বিশ্বজুড়ে এখন এক অদ্ভুত ভূ-রাজনৈতিক লড়াই চলছে। ঠিক এমন এক সময়ে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে স্বাক্ষরিত হলো মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। ২০২৬ সালের ২৭ জানুয়ারি চূড়ান্ত হওয়া এই চুক্তিটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের দীর্ঘদিনের পরিচিত সমীকরণগুলোকে তছনছ করে দিয়ে এক নতুন যুগের সূচনা করবে—এমনটাই মনে করছে প্রশাসনিক মহল। তাঁদের মতে, এটি কেবল আমদানি-রপ্তানির বাণিজ্যিক সমঝোতা নয়; বরং ওয়াশিংটন এবং বেইজিং—উভয় পক্ষকেই একটি শক্তিশালী বার্তা দেওয়ার কৌশল।

ভারত এই চুক্তির মাধ্যমে একদিকে যেমন মার্কিন বাণিজ্যিক চাপ থেকে মুক্ত হয়ে নিজস্ব ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নিশ্চিত করছে, তেমনি ইউরোপীয় বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে চীনের ম্যানুফ্যাকচারিং আধিপত্যকেও সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। একে অনেকেই ভারতের বড় জয় হিসেবে দেখছেন। তবে এই জয়ের পাশাপাশি ভারতের অভ্যন্তরে যে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, তা নিয়েও ভাববার অবকাশ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই নতুন মোড় ভারতের বাজারের জন্য কতটা সুফল বয়ে আনবে, তা খতিয়ে দেখলেই চুক্তির আসল লাভ-ক্ষতি স্পষ্ট হয়ে যাবে।

‘শুল্ক যুদ্ধ: বিপাকে কি আমেরিকা?’

ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার এই নতুন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির স্পষ্ট প্রভাব পড়তে যাচ্ছে ভারতের আমদানি শুল্ক কাঠামোয়। ভারতের বিশাল ও ক্রমবর্ধমান বাজার বরাবরই মার্কিন কোম্পানিগুলোর কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় ছিল, কিন্তু উচ্চ শুল্ক হারের কারণে তারা সেখানে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। এখন ইউরোপীয় পণ্যগুলো যে ব্যাপক শুল্ক ছাড় পেতে যাচ্ছে, তা সরাসরি মার্কিন রপ্তানি বাণিজ্যের ভিত নাড়িয়ে দিতে পারে। চলুন দেখা যাক কোন কোন খাতে আমেরিকার আঘাত পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি:

‘ভারতের অটোমোবাইল’ বাজার দীর্ঘকাল ধরেই উচ্চ শুল্কের মাধ্যমে সংরক্ষিত ছিল। বিশেষ করে বিলাসবহুল এবং উচ্চ-প্রযুক্তির গাড়ির ওপর ১১০% থেকে ১২৫% পর্যন্ত শুল্ক বলবৎ ছিল। মার্কিন ইলেকট্রিক গাড়ি নির্মাতা ‘টেসলা’ বা আইকনিক মোটরসাইকেল ব্র্যান্ড ‘হার্লে-ডেভিডসন’ এই শুল্ক কমানোর জন্য দীর্ঘদিন লবিং করলেও ভারত তাতে সাড়া দেয়নি।

তবে ভারত-ইইউ চুক্তিতে ভারত বিলাসবহুল ইউরোপীয় গাড়ির ওপর শুল্ক ১১০% থেকে কমিয়ে মাত্র ১০%-এ নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যদিও এই সুবিধাটি বছরে ২,৫০,০০০ ইউনিটের একটি নির্দিষ্ট কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ, তবুও এটি জার্মান এবং ইতালীয় গাড়ি নির্মাতাদের জন্য এক বিশাল সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এর ফলে বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ-বেঞ্জ এবং অডির মতো ব্র্যান্ডগুলো মার্কিন বা জাপানি প্রতিযোগীদের তুলনায় অনেক কম দামে ভারতের বাজারে প্রবেশ করতে পারবে, যা মার্কিন অটোমোবাইল রপ্তানির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ।

‘পশ্চিমী দেশের কৃষিপণ্য’ এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের এক বিশাল চাহিদা রয়েছে ভারতের উচ্চবিত্ত ও উদীয়মান মধ্যবিত্তদের মধ্যে । এতদিন ভারতের বাজারে ক্যালিফোর্নিয়ার ওয়াইন কিংবা মার্কিন আপেলের একছত্র আধিপত্য থাকলেও, এই চুক্তির ফলে সেই সমীকরণ এখন পুরোপুরি বদলে যেতে পারে। ইউরোপীয় ওয়াইনের ওপর বিদ্যমান ১৫০% শুল্ক প্রাথমিকভাবে কমিয়ে ৭৫% করা হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে ধাপে ধাপে মাত্র ২০%-এ নামিয়ে আনা হবে। একইভাবে, অলিভ অয়েলের ওপর থাকা ৪৫% শুল্ক আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ বিলোপ করে শূন্যে আনা হচ্ছে। এছাড়া চকোলেট, কনফেকশনারি এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের ওপর আরোপিত ৩০% থেকে ৫০% শুল্কও পুরোপুরি তুলে নেওয়া হচ্ছে। শুল্ক হ্রাসের এই নাটকীয় পরিবর্তনের ফলে ভারতীয় সুপারশপগুলোতে ইউরোপীয় পণ্য মার্কিন পণ্যের তুলনায় অনেক সাশ্রয়ী ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে, যা সরাসরি আমেরিকার কৃষি খাতের রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের ধস নামাতে পারে।

‘মার্কিন ফার্মাসিউটিক্যাল’ কোম্পানিগুলো সাধারণত কঠোর পেটেন্ট আইন এবং উচ্চ মূল্যের ওষুধের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন চুক্তি এই একচেটিয়া আধিপত্যে বড় ধরনের ফাটল ধরাতে পারে। ভারতের সাশ্রয়ী ও উচ্চমানের জেনেরিক ওষুধ এখন ইউরোপের ২৭টি দেশের বাজারে সহজে প্রবেশাধিকার পাবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের ৯৭% ট্যারিফ লাইন ভারতের জন্য উন্মুক্ত করেছে, যার মধ্যে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ এবং অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্টস অন্তর্ভুক্ত। যখন ভারতের সাশ্রয়ী ওষুধ ইউরোপের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়বে, তখন মার্কিন কোম্পানিগুলোর দামী ওষুধের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই হ্রাস পাবে। এর ফলে ভারত বিশ্ববাজারে ‘ফার্মেসি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’ হিসেবে নিজের অবস্থান আরও পোক্ত করবে। পাশাপাশি, ভারত তার ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা জ্ঞান সুরক্ষায় ‘ট্র্যাডিশনাল নলেজ ডিজিটাল লাইব্রেরি’ -এর স্বীকৃতি আদায় করেছে, যা মার্কিন কোম্পানিগুলোকে ভারতীয় ভেষজ জ্ঞান চুরি করে পেটেন্ট নেওয়া থেকে বিরত রাখবে।

চীনের বিকল্প কি ভারত?

বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকার দেশগুলো চীনের ওপর তাদের অতি-নির্ভরশীলতা কমানোর জন্য ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ নীতি গ্রহণ করেছে (অর্থাৎ, উৎপাদনের জন্য শুধু চীনের ওপর নির্ভর না করে ভারত, ভিয়েতনাম বা থাইল্যান্ডের মতো দেশকেও বিকল্প হিসেবে তৈরি রাখা)। ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে এই নীতিটি একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী ভিত্তি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। চীনের ক্রমবর্ধমান খরচ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভারতকে এখন একটি নির্ভরযোগ্য বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করছে।

ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ফলে ইউরোপের উন্নত প্রযুক্তি এবং ভারতের বিশাল ও দক্ষ শ্রমশক্তির এক অনন্য সমন্বয় ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৬,০০০ ইউরোপীয় কোম্পানি ভারতে সক্রিয় থেকে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। চুক্তিটি পূর্ণাঙ্গ কার্যকর হলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের এই সুযোগ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে – তেমনটাই মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে অটোমোবাইল, টেক্সটাইল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে ইউরোপীয় পুঁজি ও কারিগরি সহায়তা ভারতকে একটি শক্তিশালী উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত করবে, যা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ভারতের অবস্থানকে আরও নির্ভরযোগ্য করে তুলবে।

– এই চুক্তির মাধ্যমে উচ্চ-প্রযুক্তি এবং বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলের নিরাপত্তায় ভারতের অবস্থান সুদৃঢ় হবে। সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ক্লিন এনার্জির মতো খাতে ইউরোপ এখন চীনের বিকল্প হিসেবে ভারতের ওপর বেশি আস্থা রাখছে। ২০৩১ সালের মধ্যে ইলেকট্রনিক্স শিল্পে ৫০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই চুক্তি সহায়ক হবে। বিশেষ করে চিপ তৈরির যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক কমলে ভারতে উৎপাদন খরচ নাটকীয়ভাবে হ্রাস পাবে, যা বিশ্ববাজারে চীনের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করবে। পাশাপাশি, ইউরোপীয় বিনিয়োগ ভারতের গ্রিন হাইড্রোজেন ও পুনর্নবীকরণযোগ্য জ্বালানি খাতকে বিশ্বমানের করে তুলবে।

– ইউরোপীয় প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের হাত ধরে ভারত বিশ্বের নতুন উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে। আমেরিকার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কারণে তৈরি হওয়া বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তার মধ্যে ভারতের এই চুক্তি ওয়াশিংটনকে কিছুটা কৌশলগত চাপে রাখবে। এর ফলে ভারত এখন চীন বা আমেরিকার ওপর নির্ভরশীলতা কাটিয়ে নিজস্ব শর্তে বিশ্ববাণিজ্য পরিচালনা করার ক্ষমতা অর্জন করতে চলেছে।

– প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও ভারত এখন সুবিধাজনক অবস্থানে। চীন যেখানে কপিরাইট বিতর্কে কোণঠাসা এবং আমেরিকা যেখানে কঠিন রাজনৈতিক শর্তারোপ করে, সেখানে এই চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপ থেকে সহজে উন্নত প্রযুক্তি পাওয়ার পথ সুগম হবে। ভূ-রাজনৈতিকভাবে ভারত নিজেকে ‘গ্লোবাল সাউথ’ এবং উন্নত বিশ্বের মধ্যে একটি স্থিতিশীল সেতু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে, যা ভবিষ্যতে বিশ্ব রাজনীতিতে ভারতের নেতৃত্বকে আরও সুসংহত করবে।

ভু-রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ

ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন চুক্তির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাব হলো ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনে। ভারত তার পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের সাথে পূর্ণ সংহতি প্রকাশ না করে সবার সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। এই চুক্তি সেই ভারসাম্যকে আরও শক্তিশালী করেছে ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রায়ই বাণিজ্যের সাথে মানবাধিকার, পরিবেশগত কঠিন শর্ত কিংবা ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের মতো বিষয়গুলো যুক্ত করে ভারতকে চাপে রাখার চেষ্টা করে। বিশেষ করে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনায় আমেরিকা ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছিল। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট অভিযোগ করেছিলেন যে, ইউরোপ ভারতের সাথে বাণিজ্য করে পরোক্ষভাবে রাশিয়ার যুদ্ধকেই অর্থায়ন করছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে যারা কাজ করেন তাঁদের অনেকেই বলছেন এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে চুক্তি ভারতের জন্য এক বিশাল কূটনৈতিক সাফল্য। এটি প্রমাণ করে যে, ভারত এখন আর এককভাবে ওয়াশিংটনের মুখাপেক্ষী নয়। ইউরোপের মতো শক্তিশালী বাণিজ্যিক মিত্র পাশে থাকায় আমেরিকার পক্ষে এখন আর একতরফাভাবে ভারতকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।

প্রতিরক্ষা খাতের আধুনিকীকরণের জন্য ভারতের উন্নত প্রযুক্তির বিশেষ প্রয়োজন। এতদিন ভারত রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল ছিল এবং সম্প্রতি আমেরিকার সাথে ড্রোন ও জেট ইঞ্জিন নিয়ে কাজ শুরু করেছে। কিন্তু মার্কিন প্রযুক্তির সাথে সবসময়ই কঠিন নজরদারি ও শর্ত যুক্ত থাকে। ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব এই সমীকরণ বদলে দিয়েছে। এর একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হলো ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জার্মানির সাথে ভারতের ৮ বিলিয়ন ডলারের সাবমেরিন চুক্তি । জার্মানির থাইসেনক্রুপ কোম্পানি ভারতকে সরাসরি প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে — যা ভারত দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার কাছে চেয়েও পায়নি। এছাড়া মহাকাশ গবেষণা, সাইবার প্রতিরক্ষা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় দেশগুলোর সাথে ভারতের ক্রমবর্ধমান সহযোগিতা দেশটিকে মার্কিন একাধিপত্যের বাইরে একটি শক্তিশালী বিকল্প প্রদান করেছে।

তৃতীয় শক্তি হিসেবে ভারত

ইউরোপীয় ইউনিয়ন যখন ভারতের অর্থনীতিতে কয়েক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে এবং ৫০০ মিলিয়ন ইউরোর গ্রিন ফান্ড প্রদান করবে, তখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইউরোপের নিজস্ব স্বার্থেই ভারতের পক্ষ নেওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়বে । এটি বিশ্বরাজনীতিতে একটি শক্তিশালী ‘ব্যালেন্স অফ পাওয়ার’ তৈরি করবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশ এখন বিশ্ব বাণিজ্যের নিয়মাবলী নির্ধারণে ভারতের সাথে একযোগে কাজ করবে, যা অনেক ক্ষেত্রে আমেরিকার একতরফা সিদ্ধান্তের ভারসাম্য রক্ষা করবে ।

ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন মিলে বিশ্বের জিডিপির ২৫ শতাংশ এবং এক-তৃতীয়াংশ বাণিজ্যের অংশীদার। এই ব্লকের সংহতি প্রমাণ করে যে বিশ্ব এখন আর দ্বি-মেরু (চীন বনাম আমেরিকা) নয়, বরং একটি বহু-মেরু বিশ্বব্যবস্থার দিকে এগিয়ে চলেছে যেখানে ভারত একটি স্বতন্ত্র এবং শক্তিশালী মেরু ।

সম্ভাবনার উল্টো পিঠ

ভারত-ইউরোপীয় ইউনিয়ন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে যেমন উজ্জ্বল সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তেমনি এর মুদ্রার উল্টো পিঠটিও বেশ উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই পরিবর্তনের প্রভাব ভারতের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি, বিশেষ করে ক্ষুদ্র উৎপাদক ও শ্রমবাজারের ওপর নেতিবাচকভাবে পড়ার যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে।

এক, ভারতের কর্মসংস্থানের মেরুদণ্ড হলো অসংগঠিত ক্ষেত্র ও এমএসএমই খাত। এই চুক্তির ফলে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো যখন তাদের অত্যাধুনিক অটোমেশন এবং উন্নত প্রযুক্তিতে তৈরি পণ্য শূন্য শুল্কে ভারতের বাজারে আনবে, তখন দেশীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এক অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন। জার্মানি বা ফ্রান্সের আধুনিক কারখানার তুলনায় ভারতের ছোট কারখানাগুলোর উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। ফলে ইউরোপীয় পণ্যের দাপটে ভারতের শ্রম-নিবিড় শিল্পগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যা বড় ধরনের বেকারত্ব সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি করছে।

দুই, ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দুগ্ধ উৎপাদনকারী দেশ হলেও এই খাতটি মূলত কোটি কোটি প্রান্তিক কৃষকের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে কৃষি খাতে বিশাল সরকারি ভর্তুকি দেওয়া হয়। ইউরোপের সস্তা গুঁড়ো দুধ, পনির এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য যদি অবাধে ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করে, তবে আমুলের মতো সমবায় প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ কৃষকদের আয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত নড়বড়ে হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

তিন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সাধারণত অত্যন্ত কঠোর পেটেন্ট আইনের দাবি জানায়। যদি এই চুক্তিতে ইউরোপের শর্ত অনুযায়ী মেধাস্বত্ব আইন কড়াকড়ি করা হয়, তবে ভারতের সাশ্রয়ী জেনেরিক ওষুধ শিল্প বড় ধাক্কা খাবে। পেটেন্টের গ্যাঁড়াকলে জীবনদায়ী ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে, যা ভারতের মতো জনবহুল দেশের জন্য একটি বড় মানবিক ও স্বাস্থ্যসংকট তৈরি করতে পারে।

লক্ষ্য বিকশিত ভারত -২০৪৭?

ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই চুক্তি কেবল একটি বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, বরং বিশ্বমঞ্চে ভারতের শক্তিধর হয়ে ওঠার পথে এক সাহসী পদক্ষেপ। তবে এই কূটনৈতিক ‘মাস্টারস্ট্রোক’-এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে ভারসাম্যের ওপর — যেখানে একদিকে থাকবে ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ রক্ষা, আর অন্যদিকে থাকবে প্রান্তিক উৎপাদক ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য শক্তিশালী ‘সুরক্ষা কবচ’। ‘বিকশিত ভারত ২০৪৭’-এর স্বপ্ন কেবল জিডিপির শুষ্ক পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়; এই স্বপ্ন তখনই সার্থক হবে, যখন বিশ্বজয়ের সুফল দেশের তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় প্রতিফলিত হবে। বাণিজ্যের এই নতুন সমীকরণ যেন কেবল ভারতের উত্থান নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের সমৃদ্ধির সোপান হয়ে ওঠে।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, মার্চ ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য