(যাত্রাপালা)

ষষ্ঠী থেকে অষ্টমী কীভাবে যে হুস্ করে চলে গেল! সকাল থেকেই পুজো প্যান্ডেলে ঢাকের বোল অন্যরকম শোনাচ্ছে। যদিও দুপুরবেলা ভটচাজ্ বাড়িতে সে কী হুলুস্থুল! সপ্তমী ও অষ্টমীতেও ছিল। তবে নবমীর আয়োজন একদম অন্যরকম।

মংলাকাকুর চেহারাটা দারুণ। মংলাকাকু বাবার বন্ধু, তবে বাবার মতো রোগা নয়। নাকটা খাঁড়ার মতো। লম্বায় বাবার থেকে আধ হাত বড়। বাবার মতোই নস্যি টানে। মাঝেমধ্যে আমাদের বাড়িতে আসে। তখন বাবার নস্যির ডিব্বে থেকে একচিমটি আঙুলে নেয়, বুড়ো আঙুল আর তর্জনী চেপে ধরে বারবার হাত ঝাঁকায়, তারপর সোঁ-সোঁ করে নস্যি টানে। তারপর রুমাল বের করে নাক মোছে। তখন মংলাকাকুর গলার শব্দ আর নাকের শব্দ যেন মিলেমিশে যায়। প্রতিদিন বিকেলে শার্ট-প্যান্ট পরে হেঁটে জামতলার দিকে কাকু যখন যায় তখন অবশ্য দেখে বোঝা যায় না শরীরটা কী সাংঘাতিক পেটানো। পুজোর তিনদিন মংলাকাকু ধুতি পরে। গলায় ছোটোহাতের ধুতি উত্তরীয়-র মতো ঝুলতে থাকে। টিকালো নাকের উপর থেকে কপালের অনেকটা উপর পর্যন্ত লম্বালম্বিভাবে লাল টকটকে সিঁদুর টানা। হাতের কনুইয়ের উপরে মোটা তাগায় তাবিজ বাঁধা। কবজিতে মোটা লাল সুতো। গলায় কয়েকরকমের রুদ্রাক্ষমালা। বন্ধুরা কেউ কেউ বলে যে, পুজোর তিনদিন দুপুরবেলা কাকু কী যেন একটা খায়। সারাটাদুপুর চোখদুটো লাল টকটকে হয়ে থাকে। এই তিনদিন পাশ দিয়ে গেলেও মংলাকাকু আমাদের সঙ্গে কোনো কথা বলে না। অবশ্য বলবেই বা কী। তাঁর যে বিশাল দায়িত্ব।

পূজা মণ্ডপের সামনে একটা বেদী মাটিতে পোঁতা। বেদীতে সিঁদুর-আলতা মাখা। লালচে রঙ। কিছুটা দূরে অনেকগুলো পাঁঠাকে বেঁধে রাখা হয়েছে। ওরা কাঁঠাল পাতা খাচ্ছে আর ব্যাঁ-ব্যাঁ করছে। তিন-চারটে ঢাকী নেচে-নেচে ঢাক বাজাচ্ছে। বেদীটাকে ঘিরে অনেক লোক জড়ো হয়েছে। বন্ধুরা এসে গেছে। আমাদের হাতে টিনের কালো পিস্তল, পকেটে ক্যাপের গোল প্যাকেট। আমরা মন্ডপের একটা ধারে দাঁড়িয়েছি আর মাঝেমধ্যেই ফটাস-ফটাস করে পিস্তল ফাটাচ্ছি। কেউ কেউ আবার পাকা রাস্তার উপর ঢিলবোম ছুঁড়ে দুমদাম করে ফাটাচ্ছে। আমাদের বন্ধু মালা, তানিয়া, শিল্পী— ওরাও নতুন জামা পরে মন্ডপে এসে গেছে। পিস্তলের ফটাফট শব্দ আর ঢিলবোমের আগুনের ফুলকির ভয়ে ওরা কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে।

পুরোহিত মশাই চিৎকার করে মন্ত্রপাঠ করছেন। ঢাকীরা মাথার বাবড়ি চুল দুলিয়ে ঢাক বাজাচ্ছে। মহিলারা উলুধ্বনি দিচ্ছেন। প্রচন্ড জোরে কাঁসর বাজছে। একটা একটা করে পাঁঠাকে স্নান করিয়ে কপালে লাল তিলক লাগানো হচ্ছে। ও-গুলোকে পরপর দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। মংলাকাকুর হাতে তখন বিরাট একটা রামদা। অনেকটা দুর্গাঠাকুরের হাতের খড়্গের মতো দেখতে। রূপালি রামদা-টা চকচক করছে। রামদা-র দুই পিঠে সিঁদুর-আলতা দিয়ে দুটো বড় চোখ আঁকা। চোখ দুটো আবার ইলিশ মাছের মতো লম্বাটে ধরণের। মংলাকাকুর মাথায় লাল ফেট্টি বাঁধা। তখন মংলাকাকুকে দেখলেই “কপালকুন্ডলা” সিনেমার সেই তান্ত্রিকের চেহারাটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সিনেমার তান্ত্রিকের মতোই কী ভয়ানক!

এই মংলাকাকু-কে দশমীর পরদিন থেকে আবার আগের মতো হাসিখুশি দেখাচ্ছে।নবমীর দুপুরে তান্ত্রিকের মতো যে চেহারাটা ছিল, সেটা পুজো শেষ হতেই উধাও। পাড়ায় মংলাকাকুর খুব প্রভাব। ছোটোরা তো বটেই বড়রাও তাঁকে সমীহ করেন, তাঁর কথা যে বেশ ওজনদার— তাও বুঝতে পারি।

বিজয়াদশমী থেকে লক্ষ্মীপুজো পর্যন্ত এক্কেবারে পড়াশোনা নেই। রোজ সন্ধ্যায় বাড়ি-বাড়ি ঘুরে বড়দের প্রণাম করি আর কতরকমের নাড়ু-কাটানিমকি খাই। তিলের নাড়ু খেতে কী ভালই না লাগে! একটু শক্ত, সামনের দাঁত দিয়ে ভাঙা যায় না। মাড়ির দাঁত দিয়ে ভাঙলে প্রথমে ‘খটাস’ করে শব্দ হয়, তারপর পুরো নাড়ুটা মুখের মধ্যে নরম হয়ে যায়। কটরমটর করে চিবিয়ে খেতে খুব ভালো লাগে। মাড়ির দাঁতের খাঁজে-খাঁজে অল্প খানিকটা আটকে থাকে। মুখে অনেকক্ষণ ধরে চকলেট-চকলেট স্বাদ লেগে থাকে।

দেখতে দেখতে কালীপূজা এসে গেল। আর কদিন বাদেই স্কুল খুলে যাবে। তারপরেই হুহু করে অ্যানুয়াল পরীক্ষা চলে আসবে। আসুক, তখন দেখা যাবে। আগে তো কালীপূজার আনন্দ, তারপর নাহয় পড়াশোনা। কালীপূজার দুই-দিন পরে বাড়ির সামনে বড়বাজারের রাস্তা আটকে যাত্রাপালা হবে। প্রতিবছরই হয়। বড়বাজার পূজা কমিটি অনেকবছর ধরেই কালীপূজার পরে যাত্রাদল নিয়ে আসে। শুনেছি মংলাকাকু এই কমিটির বড় মাথাদের একজন।

শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ির দিক থেকে কালজানি নদী-ব্রিজের উপর দিয়ে যে রাস্তাটা বড়বাজারের উপর দিয়ে, আলিপুরদুয়ার রেলস্টেশন পার করে সোজা চৌপথীর দিকে চলে গেছে; যে রাস্তাটায় দিনরাত কত গাড়ি-ট্রাক-রিক্সা চলে— সেই রাস্তাটা কালীপূজার পরের পরেরদিন যাত্রাপালার জন্য বিকেল থেকে রাত গড়িয়ে ভোর পর্যন্ত বন্ধ থাকে। বাড়িতে শুনেছি, রাতে এই পথে চলাচলকারী ট্রাক আর অন্য গাড়িগুলো দূর্গাবাড়ির রাস্তা ধরে বাবুপাড়া হয়ে নাকি চৌপথীতে পৌঁছয়।

যাত্রাপালার দিন সন্ধ্যা পার হতে না হতেই মা আর কালোদিদা বাড়ির সবার জন্য রান্না শেষ করে। রাস্তার দু-ধারে বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড বাঁধা হয়েছে। রাস্তার ওপর অনেকটা জায়গা জুড়ে যাত্রাপালার মঞ্চ তৈরী করা হয়েছে। বড় রাস্তার একদিকে ‘পাল-ব্রাদার্স’-এর ভাই-কাকা-জ্যাঠাদের পাশাপাশি দোকান। দোকানগুলোর সামনের পাকা বারান্দায় সন্ধ্যার পরেই পোয়াল(খড়) বিছানো হয়েছে। রাস্তার অন্যধারে সাহাদের পাঁউরুটি বেকারি, ঘোষদের দোকান। এখানেও পোয়াল বিছানো। এ-পাড়া, ও-পাড়া থেকে যাত্রাপালা দেখতে পিলপিল করে লোক আসবে। অনেকেই বাড়ি থেকে চটের বস্তা সহ আসে। কেউ কেউ আবার ছোটো জলচৌকি আনে, অনেকে আনে বেতের মোড়া। পাশেই ট্যাক্সিস্ট্যান্ড। এই জায়গাটা রাস্তার সমতলে। এখানে অবশ্য পোয়াল বিছানো থাকে না। সামনের তিন-চারটে সারিতে মানুষ বসে থাকে। পেছনে অনেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যাত্রা দেখে।

চারদিকে খানিকটা দূর অন্তর লম্বা মাইকের চোঙা বাঁশের খুঁটিতে বাঁধা হয়েছে। অনেকগুলো হ্যাজাক বাতি জ্বলছে। যাত্রামঞ্চের পাটাতন থেকে রাস্তার দুই-তিন ইঞ্চি উপর অবধি নীল-সবুজ ঝালর চকচক করছে। মঞ্চের মাঝখানে, মঞ্চের ধারের দিকগুলোয় মাইকের মাউথপিস ঝুলছে। ঘোষদের দোকান-বাড়ির দিকটায় একপাশে কনসার্টের দল নানা বাদ্যযন্ত্র নিয়ে বসেছে। অন্যপাশে একটা বাড়ির ভেতরের অংশ থেকে দু-ধারে বাঁশ বেঁধে অভিনেতাদের মঞ্চে আসা-যাওয়ার জন্য পাটাতন বসিয়ে সরু রাস্তা বানানো হয়েছে। জ্যামিতি বইয়ের ত্রিভুজের মতো দেখতে হলেও এর তিনবাহু অবশ্য সমান নয়। কালোদিদা, মা ও কুট্টিপিসির সঙ্গে আমি আর ভাই এসে পালদের দোকানের বারান্দায় ভীড়ের মধ্যে বসে পড়েছি। ঠাকুরদা, বাবা, কাকাই অবশ্য আসেনি। কতো লোক! অত গাদাগাদি ভীড়ের মধ্যে বসতেও অসুবিধা হচ্ছে। হোক গে। পাশাপাশি সবাই চেপেচুপে বসেছে। একটু পরেই ঢং-ঢং করে ঘন্টা বাজবে। যাত্রাপালায় ঘন্টার শব্দটা স্কুলের ঘন্টার মতো নয়! কেমন জানি কর্কশ ধরণের। এরপরই কনসার্টের দল অতিবিচ্ছিরি একঘেয়ে সুরে হারমোনিয়াম বাজাবে। কালো লম্বা সানাই বাজবে। কয়েকজন ব্যাঙের মতো গাল ফুলিয়ে করনেট বাজাবে। কাঁসার থালার মতো বড় করতাল হাতে দুলিয়ে-দুলিয়ে ঝমাঝম করে বাজাবে কেউ কেউ। অমনি গেরুয়া পাগড়ি ও পাঞ্জাবি পরা যাত্রাপালার ‘বিবেক’ মঞ্চে এসে একঘেয়ে সুর ভাজতে-ভাজতে গানের মতো করে কিছুক্ষণ কথা বলবে, তারপর যাত্রাপালা আরম্ভ হবে। রাজা-রাণী-সেপাইদের পোশাকগুলো কী সুন্দর! মঞ্চের দুইধার থেকে স্পটলাইটের হলুদ আলোর উপর লাল-সবুজ-নীল-বেগুনী প্লাস্টিকের খোপ নাড়িয়ে মঞ্চের উপরের আলো পরিবর্তন করা হবে। একেকটা আলোয় রাজা-রাণী-সৈন্যদের পোশাকগুলোর উপর পড়তেই চারদিকে অদ্ভুত আলো ছুটে-ছুটে যাবে। ঝং-ঝং করে তলোয়ারের যুদ্ধ হবে…এরই মধ্যে অনেকে যাত্রা দেখতে দেখতে ঢুলতে-ঢুলতে ঘুমিয়েও পড়বে। প্রতিবার ভাইও ঘুমিয়ে পড়ে। আমি অবশ্য জেগে থাকি।

একটু দূরে পাড়ারই কয়েকটা কাকু নেশা করে তুমুল চিৎকার করছে। মঞ্চে যেমন যাত্রা চলছে, রাস্তার ধারে নেশাগ্রস্ত কাকুগুলোও যেন নিজেদের মধ্যে যাত্রা করছে! আমি আর মঞ্চ দেখছি না। আমি রাস্তার যাত্রা দেখছি। দেখতে পাচ্ছি ঐ যে মংলাকাকু ঐদিকে ছুটে যাচ্ছে, পেছন পেছন আরও কয়েকজন চেনা কাকু। ওরা ছুটে গিয়ে নেশাগ্রস্ত কাকুদের বকছে আর টেনে-হিঁচড়ে জামতলার গলির ভেতর নিয়ে যাচ্ছে। নেশাগ্রস্ত কাকু-গুলোর হাত-পা-মাথা কেমন জানি লটপট করছে। পুতুল নাচের পুতুলগুলোর যেমন করে লটপট করে— অনেকটা তেমন।

ততক্ষণে দূরের আকাশের জমাট অন্ধকারের গা ছিঁড়ে হালকা আভা বের হচ্ছে। যাত্রাপালার ‘বিবেক’ মঞ্চে দাঁড়িয়ে গলা ছেড়ে গান গাইছে। সেই গানটায় প্রবলভাবে নাকের শব্দ শোনা যাচ্ছে। আচ্ছা, যাত্রাপালার ‘বিবেক’-ও কি নাকে নস্যি দেয় ?

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[ পরম্পরা ওয়েবজিন, অক্টোবর ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য