
সঙ্কটে সম্পদে
“কী ভাবছো?”
“তুমি যা ভাবছো আমিও সেটাই ভাবছি।”
এইভাবেই সন্দীপ আর অপর্ণার কথা চলছিল। একই পাড়ায় দুজনের বাড়ি ছিল, ছেলেবেলা থেকেই ওরা ভীষণ ভালো বন্ধু।
কোনো একটা কারণে এখন দুজনেই খুব চিন্তিত। অপর্ণা বলল,
“কী ঠিক করলে বল। নাকি এখনও
ভেবে চলেছ।”
সন্দীপ সোজা হয়ে বসল। ডান হাত দিয়ে অপর্ণাকে কাছে টেনে নিয়ে বলল,
“আমার ভাবা হয়ে গেছে। আমি কোনোদিন
বিয়ে করবোনা। তুমি কিন্তু ইচ্ছে করলে…”
ওর বাকি কথা থামিয়ে দিয়ে অপর্ণা বলে উঠল,
“তুমি কি সব ভুলে গেলে? যেকোনো
পরিস্থিতিতে, বিপদে-আপদে একসাথে
থাকব প্রতিজ্ঞা করিনি আমরা?
কী করে ভাবলে যে তোমাকে ছাড়া…”
এবার গভীর আবেগে দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে থাকল অনেকক্ষণ। তারপর কঠিন সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলল একসাথেই।
এর মধ্যে একবার ছোটবোন লুণা তাড়া দিয়ে গেল,
“নীচে আয় দাদা, অপর্ণাদি তুমিও এস।
সবাই অপেক্ষা করছে।”
বাড়ির ড্রয়িংরুমে সবাই বসে আছে।দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শেষপর্যন্ত সন্দীপ আর অপর্ণা তিনতলার চিলেকোঠার ঘর থেকে নীচে নেমে এল । বাবা, মা ও অন্যান্য আত্মীয়স্বজন অপেক্ষা করছিল যে সময়টার জন্য অবশেষে তার অবসান হল। অপর্ণার সঙ্গে এবাড়ির সম্পর্ক তার ছোটবেলা থেকেই
যখন তারা এপাড়াতে থাকত। ওরা বাড়ি করে টালীগঞ্জে চলে গেলেও সময় পেলেই মাঝেমাঝে চলে আসে। এবাড়িতে তার অবারিত দ্বার।
সন্দীপের সঙ্গে তার যে নিবীড় ভালোবাসার সম্পর্ক এবং তারা যে বিয়ে করবে বলে অনেকদিন আগেই ঠিক করে রেখেছে সেটাও সকলের জানা । সবাই একটা বিষয়ে একমত যে এইরকম চমৎকার সম্পর্ক যাদের তারা অন্য কাউকে বিয়ের কথা ভাবতেও পারেনা। ওরা যাকে বলে “মেড ফর ইচ আদার”। সন্দীপ আর অপর্ণাও সেইরকমই মনে করে। ওদের সম্পর্ক একটু একটু করে যতই ঘনিষ্ঠ হয়েছে ওরা বুঝেছে সারাজীবন একসাথে থাকা ছাড়া ওরা বাঁচতে পারবেনা। ওদের বিয়েটা শুধু সময়ের অপেক্ষা। সন্দীপ ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পর চাকরিতে ঢুকেছে। তারপর দু’বছর হয়ে গেছে, এখন পার্মানেন্ট আর অপর্ণাও কাছের একটা কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেছে। তার বিষয় বাংলা সাহিত্য। ওদের পরিকল্পনামাফিক এইবার ওরা বিয়ের জন্য প্রস্তুত।নিজেদের বাবা-মাকে ওদের ইচ্ছের কথা ওরা জানিয়েও দিয়েছিল কয়েকমাস আগে। সবাই খুব খুশি।
সেদিন সন্দীপদের বাড়িতে সবাই মিলিত হবার উপলক্ষ্য ওদের বিয়ের দিনটা ফাইনাল করে ফেলা। ছুটির দিনে অপর্ণার বাবা-মাকেও ডেকে আনা হয়েছে একই কারণে। তারাও আনন্দের সঙ্গে অপেক্ষা করছেন। ঠিক হয়েছে দিনটা ফাইনাল হবার পর দুপুরে সবাই একসাথে খাওয়াদাওয়া এখানেই হবে। বাড়ির আবহাওয়ায় একটা খুশি খুশি ভাব।
অনেকক্ষণ পরে ওরা দুজনেই একসঙ্গে নীচে নেমে এসে ওদের কাছে বসতেই সবার মুখে হাসি। সন্দীপের বাবা জিজ্ঞেস করলেন,
“আমরা সবাই কেন এখানে অপেক্ষা করছি সেটাতো তোরা জানিস। আসলে সামনের অঘ্রাণ মাসের মাঝামাঝি একটা ভালো দিন আছে। সেদিন তোদের বিয়েটা হলে আমাদের কারো কোনো অসুবিধা হবেনা। এবার তোরা বল্।”

সন্দীপ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর আস্তে করে বলল,
“বাবা আমাদের কিছু বলার আছে।”
“হ্যাঁ অবশ্যই বলবি। সেইজন্যই তো আমরা অপেক্ষা করছি। যদি ঐসময়টা তোদের কোনো অসুবিধা থাকে তাহলে কখন কোন সময়ে বিয়ের দিন স্থির করব জানা। আমরা সবাই খোলা মনে সব আলোচনা করে আজকেই ঠিক করে ফেলব।”
সন্দীপ একটু গম্ভীর হয়ে থাকলো, কয়েক মুহূর্তের জন্যে। ঘরশুদ্ধ সবায়ের চোখ ওদের দিকে। অপর্ণার বাবা এবার একটু অধৈর্য্য হয়ে বললেন,
“আমরা সবাই অপেক্ষা করছি বাবা। সামনের মাসে বিয়ে করতে কোনো অসুবিধা থাকলে খোলাখুলি বলো।”
অপরেশবাবুর দিকে তাকিয়ে সন্দীপ আস্তে করে বলল,
“এ বিয়েটা হচ্ছেনা বাবা। “
শুধু সন্দীপের বাবা অপরেশবাবুই নয় ঘরশুদ্ধ সবাই চমকে উঠল। ভাবল ঠিক শুনেছে তো? ঘরে পরিপূর্ণ নিস্তব্ধতা নেমে এলো, একটা পিন পড়ার আওয়াজ হলেও বোধহয় শোনা যাবে।একটু পরে অপরেশবাবু আস্তে করে জিজ্ঞেস করলেন,
“হঠাৎ কী এমন হলো, তোদের মধ্যে কি কোনো ভুল বোঝাবুঝি…”
তার বাবাকে কথার মাঝখানে থামিয়ে দিয়ে সন্দীপ স্পষ্ট করে জানালো তাদের মধ্যে সঠিক বোঝাপড়া আছে বলেই এই কথাটা বলতে পারল।
অপরেশবাবু ও তাঁর স্ত্রীও ভীষণ অবাক। ওদের সম্পর্ক এতদিনের সবাই জানে। দুজনেই ভীষন ভালো। হঠাৎ কী এমন ঘটে গেল যে তারা বিয়ে করতে পারবেনা। বিষয়টি পরিষ্কার করে জানিয়ে দেওয়া এবার সন্দীপের দায়িত্ব। গলাটা একটু পরিস্কার করে সে বলল,
“খুব মন দিয়ে শোনো বাবা।”
তারপর হাতে ধরে থাকা একটি কাগজ দেখিয়ে বলল,
“এই রিপোর্টটা আজকে হাতে পেয়েছি।”
সবাই ভীষণ উৎকন্ঠা নিয়ে কিছু শোনার অপেক্ষায় রইলো। অপর্ণার বাবা বললেন,
“কীসের রিপোর্ট? এর সঙ্গে বিয়ের কী সম্পর্ক ?
একবার অপর্ণার দিকে তাকিয়ে তারপর সকলের উদ্দেশে সন্দীপ জানালো,
“আমি আর অপর্ণা দুজনেই আজ অনেক ভেবেচিন্তে একটু আগে এই সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমরা কেউ বিয়ে করবনা। সারাজীবন পরস্পরের বন্ধু হয়ে থাকব।”
“কিন্তু কেন?”
প্রায় সবাই একসাথে বলে উঠল।
এরপর আবার একটু চুপ করে থেকে সন্দীপ বলল,
“এর একমাত্র কারণ রক্তের রিপোর্ট অনুযায়ী আমরা দুজনেই থ্যালাসেমিয়ার বাহক।”
সবাই যেন বজ্রাহত। কারো মুখে কোনো কথা নেই। শুধু সিলিং ফ্যানের একটানা আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।

দুজনেই থ্যালাসেমিয়া বাহক হলে, বিয়ে একদম করা যাবে না, তা ঠিক নয়। দুজনে ক্যারিয়ার হলে, ২৫শতক বেবি এফেক্টেড হয়! বেবী
এফেক্টেড হলো কিনা তার জন্যে দুমাসের মধ্যে জেনেটিক পরীক্ষা করা হয়। এফেকটেড হলে এই প্রেগন্যান্সি এমটিপি করা হয়(নষ্ট)।
আর কোন
এফেক্টেড না হলে, প্রেগন্যান্সি কন্টিনিউ করা হয়।
এই জেনেটিক টেস্ট এখন অনেক এডভান্সড!
আমার পরিচিত কয়েকজন দম্পতি ক্যারিয়ার হয়েও
সুস্থ সন্তানের জন্ম দিয়েছে
২৫% এফেক্ট্ড হয়।
৫০%ক্যারিয়ার হয়
আর ২৫% সুস্থ বাচ্ছা হয়।
দারুণ একটা বার্তা দিলেন।
ভালো থাকুন দাদা।
🙏🏼❤️🙏🏼