রামকৃষ্ণ পরমহংস—এই নামটি আজ যে ‘সর্বজনীন’আধ্যাত্মিক তার প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, তা আদৌ কোনো স্বতঃস্ফূর্ত ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ফল নয়। এটি নির্মিত হয়েছে। সচেতন ভাবে,পরিকল্পিত ভাবে। এবং সেই নির্মাণের প্রধান কারিগর ছিলেন কলকাতা কেন্দ্রিক ভদ্রলোক বাঙালি—সংবাদ পত্রের সম্পাদকীয়র পাতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনচর্চায়, ধর্মতত্ত্বের ব্যাখ্যায়, ইতিহাস লেখার কাঠামোর ভেতর দিয়ে। যদি ওই প্রচার নিয়ে আমার আপত্তির কোন কারণ নেই।

কিন্তু আমি একটি অস্বস্তিকর সত্য কে সামনে রেখে এই প্রবন্ধ টা শুরু করা যেতে পারে—আমরা যেন ভুলে না যাই রামকৃষ্ণ দেব তাঁর জীবদ্দশায় কল কাতার ভদ্রলোক বাঙালি ছাড়া আর কারও কাছে ‘ঠাকুর’ ছিলেন না। গ্রামবাংলার জেলে, বাগদি, নমশূদ্র, ডোম, হাড়ি, মুচি সমাজে তাঁর কোনো সামাজিক উপস্থিতি ছিল না। তাঁরা তাঁকে জানতও না, মানা তো দূরের কথা। আজ যাঁকে ‘অন্ত্যজের আরাধ্য’ বলে প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাঁর জীবনে একজনও অন্ত্যজ অনুগামীর নাম দেখানো যায় না। এটি মতামত নয়—এটি ঐতিহাসিক সত্য। যতই এই সত্যি টা কে ঢাকার চেষ্টা করা হোক না কেনো , এই নির্মম সত্যি টাকে ঢেকে রাখা যায় না ।

কিন্তু সমস্যাটা শুধু এটাকে নিয়ে নয় । আসল প্রশ্ন—ইতিহাস কে লেখে? দর্শন কে ব্যাখ্যা করে? ধর্ম ‘মানবিক’ বলে কারা প্রমাণ করে ? এই সমস্ত কাজটাই করেছে ভদ্রলোক বাঙালি সমাজ। ফলে রামকৃষ্ণ হয়ে উঠেছেন এমন এক ‘সর্বজনীন’ ঠাকুর, যিনি আদতে সর্বজনের নন; তিনি ভদ্র লোকের আত্ম সংকট সামলানোর জন্য নির্মিত এক আধ্যাত্মিক প্রতিমা।

রামকৃষ্ণ দেবের জীবনের অনুপুঙ্খ দিকগুলো খুঁটিয়ে দেখলেই এই নির্মাণের ফাঁক ফোকর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি আদৌ জাতপাত-বিরোধী ছিলেন কি না—এই প্রশ্ন এখানে কেন্দ্রীয়। কথায় নয়, আচরণে।
প্রচলিত ধারণা হলো—তিনি জাতপাত মানতেন না। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, একজনও জেলে, বাগদি, নমশূদ্র তাঁর ধারে-কাছেও পৌঁছতে পারেন নি। তাঁর আশ্রমে, তাঁর সান্নিধ্যে, তাঁর আধ্যাত্মিক চর্চায়—এই সমাজ থেকে উঠে আসা নিম্নবর্গের মানুষের উপস্থিতি নেই কেনো । এটি কি নিছক কাকতালীয়? না কি তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় তাঁর নিজস্ব অবস্থানের স্বাভাবিক পরিণতি?
এই প্রশ্ন উঠলেই খুব কৌশলে টানা হয় রাসমণির প্রসঙ্গ। বলা হয়—কৈবর্ত শ্রেনীর রাণী রাসমণির মন্দিরে তিনি পুরোহিত ছিলেন, অতএব তিনি জাতভেদ মানতেন না। কিন্তু এই গল্পের অর্ধেকটাই বলা হয়। বাকি অর্ধেকটা সচেতনভাবে চেপে যাওয়া হয়।

ভুলে গেলে চলবে না—রাস মণির মন্দিরে পুরুতগিরি করানো নিয়ে রামকৃষ্ণ দেবের প্রবল আপত্তি ছিল। তিনি স্পষ্টভাবে মনে করতেন, ‘নীচু জাতের’ মানুষের মন্দিরে ব্রাহ্মণের পুরোহিত হওয়া শাস্ত্রসম্মত নয়। অর্থাৎ তাঁর প্রাথমিক অবস্থান ছিল নিখাদ ব্রাহ্মণ্যবাদী। তাহলে পরে কী বদলাল?

এখানেই ভেঙে পড়ে ভদ্রলোকের আরেকটি প্রিয় মিথ—রামকৃষ্ণ ছিলেন সরল, শিশুসুলভ, সংসারবিমুখ। বাস্তবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন একজন মানুষ, যিনি ব্যক্তিগত লাভ লোকসান বুঝতেন। যে মন্দিরের প্রসাদ খেয়ে গদাধরের গলা ধরে আসত, বমি করতে ইচ্ছে করত—কারণ প্রসাদ এসেছে ‘নীচু জাতের’ দাতার কাছ থেকে—পরবর্তীকালে সেই মন্দিরেই তিনি পুরোহিত হয়ে বসেন।

কেন?

কারণ ধর্মের পাশাপাশি বাস্তব জীবনের হিসেবটাও তিনি জানতেন। দক্ষিণেশ্বরের মন্দির মানে নিরাপত্তা, সামাজিক সম্মান, ভদ্রলোক সমাজের সঙ্গে সংযোগ, আর্থিক স্থিতি। ঠিক একজন ‘ভালো ব্রাহ্মণের’ মতোই তিনি বুঝতেন—কোথায় আদর্শ আঁকড়ে ধরতে হয়, আর কোথায় আপস করতে হয়।

এ কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য রামকৃষ্ণ কে ব্যক্তিগত ভাবে দোষারোপ বা রামকৃষ্ণর ভাবনা চিন্তা কে ছোট করে দেখানো নয়। প্রশ্নটা অন্য খানে—এই মানুষ টিকেই কীভাবে পরবর্তী কালে জাত ব্যবস্থা-ভাঙা, অন্ত্যজের আরাধ্য, সর্বজনীন মানবতা বাদীর প্রতিমূর্তি বানিয়ে ফেলা হলো?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে উনিশ শতকের বাঙালি ভদ্রলোক দের সংকটের ভেতর। একদিকে ঔপনিবেশিক আধুনিকতা, অন্যদিকে ব্রাহ্মণ্য সামাজিক কাঠামো—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভদ্রলোক সমাজের দরকার ছিল এমন এক ধর্মীয় প্রতীক, যিনি আধুনিকতার প্রশ্নে ‘উদার’, কিন্তু সামাজিক কাঠামোর প্রশ্নে নিরাপদ। রামকৃষ্ণ সেই শূন্যস্থান নিখুঁতভাবে পূরণ করেছিলেন।
তিনি জাতপাত ভাঙার কথা বলেননি, আবার প্রকাশ্যে রক্ষা করার কথাও বলেননি। তিনি বলেছেন—সব পথেই ঈশ্বরের তার ভাষায় যত মত তত পথ। এই আপাত-উদার বাক্যের আড়ালে জাতব্যবস্থা কিন্তু অক্ষত থেকে গেছে, শুধু তার নৈতিক চাপটুকু হালকা করা হয়েছে। ভদ্রলোক সমাজ এইটুকুতেই সন্তুষ্ট।

বহুল প্রচারিত দৈনিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান—সবাই মিলে এই ঠাকুরকে নির্মাণ করেছে। ইতিহাসের ধারালো প্রান্ত গুলি কে মসৃণ করা হয়েছে, বিতর্ক গুলো কে আড়াল করা হয়েছে, সামাজিক বর্জনের প্রশ্ন গুলো কে ‘আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা’র কুয়াশায় ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
ফলে আজ আমরা এমন এক রামকৃষ্ণ কে পাই, যিনি নাকি অন্ত্যজের ঠাকুর। অথচ ইতিহাস বলে—অন্ত্যজরা তাঁর জীবনে ছিলেনই না। তাঁরা না ছিল তাঁর শিষ্য, না ছিল তাঁর শ্রোতা, না ছিল তাঁর ধর্মচর্চার অংশ।

এই সত্যটা বলা জরুরি। কারণ এটি শুধু রামকৃষ্ণকে নিয়ে নয়—এটি বাঙালি ভদ্রলোকের আত্মপ্রবঞ্চনার ইতিহাস। আমরা আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ঠাকুর বানাই, ইতিহাস সাজাই, দর্শন ব্যাখ্যা করি। তারপর সেই নির্মিত ঠাকুরকে সামনে রেখে বলি—দেখো, আমরা কত মানবিক।

কিন্তু মানবিকতার প্রথম শর্ত হলো সত্যের মুখোমুখি হওয়ার সাহস। আর সেই সাহস ছাড়া কোনো ঠাকুরই সর্বসাধারণের হতে পারেন না—তিনি যতই ভদ্রলোকের হোন না কেন।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, মার্চ ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

3.9 8 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য