অর্থাৎ আমার পেসেন্ট এর কথায় ফিরি। সাবজেক্টিভ ফিলিং এ সে বেটার আছে, তার নিজের কথায় আগের চিন্তাগুলো এখন অনেক কম, ধোওয়া ধুয়িও কমেছে। তবে যে কোনো প্রসঙ্গেই যদি আমায় “মাথা খারাপ”,”পাগল”,”ও আবার কি বলবে?” সারাক্ষণই এসব বলতে থাকে, তখন মনে হয় কেনইবা ভালো থাকার চেষ্টা করি!
আর মারধর তো রোজকার ব্যাপার হয়ে গেছে! এটা ঠিক, মাথা আমারও গরম হয়, তবে আমি এখন নিয়মিত ওষুধ খেয়ে অনেকটাই কমিয়ে ফেলেছি রাগটা।

সেদিন আমার চেঁচামেচি শুনেই পাশের ফ্ল্যাটের কেউ পুলিশকে ফোন করে দিয়েছিল, তারপর তো তুলকালাম! আমিই তো থানায় গিয়ে কাকুতি মিনতি করে ছাড়িয়ে এনেছি ওকে!
সবই আমার ছেলের সামনে হচ্ছে ডাক্তারবাবু!
আপনি তো আমার বাবার মতো, আপনিই বিচার করুন এবার!
মন থেকে কথাগুলো সরছিলই না, কতটুকু আর পারি আমি? বুঝিয়ে শুনিয়ে বাড়ি পাঠাই ওদের।
এইসময়ই অমল ঢুকল।
সঙ্গে তার মা।
এতক্ষণ বাইরে অপেক্ষা করছিল তারা। তবুও বিরক্তির চিহ্নমাত্র নেই চোখমুখে।
বেশ লাজুক অমল। তেমন কোনো বন্ধু নেই ওর। ভাইবোন নেই। পড়াশোনা করেছে বটে, তবে আজকাল যেমন সকলেই ” বিশেষ”, অমল তেমন না। ঠেকতে ঠেকতে অমল একটা টেকনিক্যাল কোর্স অবদি গেছে। আর পারেনি সে। চাকরি টাকরির কোনো চান্সই নেই ওর।
জটিলতা বোঝেনা, ভীষণ সাধাসিধে। মানে, যতটা সাধাসিধে হলে লোকে বোকা বলে তার চেয়েও বেশি হয়ত। কিছু হলো না বলে বাড়িরই একতলায় ছোট্ট একটা স্টেশনারি দোকান করে দিয়েছিলেন অমলের বাবা মা। ছ’মাসেই দোকানটা তুলে দিতে হলো লোকের জ্বালায়। ঠাট্টা তামাশা আর ধার বাকিতে এমন হলো, যে অমল আর দোকানে বসতেই চাইত না।
বছর দুয়েক আগে এমন একটা সময়ে অমল এলো আমার কাছে। প্রথমটা গোঁজ হয়ে বসে থাকত। তখন শুনতাম, কি কি পারেনা অমল।
সামান্য ওষুধ দিতে হয়েছিল তাকে। আর ছিল ছোট ছোট কাজের আবদার। বারান্দায় তিনটে গাছ ছিল অমলের। প্রত্যেকেরই আলাদা আলাদা নাম।
টগর ফুলের গাছটার নাম হলো ‘আলো’। জবা ফুলের টা ‘মা’! আরও একটা ছিল লঙ্কা গাছ,তার নাম অমল রেখেছে,’শ্রীলঙ্কা’।
দিন যায়,কাজ বাড়ে অমলের।
রাস্তায় বেরোলে ছেলেরা পিছনে লাগে বলে বাড়ির বাইরে যাওয়াটা বন্ধ করে দিয়েছিল সে। ক্রমে দুবেলা হাঁটতে বেরোয়। দোকান বাজারে গিয়ে জিনিস কিনে আনে ঠিকঠাকই।
সবচাইতে বড় কথা হলো,অমল এখন পড়াচ্ছে। ক্লাস ফোর ফাইভের বাচ্চাদের পড়ায় সে। পড়াতে গিয়ে এখন আর ঘাবড়ে যায় না সে।

অমল আর তার মা বসে।
একগাল হাসি অমলের, কেমন আছেন ডাক্তারবাবু? বিশ্বকাপের খেলা দেখলেন?
–তুমি? দেখলে সব?
বলি আমি।

–সবগুলো পারিনি, রাত জাগতে পারিনা যে!

এটা সেটা কথার পর কোলের ব্যাগটা থেকে বেরিয়ে আসে একটা লাল মলাটের ডায়েরি। অমলের খাতা ওটা।
শেষ কয়েক মাসের প্রতিটা দিন কি করেছে অমল সবই লেখা আছে তাতে। এটা রুটিন অমলের।
অমল জানে,সে যা-ই লিখুক পড়বেনই ডাক্তার বাবু। মোটামুটি একটা খসড়া থাকে সেখানে, সকালে কি করল, বাড়িতে কে এলো, বিশেষ কিছু খাওয়া দাওয়া হলো কিনা, কোথাও বেড়াতে যাওয়া হলো কি? খেলার মাঠ থেকে রাজনীতির ময়দান, প্রাকৃতিক দূর্যোগ থেকে ইউক্রেন, রাশিয়ার যুদ্ধ, সবই আছে সেখানে।
তবে ব্যক্তিগত খবর অনেক বেশি।
গান শেখে অমল। কোন্ গানটা কিছুতেই বসছে না গলায়, কোনটা বারবার গাইতে ইচ্ছে করছে, তাও লেখা আছে।
ডায়েরিটা আসলে বন্ধু অমলের, সব লেখাই তাই “ডিয়ার ফ্রেন্ড” দিয়ে শুরু।
যা লেখে সটান লেখে, কোথাও যেন দুঃখ নেই, কষ্ট নেই। অমলের ছাত্র দুসপ্তাহ ধরে আসছে না, অমল লিখছে,যা দুষ্টু! কদিন পরেই আবার আসবে ফিরে! নিজে নিজে ছুটি নিয়ে নিয়েছে।

অমল কিউ আর কোড দিয়ে পেমেন্ট করতে শিখেছে। কী আনন্দ তার।
বাবার সঙ্গে গিয়ে এ টি এম থেকে টাকা তোলার দুদিন পর সে নিজেই মা-কে নিয়ে যাচ্ছে কেমন করে টাকা তুলতে হয় শেখাতে।
এবারকার মতো লেখা সাঙ্গ হয়। খাতা থেকে মুখ তুলে বলি,কি করেছ অমল? এ তো দারুন মজার ব্যাপার!
ওর মায়ের চোখ ছলছল করছে, ডাক্তারবাবু, ওষুধ ও খায়, তবু আপনিই ওকে মানুষ করে তুলেছেন!

চুপ করে থাকি আমি।
দুনিয়ায় সকলেই ভালো থাকার এক্সপেরিমেন্ট করতে ব্যস্ত।
অতিরিক্ত ভালো থাকতে গিয়ে “অতি রিক্ত” হচ্ছে সবাই। এমপ্যাথি-বিহীন একটা সমাজে কেবল ওষুধ কি করতে পারে?
মুখে বলি,
অমলের ওষুধ লাগেনা,ও নিজেই একটা ওষুধ হয়ে গেছে।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, সেপ্টেম্বর ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য