ক্যালেন্ডারে নভেম্বর মাস এলেই মনখারাপ হতে থাকে। নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত দুর্গাবাড়িতে রাসমেলা বসবে। পনের দিন ধরে চলবে।রাসমেলা শেষ হতে না হতেই ইস্কুলে ইস্কুলে অ্যানুয়াল পরীক্ষা।

বাড়ির খুব কাছেই দুর্গাবাড়ি। কালজানি ব্রিজ থেকে যে রাস্তাটা ঢালু হয়ে নেমে বড়বাজার হয়ে চৌপথি মোড়ের দিকে গেছে, সেই কালজানি ব্রিজ আর বড়বাজারের মাঝখানে আবার দুটো ছোটো রাস্তা পরস্পরের সমান্তরালে ডানদিকে নেমেছে। প্রথম রাস্তার বাম দিকে বিখ্যাত ‘স্বাধীন ভারত’ ক্লাব। ক্লাবের উল্টো দিকের গলিতেই বিশাল দুর্গাবাড়ি। দ্বিতীয় রাস্তায় অল্প গেলেই বড়বাজার, এখানকার গলিতে আমাদের বাড়ি। বাড়ি থেকে একশো পা হাঁটলেই আলিপুরদুয়ার দুর্গাবাড়ি।

মন্দির চাতালের সামনে আর মন্দিরের সীমানার বাইরে যেখানে হাট বসে সেটা আশুতোষ ক্লাবের বিরাট বড় মাঠ। সেখানে রাসমেলার জন্য প্যান্ডেল হচ্ছে। বাঁশ বাঁধা হচ্ছে। অনেকগুলো ঘর হবে—এগুলো সব রকমারি দোকানের। কোনটায় কাচের চুড়ির দোকান, কোনটায় কাঠের রকমারি জিনিস, কোনটায় শুধু গজা-মিষ্টি-জিলিপির দোকান, কোনটায় বন্দুক দিয়ে টিপ করে বেলুন ফাটানোর ব্যবস্থা, কতো রকমের খেলনার দোকান— আরও অজস্র দোকান বসবে! মেলামাঠ জুড়ে মাইকের আওয়াজে চারদিক গমগম করবে। তেলেভাজা, গজা, সিঙারা, জিলিপি— আরও কতো রকমের খাবারের দোকান থেকে দারুণ গন্ধ বাতাসে ভেসে বেড়াবে। এদিকে বাড়ি থেকে বলে দেওয়া হয়েছে ; পরীক্ষার আগে রোজ মেলায় যাওয়া যাবে না। সপ্তাহে এক বা দুই দিন মেলায় যাওয়া যেতে পারে। তবে আগে সারাদিন পড়াশোনা করতে হবে। দুপুর থেকেই মেলায় মাইক বাজবে, অথচ আমি জানি, বাড়িতে বই খুলে বসে জোরে জোরে পড়লেও একটি লাইনও মুখস্থ হবে না। মেলামাঠের দিক থেকে হট্টমেলার শব্দ ঠিক কানে আসবে।

নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ। মেলা আরম্ভ হয়েছে। দুর্গাবাড়ির সুবিশাল প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকে প্রথমে কালীমন্দির। বড় চাতাল। অনেকগুলো সিঁড়ি। সিঁড়িগুলো মার্বেল পাথরের। প্রতিটা সিঁড়িতে চৌকো চৌকো ফলক বসানো। তাতে আবার নাম লেখা। শহরের নামী ব্যক্তিরা তাদের বাবা-মায়ের স্মৃতিতে ফলক বসিয়েছে। সেগুলো পায়ে মাড়িয়ে তবেই সিঁড়ি দিয়ে ওঠা যায়, মা কালীর দর্শন করা যায়। এই যে অমুকের তমুকের বাবা-মায়ের নাম লেখা রয়েছে, সেইসব নামগুলো এতো এতো লোকে পায়ে মাড়াচ্ছে—সেগুলোর ওপর দিয়ে হেঁটে ঠাকুর দর্শন করতে একটুও ভালো লাগে না। ভালো না লাগলেও উপায়-ই বা কী! মাকালীর পুজো করেন যে ঠাকুরমশাই— উনি একটা পিতলের পাত্র হাতে নিয়ে তা থেকে ঠাকুরের চরণামৃত সবার হাতে দেন। সবাই মুখে দেয় তারপর মাথায় হাত মোছে। মিষ্টি স্বাদের চরণামৃত খেতে ভালো লাগে। তবে হাত মাথায় মুছি না—চুল চ্যাটচ্যাট করে! প্যান্টে মুছে ফেলি। সিঁড়ি দিয়ে নামতে গেলেই বামদিকে ইয়া বড় সাদা মার্বেল পাথরের গরু, পা গুটিয়ে বসেই থাকে। পাশেই শিবঠাকুরের একটা বড় ত্রিশূল। ত্রিশূলটায় আবার ডমরু বাঁধা। গরুটার চোখ দুটো কী সুন্দর আর মায়াবী! আমি ওর বড় শিং দুটোয় হাত দিই। বড় কুঁজটায় হাত বুলিয়ে চরণামৃত লেগে থাকা হাত মুছে ফেলি, আর চ্যাটচ্যাট করে না।

মন্দিরের সিঁড়ি দিয়ে নামলে একধার থেকে পরপর অনেকগুলো খুপরি ঘর। ও গুলো রাসমেলার জন্য রঙিন কাপড় আর বাঁশ দিয়ে বানানো হয়েছে। খুপরি ঘরগুলোর পেছনেই বড় আর অনেক উঁচু দুর্গামন্দির। মন্দিরটা ঢাকা পড়েছে অস্থায়ী ঘরগুলোর কারনে।সামনে বাঁশের ব্যারিকেড। বাঁশের উপর রঙিন কাপড়ের ফিতে শক্ত করে জড়ানো। একেকটা ঘরে মাটির পুতুলের মাধ্যমে রামায়ণ ও মহাভারতের একেকটা দৃশ্য দেখানো হয়েছে। পুতুলগুলো বেশ বড়। কোনোটায় রাবণ সীতাকে হরণ করছে, জটায়ুর ডানা কাটছে। হয়তো পাশের খুপরি ঘরেই রাম আর লক্ষ্মণ সমুদ্রের ধারে বসে আছে, হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে হনুমান। রাম পুতুলের গায়ের রঙ সবজে-নীল। একটু দুরেই আবার মহাভারতের পুতুল। সেখানে কৃষ্ণ পুতুলটার গায়ের রঙ হাল্কা নীল— অনেকটা আকাশের গায়ের রঙের মতো। কোনোটায় ভক্ত প্রহ্লাদ। কোথাও বিকট ও ভয়ানক চেহারার নৃসিংহ অবতার! কোথাও ছোট্ট কৃষ্ণঠাকুরকে ঝুড়িতে শুইয়ে মাথায় নিয়ে তাঁর বাবা হেঁটে যাচ্ছেন, পিছনে অনেকগুলো মাথাওয়ালা বিশাল সাপ। সাপটা সবগুলো মাথা দিয়ে ফণা তুলে ঝড়বৃষ্টির হাত থেকে শিশু কৃষ্ণঠাকুরের মাথার উপর যেন ছাতা ধরে আছে!

রামায়ণের পুতুলগুলোর ঘর শেষ হলেই মহাভারতের পুতুলগুলোর ঘর পরপর চলতে থাকে। দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ, ভীষ্মের শরশয্যা— এমন আরও কতো! মন্দির চত্ত্বরের মাঝখানে পুতনা বধের একটা বিশাল মূর্তি। তার পাশেই রাসচক্র। লোকজন রাসচক্র ঘোরাচ্ছে। আমি অবশ্য ওটার নাগাল পাই না। বাঁশের ব্যারিকেডের সামনে লাইন করে প্রচুর লোক একেকটা ঘর পেরিয়ে পাশের ঘরটার দিকে এগুচ্ছে। পিছনের লোকগুলোর ঠেলাধাক্কায় লাইন গড়গড়িয়ে এগোতে থাকে—লাইনে থাকা আমিও এগোতে থাকি। অনেকগুলো লোক টমটম গাড়ি বিক্রি করছে, সাথে শোলার তৈরি লম্বাটে পেঁচা। পেঁচার গায়ে দড়ি বাঁধা। দড়ি ধরে ওটাকে বনবন করে ঘোরালেই পিঁ-পিঁ শব্দ হতে থাকে। সব বাচ্চাদের হাতে পেঁচা, সবাই ঘুরিয়ে শব্দ করছে। কানে তালা লেগে যাচ্ছে!

পুতুলের খুপরিঘর শেষ হতেই সামনে বিশাল মেলারমাঠ। নাগরদোলা-ই কতরকম! কোনটায় বৃত্তাকারে নানা রঙের কাঠের ঘোড়া। ঘোড়াগুলোর কাঠের কান। পায়ের কাছে পা-দানি। আমার বয়েসী ছেলেমেয়েরা কাঠের কান চেপে বসেছে। আমি সাদা ঘোড়াটায় উঠে বসেছি। মনে হচ্ছে যেন আমিই অরণ্যদেব, তুফান ঘোড়ায় চেপেছি। কাঠের ঘোড়াওয়ালা নাগরদোলা গোল গোল করে বেশ কয়েক পাক ঘুরে থেমে গেল। অন্য ছেলেমেয়েরা টিকিট কেটে দাঁড়িয়ে আছে, ওরাও ঘোড়ায় চড়বে।

যেদিন- যেদিন কাকাই আমাকে নিয়ে মেলায় যায়, সেদিন খুব আনন্দ হয়। অনেককিছু কিনে দেয়। টিকিট কেটে একটা গোল ঘরের ভিতরে যাই। সেখানে দুটো লোক বিশাল গোলাকার কাঠের কুয়োয় ভিতর ঘুরে ঘুরে কী জোরে মোটরসাইকেল চালায়। কুয়োর একদম নিচ থেকে মোটরসাইকেল চালাতে চালাতে উপরে উঠে আসে, একে অপরের সাথে কাটাকুটি খেলে। আমার খুব ভয় লাগে, যদি অ্যাক্সিডেন্ট হয়! শেষ অবধি কিছুই হয় না। মোটরসাইকেল দুটোর বিকট ফ্যাটফ্যাট শব্দে কানে তালা লেগে যায়, ধোঁয়ার গন্ধে অনেকক্ষণ ধরে নাক জ্বলতে থাকে।

গোল ঘর থেকে নেমে বন্দুক দিয়ে বেলুন ফাটানোর ঘরে যাই। কাপড়ের দেয়ালে অনেকগুলো বেলুন, সাথে কয়েকটা চাবির রিং, ছোটো খেলনা পুতুল ঝুলছে। বড় বন্দুকটার ট্রিগারের কাছটা ধরে একজন বন্দুকের বাটের ঘাড় মটকে ছোটো দানার গুলি ভরে দেয়। বন্দুকটা কী ভারি! হাতে তুললে হাত কাঁপে। আমি কাঁধে ঠেকিয়ে টিপ করি, ট্রিগার টানি…একটাও বেলুন ফাটে না! না ফাটুক, তবুও বন্দুক চালাতে দারুণ লাগে। কুট্টিপিসির সঙ্গে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমায় বন্দুক চালাতে দেখেছি। ওদের কী টিপ! সিনেমায় একটা গুলি করলেই খারাপ লোকগুলো মরে যায়।

ঐ যে দূরবীনের দোকান। কাকাই কালো প্লাস্টিকের দূরবিন কিনে দেয়। একরকমের খেলনা ক্যামেরাও পাওয়া যায়। ওটার সামনের চিলতে জায়গায় সিনেমার রিল গুঁজে ক্যামেরায় চোখ রাখলে হিন্দি সিনেমার ছবি দেখা যায়। নাগিন সিনেমার ইচ্ছেধারী নাগ ও নাগিনীর ছবি দেখেছি, ওরা অবশ্য নায়ক-নায়িকা। শোলের গব্বর সিং-কে দেখি। ঠাকুর কাঁটা জুতো দিয়ে গব্বর সিং-কে মারছে। ধর্মেন্দ্র কী শক্তিশালী, না? গব্বরের গলায় লাঠি চেপে ধরেছে! এই ক্যামেরাটা আমার খুব পছন্দের। কিনলে সঙ্গে আরও অনেকগুলো রিল এর টুকরো দেয়। সব্বাইকে অবশ্য চিনি না, তবুও দেখতে দারুণ লাগে।

বাড়ি ফিরলে কুট্টিপিসি রিল দেখে আমাকে বাকিদের চিনিয়ে দেয়। ঘোড়ায় বসে থাকা বন্দুকওয়ালা মুখ ঢাকা ডাকাতদের রিলগুলো খেলনা ক্যামেরায় গুঁজে দেখতে ভালো লাগে। আমারও খুব ইচ্ছে করে বড় হয়ে একদিন ঘোড়া কিনব। ঘোড়ার পিঠে চড়ে শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়াব। তবে, আমি কিছুতেই স্থির করতে পারি না, বড় হয়ে যে ঘোড়াটা কিনব তা কি অরণ্যদেবের তুফানের মতো সাদা ঘোড়া, না কি সিনেমার ফিল্মগুলোয় দেখা মুখ ঢাকা ডাকাতদের মতো কালো ঘোড়া? একটা রাস্তা আছে অবশ্য, বড় হয়ে ঘোড়া কিনবার আগে টস করব। কুট্টিপিসি বলেছে ‘শোলে’ সিনেমায় বচ্চন টস করেছিল। বচ্চনের কয়েনটায় দুপাশেই নাকি একই ছাপ ছিল।

খেলার মাঠে বন্ধুরাও ‘শোলে’ সিনেমার মতো কেউ ধর্মেন্দ্র, কেউ বচ্চন, কেউ ঠাকুর সাজে। গব্বরকে যে মার খেতে হয়, সেজন্য কেউ গব্বর সাজতে চায় না। এক বন্ধুর পিঠের পিছনে আঙুল তুলে এক-একজনকে ডাকা হয়, ক’টা আঙুল তোলা হয়েছে তা সঠিক বলতে পারলে তবেই একেকটা রোল পাওয়া যায়। আমাদের মাঠের পাশে অনেকগুলো বড় বড় গাছ। পেছনেই রেলের গুদাম। ‘শোলে’ সিনেমার খেলা আরম্ভ হলেই সবাই দৌড়ে গাছের আড়ালে বা রেলগুদামের পিছনে লুকিয়ে পড়ে। পুজোর সময় কেনা পিস্তল, ক্যাপ আর ছোটো বন্দুক নিয়ে সবাই গুলি চালায়। সন্ধ্যা হবার মুখে ‘গব্বর সিং’ জব্বর পিটুনি খায়…

ঠাকুরদার ড্রয়ারে অনেকগুলো কয়েন দেখেছি, তবে বচ্চনের মতো দুই পিঠেই হেড বা টেল— ওরকম কয়েন তো একটাও চোখে পড়েনি। অরণ্যদেবের তুফানের মতো সাদা, নাকি সিনেমার ডাকাতদের মতো কালো কুচকুচে ঘোড়া—ভাবতে ভাবতে অংক খাতার তলা থেকে এই মাসের নতুন ‘চাঁদমামা’ বের করি। পাতা উলটে বিক্রম-বেতাল-এর গল্পটায় সবেমাত্র চোখ দিয়েছি, হঠাৎ মা-এর কানমলা আর চিৎকার, “পরীক্ষার আগে বই না পড়ে আবার চাঁদমামা পড়ছিস!”

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[ পরম্পরা ওয়েবজিন, নভেম্বর ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য