ভারতের রাজনীতিতে এতদিন ধরে শিকড় গেড়ে থাকা জাতপাত, ধর্মীয় বিভাজন আর অন্ধ রাজনৈতিক আনুগত্যের চিরচেনা সমীকরণগুলো আজ কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। প্রথাগত হিসাব-নিকেশ উল্টে দিয়ে কোন জাদুমন্ত্রে আজ দেশের রাজনীতি কাঁপিয়ে তুলছে এই নতুন প্রজন্ম? উত্তরটা লুকিয়ে আছে তাদের হাতে থাকা স্মার্টফোন, মুক্তচিন্তা আর পরিবর্তনের অদম্য জেদের মধ্যে। প্রবীণ রাজনীতিবিদদের পুরনো কৌশল আর দলীয় হিসেবনিকেশকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আজ ভারতের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে অপ্রতিরোধ্য এক নাম—‘জেন-জি’ । সোশ্যাল মিডিয়ার হ্যাশট্যাগ থেকে শুরু করে রাজপথের লড়াই —সবকিছুতেই তারা প্রমাণ করে দিয়েছে যে দেশের রাজনৈতিক ভাগ্য এখন আর পর্দার পেছনের কারবারিদের হাতে নেই।

আর জেন-জি প্রজন্মের এই প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক ক্ষোভের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে উঠেছে—‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের একটি বিতর্কিত মন্তব্য থেকে ট্রোল হিসেবে জন্ম নিয়েছিল এই সংগঠনটি। কিন্তু দেখতে দেখতে তরুণদের হাত ধরে সেই ব্যঙ্গাত্মক সংগঠনটিই হয়ে উঠেছে দেশের নাগরিক অধিকার ও প্রশাসনিক জবাবদিহির সবচেয়ে বড় মঞ্চ। ঠিক সেই সময়েই নির্বাচন কমিশনের ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় বাদ পড়ে কোটি কোটি ভোটারের নাম। ফলে ক্ষোভে ফেটে পড়ে দেশ, আর মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি ওঠে চারিদিকে। এই একটি ইস্যুই যেন দেশের প্রধান বিরোধী দলগুলোকে এক ছাতার তলায় এনে দাঁড় করিয়েছে; অন্যদিকে শাসক দল বিজেপি ও প্রশাসন হয়ে উঠেছে মারাত্মক অসহিষ্ণু ও আক্রমণাত্মক।

সিজেপি ও জেন-জির উত্থান

২০২৬ সালের ১৫ মে, ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত একটি মামলার শুনানিতে দেশের বেকার যুবকদের ‘ককরোচ’ বা আরশোলা বলে কটাক্ষ করেন, এমনকি তাদের ‘পরজীবী’ বলেও মন্তব্য করেন। বিচার বিভাগের এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। এই অপমানকে মেনে না নিয়ে বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী, ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দীপকে এগিয়ে আসেন। তিনি এই চরম অপমানকেই রাজনৈতিক অস্ত্রে বদলে দেন—জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)। তাদের আন্দোলনের দর্শনটা খুব স্পষ্ট: ‘রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের আরশোলা মনে করে, তবে তারা এমন এক অপ্রতিরোধ্য শক্তিতে পরিণত হবে, যাকে কোনো প্রশাসনিক ক্ষমতাই পিষে মারতে পারবে না’।

যুবসমাজের দীর্ঘদিনের সামাজিক-অর্থনৈতিক ক্ষোভগুলোই ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনের প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি করে দেয়। নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের বিরুদ্ধে জুলাই ২০২৬-এ দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপি-র নেতৃত্বে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ সংগঠিত হয়। এই আন্দোলনের চাপে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন, যাকে জেন-জি আন্দোলনের প্রথম বড় রাজনৈতিক জয় হিসেবে গণ্য করা হয়।

ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) প্রথাগত কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নয়, বরং এটি একটি ডিজিটাল নাগরিক আন্দোলন। তবে দলটি গোছানো—তাদের একটি জাতীয় কমিটি আছে এবং অঞ্চলভেদে দায়িত্বও ভাগ করা রয়েছে। আন্দোলনের মূল কাণ্ডারী বা জাতীয় আহ্বায়ক অভিজিৎ দীপকে, আর জাতীয় সচিবের দায়িত্বে আছেন আফরিন নওয়াজ। এছাড়া কার্য-নির্বাহী কমিটিতে রয়েছেন সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কা, অজিঙ্ক্য শিন্দে এবং বিজয় রেড্ডি মাল্লাঙ্গির মতো মুখগুলো। প্রচলিত রাজনীতিকে একপ্রকার ব্যঙ্গ করেই ‘সিজেপি’- র সদস্যপদ দেওয়া হয় একদম বিনামূল্যে। তবে সদস্য হতে গেলে কয়েকটি অদ্ভুত শর্ত পূরণ করতে হয়—আপনাকে বেকার হতে হবে, শারীরিকভাবে অলস হলেও চলবে তবে সামাজিকভাবে সচেতন হতে হবে, দিনে অন্তত ১১ ঘণ্টা অনলাইনে সক্রিয় থাকতে হবে এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুক্তি দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশের ক্ষমতা থাকতে হবে!

মজার এই কাঠামোর আড়ালে সিজেপি কিন্তু অত্যন্ত গম্ভীর ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশাসনিক সংস্কারের দাবি তুলেছে। তারা কোনো গোপন অনুদান গ্রহণ করে না এবং নিজেদের তথ্য অধিকার (আরটিআই) আইনের আওতায় এনে শতভাগ স্বচ্ছ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। তাদের ইশতেহারে রাজনৈতিক দলত্যাগ বন্ধে অভূতপূর্ব কঠোরতার প্রস্তাব করা হয়েছে—কোনো বিধায়ক বা সংসদ সদস্য দল বদল করলে তাঁকে টানা ২০ বছরের জন্য নির্বাচন ও সরকারি পদে নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। তাছাড়া, আদানি ও আম্বানি গোষ্ঠীর মালিকানাধীন গণমাধ্যমের লাইসেন্স বাতিল করে স্বাধীন সাংবাদিকতার পথ তৈরির দাবিও জানিয়েছে তারা। পাশাপাশি বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতায় প্রাক্তন প্রধান বিচারপতির রাজ্যসভায় যাওয়া বন্ধ করা এবং সংসদ ও মন্ত্রীসভায় মহিলাদের ৫০ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব সুনিশ্চিত করার দাবিও তারা তুলেছে।

এসআইআর বিতর্ক ও মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ইস্তফার দাবি

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে ২০২৫-২৬ সালে দেশজুড়ে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়া পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশনের মতে—ভুয়ো, স্থানান্তরিত ও মৃত ভোটারদের নাম বাদ দিয়ে একটি স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরি করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল।

তবে এই প্রক্রিয়ার গলদ ও অভূতপূর্ব ছাঁটাইকে কেন্দ্র করে দ্রুতই তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট তৈরি হয়। পুরো দেশে এসআইআর প্রক্রিয়ায় আনুমানিক ১৩ কোটি (১৩০ মিলিয়ন) ভোটারের নাম বাদ পড়ে। কমিশনের নিজস্ব তথ্য পর্যালোচনা করলেই দেখা যায়, বাদ পড়া ভোটারের ৭১ শতাংশ—অর্থাৎ প্রায় ৯.৫ কোটি নাম কাটা পড়েছে কেবল ‘অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত বা অন্যান্য’ ক্যাটাগরিতে! এছাড়া ২.৭ কোটি ভোটারকে মৃত এবং ১ কোটি ভোটারকে দ্বৈত নাম হিসেবে চিহ্নিত করে বাদ দেওয়া হয়।

গুরুতর অভিযোগ ওঠে যে, কমিশন ‘এরোনেট’ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ব্যবহার করে ঢালাওভাবে ‘ফর্ম-৭’ তৈরি করেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষকে আপত্তির কোনো সুযোগ না দিয়েই নাম মুছে ফেলা হয়। বিশেষ করে নাম বা ঠিকানার ইংরেজি বানানের সামান্য ভুলকে অজুহাত করে সংখ্যালঘু, দলিত, আদিবাসী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নাম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে বিরোধীরা সরব হয়। এমনকি, সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে ‘ফর্ম-৬’ সংশোধনের নোটিশ জারি করা হলে সর্বোচ্চ আদালত নিজেই স্পষ্ট জানিয়ে দেয়—তারা এমন কোনো পরিবর্তনের অনুমোদন দেয়নি।

নির্বাচন কমিশনের ভেতরের নিরপেক্ষতা ও কাজের স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়ে ওঠে এক অভ্যন্তরীণ তথ্যে। জানা যায়, গত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী অন্তত ১৪ বার কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও আদেশের বিরুদ্ধে লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন! তাঁদের স্পষ্ট অভিযোগ ছিল—পূর্ণাঙ্গ কমিশনকে অন্ধকারে রেখে একতরফাভাবে ফাইল অনুমোদন ও নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ভারতের সাবেক নির্বাচন কমিশনার অশোক লাভাসাও প্রকাশ্যে কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতার তীব্র সমালোচনা করেন।

এই অভূতপূর্ব পরিস্থিতির মুখে সিজেপি এবং দেশের প্রধান বিরোধী দলগুলো মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সরব হয়। রাজপথের আন্দোলনের পাশাপাশি কেরল বিধানসভা সর্বসম্মতিক্রমে একটি প্রস্তাব পাস করে তাঁর অপসারণ দাবি করে এবং এসআইআর প্রক্রিয়াকে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার হরণের সামিল হিসেবে চিহ্নিত করে।

বিরোধী সংহতি ও নাগরিক সমাজ

ভোটার তালিকা থেকে কোটি কোটি নাম গায়েব হওয়া এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে জেন-জি আন্দোলন—যা এখন দেশজুড়ে ‘যন্তর মন্তর ২.০’ নামে পরিচিতি পেয়েছে—তা যখন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, ঠিক তখনই কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ‘ইন্ডিয়া’ জোট এটিকে মোদী সরকার ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে এক জাতীয় প্ল্যাটফর্মে রূপ দিতে উদ্যোগী হয়। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী নয়াদিল্লিতে নিজ বাসভবনে ইন্ডিয়া জোটের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে এক জরুরি বৈঠক করেন এবং এই যুব আন্দোলনকে পূর্ণ সমর্থন জানান। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন—ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর ভারতের সাধারণ মানুষের অধিকারের প্রতীক, আর বর্তমান প্রশাসনের স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তে মানুষের কেড়ে নেওয়া গণতান্ত্রিক অধিকার দেশের যুবসমাজই ছিনিয়ে আনবে।

এই যুবজাগরণে সিজেপি-র পাশাপাশি প্রথাগত ছাত্র সংগঠনগুলোর জেন-জি নেতৃত্বও কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (এআইএসএ বা আয়সা)-এর জাতীয় সভাপতি নেহা বোরা এবং স্টুডেন্টস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়া (এসএফআই)-এর কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক তথা ডাকসাইটে নেত্রী ঐশী ঘোষ এখন সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও এসআইআর বাতিলের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ। আন্দোলন চলাকালে দিল্লিতে একাধিকবার আটক হওয়া সত্ত্বেও ২৯ বছর বয়সী নেহা বোরা ‘যন্তর মন্তর ২.০’ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুংকার দিয়েছেন। সম্প্রতি প্রেস ক্লাব অফ ইন্ডিয়ায় সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে, প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিব্বল, প্রশান্ত ভূষণ ও অভিনেতা প্রকাশ রাজের সাথে যৌথ সাংবাদিক সম্মেলন করে নেহা বোরা ও ঐশী ঘোষ। সেখানে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানানো হয়। পরবর্তীতে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর নেতৃত্বে ইন্ডিয়া জোটের সংসদ ভবন ও সুপ্রিম কোর্টমুখী পদযাত্রায় তাঁরা সরাসরি বিরোধী নেতাদের পাশে থেকে জেন-জি সংহতির বার্তা পৌঁছে দেন।

দেশের আঞ্চলিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারাও এই আন্দোলনের সাথে সরাসরি যুক্ত হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম. কে. স্ট্যালিন, দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে) প্রধান উদ্ধব ঠাকরে আন্দোলনকারীদের পক্ষে রাজনৈতিক ও আইনি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে মুম্বাইতে সঞ্জয় রাউত, আদিত্য ঠাকরে ও অনিল পরবের নেতৃত্বে বিশাল বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয় এবং পুলিশি গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ডিএন নগর থানার সামনে ধর্না কর্মসূচি পালিত হয়।

শুধু রাজনৈতিক দলই নয়, সমাজের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক অধিকার কর্মীরাও এই আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ভারতের প্রখ্যাত উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ জঁ দ্রেজ পরিসংখ্যান তুলে ধরে এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কোটি কোটি প্রান্তিক ও পরিযায়ী ভোটারের নাম ছাঁটাইয়ের আইনি ও গাণিতিক গলদ উন্মোচন করেন এবং আন্দোলনকারীদের সাথে রাজপথে নেমে গ্রেপ্তারও হন। তাঁর পাশাপাশি পরিবেশকর্মী সোনাম ওয়াংচুক, কৌতুকশিল্পী কুনাল কামরা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নাসিরুদ্দিন শাহ ও প্রকাশ রাজ, বিশিষ্ট লেখিকা অরুন্ধতী রায়, রাজনৈতিক বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদব, আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ এবং মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধী সরাসরি আন্দোলনে সংহতি জানিয়েছেন। এমনকি দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের প্রবীণ নেতা আন্না হাজারেও যুবসমাজের ক্ষোভকে ন্যায়সঙ্গত আখ্যা দিয়ে সরকারকে দ্রুত দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এর পাশাপাশি ‘এআইএসএ’, ‘এসএফআই’, ‘ডিওয়াইএফআই’ এবং ‘এনএসইউআই’-এর মতো মূলধারার ছাত্র ও যুব সংগঠনগুলো সিজেপি-র সাথে হাত মিলিয়ে রাজপথে এক অভূতপূর্ব ঐক্যের ছবি তৈরি করেছে।

প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস

আন্দোলনের গতি ও ব্যাপকতা হঠাৎ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের গঠিত একটি বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশে দিল্লি পুলিশ কমিশনার এক নজিরবিহীন আদেশ জারি করেন। এতদিন ধরে দেশের প্রধান প্রতিবাদ-স্থল হিসেবে পরিচিত ঐতিহাসিক ‘যন্তর মন্তর’-কে অনুমোদিত প্রতিবাদ স্থানের তালিকা থেকে বাদ বা ‘ডি-নোটিফাই’ করা হয়। বদলে বিকল্প প্রতিবাদ স্থল হিসেবে রামলীলা ময়দান বা বুরারি গ্রাউন্ডের কথা সরকার নির্দেশ দিয়ে জানায়। সিজেপি-সহ আন্দোলনের তরুণ নেতৃত্ব প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে মোটেও সহজভাবে নেয়নি; তারা একে রাজপথের ভিন্নমত ও সোচ্চার কণ্ঠকে আড়াল করার রাষ্ট্রীয় চক্রান্ত বলে এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়।

১৩ অক্টোবর ২০২৬-এর ভোরে যন্তর মন্তরে প্রবেশের কড়া নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই রাজপথে নামেন আন্দোলনকারীরা। সিজেপি নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও অজিঙ্ক্য শিন্দে পার্শ্ববর্তী জনতা দল (ইউনাইটেড) কার্যালয়ের পেছনের গলি দিয়ে লোহার গেট টপকে অবরুদ্ধ এলাকায় ঢুকে পড়েন এবং জাতীয় পতাকা উঁচিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন। দিল্লি পুলিশ সাথে সাথেই তাঁদের গ্রেফতার করে কনট প্লেস ও পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় মামলা দায়ের করে। তাঁদের বিরুদ্ধে সরকারি আদেশ অমান্য করা, বেআইনি অনুপ্রবেশ, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার মতো কঠোর ভারতীয় ন্যায় সংহিতা-র একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়।

পরদিন আদালতে তোলা হলে আশুতোষ রাঙ্কাকে ৫ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজত দেওয়া হয় এবং তাঁকে তিহার জেলের ৪ নম্বর সেলে পাঠানো হয়। অন্যদিকে অজিঙ্ক্য শিন্দেকে আগামী ৬ মাসের জন্য শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার শর্তে ৫,০০০ টাকার ব্যক্তিগত বন্ডে মুক্তি দেওয়া হয়।

আন্দোলন দমন করতে দিল্লি পুলিশ বিমানবন্দর থেকে সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং সিজেপি-র কার্য নির্বাহী কমিটির সদস্য ও তরুণ নেতা সৌরভ দাসকে বিমানের ভেতরেই প্রতিরোধমূলক আটক করে। তাঁদের বহনকারী বিমানটি দিল্লি বিমানবন্দরে অবতরণ করার পরপরই পুলিশ সোজা বিমানের কেবিনে প্রবেশ করে এবং তাঁদের আটক করে। চলন্ত বা সদ্য অবতরণ করা বিমান থেকে এভাবে নেতাদের আটক করার ঘটনা দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল বিধি ও নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে এক নতুন আইনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পরবর্তীতে সৌরভ দাসকেও বিচার বিভাগীয় হেফাজতের নামে তিহার জেলের ২ নম্বর সেলে পাঠানো হয়।

প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে পাল্টা কৌশল নেয় শাসক দল বিজেপি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)। আরএসএস-এর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অতুল লিমায়ে মন্তব্য করেন—শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ যুক্তিযুক্ত হলেও উগ্র বামপন্থী গোষ্ঠীগুলো নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে একে ব্যবহার করছে। অন্যদিকে, আমেরিকান গায়িকা মেরি মিলবেনের সাথে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিজিৎ দীপকের বাকবিতণ্ডাকে অস্ত্র করে শাসক শিবির দাবি করে—এই আন্দোলনের পেছনে বিদেশি অর্থায়ন থাকতে পারে। সরকারের পক্ষে সাফাই গেয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজু জানান, একটি স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরির জন্য ভুয়া নাম বাদ দেওয়া ছাড়া উপায় নেই, তাই এসআইআর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ সঠিক ও অপরিহার্য। একই সময়ে দেশের ১২৪ জন প্রাক্তন আমলা ও কূটনীতিক যৌথ চিঠি দিয়ে নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা রাখার এবং সাধারণ মানুষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান।

রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক প্রভাব

নির্বাচন কমিশনের নথি বিতর্কের আবহ তৈরি হতেই জেন-জি আন্দোলন এবং বিরোধী জোটের রাজপথের প্রতিবাদ যেভাবে একে অপরের সাথে মিশে গেছে—তা ভারতের রাজনীতি, শাসনব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে এক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

প্রথমত, প্রথাগত রাজনীতির বাইরে গিয়ে ডিজিটাল নেটওয়ার্কের এক অভূতপূর্ব শক্তি সামনে এসেছে। বিশাল রাজনৈতিক ফান্ড বা শক্ত সাংগঠনিক কাঠামো ছাড়াই কেবল ডিজিটাল মিম, রাজনৈতিক ব্যঙ্গ আর তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে কীভাবে দ্রুত বিশাল আন্দোলন গড়ে তোলা যায়, তা প্রমাণিত হলো। সিজেপি, এআইএসএ ও এসএফআই -এর তরুণ নেতৃত্ব যেন আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল, বহু পুরোনো দলীয় রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরেও বিকল্প নাগরিক শক্তি গড়ে তোলা সম্ভব।

দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশনের স্বায়ত্তশাসন ও সাধারণ মানুষের আস্থায় এক বড় আঘাত লেগেছে। কমিশনের নিজস্ব কমিশনারদের অভ্যন্তরীণ মতভেদ, সুপ্রিম কোর্টের কড়া নজরদারি এবং কোটি কোটি ভোটারের নাম ছাঁটাইয়ের ঘটনায় কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে চরম সংশয় তৈরি হয়েছে। ফলে আগামী নির্বাচনগুলোর নিরপেক্ষতা ও তার ফলাফল কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠে গেল।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনেও ভারতের ভাবমূর্তি নতুন প্রশ্নের মুখে পড়েছে। জাতিসংঘের তিনজন বিশেষ প্রতিনিধি ভারতের এই এসআইআর প্রক্রিয়া ও মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো বৈশ্বিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো আন্দোলনকারীদের ওপর দমনপীড়নের তীব্র সমালোচনা করেছে। এমনকি যুক্তরাজ্য সরকারের বাণিজ্যিক প্রতিনিধি দলের প্রধান জনি রেনল্ডস দিল্লি সফরে এসে এই প্রশাসনিক বলপ্রয়োগের বিষয়টি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে তুলেছেন। যদিও ভারত সরকার একে ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে, তবুও আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক সূচকে ভারতের অবস্থান ও বিদেশি বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্বজুড়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে।

উপসংহার

২০২৬ সালে ‘সিজেপি’-র উত্থান, ‘জেন-জি’-দের লড়াই এবং ‘এসআইআর’ বিতর্ক—সব মিলিয়ে ভারতের গণতন্ত্রে এক গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিচার বিভাগের একটি অবমাননাকর মন্তব্যকে ঘিরে তৈরি হওয়া ব্যঙ্গাত্মক প্রতিবাদ যেভাবে ভোটাধিকার রক্ষা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার জাতীয় ইস্যুতে রূপ নিল, তা ভারতের তরুণ প্রজন্মের অভূতপূর্ব রাজনৈতিক সচেতনতা ও উদ্ভাবনী শক্তিরই প্রমাণ। যন্তর মন্তরের মতো ঐতিহাসিক প্রতিবাদ স্থান বন্ধ করা, শীর্ষ নেতাদের ওপর কঠোর ফৌজদারি ধারা বসানো কিংবা তিহার জেলে পাঠানোর মতো প্রশাসনিক পদক্ষেপে রাজপথের আন্দোলন সাময়িকভাবে থমকে যেতে পারে, কিন্তু জনঅসন্তোষের মূল কারণগুলোকে মোটেও মুছে ফেলা যায় না।

রাষ্ট্র যদি প্রশাসনিক কঠোরতার পথ ছেড়ে নাগরিক অধিকার, নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ফিরিয়ে না আনে—তবে এই রাজপথের ক্ষোভ দীর্ঘমেয়াদে ভারতের অভ্যন্তরীণ স্থায়িত্ব ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উভয়কেই বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলবে।

বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক সংহতি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর গভীর উদ্বেগ ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই সংঘাত আর কেবল কোনো স্থানীয় প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাই এই স্বৈরাচারী বিজেপি সরকারকে সরিয়ে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনতে হলে, আগামী নির্বাচন পর্যন্ত জেন জি-কে সামনে রেখে বিরোধী শক্তিকে এই ঐক্য ধরে রাখতেই হবে। সব আঞ্চলিক দাবি ও দলীয় স্বার্থ দূরে সরিয়ে রেখে দেশ বাঁচাতে এখন একজোট হওয়া ছাড়া আর কোনো পথ নেই।

সহযোগিতার হাত বাড়াতে ওপরের ছবিতে ক্লিক করুন

[লেখকের পূর্ব রচনা]

[পরম্পরা ওয়েবজিন, নভেম্বর ২৬, সূচিপত্র – এখানে ক্লিক করুন]

0 0 ভোট
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
পংক্তির ভেতর মন্তব্য
সব মন্তব্য